মাদাম বোভারি, আন্না কারেনিনা, রবীন্দ্রনাথের কুমু ও আজকের বাংলাদেশের মিতু


নিউজটি শেয়ার করুন

অদিতি ফাল্গুনী

১৮৫৬ সালে ফরাসী সাহিত্যিক গুঁস্তাভ ফ্ল্যবেয়ার যখন ‘মাদাম বোভারি’ উপন্যাসের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করেন, গোটা দেশ জুড়ে উপন্যাসটি নিয়ে নিন্দার ঝড় ওঠে। উপন্যাসের নামচরিত্র মাদাম বোভারি মফস্বলী জীবনের তুচ্ছতা ও শূন্যতা এড়াতে সাধ্যের অতীত এক জীবন যাপনে অভ্যস্ত হয়ে যায়। অক্টোবর ১, ১৮৫৬-১৫ ডিসেম্বর ১৮৫৬ সাল নাগাদ উপন্যাসটি যখন প্রথম একটি পত্রিকায় ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হয়, তখন পাবলিক প্রসিকিউটররা অশ্লীলতার দায়ে লেখকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। ১৮৫৭ সালের জানুয়ারি মাসে উপন্যাসের জন্য লেখক আদালতে গেলে উপন্যাসটি বাস্তবিক বিখ্যাত হয়ে ওঠে। ১৮৫৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে ফ্লবেয়ার আদালত থেকে ছাড়া পেলে এপ্রিল নাগাদ বইটি বেস্ট সেলার হয় এবং এটা ফ্লবেয়ারের জীবনের মাস্টারপিস ও ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী সাহিত্যকৃতি হিসেবে বিবেচিত হয়।

ফ্রান্সের উত্তরের এক মফস্বল শহরে মাদাম বোভারি থাকতেন, নর্ম্যান্ডির রুয়ে শহরের পাশে। তাঁর স্বামী চার্লস বোভারি কৈশোরে ছিল এক লাজুক ও কিম্ভুতকিমাকার পোশাক পরা ছেলে যে স্কুলে গেলে সহপাঠীরা তাকে ঠাট্টা করতো। বহু কষ্টে চার্লস পরে দ্বিতীয় সারির একটি ডাক্তারি ডিগ্রি অর্জন করে এবং পাবলিক হেলথ সার্ভিসে ‘অফিসার দ্যু সন্তে’ বা স্বাস্থ্য অফিসার হিসেবে নিয়োগ পায়। মা’র পছন্দ অনুযায়ী হেলোইস দ্যুবাক নামের এক ধনাঢ্য বিধবাকে বিয়ে করে চার্লস এবং টোটস গ্রামে ডাক্তারি করা শুরু করে।

টোটস গ্রামেই এক খামারবাড়িতে খামারের মালিকের পা ভেঙ্গে গেলে চার্লস তাঁকে দেখতে যায়। রোগীর মেয়ে এম্মা হুলোতের সাথে সেখানেই তার পরিচয় হয়। সুন্দরী ও সুসজ্জিতা এম্মা কনভেন্টে ‘ভাল শিক্ষা’ পেয়েছে। জনপ্রিয় উপন্যাসে পড়া বিলাস বহুল ও রোমান্টিক জীবনের জন্য এম্মার রয়েছে গভীর বাসনা। চার্লস প্রেমে পড়ে এম্মার এবং দরকারে-অদরকারে এম্মার বাবার পা ভাল হয়েছে কিনা বা ভাল হলেও কতটা ভাল হয়েছে এসব দেখতে যায়। তবে বিধবা স্ত্রী হেলোইস ঈর্ষাকাতর হয়ে পড়লে চার্লস কিছুদিনের জন্য বিরতি দেয়।

সহসা হেলোইসের অপ্রত্যাশিত মৃত্যু হলে চার্লস কিছুদিন অপেক্ষার পর (যেমনটা দম্পতির কারো মৃত্যু হলে প্রতীক্ষা করা সমীচীন) এম্মার বাবার কাছে তাঁর কন্যার পাণিপ্রার্থনা করে। এম্মার বাবা খুশি হয়েই রাজি হন এবং এম্মা ও চার্লস বিয়ে করে।

এরপরেই উপন্যাসে এম্মাকে নিয়ে কাহিনী জমে ওঠে। চার্লস টাকা-কড়ি ভালই আয় করে, পরিশ্রমী তবে দেখতে অসুন্দর। একবার মার্ক্যুইস দ্যু আন্দেরভিলিয়েস কর্তৃক প্রদত্ত একটি বল নাচের আসরে গেলে চারপাশের অভিজাত নর-নারীর চাকচিক্যে এম্মার কাছে নিজের বিবাহিত জীবন খুবই ক্লান্তিকর এবং অবসন্ন বোধ হয়। স্ত্রীর ক্রমাগত অবসাদ লক্ষ্য করে চার্লস তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে একটি অপেক্ষাকৃত বড়সর শহর ইয়োনভিলে গিয়ে বসবাস এবং ডাক্তারি করা শুরু করে। এখানে এসে বার্থে নামে এক কন্যা সন্তানের জন্ম দিলেও মাতৃত্ব তাকে জীবনের প্রতি আরো বিরূপ করে তোলে। ইয়োনভিলে এসেই এম্মার সাথে এক বুদ্ধিমান তরুণ যুবকের পরিচয় হয়। আইনের ছাত্র লিও দ্যুপুই এম্মার সাথে সাহিত্য, সঙ্গীত ও শিল্পকলা নিয়ে আলোচনা করে এবং মাদাম বোভারি তার আত্মপ্রত্যয় ফিরে পায়।

তবে শুরুতেই বিবাহিত জীবনের শপথ ভঙ্গ করতে চায়নি এম্মা। লিওর জন্য নিজের আবেগকে লুকোয় সে, লুকোয় চার্লসের জন্য অবজ্ঞা। নিজেকে ‘সতী’ নারী ভেবে তৃপ্তি বোধ করে। নিরাশ লিও উচ্চতর পড়া-শোনার জন্য প্যারিস শহরে চলে যায়।

