বেগম রোকেয়া’র লেখনীতে সমাজচিন্তাই মূর্ত হয়েছে - Women Words

বেগম রোকেয়া’র লেখনীতে সমাজচিন্তাই মূর্ত হয়েছে

মিতু বালা

বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন নামটির সঙ্গে অনেক ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে, আধুনিক যুগের ইতিহাস আওড়াতে গিয়ে তাঁর নামটা কোনোভাবে এড়িয়ে যাওয়ায় দায় নেই। তারপরও নয়’ই ডিসেম্বর তাঁকে বিশেষ ভাবে স্মরণ করা হয়।তাঁর জন্ম-মৃত্যুর দু’টো তারিখই নয় ডিসেম্বর। তাই, এই দিনটি বাংলাদেশে “রোকেয়া দিবস”হিসেবে পালিত হয়। তাঁকে স্মরণ করতে গিয়ে তাঁর লেখা একটা চিঠির অংশ তুলে ধরবো পাঠক সম্মুখে। ভগিনী মরিয়ম কে লেখা :

“ভগিনীরে এই যে হাড়ভাঙ্গা গাধার খাটুনী-ইহার বিনিময় কি জানিস? বিনিময় হইতেছে, “ভাঁড় লিপকে হাত কালা”অর্থাৎ উনুন লেপন করিলে উনুন বেশ পরিষ্কার হয়, কিন্তু যে লেপন করে তাহারই হাত কালিতে কালো হইয়া যায়। আমার হাড়ভাঙ্গা খাটুনীর পরিবর্তে সমাজ বিস্ফোরিত নেত্রে আমার খুঁটিনাটি ভুল ভ্রান্তির ছিদ্র অন্বেষণ করিতেই বদ্ধ পরিকর।”

লেখকদের চিঠিকে তাঁদের সাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত করা হয়,তাই চিঠি গুলো এখনও সহজলভ্য। চাইলে সেটা পড়া সম্ভব।  তবে সাহিত্যের সঙ্গে চিঠির একটা ছোট্ট তফাৎ আছে ।চিঠির আগাগোড়া সবটা সত্যি দিয়ে মোড়া থাকে, কিন্তু সাহিত্যের অন্য বিষয়গুলো যেমন গল্প, উপন্যাসে এই সত্যটা অনেকটা সত্য আবার কিছুটা কল্পনার আশ্রয় গ্রহণ করে।আর এই চিঠির ছোট্ট অংশ স্রোতের বিপরীতে থেকে বেগম রোকেয়ার লড়াকু জীবনের কথা মনে করিয়ে দেয় ।মুসলমান মেয়েরা যেন তাদের পারিবারিক এবং সামাজিক অবস্থানের পরিবর্তন ঘটাতে পারে, তারাও যেন মুক্তবুদ্ধির চর্চা করে নিজেদের আত্মবিকাশ করতে পারে এই আকাঙ্খা থেকেই আমৃত্যু তিনি লড়ে গেছেন প্রচলিত সমাজ সমস্যার বিরুদ্ধে।

তিনি একটা মৃত সময়’কে পাল্টে দিয়েছিলেন। নিয়ম ভাঙা কিন্তু সহজ কথা নয়। সমাজের নিয়ম ভেঙে কোনো নতুন নিয়ম গড়তে গেলে খুব গুটিকয়েক মানুষ’কেই পাশে পাওয়া যায়। কিছু সময় একাও চলতে হতে পারে। কিন্তু তিনি ঐসময়ে থেকে এই সাহসটা দেখিয়েছিলেন এবং তিনি সফল।

ব্যক্তিগত জীবনেও সুখী মানুষ ছিলেন না বললেই চলে। ছোটবেলা থেকে বড়োবেলা এবং জীবনের শেষ বেলায়ও প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে সামনে এগিয়ে গেছেন;  তবে সঙ্গে কিছু ভালো মানুষের সংস্পর্শে আসতে পেরেছিলেন বলেই তাঁর এই দীর্ঘ পথযাত্রার পথ কখনও থেমে থাকেনি ।ধর্মীয় প্রতিবন্ধকতা আর সামজিক কুসংস্কারে আচ্ছন্ন সমাজের কুয়াশাকে আড়াল করে আলোর শৃঙ্খলে হাঁটতে শিখিয়েছিলেন তিনি। রক্ষণশীল সমাজের চোখ রাঙানো তাকে কখনও দমাতে পারেনি। আমাদের সমাজের নীতি, প্রথা, দৃষ্টিভঙ্গি সবটাই যে নারীর বিপরীতে সেটা তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। তাঁর “মতিচূর-প্রথম খন্ডে’র বিষয়ই ছিলো তৎকালীন মৃত সমাজ। সমাজের ক্ষতগুলোকে তিনি চিহ্নিত করেছিলেন। তাঁর “অবরোধ-বাসিনী”তে ছিলো ভারতবর্ষের নারী লাঞ্ছনার খন্ড খন্ড ইতিহাসের সংকলন। পুরুষের আচরণ ও পুরুষ কর্তৃক উদ্ভুত পরিবেশের কিছু হাস্যরসাত্মক চিত্রের উপস্থাপনা করেছিলেন : “হ্যাঁ, এরই নাম পর্দ্দা বটে, একেবারে মশারি যাত্রা। ” নারীদের পর্দাপ্রথা’র বাড়াবাড়ি রকমের বির্পযয়কে তিনি তাঁর লেখনীতে এভাবেই প্রকাশ করেছিলেন।

তাঁর লেখনীতে বহু ধরনের বার্তা পাঠক দরবারে হাজির করা হয়েছে ; তবে যেটা তিনি বার বার বলেছেন,  সেটা হলো প্রকৃত শিক্ষার কথা। এটা কেবল পাশ করা বিদ্যে নয়। আমাদের যে স্বাভাবিক প্রবৃত্তি রয়েছে,  সেটাকে অনুশীলনের মাধ্যমে উৎকর্ষ করাই প্রকৃত শিক্ষা । আর এই শিক্ষিত হওয়াটা শুধু চাকরির দরবারে নিজেদেরকে পেষ করবার জন্য নয়,  এই শিক্ষার ঝলকানি আমাদের চলনে,বলনে,কথনে, কাজকর্মে সর্বদাই প্রকাশ পাবে। স্বভাবতই দেখা যায়, “আতা গাছে আতাই ফলে, জাম ফলে না। ” শিশু স্বভাবতই মা’কে অধিক ভালোবাসে, বিশ্বাস করে এবং অনুকরণ করে। একজন শিক্ষিত মা সমাজ তৈরির প্রথম কারিগর বলা যায়। কারণ, সুষ্ঠু সমাজ তৈরির প্রাথমিক পর্যায়টা ঘর থেকেই শুরু হয়। ঘরের গৃহিনী শিক্ষিত না হলেও প্রতিক্ষেত্র বিশেষে ঘটে অনাসৃষ্টি কান্ড।

তাই, তিনি বারবার নারী মুক্তির কথা, নারী শিক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। তবে নারীদের এই গৃহবন্দী ও অশিক্ষিত থাকার দায়ভার সম্পূর্ণটা তিনি পুরুষ কর্তৃক চালিত সমাজকে দেননি, তার কিছুটা দায়ভার কিন্তু  নারী’র। এটা তিনি বেশ যুক্তি দিয়ে “ স্ত্রী জাতির অবনতি” নামক প্রবন্ধে  বলেছিলেন:

”আমাদের আলস্যের প্রকারান্তরে পুরুষের দাসী হইয়াছি। ক্রমশ আমাদের মন পর্যন্ত দাস হইয়া গিয়াছে। এবং আমাদের বহুকাল হইতে দাসীপানা করিতে করিতে দাসত্বের অভ্যস্থ হইয়া পড়িয়াছি। ”

নির্ভরশীলতা খুব খারাপ জিনিস। একটু একটু করে নির্ভর হতে গিয়ে আমরা ভীষণ ভাবে নির্ভরশীল হয়ে যাই এবং একটা সময় এই নির্ভরশীলতাই আমাদেরকে পঙ্গু করে দেয়। আমাদের মেয়েদের ক্ষেত্রেও ঠিক তেমনটা ঘটেছিল। বিদ্রুপ করেই তিনি বলেছিলেন, “কোনো বিষয়ে জ্ঞানলাভ করিবার শক্তিটুকুও ইহাদের নাই। আমাদের উন্নতির আশা বহুদূর, ভরসা কেবল পতিত পাবন ।”

বেগম রোকেয়াকে আজও আমরা কেনো মনে করি? আজও কেনো বেগম রোকেয়া?

কারণ, তাঁর লেখা পড়তে গিয়ে  আমাদের বিবেক বোধ জেগে ওঠে, ভেতরের সত্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা আর  সাহস জোগায়। স্বপ্ন দেখতে শেখায়, নতুন করে ভাবতে শেখায়। আর  তাই  মননে, প্রাণে, যুক্তিতে বেগম রোকেয়ার শেখানো বুলি ধারণ করতে পারলেই তাঁর আদর্শে পথ চলা সম্ভব। ’দি মুসলমান’ পত্রিকায় রোকেয়া প্রসঙ্গে একটা কথা বলা হয়েছিলো, “ রোকেয়া রচনা ও পত্রাবলীতে তার সাহিত্য চিন্তা নয়, সমাজ চিন্তাই মূর্ত হয়েছে। ”

কথাটা ভীষণ সত্যি ও স্বাভাবিক। শিশু অবস্থায় কলকাতা থাকাকালীন লেখাপড়ার যে সামান্য সুযোগ  তিনি পেয়েছিলেন তা সমাজ এবং আত্মীয়স্বজনের সমালোচনায় বেশি দূর এগোয় নি। ভাইবোনের সহযোগিতায় আরবি,ফারসি,উর্দু ও বাংলা আয়ত্ত করেছিলেন। তবে, তাঁর সাহিত্য চর্চার শুরুটা হয়েছিল স্বামীর অনুপ্রেরণায়। আর স্বামীর মৃত্যুর পরই আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল রোকেয়ার নতুন রূপে। তিনি অনুভব করেছিলেন নারীকে যথাযথ স্থানে প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে সমাজে উন্নতি সম্ভব নয়। তাই সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি সমাজ বদলের চিন্তাও তাকে গ্রাস করলো। সাহিত্যের প্রতি ভালোলাগা আর সমাজের প্রতি দায়িত্ব বোধে’র তাগিদ থেকেই তাঁর এই সাহিত্য চর্চা ও সমাজচিন্তা। কিন্তু তাঁর সাহিত্যের বহু পাতায় তাঁর সমাজকেন্দ্রিক চিন্তার প্রতিফলনই সুস্পষ্ট।

সমকালীন ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় সেখানে মুসলমান ছেলেদেরই শিক্ষার প্রসার তেমন ঘটেনি, সেখানে মেয়েদের তো আরো দুরবস্থা ।বাইরের আলো দেখাই যাদের নিষেধ ছিলো তারা শিক্ষার আলো কিভাবে দেখবে? সেই অসম্ভবকেই সম্ভব করেছিলো বেগম রোকেয়া।

আর তাঁর এই দৃঢ় মনোবল ও নিষ্ঠা বাঙালি মুসলমান নারীদের অগ্রগতির যাত্রা পথে এক অনুসরণ যোগ্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।