You are here
নীড়পাতা > অন্য মাধ্যমে প্রকাশিত > সংবাদপত্র > মধ্যপ্রাচ্যে ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার বাংলাদেশি নারী কর্মীরা

মধ্যপ্রাচ্যে ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার বাংলাদেশি নারী কর্মীরা

হায়দার আলী

সংসারে সচ্ছলতা ফেরাতে বা আরেকটু ভালো থাকার আশায় সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে যাচ্চেন বাংলাদেশি নারী শ্রমিকরা। কিন্তু সেখানে গিয়ে তাদের স্বপ্ন ভঙ্গ হচ্ছে। যৌন নির্যাতনসহ নানাভাবে নির্যাতিত হচ্ছেন তারা।

বিভিন্ন নির্যাতনের শিকার হয়ে ২০১৬ সালেই দেশে ফিরে এসেছেন ৫০০ নারী কর্মী। এঁরা মূলত বাসাবাড়িতে কাজ করার জন্য সৌদি আরবে গিয়েছিলেন।

জানা গেছে, সেখানকার বাংলাদেশ দূতাবাস ও শেল্টার হোমে আরো ৩৫০ বাংলাদেশি নারী কর্মী অবস্থান করছেন। নির্যাতনের শিকার এসব নারীকে দেশে ফিরিয়ে আনা হবে। শুধু সৌদি আরবেই নয়, এমন নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে মধ্যপ্রাচ্যের আরো কয়েকটি দেশে। মূলত দালালের মাধ্যমে ওই সব দেশে গিয়ে নারী কর্মীরা সংকটে পড়ছেন। নির্যাতিত নারীদের স্বজনরা প্রতিনিয়ত প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়, প্রবাসীকল্যাণ বোর্ডসহ বিভিন্ন সংস্থায় অভিযোগ জানিয়ে প্রতিকার চাচ্ছেন। এ অবস্থায় ওই সব দেশে নারী কর্মী, বিশেষ করে গৃহকাজে নারী কর্মী পাঠানো প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

গাজীপুরের কাপাসিয়ার মালেকের স্ত্রী হনুফা বেগম (প্রকৃত নাম নয়)। স্বামী মানসিক ভারসাম্যহীন, তাই সংসারের হাল ধরতে হয় স্ত্রী হনুফাকে। তিন ছেলে আর দুই মেয়ের ভবিষ্যৎ ভেবে ২০১৫ সালের অক্টোবর মাসে গৃহকর্মীর কাজ নিয়ে সৌদি আরবের রিয়াদে যান তিনি। কয়েক দিনের মধ্যেই তিনি বুঝতে পারেন, অক্লান্ত পরিশ্রম আর চরম নির্যাতন তাঁর জন্য অপেক্ষা করে আছে। দৈনিক ১৫ ঘণ্টা কাজ শেষে রাতে বিশ্রামের সুযোগ নেই। চলে পাশবিক নির্যাতনও। চার মাস বেতন পেলেও প্রায় এক বছর ধরে তাও বন্ধ। দেশে ফেরত আসার জন্য প্রতিদিনই মোবাইল ফোনে কল করে কান্নাকাটি করেন। কিন্তু দুই সপ্তাহ ধরে বন্ধ হয়ে গেছে ফোন করাও। সৌদি আরবে নির্যাতনের শিকার বোনকে দেশে ফেরত আনতে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছেন তাঁর ছোট বোন। হনুফার কথা জানতে চাইলে তাঁর বোন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘জামাইডা পাগল, শিকলে বাইন্দা রাখতে হয়, বড় পোলাডাও প্রতিবন্ধী। আট মাসের ছোট বাচ্চা রাইখ্যা বোন গেছে বিদেশে, শুধু বোনের বাচ্চাগো মুখে কিছু খাওয়ার জোগাড়ের লাইগ্যা। আজ হেই বোনের ওপর নির্যাতন হইতাছে। দুই সপ্তাহ ধইরা বোনের খোঁজ নাই। দয়া কইরা আমার বইনডারে একটু ফিরাইয়া আইন্যা দেন।’ এসব কথা বলেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।