এরপরপরই অভিজাত এবং লম্পট ধনী রুদলফ ব্যুলোজেঁ একদিন চার্লসের চেম্বারে তাঁর রক্তাক্ত ভৃত্যকে নিয়ে আসে। চেম্বারে সুন্দরী এম্মাকে দেখে রুদলফের মনে হয় যে এম্মাকে সহজেই সে মুগ্ধ করতে পারবে। এম্মাকে স্বাস্থ্যোদ্ধারের জন্য একসাথে অশ্মারোহণের প্রস্তাব দেয় রুদলফ। চার্লস স্ত্রীর স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগের কারণে সাথে সাথে রুদলফের প্রস্তাবে রাজি হয়। এম্মা ও রুদলফের প্রেম শুরু হয়। চার বছর প্রেমের পর এম্মা রুদলফের সাথে পালাতে চাইলে রুদলফ রাজি হয় না। দ্রুতই সে সর্ম্পকের ইতি টানে এবং এপ্রিকট ফলের একটি ঝুড়িতে ক্ষমা চেয়ে একটি বিদায়ী চিরকূট দেয় সে এম্মাকে। এই ঘটনার মানসিক অভিঘাতে এম্মা প্রায় মৃত্যুশয্যা নেয় এবং কিছুদিনের জন্য ধর্ম-কর্মে মন দেয়।

যাহোক, সুস্থ হবার পর চার্লস স্ত্রীকে নিয়ে অপেরায় বেড়াতে গেলে সেখানে লিওর সাথে পুনরায় এম্মার দেখা হয়। এবার লিওর সাথে প্রেম শুরু হয় মাদাম বোভারির। পিয়ানো বাদন শেখার নাম করে প্রতি সপ্তাহে এম্মা লিওকে দেখতে অন্য এক শহরে বেড়াতে যায়। একটি হোটেলের নির্দিষ্ট এক কক্ষে নিয়মিত মিলিত হয় তারা। শুরুতে প্রেমের আবেশে আচ্ছন্ন থাকলেও এম্মার ভাবালুতায় একটা সময় লিও বিরক্ত হতে শুরু করে এবং এম্মা সম্পর্ক নিয়ে পুনরায় অনিশ্চিত হতে থাকে। এসময়েই নানা প্রকার বিলাসদ্রব্য ক্রয়ে এম্মার একটি ঝোঁক তৈরি হয় এবং বণিক লহরোজের কাছ থেকে ধারে নানা বিলাসদ্রব্য সে কিনতে থাকে। লহরোজ একাজে এম্মাকে সহায়তা করার জন্য কৌশলে চার্লসের সম্পত্তির ‘পাওয়ার অফ এ্যাটনি’ পেতে সাহায্য করে। এম্মার দেনা বাড়তে থাকে।

এতকিছুর পরও এম্মার দেনা একসময় এতই বিপুলায়তন হয় যে লহরোজ দেনা শোধের জন্য তীব্র চাপ দেয়। প্রাক্তন প্রেমিক লিও এবং রুদলফের কাছে টাকার জন্য অনুনয় করে ব্যর্থ হয় এম্মা। হতাশ এম্মা আর্সেনিক পান করে করুণ মৃত্যু বরণ করে। চার্লস এম্মার জন্য গভীর শোকে নিমজ্জিত হয়। এম্মার কক্ষকে বেদীর মত সংরক্ষণ করতে চায় সে। লহরোজের কাছে দেনা পরিশোধে চার্লস তার সব সম্পত্তি বিক্রি করতে থাকে। এরই ভেতর বজ্রাঘাতের মত রুদলফ ও লিওকে লেখা এম্মার প্রেমপত্রগুলো পড়ে একদমই ভেঙ্গে পড়ে চার্লস। দ্রুতই মৃত্যু হয় তার। কন্যা বার্থেকে নেয় তার পিতামহী এবং পিতামহীও বেশিদিন বাঁচেন না। বার্থেকে পাঠানো হয় বাবার এক দরিদ্র বোনের কাছে যে মেয়েটিকে তুলা কারখানায় কাজ করতে পাঠায়। উপন্যাসটি শেষ হয় চার্লসের মৃত্যুর পর সেই মফস্বল শহরে হোমেইস নামে এক স্থানীয় ফার্মেসিস্টের ডাক্তারিতে পসার অর্জনের মাধ্যমে।

‘বিদেশের নিষিদ্ধ উপন্যাস’ শিরোনামে বাংলা অনুবাদে ‘মাদাম বোভারি’ প্রথম পড়ি মাত্র চোদ্দ বছর বয়সে। বলা চলে তখন একদমই ভাল লাগে নি। নারীকে হতে হবে ‘সীতা-সতী-সাবিত্রি’র মত পূণ্যবতী, পতিভক্ত এমন সব শিক্ষা মা-মাতামহীর কাছ থেকে পেয়েই এ প্রাচ্যের সমাজে একটি কিশোরী বড় হয়। কাজেই সেই বয়সে এটা ছিল ‘কালচারাল শক।’ আপাত:দৃষ্টে লেখক ফ্ল্যবেয়ারকেও মনে হচ্ছে যেন নারী-বিদ্বেষী। আটঘাট বেঁধেই কি এক সরল স্বামীর প্রতারিত হবার কাহিনী লিখছেন? আজ এই বয়সে এসে একটু ভেবে দেখলে বোঝা যায় ফ্ল্যবেয়ার আসলে লিখেছেন যুগসন্ধিক্ষণের ফরাসী নারীর কাহিনী। ফরাসী বিপ্লবের ৬৩ বছর পরের এই সমাজে মধ্যবিত্ত সমাজে এম্মার মত তরুণীরা কনভেন্টে লেখা-পড়া শিখতে পারছে তবে চাকরি করার রেওয়াজ তখনো দূর অস্ত। ইউরোপেই নারীর ভোটাধিকার ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার অধিকার পেতে বিংশ শতকের শুরু অব্দি সময় লেগে গেছে। পশ্চিমের নারী তখন শিল্প-সাহিত্য সম্পর্কে জানতে পারে, পিয়ানো শিক্ষার অধিকার আছে, স্বামীর সাথে অপেরা দেখতে যেতে পারে। তবে, পেশা হিসেবে অপেরায় অভিনয় করা, নাচা বা গান গাওয়া তখনো ‘ভদ্র ঘরের’ মেয়েদের জন্য নিষিদ্ধ। নারীর জন্য তখনো একমাত্র ‘বৃত্তি’ বা জীবিকা হলো বিয়ে। কদাকার দর্শন চার্লস যে শিল্প-সাহিত্য সম্পর্কে যথেষ্ট অবগত নয়, তার সাথে শুধুই ‘সতী ধর্ম’ রক্ষার শপথ বেশিদিন চালাতে পারে না এম্মা। প্রশ্ন উঠতে পারে সেসময় এম্মার মত অনেক নারীই হয়তো সংসার ধর্ম তবু চালিয়ে গেছিল। সে তো’ গ্যাছে। কিন্তÍ যে মেয়ে সত্যিই চেয়েছিল বিকশিত হতে অথচ সমাজে তার কোন পথই খোলা ছিল না…সে হয়তো পরে ব্যভিচারে বা বিলাস দ্রব্য ক্রয়ের মাধ্যমেই ভুলে থাকতে চেয়েছে জীবনের সব তুচ্ছতা?

