ছোবল - Women Words

ছোবল

মিতু বালা

মোবাইলের স্ক্রিনে ভেসে ওঠা ভয়েস ম্যাসেজটা বার বার শুনছে ;এতোবার শুনছে যে ওর দাদা ক্ষিপ্ত হয়ে  মোবাইলটা নিয়ে গেলো।

এইটুকু বয়সে তোর কিসের ম্যাসেঞ্জার? আদরে বাঁদর হচ্ছিস দিনে দিনে। আজ থেকে তোর ম্যাসেঞ্জার ব্যবহার করা খতম।

ঋতু উৎকন্ঠিত হয়ে বলতে লাগলো, “দাদা,দাদা…প্লিজ ডিলিট করিস না! ”

কে শোনে কার কথা, ওর দাদা মোবাইলটা হাতে নিয়েই পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করে দিলো।

ঋতু এক দৌড়ে নিচে  নেমে গেলো মায়ের কাছে ; ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে আরম্ভ করলো। বিড়বিড় করে নালিশ জানালো দাদার বিরুদ্ধে। মা সান্ত্বনার সুরে  বললো,কাঁদিস না মা। তোর বাবা এক্ষুনি বাড়ি ফিরে আসবে। বাবাকে বলিস কি হয়েছে। মায়ের সান্ত্বনায় সে খানিক স্বস্তি ফিরে পেলো। কান্না থামিয়ে দিয়ে বাবার  বাড়ি ফেরার অপেক্ষা করতে লাগলো। বারবার জানালা দিয়ে রাস্তায় উঁকিঝুঁকি দিচ্ছিলো। ওর বাবার একটা ফার্মেসী আছে। তাই লকডাউন থাকা সত্ত্বেও নিয়মিত বাইরে বেরোতে হচ্ছে। বাবাকে দেখেই  ছুটে কাছে যেতে চাইলো।

বাবা এক পা পিছিয়ে গিয়ে একটু দূর  থেকেই বললো, “মা কাছে এসো না।স্নান করি, তারপর তোমার কথা শুনবো । ”

স্নান ঘর থেকে বেরনোর সঙ্গে সঙ্গেই ঋতু বকবক করে সবটা বলতে আরম্ভ করলো। নালিশ শুনে নির্ঝরকে খানিকটা বকা দিলো বাবা। ও ছোটো তো কি হয়েছে।একটা ভীতি-উদ্রেককারী সময় আমরা পার করছি।মারণ ভাইরাস করোনার প্রকোপে সবাই আজ গৃহবন্দী। ওর শৈশবের দিনগুলো বিভীষিকাময় না হয়ে যায়।আমরা তো দিব্যি সবার সঙ্গে যোগাযোগ করছি। ওরা তো চাইলেও বন্ধুদের কাছে পাচ্ছে না। ওদের শৈশবটাকে একলা শৈশব হতে দিও না ।

ফোনটা হাতে পেয়ে এক  টুকরো হাসি নিয়ে উপরের ঘরে চলে এলো। মাঝারি গোছের দোতলা বাড়ি। ওদের নিজেদের বাড়িতে কোনো ওয়াইফাই নেই। উপরের তলায় এলে  পাশের বাড়ির ওয়াইফাই সংযোগটা কাজে লাগে। সেই ওয়াইফাই দিয়েই বন্ধুদের সঙ্গে ম্যাসেজিং কিংবা ভিডিও কল এর মাধ্যমে কথার আদান প্রদান করে। ওর বন্ধুদের মধ্যে কয়েকজন আছে ওর প্রতিবেশী।

কেয়া,অর্থিতা,সুগত,আয়েশা,আরাফ,গদ্য,মিষ্টি,যশ, ফ্লোরিডা, পূর্ণতা -এরা সকলে ওর প্রতিবেশী বন্ধু ।ওরা হচ্ছে এই পাড়ার ছোট্ট একটা দল। সবাই একটা সময় দলে দলে ছুটতো। ওদের মুখে লেগে থাকতো চাঁদের হাসি। ওদের ছিলো অফুরন্ত খেলার ভান্ডার। আর ঋতুকে ওদের দলের দলপতি বলা চলে। ঋতু ওদের থেকে বয়সে একটু বড়ো ;ক্লাস ফোরে পড়ে। আর ওর স্কুলের ও প্রতিবেশী বন্ধুর – দু’দলেই রয়েছে অর্থিতা।তবে ঋতুর প্রিয় বন্ধু কে?

