You are here
নীড়পাতা > নারীর অগ্রযাত্রা > বিজয়লক্ষ্মী > সত্যিকারের মানুষ গড়ার তিন কারিগর

সত্যিকারের মানুষ গড়ার তিন কারিগর

romena-lais-women-wordsসুনামগঞ্জের সরকারী এস সি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের দীর্ঘ ৭৫ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। এ দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় অনেক সুযোগ্য প্রধান শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে বিদ্যালয়টি পরিচালিত হয়েছে। আজ তাঁদের মধ্য থেকে ১৯৬৯-১৯৮৫ সময়কালের তিনজন কে আপনাদের সামনে তুলে ধরছি।

১.মাহতাবুন্নেসা খাতুন একজন দৃঢ় অথচ অনুচ্চ কন্ঠ ,পরিশ্রমী প্রধান শিক্ষক। যাকে আমরা সরকারী এস সি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে দীর্ঘ দশ বছর প্রধান শিক্ষক হিসাবে পেয়েছিলাম। ১৯২৬ সালে সিলেট শহরে তাঁর জন্ম । সিলেট অগ্রগামী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় থেকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ম্যাট্রিক, উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন তিনি।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে স্নাতক পাশ করেন। প্রতিটি পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করেন।

তাঁর স্বামী জনাব আব্দুর রহমান চৌধুরীর সহযোগিতা ছিল তাঁর অনুপ্রেরণা। যা তাঁকে সফলতার ক্ষেত্রে এগিয়ে যেতে সাহস জুগিয়েছে। তিনি ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে (বি.টি) প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।প্রথম শ্রেণী পেয়েছিলেন। সিনিয়র সহকারী শিক্ষক হিসাবে মাধ্যমিক অগ্রগামী বিদ্যালয়ে পেশার শুরু। পদোন্নতি পেয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে কুমিল্লার বিখ্যাত ফয়জুন্নেসা সরকারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে যোগদান করেন ১৯৬৫ সালে। পদোন্নতি পেয়ে প্রধান শিক্ষক হিসাবে ১৯৬৯ সালে সুনামগঞ্জ সরকারী এস সি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে যোগদান করেন। পরবর্তিতে টানা দশ বছর প্রধান শিক্ষক হিসেবে সততা, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৮ সালে সিলেটের সরকারী অগ্রগামী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে বদলী হন। চার বছর পর ফেব্রুয়ারী, ১৯৮২ সালে অবসর গ্রহণ করেন।

সিলেটের ঝেরঝেরী পাড়ার নিজ বাড়িতে বসবাসকালে জীবনের শেষের দিকে হৃদরোগে আক্রান্ত হন। এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৯৯১ সালের ২রা মার্চ তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন। তাঁর একমাত্র সন্তান ডাঃ আয়েশা নিলোফার চৌধুরী আশু। যিনি সুনামগঞ্জ এস সি সরকারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এস এস সি পাশ করেন।সিলেট মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাশ করে বর্তমানে সিলেটে কর্মরত আছেন।

সেই অনগ্রসর সমাজে বসবাস করেও একজন সংস্কৃতিমনা, অত্যাধুনিক, শিল্পবোধ সম্পন্ন ,অসাধারণ মহিলা ছিলেন তিনি। ছবি আঁকা, জামাকাপড় সেলাই ও উলের পোষাক বুননে পটু ছিলেন। ঘরোয়া পরিবেশে পুরোনো দিনের গান গেয়ে পরিবারের সবাইকে আনন্দধারায় ভাসিয়ে প্রশান্তি অনুভব করতেন। অসম্ভব ধৈর্যশীল এই মহতী নারী দীর্ঘ কর্মজীবনে সকল কাজে সততা ও নিষ্ঠার প্রমাণ রাখতে আপ্রাণ চেষ্টা করতেন। কর্মজীবনে যখন যে প্রতিষ্ঠানে ছিলেন আপণ আলোয় আলোকিত করেছেন সকলকে। আর তাইতো তাঁর অসংখ্য ছাত্রীর মনে ধ্রুবতারা সম জ্বলজ্বল করছেন , করবেন অনন্তকাল।