একইভাবে পরিবারে সচ্ছলতা ফেরাতে কাতারে গিয়েছেন নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের মেয়ে রুমা আক্তার (এ ক্ষেত্রেও প্রকৃত নাম ব্যবহার করা হলো না)। সাত মাস আগে গৃহকর্মীর ভিসায় বিদেশে গেলেও তাঁকে বিক্রি করে দেওয়া হয়। সেখানে তাঁর ওপর দিনরাত চলে নির্যাতন। সেই নির্যাতন সইতে না পেরে কৌশলে সেখান থেকে পালিয়ে অন্য জায়গায় আশ্রয় নেন রুমা। এ প্রসঙ্গে তাঁর বাবা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আর কেউ যেন কোনো দালালের প্রতারণায় না পড়ে। ওদের ফাঁদে পড়লে মেয়েদের জীবন শেষ। আমার টাকা-পয়সার দরকার নাই। আমার মেয়েটা যেন আমার বুকে ফিরে আসে। শাক আর ডাল দিয়ে ভাত খাব, তবু শান্তিতে থাকব। ’

শুধু হনুফা আর রুমাই নন, গৃহকর্মী ভিসায় মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে গিয়ে নারী কর্মীরা অমানবিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন অহরহ। স্বামী নেই ও দরিদ্র পরিবারেরসহ বেশির ভাগ অসহায় নারী কর্মী সংসারে সুখ আনতে পাড়ি জমান সৌদি আরব, ওমান, লেবানন, বাহরাইন, আরব আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে। অল্প টাকায় বিদেশের মাটিতে পা রাখলেও মুহূর্তেই তাঁদের সব স্বপ্ন ধুলায় মিশে যায়। গৃহকর্মীর কাজ আট থেকে ১০ ঘণ্টা করার কথা থাকলেও ১৫ থেকে ২০ ঘণ্টাও কাজ করতে হয়। শুধু তাই নয়, গৃহকর্মীর কাজের কথা বলে নিয়োগ দেওয়া হলেও অনেকের ওপর চলে পাশবিক নির্যাতন। গৃহকর্মী ভিসায় মধ্যপ্রাচ্যে গিয়ে ভয়ংকর নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরে এসেছেন এমন কয়েকজন নারী কর্মীর সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। দেশে ফেরত আসা নারী কর্মীদের আকুতি, আর যেন কোনো নারী দালালের প্রলোভনে পড়ে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে না যায়। সেখানে গৃহকর্মীর কথা বলে নেওয়ার পর অনেকের স্থান হয় ছোট ছোট পতিতালয়ে। মোটা অঙ্কের টাকায় নারী কর্মীদের বিক্রি করে দেওয়ার কথা জানালেন তাঁরা। কথামতো কাজ না করলে তাঁদের বৈদ্যুতিক শক, সিগারেটের আগুন দিয়ে ছেঁকাসহ অমানুষিক নির্যাতন সহ্য করতে হয়। অনেকেই ভয়ংকর নির্যাতন সইতে না পেরে বহুতল ভবন থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেছেন। কেউ বা মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছেন। অনেক নারী কর্মী পঙ্গু হয়ে দেশে ফিরে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। নির্যাতিত নারী কর্মীর পরিবার ও স্বজনরা তাঁদের দেশে ফিরিয়ে আনতে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থায় অভিযোগ করছে। প্রতি মাসে এমন অর্ধশতাধিক অভিযোগ জমা পড়ছে। স্বজনরা প্রতিকার চেয়ে নির্যাতিতদের দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য আকুতি জানিয়েছে।

ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার এক নারী সাত মাস আগে গিয়েছিলেন সৌদি আরবের রিয়াদে। ২০ হাজার টাকা বেতন দেওয়ার কথা বলা হলেও সেখানে যাওয়ার পর বেতন তো দূরের কথা ঠিকমতো খাবার দেওয়া হতো না তাঁকে। দিনভর ঘরের কাজ করানোর পর রাতে চলত পাশবিক নির্যাতন। শেষ পর্যন্ত সেখান থেকে পালিয়ে এখন তাঁর ঠাঁই হয়েছে বাংলাদেশ দূতাবাসের শেল্টার হোমে। আড়াই মাস ধরে সেখানেই অবস্থান করছেন তিনি। ঠিকানা নিয়ে কালের কণ্ঠ’র পক্ষ থেকে তাঁর ছেলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে সে বলে, ‘দালালরা মিথ্যা কথা বলে আমার মাকে সেখানে নিয়ে যায়। বলেছিল, ২০ হাজার টাকা বেতন দিবে কিন্তু সেখানে মা তার জীবন নিয়েই হুমকিতে ছিল। পালিয়ে গিয়ে এখন দূতাবাসের আশ্রয়ে আছে। কবে মাকে দেশে ফিরিয়ে আনা হবে, সেই অপেক্ষায় আছি। ’ আর রংপুরের পীরগঞ্জের আরেক নারী দুই বছর আগে আবুধাবিতে যান। কিন্তু নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরিয়ে আনতে আকুতি জানান পরিবারের সদস্যদের কাছে। তাঁর স্বামী বলেন, ‘অনেক দিন কোনো খোঁজ পাই না, মোবাইল বন্ধ, বেঁচে আছে নাকি মারা গেছে, সেটাও জানি না। দয়া করে আপনারা আমার বাচ্চার মাকে ফিরিয়ে এনে দিন। ’

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) সূত্রে জানা গেছে, নারী শ্রমিকদের জন্য বড় বাজারগুলো হচ্ছে আরব আমিরাত, জর্দান, সৌদি আরব, ওমান, লেবানন ও কাতার। তবে চলতি বছর এই বাজারগুলোর মধ্যে শুধু সৌদি আরবে নারী কর্মী যাওয়ার হার বেড়েছে। অন্যদিকে কয়েক মাসে জর্দান, ওমান, লেবানন ও কাতারে নারী কর্মী যাওয়ার হার কমে গেছে। বিদেশে যাওয়া নারী শ্রমিকদের প্রশিক্ষণকেন্দ্র কোরিয়া-বাংলাদেশ টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারে বেশ কয়েকজন নারী শ্রমিকের সঙ্গে কথা হয়। এঁদের অনেকের মধ্যপ্রাচ্যে কাজের অভিজ্ঞতা আছে। তাঁরা জানান, সেখানে গৃহস্থালি কাজের জন্য তাঁদের ঠিকমতো খাবার দেওয়া হয় না। বিশ্রামও নিতে দেওয়া হয় না।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে গৃহকর্মীসহ বিভিন্ন পেশায় নারী কর্মীর অভিবাসন হয়েছে এক লাখ ১৮ হাজার ৪৪ জনের। এর মধ্যে গত এক বছরে সৌদি আরবে গেছেন ৬৪ হাজার ২৮৬ জন। জর্দানে গেছেন ২২ হাজার ৬৮৯ জন, ওমানে ১২ হাজার ৮৯৭ জন, কাতারে পাঁচ হাজার ৩৮১ জন ও আরব আমিরাতে গেছেন পাঁচ হাজার ১৫১ জন। আর ১৯৯১ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত বিদেশের মাটিতে নারী কর্মী গেছেন পাঁচ লাখ ৭৪ হাজার ৭৫ জন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি নারী কর্মী গেছেন আরব আমিরাতে, এক লাখ ২২ হাজার ৭২৯ জন। আমিরাতের পরেই বেশি নারী কর্মী গেছেন সৌদি আরবে, এক লাখ ২১ হাজার ৩৭৫ জন। এর পরেই ধারাবাহিকভাবে জর্দানে এক লাখ ৯ হাজার ৯৪৮ জন, লেবাননে এক লাখ দুই হাজার ৫৬৫ জন, ওমানে ৫৫ হাজার ৪০৩ জন, কাতারে ২২ হাজার ৬১৩ জন কর্মীর অভিবাসন হয়েছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সৌদি আরবের রিয়াদ আর জেদ্দায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো এলাকায় প্রবাসী বাংলাদেশি নারী কর্মীরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। এঁদের অনেকেই পালিয়ে বাংলাদেশ দূতাবাস কিংবা শেল্টার হোমে আশ্রয় নিচ্ছেন। অনেক নারী কর্মী যৌন নির্যাতন থেকে শুরু করে ভয়ংকর সব নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। সৌদি দূতাবাস সূত্রে জানা গেছে, শুধু ২০১৬ সালেই পাঁচ শতাধিক নারী কর্মীকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। এদের সবাই যৌন নির্যাতনসহ নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। নির্যাতিত প্রায় ৩০০ নারী কর্মী সৌদিতে বাংলাদেশি শেল্টার হোম ও দূতাবাসে আশ্রয় নিয়েছেন। এঁদের সবাইকে পর্যায়ক্রমে দেশে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। দেশে ফিরিয়ে আনা আর দেশে ফিরতে আশ্রয় পাওয়াদের যে সংখ্যা দূতাবাস দিচ্ছে প্রকৃতপক্ষে নির্যাতিতের সংখ্যা আরো বেশি। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে নির্যাতিত নারী কর্মীদের ফিরিয়ে আনতে তাঁদের পরিবার ও স্বজনরা প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন করছেন। ওই সব চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ প্রবাসীকল্যাণ বোর্ড থেকে সৌদি আরবের রিয়াদ ও জেদ্দার শ্রম কাউন্সিলরসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে একাধিক চিঠি দেওয়া হলেও উত্তর মেলেনি। ১৫ জানুয়ারি ২০১৭ প্রবাসীকল্যাণ বোর্ডের পরিচালক নুরুল আখতারের পাঠানো এক চিঠিতেও সাতজন নারী কর্মীকে দেশে ফেরত পাঠানোর জন্য লিখিতভাবে বলা হয়। যাঁদের দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য বলা হয়েছে তাঁদের মধ্যে সাতক্ষীরার শ্যামনগরের একজন, আশাশুনির দুজন, সদরের একজন; যশোর জেলার বেনাপোলের একজন, ময়মনসিংহের নান্দাইলের একজন ও গাজীপুরের কাপাসিয়ার একজন।

