You are here
নীড়পাতা > প্রতিবেদন > মিলনমেলায় আসা যাওয়ার পথের ধারে (২)

মিলনমেলায় আসা যাওয়ার পথের ধারে (২)

romena-lais-women-wordsরূপু,সিপির সাথে সাথে তিমনও আসলো। পরদিন ডিনারের দাওয়াত দিয়ে গেলো। রূবিনাও রেহানা কে সাথে নিয়ে বিমানের ফ্লাইটে এসেছে আজই। রুনার সাথে তখনো দেখা হয়নি। রিহা্র্সেলে ছিলো।রুনা আসলে চলে গেলাম স্কুলে ।রাতের উৎসবের আমেজে সেজেছে স্কুল ।চুণিমুনি লাইট দিয়ে পুরা স্কুল সাজানো রূপকথা জানালো আমার লেখা থিম সং নাকি সবার খুব প্রিয়।গেয়েও শোনালো সে। মন আমার ছুটে গেলো স্কুলেই। ঘুম ভাঙলো দেরিতে।

“সারা পথের ক্লান্তি আমার সারা দিনের তৃষা কেমন করে মেটাব যে খুঁজে না পাই দিশা-” রূপুদের বাসায় মিলনমেলার জেসমিনআপা,রীনাদি,আরতিদি,অঞ্জলীদি, রুশিআপা,লিজিখালা,নার্গিস আরও অনেকের সাথে দেখা হলো। কী আনন্দ কী আনন্দ । সেই বালিকাবেলায় যেন ফিরে গেছি সবাই । সংসার ছেড়ে এসে মুক্ত বিহঙ্গ সবাই।কারো বাড়ি ফেরার তাড়া নেই।সবাই গান গাইছে।ধামাইল দিচ্ছে। আহা এতো আনন্দ । সঞ্চিতা দিদি এলেন।

স্কুলে গেলাম সবাই মিলে। আই ডি কার্ড সংগ্রহ করতে এসেছে সব বালিকারা। স্কুলের মাঠে পা রেখে আমি নিজেই দুই বেনী দুলানো সেই কিশোরীদিনে ফিরে যাই। কিন্তু বালিকা হতে চাইলেই কী আর হওয়া যায়। আমার প্রিয় ছাত্রীরা যারা ১৯৯২-৯৪ সাল পর্যন্ত আমায় পেয়েছে তারা আমার পা ছুঁয়ে সালাম করছিলো। আমিও বালিকা থেকে শিক্ষক হয়ে ওদের বুকে জড়িয়ে ধরছি।সেদিনের সেই শিক্ষার্থীরা সবাই আজ প্রতিষ্ঠিত ,কেউ ব্যাংকার,কেউ শিক্ষক,কেউ প্রোগ্রামার আরো কতো কী। আমার মনে দুই রকমের অনুভূতি। শামসুন্নাহার বেগম শাহানা এম পির সাথে দেখা। বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন -“খুব ইচ্ছে ছিলো তোমাকে এয়ারপোর্টে রিসিভ করার, তোমার স্বপ্নের মতো।” একজীবনে মানুষ কতো আর পেতে পারে। বড়বোনদের ভালবাসা ,ছাত্রীদের শ্রদ্ধা আমাকে স্বপ্নলোকে নিয়ে যায়।আমার মন ভিজে যেতে থাকে নরম পেলব ভালবাসায়। আমার শিক্ষক পরবর্তীতে সহকর্মী অঞ্জলীদির সাথে দেখা হলো। পা ছুঁতে যেতেই বুকে টেনে নিলেন। ছাত্রীদের মধ্যে দেখা হলো সোমা,সুরাইয়া, জেসমিন,গুলশান,লুবনা,তমন,জয় আরো অনেকে।আমার বন্ধু জেসমিন, তামান্না আর মাহফুজা আসলো।ঢাকা সিলেট ইউএসএ লন্ডন অস্ট্রেলিয়া থেকে যারা এসেছে সবাই একনজর স্কুলে ছুটে আসছে। তামান্না ,জেসমিন ,মাহফুজা,এনী,নার্গিস, খায়রুন ,ফারহানা,বিজুআপা,তানিম,রেহানা ,শিখা, শিউলি,জয়া,লীপা,বাবলীদি,রওশন, আমীরুন আরো কতো প্রিয় মুখ। কৃষ্ণা এক বাক্স সন্দেশ আর নারকেলের নাড়ু নিয়ে এলো। আমার মন ছুটে যায় সেই স্কুলে।কৃষ্ণা সিক্সে ভর্তি হলো।ওর বাবা জুবিলীর শিক্ষক। ওইটুকু মেয়ে রান্নাবান্না করে রেখে আমার সাথে স্কুলে যায়।আর ফিরে এসে বিকেলবেলা একসাথে খেলি আমরা।কৃষ্ণার প্রতি সম্মানবোধ আমার তখন থেকেই। ভালোবাসার ছড়াছড়ি।