এই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলে ওর মুখে দিয়ে বেরিয়ে আসবে কেয়া আর নীহারিকার নাম । নীহারিকা ওর স্কুলের বন্ধু।

কেয়াকে অবশ্য প্রিয় বন্ধুর কথা জিজ্ঞেস করলে, বেশ অহংকার নিয়ে বলবে, আমার প্রিয়  বন্ধু  শুধুই ‘ঋতু’।কেয়া মেয়েটা ছিমছাম, শান্ত স্বভাবের। ওর মুখে একটা মুচকি হাসি লেগে থাকে সর্বক্ষণ।

ঋতু ওদের ছোট্ট দলের নাম রেখেছে,“গোল্লাছুট”। এই দলে ওর সমবয়সী থেকে ছানাপোনা পর্যন্ত সবাই রয়েছে। সবাইকে ঋতু ভীষণ ভাবে সামাল দেয়। সবার জন্য ওর মন কাঁদে। ঋতু একটু মিশুকে আর চঞ্চল প্রকৃতির। ঋতুর কথা বললেই  সকলের মুখে ভেসে ওঠে সদা হাস্যজ্জ্বল একটা ফুটফুটে মেয়ের কথা। পারিপার্শ্বিক দিকটাকেও হৈচৈপূর্ণ রাখতে চায়। আর সর্বক্ষণ মাথায় শুধু নতুন খেলার বুদ্ধি আঁটতে থাকে।ওর বন্ধু কেয়াকে বলা যায় ওর ছায়াসঙ্গী। ঋতুর সব খেলায় ইন্ধন দেয় কেয়া। কেয়াকে সব খেলাতেই ওর চাই। ঋতু দলের ছানাপোনাদের সব বিষয়ে বেশ নজরদারি করে।

মিষ্টির মা মিষ্টিকে বকা দিয়েছে। মিষ্টি একা একা ডুকরে ডুকরে রুমে বসে কাঁদছে। ঋতুর কানে সেই কান্না পৌঁছেছে কি ঋতু ছুট্টে গিয়ে মিষ্টিকে বগলদাবা  করে নিয়ে আসবে নিজের কাছে। মিষ্টির সমস্ত মন খারাপের সঙ্গী হবে। মিষ্টি সাজতে ভালোবাসে। তাই মিষ্টিকে  সাজাতে সে ব্যতিব্যস্ত হয়ে যাবে। মিষ্টি তখন ফুর্তি মনে ঋতুর সঙ্গে খেলতে আরম্ভ করবে। কিংবা ক্লাস টু’এর আরাফ বিকেল হলেই ওর সাইকেল চালিয়ে ভোঁ ভোঁ করে এসে থামবে ঋতুর বাড়ির গ্রিল ঘেষে। তারপর গ্রিলের দিকে মুখ বাড়িয়ে চড়া কণ্ঠে ডাকতে আরম্ভ করবে,এই…. ঋতু…..ঋতু…….খেলবা?

ঋতু যে ওর বড় নাকি ছোটো সে বালাই ওর নেই। তবে এতো মিষ্টি করে কথা টেনে টেনে ঋতু বলে ডাকবে ;যে সবাই উঁকিঝুঁকি দেবে ওকে দেখার জন্য।