নারীর প্রতারণা বা স্ত্রী/সঙ্গীনীর অবিশ্বস্ততা নিয়ে পুরুষ চিন্তিত সহস্রাব্দ ধরে। জাতকের গল্পে, পঞ্চতন্ত্রে, বোকাচ্চিওর ডেকামেরন বা চসারের ‘ক্যান্টারবেরী টেলস’-এ স্ত্রী কত ভয়াবহ প্রতারণাকারীনী হতে পারে সেটা নিয়ে পুরুষ লেখক সদা চিন্তিত। ‘আলিফ লায়লা ওয়া লায়লা’-য় বাদশাহ শাহরিয়ার নারী জাতির প্রতারণায় ক্রুদ্ধ হয়ে প্রতিদিন বিয়ে করে নববধূকে হত্যা করেন এবং সেই নারীমেধ ঠেকাতে বুদ্ধিমতী মন্ত্রী বা উজিরের মেয়ে শেহেরজাদি তার এক হাজার ও এক রাতের গল্পে বাদশাহের মন থেকে মুছে ফেলেন নারী-বিদ্বেষ। ‘রামায়ণ’-এ রাক্ষসরাজ রাবণ সীতাকে বন্দী করে অশোক কাননে আবদ্ধ করে রাখলেও সীতাকে ধর্ষণ করতে পারেন না। কারণ ইতোপূর্বে বেদবতী নামে এক নারী তার হাতে ধর্ষিত হবার পর আগুনে আত্মত্যাগের আগে বলেছিল ভবিষ্যতে কোন নারীকে বলপ্রয়োগ করতে গেলে রাবণের দশ মুন্ড সাথে সাথে খসে পড়বে। তরুণ, একনিষ্ঠ রামকে ছেড়ে বৃদ্ধ প্রায় রাক্ষসরাজ তার সব সম্পদের প্রতিশ্রুতি দিয়েও সীতার মন পাবেন না এটাই স্বাভাবিক। শ্বেতাঙ্গিনী সীতার বর্ণ গরিমাও হয়তো ছিল দ্রাবিড় রাবণকে গ্রহণের প্রশ্নে। তা’ এমন সতী ধর্ম রক্ষার পরেও যুদ্ধের পরপরই বিজয়ী রাম সবার সামনেই কটু কথা বলেন সীতাকে। আগুনে ঝাঁপ দিয়ে নিজের সতীত্ব পরীক্ষায় বিজয়ী হন সীতা। ইদানীং মনে প্রশ্ন আসে আসলে এই অগ্নি পরীক্ষা কি ‘টু ফিঙ্গার টেস্ট’ জাতীয় কিছু ছিল? হয়তো বিভীষণের স্ত্রী সরমাই করেছিলেন? শুধু যে কুমারীর যোনিপথ শক্ত ও দূর্ভেদ্য হয় তা’ নয়, দীর্ঘ অনভ্যাসে বহুদিনের একাকী জীবন যাপন করা সধবারও যোনিপথ ঠিক কুমারীর মত না হলেও নিয়মিত সঙ্গমে অভ্যস্ত নারীর থেকে কিছুটা শক্ত হবে বলে আধুনিক মেডিক্যাল সায়েন্স জানাচ্ছে। অবশ্য কুমারীর যোনিপথই যে প্রথম মিলনেই রক্তাক্ত হবে এমনো নয়। ‘নারী’-তে প্রকাশিত একটি নিবন্ধেই পড়েছি কিছু নারীর সতীচ্ছদ খেলা-ধূলা, সাইকেল চালনা, অত্যধিক ভ্রমণ এমনকি মাসিক রজস্রাবের সময় তুলার প্যাড বা শক্ত কাপড়ের ঘর্ষণেও ক্ষয় হয়। আবার কিছু নারীর (প্রায় ৩০ শতাংশ নারীর) সতীচ্ছদ বহু বার সঙ্গমেও ছেঁড়ে না বা রক্তাক্ত হয় না। সম্ভবত: গ্রীক পুরাণে ট্রোজান রাজকুমারী ক্লাইটেমেনেস্ট্রাকে দেবতা ও প্রেমিক এ্যাপোলো বর দিয়েছিলেন যে শত সঙ্গম বা এমনকি ধর্ষণেও ক্লাইটেমেনেস্ট্রার সতীচ্ছদ ছিঁড়বে না- এটার একটা বৈজ্ঞানিক ব্যখ্যা পাওয়া গেল। একারণেই ক্লাইটেমেনেস্ট্রাকে নিয়ে গ্রীক শিবিরে ছিল তুমুল উত্তেজনা। যুদ্ধ জয়ের পর ক্লাইটেমেনেস্ট্রাকে পেতে গ্রীক সেনাপতিরা অস্থির। এডিথ হ্যামিলটনের অসামান্য অনুবাদে (গ্রীক থেকে ইংরেজি) ‘ট্রোজান উইমেনে’ ক্লাইটেমেনেস্ট্রার এই চিরকুমারী থাকার যে রহস্য ষোল বছরের আমাকে প্রচন্ড অবাক করেছিল, সেটা আজ ঘুচে যাচ্ছে।

মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসি। আমার লেখার শিরোনামে ‘মাদাম বোভারি-আন্না কারেনিনা-কুমু’ আলোচনার তিন নারী হলেও সঙ্গত ভাবেই আলোচনায় প্রাচীন যুগ থেকে অদ্যাবধি বিশ্ব সাহিত্যের নানা নারী চরিত্রই আলোচনায় আসবে। সীতার প্রসঙ্গে আর একটু বলি। প্রথমবার অগ্নিপরীক্ষার পর প্রাসাদে তো ফিরতে পারলেন সীতা। তবে, প্রজাদের সন্দেহ আর কানকথায় ‘লোক ধর্ম’ রক্ষায় ‘সত্য ধর্ম’ বিসর্জন দেন রাম এবং সীতাকে পুনরায় অরণ্যে পাঠানো হয়। বাংলার কবি কৃত্তিবাস যখন এই রামায়ণ বাংলায় পুনসৃজন করেন, তখন নর-নারী সম্পর্কের জটিলতা ও পুরুষ মনস্তত্বের একটি দূর্দান্ত, বাড়তি সংযোজন করেন তিনি। কৃত্তিবাস দেখাচ্ছেন একদিন নদীর ঘাটে গিয়ে দুই ধোপার মুখে স্ত্রীর চরিত্র নিয়ে কটু কথা শুনে অবসন্ন মনে রাম যখন দুপুর বেলা বিশ্রাম নিতে প্রাসাদে ঢুকলেন, তার কিছু আগেই সীতা প্রাসাদে সঙ্গীনীদের অনুরোধে রাক্ষসরাজা রাবণ কেমন দেখতে তার উত্তরে জানান যে লঙ্কায় চোদ্দ বছরে একবারও রাক্ষসরাজার মুখের দিকে তিনি তাকান নি। তবে, রাবণ যখন সীতাকে অপহরণ করে পুষ্পক রথে তুলে সমুদ্রের উপর দিয়ে পার হচ্ছিলেন, তখন অবনতমুখী সীতা সমুদ্রের জলে যে দশ মাথা আর বিশ হাত বিকট রাক্ষসকে দেখেছিলেন, তারই একটি ছবি তিনি চকখড়ি দিয়ে প্রাসাদের মেঝেতে আঁকেন। সঙ্গীনীরা চলে গেলে পর গরমের দিনের উত্তাপে গর্ভবতী সীতা ছবিটির পাশেই ঘুমিয়ে পড়েন। এদিকে রাম তখনি ঘরে ঢুকে এ দৃশ্য দেখে ঈর্ষা কাতর হন এবং সীতার নির্বাসন নিশ্চিত হয়। চোদ্দ বছর পর পুনরায় দুই পুত্রের কল্যাণে আবার রাজধানীতে ফিরতে পারলেও সতীত্ব প্রশ্নে তাঁকে আবার অগ্নি পরীক্ষার আদেশ করা হলে তিনি অপমান ও লজ্জায় জীবনে প্রথম বারের মত বিদ্রোহ করেন এবং চিরদিনের মত পাতালে প্রবেশ করেন। তুলনায় গ্রীসের হেলেন ভাগ্যবতীই ছিল বলতে হবে। কুরূপ ও বয়সী মেনিলাসকে ছেড়ে তরুণ ও সুন্দর দেখতে প্যারিসের সাথে সে পালিয়ে যায় এবং বহু বছর প্যারিসের সাথে বসবাসের পর যুদ্ধে ট্রয়ের পরাজয় হলে মেনিলাস তাকে আবার ফিরিয়ে নেয়। নারীর সতীত্ব নিয়ে প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের পুরুষের কড়াকড়ি মাত্রায় বরাবরই যে প্রভেদ ছিল, সেটা এখানে স্পষ্ট। সম্প্রতি আমি অবশ্য আমার একাধিক কবিতায় এবং আসন্ন একটি উপন্যাসিকায় হেলেনের নতুন নির্মাণ করতে চাচ্ছি। হেলেন কি অবিশ্বস্ত ছিল? নাকি মেনিলাসের উদাসীনতা, নিস্পৃহতা, প্রেম প্রকাশে ব্যর্থতা তাকে অবিশ্বস্ত করে তুলেছিল?