২. ছোটখাট অবয়বের অত্যন্ত মার্জিত , মায়াবী নূর রওশন চৌধুরী সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে ১৯৭৮ সালে সরকারী এস সি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে যোগ দেন। আন্তরিকতা আর সহমর্মিতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তিনি। তিনি প্রত্যুৎপন্নোমতি । ১৯৮১ সালে প্রধান শিক্ষক হিসাবে পদোন্নতি পান এবং ১৯৮৫ পর্যন্ত সরকারী এস সি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর পিতা আব্দুজ্জাহির চৌধুরী আর মা হেলাল জাঁহা চৌধুরী। পিতৃনিবাস সিলেটের গোলাপগঞ্জ থানার ফুলবাড়ি। তাঁর জন্ম ১৯৩৯ সালে সিলেটের কুয়ারপাড়ের হাজিবিবি হাউসে। ১৯৫৩ সালে সিলেট সরকারী অগ্রগামী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় থেকে মেট্রিক পাশ করেন।১৯৫৭ সালে সিলেট সরকারী মহিলা কলেজ থেকে এইচ এস সি ও ১৯৬০ সালে স্নাতক ডিগ্রী অর্জন করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামের ইতিহাসে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ করেন।১৯৬১-৬২ সালে ময়মনসিংহ টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে বিএড ও বিইএস ডিগ্রী অর্জন করেন। ১৯৬২সালে সিলেট সরকারী অগ্রগামী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসাবে কর্মজীবন শুরু করেন।১৯৬৯ থেকে ১৯৭২ পর্যন্ত ফরিদপুর সরকারী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসাবে কর্মরত ছিলেন।সরকারী এস সি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ১৯৭৮ থেকে ১৯৮৫ পর্যন্ত সহকারী প্রধান শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।১৯৮৫ থেকে ১৯৯৫ পর্যন্ত সিলেটের জেলা শিক্ষা অফিসার হিসাবে দায়িত্ব পালন করে অবসর গ্রহণ করেন। নূর রওশন চৌধুরীর স্বামী এম এ মান্নান এম সি কলেজ ও সিলেট মহিলা কলেজের ইসলামের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন।তাঁদের তিন মেয়ে ও এক ছেলে।বড় মেয়ে মম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্স ও মাস্টার্স। দ্বিতীয় মেয়ে রেশমা সিলেট মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাশ করেন। ছোট মেয়ে ডালিয়া শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজকর্ম বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স পাশ করে।তাঁদের একমাত্র ছেলে তওফিক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে অনার্স মাস্টার্স করে পঞ্চদশ বিসিএস দিয়ে বাংলাদেশ পুলিশ বিভাগে যোগ দিয়েছেন। বর্তমানে এডিশনাল ডিআইজি হিসাবে কর্মরত।

তাঁর লেখা বই ছহিফা বানু: সিলেটের প্রথম মহিলা কবির জীবন ও কাব্য ২০১০ সালে মুদ্রিত হয়।বর্তমানে তিনি অবসর জীবন যাপন করছেন।

৩. হুরমত বানু ১৯৪১ সালের ১ লা ডিসেম্বর কুমিল্লার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন।তিনি কুমিল্লা শৈলরানী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে ও কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া কলেজে পড়ালেখা করেন।ময়মনসিংহ টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে ১৯৬৩ সালে বিএড করেন। ১৯৬৩ সালে ফয়জুন্নেছা সরকারী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে যোগ দেন।চাকুরীকালীন সময়ে তিনি বাংলায় এম এ করেন। পরবর্তীতে বিসিএস( সাধারণ শিক্ষা) সম্পন্ন করেন।১৯৭৩ সালে সহকারী প্রধান শিক্ষক হয়ে পদোন্নতি প্রাপ্ত হন।১৯৭৯ সালে প্রধান শিক্ষক হিসাবে সুনামগঞ্জ সরকারী এস সি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে যোগদান করেন।পরবর্তীতে তিনি চট্টগ্রাম ডাঃ খাস্তগীর উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়,চট্টগ্রাম সরকারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়,নাসিরাবাদ সরকারী উচ্চ বালক বিদ্যালয়,বাকলিয়া সরকারী উচ্চ বালক বিদ্যালয়ে নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর স্বামী প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইসমাইল। তিনি বিসিআইসিতে কর্মরত ছিলেন। হুরমত বানু সরকারী এস সি বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক থাকাকালীন তাঁর স্বামী মৃতুবরণ করেন। স্বামীর অবর্তমানে তিনি তাঁর সন্তানদের যথাযথভাবে মানুষ করে তোলেন। তাঁর দুই পুত্র প্রকৌশলী।একজন কাফকোতে অন্যজন বার্জার পেইন্টসে কর্মরত।একমাত্র কন্যা পেশায় চিকিৎসক। সে রাঙামাটি সরকারী হাসপাতালে কর্মরত।

১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক তিনি শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক মনোনীত হন ও স্বর্ণপদক পান। ২০১০ সালে তিনি আজাদ প্রোডাক্টস এর রত্নগর্ভা মা মনোনীত হন।

সরকারী এস সি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়টি আকার বা আয়তনে ছোট হলেও জ্ঞানী গুণী শিক্ষক দ্বারা পরিচালিত হয়েছে। তাঁদের স্নেহের ছায়ায় ও পরিচর্যায় বেড়ে ওঠা ছাত্রীরা নানা পেশায় ছড়িয়ে আছেন আজ বিশ্বজুড়ে। আমি আমাদের শিক্ষাগুরু,পথপ্রদর্শকদের দীর্ঘায়ু কামনা করি। আর যিনি পরপারে চলে গেছেন তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করি।

Similar Articles

Leave a Reply