তিমনের বাসায় রাতের দাওয়াতে গিয়ে চক্ষু চড়কগাছ। তিমনের বউ ছোট মেয়ে নসুহা। ২০০৫ এর সতীশাইন। প্রায় বিশরকম আইটেম দিয়ে টেবিল ভরিয়ে ফেলেছে।আর মজার ব্যাপার হলো পুরো পরিবারের সতীশাইন ও তাদের পরিবার মিলে প্রায় তিরিশ পঁয়ত্রিশজন একত্রিত হয়েছিলাম। সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ ঝর্ণাআপা। তারপর মুক্তাপা, তারপর আমি। রেহানা,রূবিনা,বিউটি মুক্তি ,মৌসুম,নসুহা,তিন্না,রাইয়া আর রূপকথা। সবার ছেলে মেয়ে নাতিপুতি। রানাভাই এর ছেলে তিমন আর তার বউ নসুহা। আমাদের বিশাল পারিবারিক ডিনারের জমজমাট আয়োজনে মিলনমেলার পূর্ব রাতে আমরা মিলিত হলাম।এই চিত্র কিন্তু শুধু আমাদের পরিবারের না।সুনামগঞ্জের সব বাড়িতে তাদের সব মেয়েরা একসাথে ঘরে ফিরেছে। চাঁদের হাট বসেছে প্রায় সব বাড়িতে । খাওয়ার পরে আবার স্কুলে গেলাম। মঞ্চ রেডি। আমরা প্যান্ডেলে গিয়ে মঞ্চও দেখে আসলাম। সাউন্ড সিস্টেম সেট করছিলো। পল্লবদের সাথে দেখা।

সকাল সাড়ে আটটায় শুরু হলো উদ্বোধনী অনুষ্ঠান।স্কুল প্রাঙ্গণে সাদা-লালের সমাবেশ। ব্যান্ডের তালে তালে সবাই লাইনে দাঁড়িয়ে গেছে। প্রথমে পবিত্র কোরান থেকে তেলাওয়াত ।পবিত্র গীতা পাঠের পর শপথপাঠ,পতাকা উত্তোলন। তারপরে জাতীয় সঙ্গীত গাইলো সবাই ।বেলুন আর কবুতর উড়িয়ে উদ্বোধনী ঘোষণা হলো। পিটি করানো হলো।তারপরই র‌্যালি বের হলো।আমরা ৭৯ ব্যাচ আমাদের নিজস্ব ব্যানারসহ র‌্যালি নিয়ে এগিয়ে চললাম। শহরের থানার পাশ দিয়ে গিয়ে ডিসির বাসভবনের পাশ দিয়ে ঘুরে কালীবাড়ি সড়ক দিয়ে হয়ে আবার স্কুলে ফিরে আসলো । গেটে দাঁড়িয়ে একজন বয়স্ক কিশোরী সবাইকে ফুল ছিটিয়ে বরণ করছেন।তিনি আর কেউ না।আমাদের শিক্ষক সুনীতিদি ।দিদিকে খুঁজে হেডস্যারের রুমে গিয়ে পেলাম।পা ছুঁতেই বুকে জড়িয়ে ধরলেন। অতিথিরা আসলেন।মঞ্চে আসনগ্রহণ করলেন । তাদের মধ্যে ছিলেন বিচারপতি মিফতাউদ্দীন রুমি,পিএসসির চেয়ারম্যান ডঃ মোহাম্মদ সাদিক,প্রতিমন্ত্রী আব্দুল মান্নান, সাংসদ পীর মিসবাহ, শামসুন্নাহার বেগম শাহানা এমপি। আসলেন সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক,পুলিশ সুপার এবং প্রাক্তন শিক্ষার্থী রওশন আরা । মঞ্চের সামনে ছিলেন স্কুলে র প্রাক্তন আলোকিত ছাত্রী রা। প্রাক্তন মহাপরিচালক মাউশি, সচিববৃন্দ, প্রফেসর,জেলা ও দায়রা জজ,ডাক্তার,ব্যংকার,এডভোকেট,শিক্ষক বৃন্দ।