‘গোল্লাছুটে’র ধরা যাক কারো জন্মদিন। ওদের আনন্দ সেদিন দেখে কে।সেদিন সবাই সেজেগুজে প্রাণখুলে হাসবে আর নাচবে। জীবনের রঙে ওরা ভীষণ রঙিন। “গোল্লাছুট” এই পাড়ার মন ভালো করা দল। ওদের গান, ওদের নাচ সবটা মিলে সব সময় হাসি হট্টগোলে  ওদের জগত পরিপূর্ণ হয়ে থাকে। কিন্তু গোটা বিশ্বের মতো ওদের ঝুড়ি ভর্তি এক রঙা হাসিতে করোনার ছোবল বসলো। সবটা জুড়ে এখন শুধু নিস্তব্ধতা আর একাকীত্ব। ওদের সময় যেন আর কাটতে চায় না।জানালার গরাদ দিয়ে ওরা বাইরেটা দেখে। ওরা বৃষ্টি দেখে। রোদ দেখে। চাঁদ দেখে। কিন্তু সমস্তটা একা দেখে। একটা নিষ্প্রভ সময়। ওদের ছুটন্ত দল নিয়ে দেখার সুযোগ হয়ে ওঠে না।লকডাউনের প্রথম এক মাসের  ছুটির কথা শুনে ওদের মনে ভারি ফুর্তি জেগেছিলো।স্কুল ছুটি। চারটে পাঁচটে ক্লাস করতে হবে না।হোম ওয়ার্ক করার বালাই নেই। প্রাইভেট টিউটর আর বাড়ি আসবে না। রোজকার পড়া করতে হবে না।সবটা মিলে প্রথম একমাস বেশ আমেজে কেটেছে।পুতুল খেলায় মাতোয়ারা ছিলো। সোনালি চুলের বারবিকে ঘিরেই চলছিলো জল্পনা কল্পনা। একটা কাপড়ের পুতুলেরও প্রাপ্তিযোগ ঘটেছিলো এই সময়ে।

ওর দাদা নির্ঝর ওড়না দিয়ে ব্যালকনিতে দোল খাওয়ার জন্য একটা দোলনাও বানিয়ে দিয়েছিলো।

আর ব্যালকনিতে ফুলের সমারোহ থাকায়, সেখানে জমায়েত করতো মৌমাছি, প্রজাপতি আর নানা রঙের পাখি ।ওদের গুঞ্জনে মুখরিত হতো চারদিক। সেই কুঞ্জবনে  দোল খেতে খেতে  অন্যমনস্কভাবে  গানও করতো ঋতু—

“ পকসী…..পকসী….. প্যায়ারি….. প্যায়ারি…… পকসী…. সুন্দর….প্যায়ারি….. রঙ বেরঙকি…. পকসী……। টিকেলি…. টিকেলি…….প্যায়ারি…. প্যায়ারি…………টিকেলি……সুন্দর… .প্যায়ারি……. রঙ……বেরঙকি……….টিকেলি………।”

এসব গান তার শেখা গানের তালিকায় ছিলো না,সবই আনমনে  গাওয়া গান ছিলো। কার্টুন দেখে দেখে এসব গানের খেয়াল তার মাথায় আসতো।।