এবার আসি আন্না কারেনিনার প্রশ্নে। ১৮৭৮ সালে প্রকাশিত কাউন্ট লিও তলস্তয়ের এই উপন্যাসে অভিজাত কূটনীতিক কাউন্ট কারেনিনের থেকে বয়সে বিশ বছরের ছোট ও সুন্দরী স্ত্রী আন্না তার নারীপ্রিয় আপন ভাই প্রিন্স অবলনস্কির সংসার রক্ষায় ট্রেনে চেপে পিটাসবুর্গ থেকে মস্কো চলেছেন। স্টেশনে নামতে দেখা হয় যুবক ও সেনা কমকর্তা কাউন্ট ভ্রনস্কির সাথে যে তার মা’কে নিতে এসেছে। আন্না যে কিনা সেই যুগেই জন্ম নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালায় দেহটি সুন্দর রাখতে কারণ সে সত্যিই চায়না ভ্রাতৃবধূ ডলির মত একটির পর একটি সন্তানের জন্ম দিতে দিতে অমন কদাকার হয়ে যাক সে দেখতে। সাদাসিধা ভ্রাতৃবধূকে তার ভাই অবলনস্কি যে আজো ভালবাসে সেটা নানাভাবে বোঝাতে সক্ষম হয় আন্না। সন্ধ্যায় বলনাচের আসরে ডলিরই ছোট বোন ও আঠারো বছর বয়সের তরুণী কিটি যার মা চাইছেন বয়সে খানিকটা বড় ও গ্রামে থাকা জমিদার কাউন্ট লেভিনের বদলে যুবক সেনা অফিসার ভ্রনস্কির সাথে বিয়ে দিতে ও কিটিরও পছন্দ ভ্রনস্কিকেই- কিটিকে বেদনাহত করে ভ্রনস্কি নাচতে শুরু করে সাত বছরের পুত্র সন্তানের মা আন্নার সাথে। তারপরের কাহিনী অনেকেরই জানা। ভ্রনস্কি কিন্তÍ আন্নার জন্য কম ত্যাগ স্বীকার করে না। চাকরি ছাড়া থেকে আত্মহত্যার চেষ্টা- কি না সে করে নি? ভ্রনস্কির সাথে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে আন্না। পাঠক হিসেবে রুদ্ধশ্বাস হবার উপক্রম হয় যখন স্বামী কারেনিনের ঘরেই ভ্রনস্কির সন্তান জন্ম দিচ্ছে আন্না আর প্রসূতির শয্যার সামনে প্রেমিক আসছে, আসছে স্বামী কারেনিনও। স্বামী কারেনিন এলে অনুতপ্ত আন্না প্রেমিককে বলে তার মহান স্বামী কারেনিনের কাছে ক্ষমা চাইতে। শীতল কূটনীতিক কারেনিন তবু স্ত্রীকে বিয়ে বিচ্ছেদ করতে রাজি হন না। ভ্রনস্কি উন্মত্ত হয়ে পড়ে: ‘আমার যত সন্তান হবে, সব নিয়ম অনুযায়ী হবে ঐ কারেনিনের।’ মনে পড়ে এঙ্গেলস যখন ‘কোড অফ নেপোলিয়ন’ থেকে উদ্ধৃত করছেন যে ‘বিবাহ যতদিন বিদ্যমান থাকে, ততদিন স্ত্রীর গর্ভজাত সব সন্তানকে স্বামীর সন্তান হিসেবে ধরে নেওয়া হবে?

নানা ঝক্কি-ঝামেলা করে আন্না অবশেষে সংসার ছাড়ে ভ্রনস্কির জন্য। পুত্র সেরিওজার জন্যও আছে অনুতাপ। ব্যভিচারীনী নারী হিসেবে তার সাথে কেউ মিশতে চায় না। ভ্রনস্কির কিন্তÍ গ্রহণযোগ্যতার কোন সমস্যা হয় না। দিন দিন খিটখিটে মেজাজের আর সন্দেহপ্রবণ আন্না একটা সময় আত্মহত্যা করে।

আন্নার ভাগ্যও আসলে মাদাম বোভারির ভাগ্য থেকে খুব আলাদা নয়। যদিও সে আরো অভিজাত সমাজের নারী। এত শিক্ষা-দীক্ষা, অশ্বারোহণ, বল নাচ বা পিয়ানো বাদন জেনে কি লাভ ছিল সেই নারীদের? তখনো তারা জীবিকা বেছে নিতে পারত না, পেশা হিসেবেই পিয়ানো বাদন বা অশ্ম চালনা নেবার সম্ভাবনা ছিল না। ভেতরের গভীর কোন শূন্যতাই কি এদের এমন তাড়িত করেছিল?

রবীন্দ্রনাথ তলস্তয়ের ‘আন্না কারেনিনা’ পড়ে খুবই অপছন্দ করেছেন। মানুষ এত ‘অসুস্থ’ লেখা লেখে কিভাবে এটা ভেবেও অবাক হয়েছেন তিনি। তবু তাঁর ‘ঘরে বাইরে’ উপন্যাসে জমিদারের স্ত্রী বিমলা কিছুটা জড়িয়ে পড়ে স্বামীরই ভন্ড রাজনীতিক তথা স্বদেশী বন্ধু সন্দীপের সাথে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর পক্ষে যতটা সম্ভব ভাষার শুচিতা ও শালীনতা রক্ষা করেই লিখেছেন এবং সত্যজিত রায় চূড়ান্ত সাহসী হয়ে অভিনয়ে সৌমিত্র ও স্বাতীলেখার একাধিক চুম্বন দৃশ্য দেখিয়েছেন। এর বেশি সাহস করেননি। সাহস করলেও সেটা বাস্তবোচিত হত না সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে। উপন্যাসের শেষটায় ‘বাইরে’ থেকে অনুতপ্ত বিমলাকে আবার ফিরতে হয় ‘ঘরে।’ রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘লিপিকা’তেও মেয়েদের ‘সীমাস্বর্গের ইন্দ্রানী’ করে রেখেছেন। ‘নষ্টনীড়ে’ অমল পলাতক হয়। ভূপতি আর চারুর সংসার ‘নষ্টনীড়’ হয়েই থাকে। হয়তো এটা খানিকটা রবীন্দ্রনাথের আত্মজীবনীমূলক লেখাও বটে। এবার আসি ‘যোগাযোগ’ উপন্যাসে যেটাকে রুশ সাহিত্য সমালোচকরা তাঁর সেরা উপন্যাস মনে করেন। পড়ন্ত সামন্ত ভূস্বামী বিপ্রদাসের ছোট বোন কুমু যে কিনা রুচিবান দাদার কাছ থেকে সেতার শেখা থেকে ইংরেজি কবিতা পড়া সমেত নানা কলাবিদ্যা অর্জনের পরও পড়ন্ত অবস্থার কারণেই নব্য পুঁজির মালিক, বয়সী ও কুরূপ মধুসূদনকে বিয়ে করতে রাজি হয়। তারপর? কুমু ত’ তার ছোট জায়ের মত নয় যে বাল্য বিবাহ হয়েছে। উনিশ বছরের শিক্ষিত, রুচিশীল তরুণী ইচ্ছার বিরুদ্ধে যখন স্বামীকে মনের সাথে তীব্র লড়াই করতে করতে বলে, ‘শোবে এসো’- সেটা যেন স্বেচ্ছা ধর্ষিতা হবার গল্পের মতই লাগে। বিয়ের আসরে মধুসূদনের পাশে কুমুকে দেখে যে হিংসা কাতর যুবকেরা দৈত্যের লক্ষী পাওয়ার শোকে আচ্ছন্ন হয়- কতবার মনে হয়েছে তেমন কোন যুবকের সাথে কুমুর প্রেম হলো না কেন? হতে পারেনি। বিধবা ভ্রাতৃবধূর সাথে মধুসূদনের সম্পর্কের পর অপমানিত কুমু দাদার কাছে ফিরে গেলেও ‘এ্যানাটমি ইজ দ্য ডেস্টিনি’ মেনে কুমু অন্তঃসত্ত্বা হলে তাকে ফিরতে হয় মধুসূদনের কাছেই। একটা কোন দুর্ঘটনা ঘটতে পারতো কুমুর? সিঁড়ি দিয়ে পা পিছলে গর্ভপাত হলো বা তেমন কিছু? না- এ ত’ নব্য পুঁজির সব কদাকার নিষ্ঠুরতার কাছে পরাজিত সামন্তের সমর্পণেরই কাহিনী। কাজেই কুমুকে ফিরতেই হলো।