নির্যাতিত প্রবাসী নারী কর্মীদের নিয়মিত দেশে ফেরত পাঠানোর কথা জানিয়ে সৌদ আরবের রিয়াদের কাউন্সিলর (শ্রম) সারোয়ার আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নির্যাতিত নারী কর্মী যাঁরা দেশে ফেরত যেতে চান তাঁদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে। গত বছর পাঁচ শতাধিক নারী কর্মীকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। আরো প্রায় ৩৫০ নারী কর্মী দূতাবাস ও শেল্টার হোমে আছেন। তাঁদেরও পর্যায়ক্রমে দেশে ফেরত পাঠানো হবে। সৌদি আরবে নির্যাতিতদের উদ্ধার কিংবা আইনগত সহায়তা সবাই পাচ্ছেন না এমন অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে বসে অনেক কিছুই বলা যায় কিন্তু বাস্তবতা অনেক ভিন্ন। আমরা আমাদের সাধ্য অনুযায়ী ব্যবস্থা নিচ্ছি। ’ সৌদির জেদ্দার কাউন্সিলর (শ্রম) মোকাম্মেল হোসেন বলেন, ‘আমাদের শেল্টার হোমে ২৭ জন নারী কর্মী আশ্রয় নিয়েছেন। যেখানেই কোনো নারী নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন তাঁদের উদ্ধার করে আশ্রয় দেওয়া হচ্ছে।

দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পেতে উন্নত জীবনযাপনের স্বপ্ন নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে যেসব নারী কর্মী যাচ্ছেন, তাঁদের বেশির ভাগই গৃহকর্মী হিসেবে যাচ্ছেন। প্রবাসী শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করে এমন কয়েকটি সংস্থার প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, অভাবগ্রস্ত, নিপীড়িত, অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত নারী কর্মীরা বিদেশে গিয়ে নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন। ভালো আচরণ ও মুসলমান হওয়ার কারণে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বাংলাদেশি নারী শ্রমিকের বিপুল চাহিদা। তবে নারী শ্রমিকদের ওপর নির্যাতনের কারণে ভারত, শ্রীলঙ্কা, ফিলিপাইন ও ইন্দোনেশিয়াসহ কয়েকটি দেশ তাদের নারী গৃহকর্মীদের ওই সব দেশে পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছে। এতে বাংলাদেশ থেকে নারী শ্রমিকদের মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়ার হার কয়েক গুণ বৃদ্ধি পায়। আবার তিন-চার বছরে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী মধ্যপ্রাচ্যে কাজ করতে গিয়ে নির্যাতিত হয়ে দেশে ফিরেছেন। তাঁদের নির্যাতনের কথা শুনে অনেকেই এখন সেখানে যেতে আগ্রহী নন। আগে যাচাই-বাছাই ও প্রশিক্ষণ ছাড়া এবং নিজের নিরাপত্তার কথা না ভেবেই দরিদ্র নারীরা বিদেশে কাজ করতে যেতেন। কিন্তু এখন নারী শ্রমিকরা সচেতন। বিশেষ করে নির্যাতনের ভয়ে নারী শ্রমিকরা এখন মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কাজ করতে যাওয়ার আগে প্রশিক্ষণ নিয়ে তবেই যাচ্ছেন।

মধ্যপ্রাচ্য থেকে নির্যাতনের শিকার হয়ে ফেরত আসা নারী কর্মীরা প্রতি মাসেই প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়, প্রবাসীকল্যাণ বোর্ড, বিএমইটি, বাংলাদেশি অভিবাসী মহিলা শ্রমিক অ্যাসোসিয়েশনসহ (বমসা) বিভিন্ন সংস্থায় অভিযোগ করছেন। এসব সংস্থায় প্রতি মাসে কম করে হলেও অর্ধশতাধিক অভিযোগ জমা পড়ছে। তাঁরা জানিয়েছেন শারীরিক, মানসিক ও অর্থনৈতিক নির্য়াতন চলে সেখানে। কর্মীর সঙ্গে নিয়োগকর্তারা ক্রীতদাসের মতোই আচরণ করেন। ঠিকমতো খাবার, সুপেয় পানি পর্যন্ত দেন না।   চুক্তি অনুযায়ী বেতনও পান না তাঁরা। যৌন নির্যাতন চালান অনেক নিয়োগকর্তা। অন্যদিকে লেবার উইংগুলোতে নারী কর্মকর্তা কম থাকায় নারী কর্মীরা তাঁদের সমস্যার কথা ঠিকভাবে বলতেও পারেন না। আর ওমানের অনেক বাড়িতে বাংলাদেশি গৃহকর্মীরা বন্দি অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন বলে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এক প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে। ওমানের গৃহকর্তাদের দ্বারা বন্দি নারী শ্রমিকদের ওপর যৌন ও শারীরিক নির্যাতনের ঘটনা উঠে এসেছে ওই সব প্রতিবেদনে।

বাংলাদেশি অভিবাসী মহিলা শ্রমিক অ্যাসোসিয়েশনের (বমসা) একজন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অধিকাংশ গৃহকর্মী মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে গৃহকর্মী হিসেবে যাচ্ছেন। সেখানে প্রতিদিনই কোনো না কোনোভাবে নারী কর্মীরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। এসব নির্যাতন বন্ধ করতে হলে সরকারকে কঠোর হতে হবে, নইলে এটা বন্ধ হবে না। নারী কর্মী পাঠানোর আগে প্রত্যেককে মোবাইল ফোন দেওয়া ও দূতাবাসের পক্ষ থেকেও নিয়মিত তদারকির ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নারী কর্মীদের ওপর নির্যাতনের ঘটনাগুলো দুঃখজনক। আমরা এ ধরনের অভিযোগ পেলেই খোঁজ নিই এবং তাঁদের দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করি। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি দেশে শেল্টার হোমের ব্যবস্থা করেছি। অনেককে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করেছি। সচিবের নেতৃত্বে আমাদের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল সৌদি আরব ঘুরে বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলে এসেছে। ’

সূত্র: কালের কন্ঠ

 

Similar Articles

Leave a Reply