বক্তৃতা চলাকালীন জুবিলীয়ানদের নিজস্ব বয়ানে বালিকা বিদ্যালয় নিয়ে তাদের ও তাদের সময়ের নিজের ও বন্ধু দের হা হুতাসের কিছু টা জানা গেলো।একফাকে আমার বন্ধু ডাঃ লুৎফুন্নাহার জেসমিন আর এডভোকেট মাহফুজা বেগম সাঈদা মঞ্চের অতিথি দের হাতে আমার প্রথম প্রকাশিত বই ভালোবাসার রঙ নীল তুলে দেয়।

জীবনের ফেলে আসা কৈশোর যাদের কেটেছে এই বিদ্যালয়ে, তারা সবাই একত্রিত হয়েছি। বয়সের ব্যবধান ভুলে সবাই মিশে গেছি এক হয়ে। লাঞ্চ নিয়ে সবাই একঘন্টার বিরতির পর আবার ফিরে আসলো স্কুলে ।১৯৫০-৭০ ব্যাচের ছাত্রীরা মঞ্চে উঠে নিজের পরিচয় দিয়ে স্মৃতিচারণ করলেন। এই সময়ের মধ্যে দেখা গেল একই পরিবারের তিন প্রজন্মকে অর্থাৎ নানি, মেয়ে ও নাতি। তারা হলেন সৃজন বিদ্যাপীঠের কানিজ (১৯৮৫ ব্যাচ), তার মা (১৯৫৭ ব্যাচ) ও মেয়েরা (২০১৩ ব্যাচ)। মাউশির মহাপরিচালক দিলারা হাফিজ (১৯৬৩ ব্যাচ) একটি কবিতা শোনালেন। কাবেরীদি, রানী রায়  সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখলেন । রানী রায় ছিলেন তুখোড় খেলোয়াড় ও ছাত্র নেত্রী।১৯৭৩-৭৪ ব্যাচ উঠলো ধামাইল নিয়ে। মঞ্চের সামনে ছোট বড় সবাই হাতে হাত রেখে ধামাইল শুরু করলো।বয়স, সময় সব ভুলে কি যে উচ্ছ্বাস সকলের। এরপর পরই ১৯৭৫-৭৭ ব্যাচের ছাত্রীরা এলেন। তবে তাদের উপস্থিতি কম।পরিচয় দিয়ে সবাই ধামাইল গান গাইলো।সাথে নাচলো  সকলে। ব্যতিক্রম ১৯৭৯ ব্যাচ।আমরা দেশের গান ‘ধনধান্য পুষ্পে ভরা’ গাইলাম । আর একটা বিয়ের গান। এরপর সিলেট এর শিক্ষার্থীদের পরিবেশনা সবাইকে আনন্দে মাতিয়ে তুলে। তুলিকা ঘোষ চৌধুরীর পরিচালনায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছিলো সর্বশেষ আকর্ষণ। বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও জেলা জজ জেসমিন আরা বেগমের (১৯৭৬ ব্যাচ) রচিত থিম সং ও সংঘমিত্রা ভট্টাচার্যের (১৯৭৮ ব্যাচ) রচিত থিম সং। দুটি থিম সং এরই সুর করেছেন দেবদাস চৌধুরী রঞ্জন। বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তা খুব সুন্দর ভাবে পরিবেশন করেন। শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে চমৎকার, জমজমাট গান আর নাচ।মৌলী, রুম্পিরা নাচ পরিবেশন করে। মন কাড়ে পৃথা, তুলনা, সুমাইয়ার চমৎকার কিছু লোকগান। আমাদের সময়ের জনপ্রিয় শিল্পী ছিলেন সোহেল ভাই।সাব্বীর আহমেদ সোহেল। উনার মেয়ে শৈলির কন্ঠে ‘আমায় প্রশ্ন করেনীল ধ্রুবতারা’ শুনে অকাল প্রয়াত সোহেল ভাইয়ের কথাই মনে পড়ছিল। আরও কত মেয়ে। ওদের চিনি না, ওরাও কত চমৎকার করে গান গাইলো, যেমন তাদের সুন্দর কন্ঠ, তেমনি চমৎকার উপস্থাপন। এরা আমাদের স্কুলের নতুন প্রজন্ম, আমাদের ভবিষ্যৎ। বাপ্পার ‘দিন বাড়ি যায়’ গানটি গায় আমাদের বাসার কনিষ্ঠ সতীশাইন রূপকথা । পুরা অনুষ্ঠান টি লাইভ টেলিকাষ্ট করেছে এয়ারলিঙ্ক। সরাসরি সম্প্রচার করায় অনুষ্ঠানে আসতে না পারলেও সুনামগঞ্জে ঘরে ঘরে সবাই সরাসরি সমস্ত প্রোগ্রামই উপভোগ করতে পেরেছেন।

Similar Articles

Leave a Reply