প্রিয় পাঠক, এখন কি ভাবছেন বিশ্ব ও বাংলা সাহিত্যের এই নায়িকাদের সাথে মিতুর যোগসূত্র কি? হ্যাঁ, সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রামের ৩৩ বছর বয়সী এক ডাক্তার যুবক আকাশের ‘স্ত্রী দ্বারা প্রতারিত হয়ে আত্মহত্যা’র অভিযোগে ফেসবুক উত্তাল হয়েছে। স্ত্রী মিতুকে নেয়া হয়েছে রিমান্ডে। আকাশের স্যুইসাইড নোট অনুযায়ী মিতুর সাথে কয়েক বছর প্রেমের পর বিয়ের আগে মিতুর ফোনে একাধিক যুবকের সাথে হোটেলে সময় কাটানোর ছবি দেখেও সে বিয়ে ভঙ্গ করেনি, সামাজিক লজ্জার ভয়ে বিয়ে করে। বিয়ের পর মিতু উচ্চশিক্ষায় বিদেশে গেলে সেখানে জনৈক গুজরাতি যুবক উত্তম প্যাটেলের সাথে মিতুকে জড়িয়ে সন্দেহের প্রমাণ হিসেবে আকাশ মিতু ও উত্তম প্যাটেলের কিছু মেসেজের স্ক্রিনশট দেয়। তবে, আকাশের অভিযোগ নিয়েও কিছু ‘সন্দেহ’ আছে:

১. শুধুই সামাজিক লজ্জার ভয়ে মিতুর সাথে অন্য ছেলেদের সম্পর্ক জেনেও সে বিয়ে ভাঙে নি? এবং চড়া দেনমোহর শুধতে হবে মেনে নিয়েই বিয়ে করেছে?

২. মিতু উত্তম প্যাটেলের সাথে তার সম্পর্কের কথা স্বীকার করেছে মারের মুখে। প্রচন্ড মার খেয়ে, ঠোঁটে রক্ত জমা অবস্থায় যে কোন মানুষ যে কোন কিছু স্বীকার করতে পারে। আকাশ, তার মা ও ভাই মিতুকে মেরে সেটা বীরদপে ফেসবুকে ছাড়া হয়েছে।

৩. এমন বেধড়ক মার খাবার পরও মিতু তার বাবা বা বোনেরর কথায় আকাশের বিরুদ্ধে নারী নির্যাতন মামলা করতে চায়নি। কেন? অত্যাচারী আকাশকে কি সে ভালবাসত? যেহেতু অতিরিক্ত সন্দেহকাতর পুরুষ সঙ্গী/প্রেমিক/স্বামী সবসময়ই অত্যাচারকে ‘বৈধ’ করতে ‘ভালবাসা’র দোহাইটাই দেয় এবং নির্যাতিত হতে হতেও মেয়েটি সেটা মেনে নেয়? ফলে অত্যাচারীর প্রতিই তার সহানুভূতি থাকে বেশি?

৪. উত্তম প্যাটেল ও মিতুর যে মেসেজগুলো স্ক্রিনশটে দেয়া হয়েছে, সেখানে স্ক্রিনশটগুলো ফটোশপড বলে মনে করছেন কেউ কেউ। তার পক্ষে যথেষ্ট কারণও রয়েছে।

