আমার শহরের রাস্তায়, আমি কতটা নিরাপদ? - Women Words

আমার শহরের রাস্তায়, আমি কতটা নিরাপদ?

জুডি রোজারিও

দিনটি ৭ই জুন। অফিস শেষে গেলাম সিদ্ধেশ্বরী। আমার ওরাল সার্জারির সেলাই খুলতে। মা বারবার সঙ্গে যেতে চাইলেও, নিজেই একা একা চলে যাই।নিজেকে অনেক সাহসী মনে হচ্ছিল ওয়েটিং রুমে বসে থাকতে থাকতে। মিস্টার বিনের ডেন্টিস্ট এপিসোডের ভিডিও ক্লিপ দেখতে থাকি বসে বসে।
আমার কল আসা সত্ত্বেও রিসিপশনের আপুকে বলি, ‘আমি ডক্টর রবি কে দেখাবো , উনি ফ্রি হলেই যাবো ‘
(কারণ উনি আমাকে বলেছিলো যে আমার মাড়ি অবশ করে নিবে, টের পাব না। ) শেষ করে মা কে জানালাম কাজ শেষ, বাসায় ফিরবো, ফোনে চার্জ নাই, অফ হয়ে গেলে টেনশন যেন না করে। কিছুক্ষন বসলাম, অ্যানাসথেসিয়া স্প্রেতে,ভারী হওয়া গাল টা নিয়ে।
নিচে নেমে সিএনজি অটোরিক্সা না পেয়ে বেইলি রোডের দিকে হাঁটা শুরু করলাম। কেউ যেতে চায়না, যখন মেইন রোডের প্রায় কাছাকাছি, একটু চিন্তায় পড়লাম যে হায় হায় বাসায় যাবো কিভাবে ! ঠিক তখনি মেইন রোডের দিকে থেকে একটা ছেলে (কদম ছাঁট চুল, শুকনা করে,লাল টিশার্ট গাঁয়ে ), কিছু বুঝে ওঠার আগেই সামনে থেকে হুট করে এসে ঘুষি মেরে বসলো আমার গালে!
তীব্র ব্যথা, সারা মুখ থেকে মাথা জুড়ে। কোনভাবে ঘুরে তাকালাম পিছনে (ব্যথা নিয়েও এতটুকু সেন্স ছিল যে ছিনতাইকারি হবে ), কিন্তু আমার ব্যাগ না নিয়েই খুব হেলেদুলে সেই লোক হেঁটে সামনে চলে গেল। যতক্ষনে আবার তাঁকাতে পারলাম, দুইজন লোক ঘুরে ঘুরে ৩/৪ বার দেখলো কিন্তু এগিয়ে আসলো না। তাঁদের সামনে দিয়ে চলে যাওয়া লোকটা কে ধরারও প্রয়োজন মনে করলো না !
যখন জ্ঞান ফিরলো বুঝলাম আমার চোখ শেষ আজকে ,জীবন ও হয়তো শেষ। টের পেলাম গড়গড় করে রক্ত পড়ছে গাল বেয়ে। কিন্তু ওইখানে মরলে আমার হদিস পাবে কে আর কিভাবে। ওই অবস্থায় আমার মরা দেহ উদ্ধার হবে চাই নাই। রিকশা ঠিক করে কোনো ভাবে রওনা দিতে বলি মামা কে, সামনে। ভাগ্য ভালো ডাক্তার সাথে সাথে ফোন ধরে, বলতে থাকি,’ প্লিজ হেল্প ,এটাক করেছে আমাকে , সেইভ মি’। এরপর ভাবি কাছাকাছি কে থাকতে পারে, বা মা কে ম্যানেজ করে এখানে কে আনতে পারবে। ডায়াল লিস্টে বন্ধুদের ধুমায়ে ফোন দেই, ‘মা ‘ কে ছাড়া। কারণ আমি জানি ওই অবস্থায় মা আমাকে দেখতে পারবে না, আমার অবস্থা শুনে সে নিজেই অসুস্থ হয়ে যাবে।
পৌঁছাই যখন চোখে ঘোর অন্ধকার, ডেন্টিস্টের চেনা গেইট অচেনা লাগে। সাথে সাথে ২ জন আপু এসে আমাকে নিয়ে যায় ধরে ধরে। সেইখানে পোঁছে প্রথম শুনি আমার ঠিক কি অবস্থা আসলে। যে আমি ইঞ্জেকশনের এত্ত ভয় পাই, নিজে চেয়ে নেই জাস্ট ব্যথা দূর করানোর জন্য। ডাক্তার কে একটা ফোন নম্বরই বলতে থাকি। সেই বন্ধুর সাথে আমি দীর্ঘদিন যোগাযোগহীন, কিন্তু সে ঠিকই চলে আসে সবার আগে। তারপর সে মা কে আর ভাইয়া কে ফোন দিয়ে নিয়ে আসে। প্রাণে বেঁচে যাই অল্পের জন্য। কিন্তু নিজের চেহারা আয়নায় দেখার মতো সাহস হয়না দ্বিতীয়বার ।
আজকে ১০দিন, এখনো আমার নিজেকে দেখলে ভয় লাগে, চিনতে পারিনা।
সেইদিন যদি গাছটার নিচে মরে থাকতাম, আমার বন্ধুরা কি জানতো কি হয়েছিল? আমার ফোন বন্ধ হয়ে গেলে বা ডেন্টিস্ট ফোন না ধরলে কি না হতে পারতো আমার সাথে? কে বাঁচাতো আমাকে? সুপারম্যান? আমার মতো হাজারটা মেয়ে মরে গেলে আজকে কারোই কিছু যাবে আসবে না, আমাদের বন্ধু আর পরিবার ছাড়া। আমি চাইনা আমার সাথে কারণ ছাড়া যা ঘটানো হলো, এটা অন্য কোনো মানুষের সাথে ঘটুক। আমি নিরাপদ ভাবে হেঁটে বেড়াতে চাই আমার শহরে।
আমি কি বাচ্চা নাকি যে সর্বক্ষণ মা কে সাথে নিয়ে চলতে হবে?