বেশ কতদিন আবার  ইউটিউব দেখে স্লাইম বানাতে গিয়ে ব্যস্ত সময় কাটিয়েছে। তারপর মাথায় এলো রান্নার ভূত। ইউটিউব দেখে প্রতিদিন নানা পদের খাবার রান্না করার বায়না করেছে। একদিন কেক, তো অন্যদিন ডোরা কেক কি চকলেট কেক,তারপর দিন থেকে হয় মিষ্টি না হয় দই, না হলে ফুচকা,তারপর সিংগাড়া, চটপটি, হালিম -এ সব কিছুই ওর বায়না করা রান্না  খাবারের তালিকায় ছিলো। ঋতুর মা প্রথম ক’দিন ওর কথামতো সবগুলো করার চেষ্টা করেছে। তবে,এটাও সত্যি ঋতুও ওর মা’কে অনেক সাহায্য করেছে।কেক বানাতে কি কি উপাদান দরকার সেটা ঋতুর থেকে এ বাড়ির ভালো কেউ জানে না। কেক বানাতে গিয়ে কোনো উপাদান বাদ গেলো কিনা সেটা ওর চোখ এড়িয়ে কখনও যায় না। ছোট হলেও পাকা বুড়ির মতো স্বভাব। তারপর ছুটির পরের মাস যখন রমজান এলো। ওর খাবারের তালিকায়ও ভিন্ন ভিন্ন খাবার যুক্ত হলো-পেয়াজি,বেগুনি, আলুর চপ, ছোলা ভাজা,চিকেন পাকোড়া।এর মধ্যে ওর মা ওকে একটা ছোট্টো মাটির চুলা বানিয়ে দিয়েছে। প্রথমদিন সে তার মায়ের সহযোগিতায় চুলায় খিচুড়ি রান্না করেছে। সেই সামান্য খিচুড়ি সে বাড়ির সবাইকে একটু একটু করে খাইয়েছে।তার প্রথম রান্না বলে কথা।ইদানীং, বাড়িতে মাংস রান্না হলেই সে তার চুলায় পোলাও রান্না করবে।এমনকি মাঝেমধ্যে খোশখেয়ালে দুপুরে নিজের ভাতটা একাই রান্না করে; কিন্তু এখন সে সবটা মিলে হাঁপিয়ে উঠেছে।  এখন তার স্কুলের কথা, বন্ধুদের কথা ভীষণ ভাবে মনে পড়ে,ওদের সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করে, খেলতে ইচ্ছে করে। ও ওর আগের সময়টাকে ভীষণ ভাবে মিস করছে। মাঝেমধ্যে টিভিতে ও যখন “ডোরেমন” দেখে তখন ওর শিশু মনে কল্পনার এক রাজ্য সৃষ্টি হয়। ও মনে মনে ভাবে, ইস! আজ যদি ওর সঙ্গী ডোরেমন হতো তবে ডোরেমনের গ্যাজেটে’র সাহায্যে পৃথিবীকে নিশ্চয়ই করোনা মুক্ত করা যেতো। আবার মনে মনে এটাও ভাবে,এমন কোনো ভাইরাস  যদি আসতো…! যে ভাইরাসের সময় দু’টো পরিবারকে একসঙ্গে থাকতে হবে। তাহলে, নিশ্চয়ই কেয়া’র পরিবার আর ওর পরিবার একসঙ্গে থাকতে পারতো। ওর মনের মধ্যে সর্বক্ষণ আগডুম বাগডুম ভাবনা খেলা  করে।

প্রতিবেশী বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা জমাতে কখনও ভরদুপুরে কিংবা বিকেলে  ছাদে গিয়ে ডাকাডাকি করে। ছোট্ট বন্ধু সুগতের সঙ্গে জানালার ফাঁক দিয়ে কথার আদান প্রদান করে।

আড়াই বছরের গদ্য ব্যালকনিতে এসে  “ঋতু দি….ঋতু দি” বলে ডাকতে শুরু করে…।

ঋতু কথার সাড়া জাগাতে বলবে, “ কি  বলছো গদ্য? ”

তখন দুষ্ট গদ্য বলবে,“আমাদের বাসায় আসবা?” খানিক বাদেই আবার বলবে,“না আসতে হবে না…কলোনা ভাইলেস আছে।”

এই ছোট্ট গদ্যও ওর মতো করে ভয়ংকর করোনাকে বুঝতে শিখেছে।

ঋতু বিকেলে  ছাদে গেলেই ছয় মাস বয়সী ইনেশের সঙ্গে ওর দেখা হয়।ঋতুর বাড়ির ছাদ আর ইনেশের তিন তলার জানালা- এই তাদের যোগাযোগের পথ, এক অব্যক্ত সম্পর্ক। ঋতু ওর সঙ্গে  নানা অঙ্গভঙ্গি জাহির করে কথা বলে। ছোট্ট ইনেশ ঋতুর কথা শুনে খুব হাসে। আর আ…..আ….করে। ঋতুর কথা আসলেই তার কাছে বোধগম্য হয় কিনা সেটা সে ভালো বলতে পারবে। ইনেশ’কে ওর মা যখন জানালার গ্রিলের পাশে এসে দাঁড় করিয়ে ধরে তখন তার ভাবভঙ্গি এমনটা যেন সে ঋতুকে কাছে পেলে জাপটে ধরতো। নিষ্পাপ এই শিশুটিও Covid-19 এর কারণে প্রিয়জনের স্পর্শের ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

ঋতুর জেঠতুতো দিদির ছেলের বয়স এই তিন বছর পূর্ণ হলো।কর্মসূত্রে ওর পরিবার ঢাকা থাকে।ঐ তিন বছরের ছোট্ট সাম্যের সঙ্গে ঋতুর আবার ভিষণ ভাব। মাঝেমধ্যে ফুরসত পেলে ঋতু ওর সঙ্গে দেখা করতে যেতো। এই করোনাকালীন সময়ে বহুদিন ওদের দেখা সাক্ষাৎ হয় না। সাম্য তার মাম্মামকে জিজ্ঞেস করে,“মাম্মাম,ঋতু মিমি কি করোনায় আটকা পড়ে গেছে…..? এই করোনা কবে যাবে….?”

শিশুমনেরও ভীষণ কৌতূহল, কবে বিদেয় নেবে এই করোনা?

দু’ বছরের ছোট্ট মধুপর্ণাকে করোনার সময় ন্যাড়া করে দেওয়া হয়েছে। সেটার জন্য তার উথাল-পাথাল কান্না সমস্ত পাড়াপড়শি’দের জাগিয়ে দিলো একবার। সেদিন মধুপর্ণার চুল কে নিয়ে গেছে সেই সান্ত্বনা দিতে ছাদ কিংবা ব্যালকনি থেকে সবাই মধুকে অনেক বোঝালো। তারপর মধুকে আরো একটু সান্ত্বনা বাণী শোনানোর জন্য ঋতু আর কেয়াকেও ন্যাড়া করার সিদ্ধান্ত হলো। ঋতু আর কেয়া’র তো ভিরমি খাওয়ার জো। একটু একটু করে কতোদিন ধরে ওরা চুল বড়ো করেছে। সেটার বিসর্জন। ভাবাই যায় না। স্কুল খুললে বন্ধুরা এই ন্যাড়া অবস্থায় দেখলে হাসি-তামাশা করবে সেটা নিয়েও তারা খানিকটা ভাবলো। শেষ অবধি ন্যাড়া হওয়া থেকে কেয়া রক্ষে পেলেও ঋতু পেলো না। কারণ,ঋতুর চুলে বাসা বেঁধেছিলো রাজ্যের উঁকুন। তাই, এই গরমে ঋতুকে ন্যাড়া হতেই হলো। ও কিছুদিন মনের দুঃখে কারো সঙ্গেই কথা বললো না। ও কিচ্ছু করবে না। আয়নায় যখনই দেখে ওর এতো দিনের লালন করা চুল  মাথা থেকে উধাও তখন মনের দুঃখে ওর কারো সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে হয় না। ওর মনে হতে শুরু হয় কেউ ওকে ভালোই বাসে না।

নেহাত সাদামাটাভাবে সবটা চলছিলো। কিন্তু দিন যায় লকডাউনের পরিসীমা বাড়তে থাকে। তাই সবটা ঘিরে বেশ বিরক্ত বোধ করছে ঋতু।

কেয়ার সঙ্গে হঠাৎ একদিন কথা বলতে গিয়ে, কেয়াই প্রস্তাবটা দিলো, “রাতে তুই আমার সঙ্গে ম্যাসেঞ্জারে কথা বলতে পারবি?”

এটা শুনে ঋতুর মনে ভারি উল্লাস। এতো দারুণ বুদ্ধি।নতুন করে মোবাইলের পর্দায় ফিরে পাওয়া যাবে আবার বন্ধুদের। সেই রাতে কেয়ার সঙ্গে একটু আধটু কথা হলো ম্যাসেঞ্জারে। তাও ওর দাদার হাতেপায়ে ধরে কিছু সময়ের জন্য। প্রতিদিন অধীর অপেক্ষায় থাকতো সেই সময়টুকুর জন্য। দিনদিন নেশা বাড়ে। ওদের কথা বলার সময়টুকু একটু একটু করে বাড়ে। এখন দুপুরের পর থেকেই ওদের ম্যাসেজিং এ কথা হয়।

দু’জনের ম্যাসেজিং বেশ অবাক করার মতো। শুদ্ধ বাংলা শব্দের ব্যবহার করে ওরা ম্যাসেজ করে। দেখলে বোঝাই যাবে না ক্লাস থ্রি ফোরের বাচ্চা কাচ্চার ম্যাসেজ। দু’জন একে অপরকে ছবি তুলে পাঠায়। দু’জন মিলে গান করে। আবোল তাবোল গোছের গানও বানায় দু’জন। ওদের খেলনা পিয়ানোতে নতুন গান তোলে।

ও একটা কথাই তো বলাই হলো না,ঋতুর ভারি সুরেলা কণ্ঠ। মিষ্টি গলায় বেশ গান করে ও। সব থেকে অদ্ভুত বিষয়, যে কোনো হিন্দি কিংবা বাংলা গান সেটা দু থেকে তিনবার শুনলেই ও সুরের সামাল দিয়ে গানটা বেশ নিজের মতো করে গাইতে পারে। এবং সেটা নিয়ে সারাবেলা আপন মনে গুনগুন করতে থাকে।

ওদের দু’জনের এই ভার্চুয়াল আলাপ ওদের মনে করিয়ে দেয় স্কুলের বাকি বন্ধুদের কথা। সবার পারিবারিক ফোন নম্বরে ও কল করে। এই ম্যাসেঞ্জারের প্রসঙ্গটা উত্থাপন করে। তারপর ওরা বেশ কয়েকজন স্কুলের বন্ধু মিলে নিজেরাই একটা ম্যাসেঞ্জার গ্রুপ খোলে। যদিও এগুলো কোনোটাই ওদের বন্ধুদের নিজের আইডি ছিলো না। কারো বড়ো আপু,ভাইয়া কিংবা বাবা মা’য়ের আইডি।বেশ চলছিলো ওদের আড্ডা।

কিন্তু মাঝখানে একদিন গ্রুপের দৌলতে জানতে পারে ওদের বন্ধু গুনগুন করোনার মরণ থাবায় আক্রান্ত। গুনগুনকে ঢাকায় আইসোলেশনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সবটা মিলে ওদের সবার মন ভারাক্রান্ত। গ্রুপের আড্ডা আজকাল আর জমে না। সবার মন মরুভূমির মতো শুষ্ক হয়ে গেছে। ম্যাড়মেড়ে সময়। তেরো দিন পার হয়ে গেছে গুনগুনের কোনো ভালো সংবাদ ওরা এখনও পায়নি।

পরদিন  ভোরবেলা ঋতু একটা মিষ্টি স্বপ্ন দেখলো। কুয়াশা কেটে গিয়ে চারদিকে দুষ্টমিষ্ট কোকিলের কুহুতান ধ্বনি।মেঘ বৃষ্টির মিলন মেলা। একটা লাল টুকটুকে ফ্রক পরে ঋতু তার সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে একটা হলুদ প্রজাপতির পেছনে ছুটতে ছুটতে মেঘের দেশে এসে হাজির হয়েছে। তুলোর মতো সাদা ধবধবে মেঘের দেশে তারা দেখলো একটা ফুটন্ত নীল পদ্ম। নীল পদ্মে বৃত্তাকার হয়ে জড়ো হয়েছে ভ্রমর আর লাল, নীল হলুদ রঙের হরেক প্রজাপতি। আনন্দোচ্ছ্বাস চারিদিকে ।দূর থেকে একটা রব তারা শুনতে পেলো, “পৃথিবী আজ থেকে করোনা মুক্ত। ”

সেই মুহুর্তে ওর মায়ের আদুরে আর নির্মল  হাসিমাখা কণ্ঠস্বরে ঋতুর ঘুম ভাঙল।

গাল ভর্তি এক মুখ হাসি নিয়ে মা বললো,“গুনগুনের করোনা নেগেটিভ এসেছে।

চৌদ্দ  দিন  বাদে  আইসোলেশন থেকে ফুটফুটে বাচ্চা মেয়ে গুনগুন মুক্তি পেয়েছে।