৫. আপাত:দৃষ্টে উত্তম প্যাটেলকে লেখা মিতুর মেসেজগুলো একজন নারী হিসেবে আমার কাছেই যথেষ্ট ‘শকিং’ মনে হয়েছে। কেন? হিন্দু বা ইসলাম ধর্মে শরীর বা নর-নারীর কাম কিন্ত অপরাধ নয় যেভাবে খ্রিষ্টান ধর্মে দৈহিক সম্পর্ক মানেই পাপ। তাদের ঈশ্বরপুত্র যিশুকে তাই চিরকুমার হতে হয়। চিরকুমার হয়ে শরীরের পাপকে তিনি অতিক্রম করেন। আজকের উপমহাদেশে বিশেষত: বাংলার যে শিক্ষা ব্যবস্থা তা’ ব্রাম্মধর্ম (পড়ন্তু আমাদের জন্য বিশেষ ভাবে ফিল্টারড ভিক্টোরিয়ান ক্রিশ্চিয়ানিটির) প্রভাবিত একটি পিউরিটান শিক্ষা ব্যবস্থা। রবীন্দ্রনাথের ভলিউম ভলিউম গীতিনাট্য-কবিতা-নাটকে-গল্পে শান্ত বিরহে আচ্ছন্ন নর-নারীরা এক ভারি উচ্চ ভাবলোকের শিক্ষা আমাদের দেয়। সেই ভাবলোক থেকে ধরা যাক নব্বই দশকের শেষ সন্তান হিসেবে আমরা কেউ কেউ আঁতকে উঠলেও পরের প্রজন্মের নারীরা বরং দেখছি অনেক স্পষ্ট। তারা বলছেন যে পুরুষ অসংখ্য নারীকে জ্ঞাতে বা অজ্ঞাতে ভোগ করতে পারলে নারী কেন পারবে না? নারীকে কেন সবসময়ই ১৯৮৪ সালের কোন বাংলাদেশি সিনেমায় শাবানার কণ্ঠে সাবিনা ইয়াসমীনের চির ভাল মেয়ের তথা পতিব্রতা তবে প্রতারিত স্ত্রীর মিষ্টি ও দু:খভেজা ‘আমি রজনীগন্ধা ফুলের মত গন্ধ বিলিয়ে যাই/ আমি মেঘে ঢাকা চাঁদের মত জ্যোছনা লুকোতে চাই” গাইতে হবে? আজকের মেয়েরা আরো অনেক সোচ্চার। তারা সাদা শাড়ির বিরহিনী, ভাল নায়িকার গলায় লতা মঙ্গেশকারের গানের পাশাপাশি ঝকমকে পোশাকের ক্যাবারে ড্যান্সারের গানে আশা ভোঁসলের গলায় কোন দোষ পান না।

৫. ফিরে আসি মিতুর টেক্সট মেসেজের ভাষায়। আকাশের পক্ষ নিয়েছেন যারা তারা সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন তুলছেন যে কেন আকাশ নিজেই এমন স্ক্রিনশট বানিয়ে আত্মহত্যা করবে? সে ত’ আত্মহত্যাই করেছে? তবে? তবে মিতু অবশ্যই পাপী। আচ্ছা, এর উত্তর কি শেক্সপীয়র বহু আগেই দিয়ে যান নি? ইয়াগো নামে এক দুষ্টু লোকের কথায় ও ষঢ়যন্ত্রে দেসদিমোনার শয়নকক্ষে ক্যাসিওর রুমাল রেখে যাওয়ায় এবং সেই কথা ওথেলোর কানে তোলায় সন্দেহ উন্মত্ত ওথেলো দেসদিমোনার যাবতীয় আর্তি উপেক্ষা করে তাকে হত্যা করে? এবং সামান্য পরেই নিজের ভুল জানতে পেরে আত্মহত্যা করে? সেই দেসদিমোনাকে সে হত্যা করে যার জন্য শ্বেতাঙ্গিনী দেসদিমোনা নিজ সমাজ ছেড়ে, বৃদ্ধ পিতাকে কষ্ট দিয়ে ‘কালো মুরের’ সাথে চলে এসেছিল। বঙ্কিমের ‘কপালকুন্ডলা’য় পুরুষ বেশধারী নিজেরই প্রথমা স্ত্রীর সাথে দ্বিতীয়া স্ত্রী মৃম্ময়ী বা ‘কপালকুন্ডলা’কে দেখে নবকুমার মৃম্ময়ীকে হত্যা করতে নিয়ে যায়। শৈশব থেকে অরণ্যচারী ‘কপালকুন্ডলা’র কাছে অবশ্য এই হত্যার আয়োজন এক ধরণের মুক্তি।

‘তুমি কাঁপিতেছ কেন?’

কপালকুন্ডলার এমন প্রশ্নে নবকুমার যখন বলে, ‘তুমি ত’ রূপ দেখিয়া উন্মত্ত হও নাই।…মৃম্ময়ী, তুমি একবার বলো তুমি অবিশ্বসীনী নও। আমি তোমাকে পুনরায় হৃদয়ে ধারণ করি।’

উত্তরে অকম্পিত কণ্ঠে কপালকুন্ডলা শুধু জানায়, ‘তুমি ত’ জিজ্ঞাসা করো নাই।’

একইভাবে দেসদিমোনাকে হত্যার সঙ্কল্প নিয়ে তাঁর শয়নকক্ষে নিদ্রিতা স্ত্রীর মাথার কাছে এসে ওথেলোর স্বগত সংলাপ স্মরণ করুন:

It is the cause, it is the cause, my soul,– Let me not name it to you, you chaste stars!– It is the cause. Yet I’ll not shed her blood; Nor scar that whiter skin of hers than snow, And smooth as monumental alabaster. Yet she must die, else she’ll betray more men. Put out the light, and then put out the light:

কাজেই পুরুষের ঈর্ষা প্রমাণ সাপেক্ষ এবং ভয়ানক ভাবেই প্রমাণ অসাপেক্ষও বটে। এটা পুরুষের ভূতের ভয়ই হয়তো। যেহেতু সে সরাসরি সন্তানকে জন্ম দেয় না এবং সন্তানের জন্ম দেয় মা- তার সম্পদ এবং তার উত্তরাধিকারের মালিকানা তারই প্রকৃত উত্তরাধিকারী কিনা বা সন্তানের আশু মা বিশ্বস্ত কিনা, তাকে ঠকাচ্ছে কিনা অথবা নেহাতই এই বিদ্যমান নারী শরীরটির মাংস পুরোপুরি তার কিনা ইত্যাদি নিয়ে এক ভয়ানক ভূতের ভয়ে বহু পুরুষ দিন কাটায়। এই ভয় প্রবলতর হয় যখন নারীটি শিক্ষা-দীক্ষা, আয়-রোজগারে, সামাজিক জনপ্রিয়তা বা খ্যাতি সহ নানা ক্ষেত্রে তার সমান হয় বা তাকেও ছাড়িয়ে যায়। বিদেশে পড়তে গেছিল মিতু। হাসি-খুশি মিতু বন্ধু উত্তম প্যাটেলের নাম ফেসবুকে লিখতে দ্বিধা করেনি। এসবই হয়তো আকাশের সহ্য হয়নি? নিজেরই প্যারানয়েড মনোভাবকে বৈধতা দিতে সে নিজেই সাজায়নি ত’ স্ক্রিনশটগুলো এবং তারপর আত্মহত্যা করেনি? কয়েক বছর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষিকাকে এমনি সন্দেহে অন্ধ করে দিয়েছেন তার বেকার স্বামী। এবং আজো ত’ চারপাশে এমন অসংখ্য ঘটনা ঘটছে যেখানে স্বামীর বা প্রেমিকের নারী সহকর্মী, সহশিল্পী বা যে কেউকে মেয়েটি মেনে নিলেও স্ত্রী বা প্রেমিকার পুরুষ সহকর্মী, সহপাঠী বা সহশিল্পী মেনে নিতে অনেক ‘যুক্তিবাদী, প্রগতিশীল’ ছেলেরও প্রচন্ড সমস্যা হয়? ‘মাল্যবান’ কোন সন্দেহকাতর স্বামীর (যত প্রতিভাবানই হোন) পীড়িত আত্মার রচনা নয় ত’? একই কবি ‘সুরঞ্জনা’-কে কোথাও অন্য কোন যুবকের সাথে কথা বলতে নিষেধ করছে, ‘মনোকণিকা’-য় এক কবি তার নারীকে ভালবাসে যদিও সে নারী প্রীত হয়েছিল দশজন মূর্খের বিক্ষোভে? এমনো হতে পারে যে লাবণ্যকে প্রতিদিনের চাল-ডাল নিয়েই কঠিন বিড়ম্বনায় থাকতে হতো। তবু দরিদ্রের ঘরে রূপসী স্ত্রীকে নিয়ে দরিদ্র তবে প্রতিভাবাণ কবি বিচলিত: না জানি সে কতজন মূর্খের বিক্ষোভে প্রীত?

৬. এবার শেষ কথায় আসি। আচ্ছা- ধরা যাক- মিতু আকাশকে প্রতারণাই করেছে। সত্যিই উত্তম প্যাটেলের সাথে দৈহিক সম্বন্ধই ছিল তার। তাতেই কি তাকে মেরে ভিডিও করা যায়? তাকে রিমান্ডে নেয়া যায়? অথচ হাজার হাজার বা লক্ষ লক্ষ পুরুষ প্রতিদিন স্ত্রীকে রেখে বান্ধবী/উপ-পত্নী থেকে কাজের মেয়ে বা পয়সার বিনিময়ে পতিতাসঙ্গ ত’ করছেন। মনে পড়ে ১৯৮৭ সালের শারমিন রীমা হত্যাকান্ড? ত্রিশ বছরের ধনাঢ্য যুবক মুনিরকে তার বাবা-মা চল্লিশের এক বিবাহিতা নারীর সাথে প্রেম ছোটাতে তড়িঘড়ি বিয়ে দিলেন কুড়ির মেয়ে শারমীন রীমার সাথে? রিমা যখন আপত্তি জানালো, মুনীর তাকে খুন করলো। গোটা বাংলাদেশের সংবাদপত্রে খুকু তখন এক ডাইনী- তাকে জেলে পোরা হলো। ব্যপারটা আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বিবাহ ব্যবস্থাকে হাল্কা পরিহাসও করে। সমাজের প্রথা মেনে বরের থেকে বউ দশ বছরের ছোট হলে খুবই ভাল। অথচ, ছেলেটি ত’ দশ বছরের বড় নারীর প্রতিও আকর্ষিত হতে পারে?

যাহোক, তা’ প্রতিদিনই এত এত পুরুষের এত বহু নারীগমনে দোষ নেই। দোষ একা মিতুর? তারপরও আকাশ যদি সত্যিই প্রতারিত হয়ে আত্মহত্যা করেন, সেটাও খুবই বেদনার বিষয়। তবে আসলেই কি মিতু প্রতারণা করেছেন নাকি গোটাটাই প্যারানয়েড আকাশের মনোবিকার?

আজকের বাংলাদেশে যখন হাজার হাজার নারী শত সমস্যার ভেতরেও শিক্ষিত হচ্ছেন, হচ্ছেন স্বাবলম্বী ও কর্মজীবী- পেশাগত সাফল্যে ছাড়িয়ে যাচ্ছেন পুরুষ সঙ্গীকে- তখন উনিশ শতকের রুশ বা ফরাসী উপন্যাস বা বিশ শতকের শুরুর বাংলা উপন্যাসের নারীর থেকেও কঠিন এক যুগসন্ধিক্ষণে তারা অবতীর্ণ। ‘গৃহদাহ’-এর অচলারও শেষ অব্দি ‘শিক্ষা’ থাকলেও চাকরি ছিল না বলে ‘মহিম’ আর ‘সুরেশে’-র আবর্তেই দিন কাটাতে হয়েছে। মৃণালের মত দরিদ্র ও বৃদ্ধ বরের সেবায় দিনপাত করাও তার পক্ষে অসম্ভব ছিল। যেহেতু ব্রাম্ম শিক্ষা তথা আধুনিকতার সাথে সংস্পর্শ ঘটেছিল অচলার।

আজকের বাংলাদেশের যে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষিকা বেকার স্বামীর হাতে অন্ধ হচ্ছেন বা যে মিতু তাঁর তুলনায় পেশাগত ভাবে পিছিয়ে পড়া স্বামীর অন্ধ হিংসার শিকার হচ্ছেন (স্বামীটিও আত্মহত্যা করেছেন অবশ্য)…এটা আমাদের যুগসন্ধিক্ষণের নারী-পুরুষ সর্ম্পকের জটিলতাই প্রকাশ করছে মাত্র।

সময় ও পরিসরের কথা বিবেচনা করে লেখাটি এর থেকে আর বড় করা গেল না। ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস’ উপলক্ষ্যে নিজস্ব কিছু ভাবনা-চিন্তা সতীর্থ সব বোনের সাথে ভাগ করে নিতে চাইলাম।

 

এই বিভাগের আরও সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *