ছন্নছাড়া চড়ুইভাতি - Women Words

ছন্নছাড়া চড়ুইভাতি

মিতু বালা
সময়  যেন থমকে গেছে। ঝুম বৃষ্টি দমকা হাওয়ায় উড়ে গেছে।লাজুক বৃষ্টি উড়ে এসে জুড়ে বসেছে। আমি ভয়ংকর ভাবনায় বুঁদ হয়ে আছি। শেষ প্রহরের আলো নিভু নিভু করছে। ঘুমের ঘোরে অচেতন আমি। হঠাৎ কলরবে আচমকা চেতন এলো । এই রুমের  ভেন্টিলেটরে এক চড়ুই যুগলের বসবাস।তাদের বহুকণ্ঠীয় কিচির মিচির আওয়াজে সমস্ত ঘোর কেটে গেলো।চোখ রগড়াতে রগড়াতে ব্যালকনিতে চলে এলাম।  গোধূলি জুড়ে মৃদুমধুর শীতল হাওয়া চোখের ক্লান্তিকে এক ঝটকায় যেন ছিনিয়ে নিয়ে গেলো। আযানের ধ্বনি চারিপাশ জুড়ে সুরে বেসুরে ভেসে আসছে। অদূরে শঙ্খধ্বনি চারপাশটাকে সরব করে তুললো।হঠাৎ কণ্ঠস্বর সমস্ত অনুভূতির ছেদ ঘটালো।

কি তোমার  ঘুম ভাঙল?অনেক বার হলো তোমার রুমে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছিলাম।দেখলাম তুমি অঘোরে ঘুমোচ্ছ।

হ্যাঁ,তবে ঘুম ভাঙ্গেনি ঘুমকে জোর করে ভাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে। আপনি কখন এলেন?

এই একলা ঘর আর এই অচেনা গ্রামে আমার দমবন্ধ হওয়ার উপক্রম হচ্ছিল।

তা  ঘুমটা তোমার  ভাঙালো কে?

প্রেয়সীর ফোন কল..হো..হো…!

বুকের মধ্যে চিনচিনে হাহাকার নিয়ে বললাম,“ভাইয়া, ভালোবাসা  হঠাৎ হারিয়ে গেছে দূর অজানায়।”

আর  আমার ঘুম ভাঙার সমস্ত দায় আপনার অতিথিদের।

আমার অতিথি ! কস্মিনকালেও আমার সঙ্গে এই গন্ডগ্রামে কেউ দেখা করতে  এসেছে বলে তো মনে পড়ছে না !

এরা যে আপনার বহুদিনের অতিথি ;অতিথি বললে বরং ভুল বলা হবে, এরা আপনার পরিবারের সদস্যও বটে।

হেঁয়ালি ছেড়ে বলো তো কি হয়েছে?

হা….হা!!প্রসূন ভাইয়া, তেমন কিছু না । আপনার চড়ুই পাখির কিচির-মিচির  আওয়াজে কি ঘুমোবার জো আছে।  সর্বক্ষণ  চ্যা…..চ্যা….চিঁ…..চিঁ…করতেই আছে।

এই শুনে প্রসূন ভাইয়ার অট্টহাসি পুরো বাড়িটাকে কলরবে ভরিয়ে দিল। ভীষণ মিশুকে এবং অতি চঞ্চল প্রকৃতির মানুষ । দিন কতক হলো এখানে এসেছি কিন্তু বড্ড আপন করে নিয়েছে।

রোদ্দুর, তোমার সঙ্গে ভাব  জমাতে এলাম।আমি আবার চুপচাপ বসে থাকতে পারি না। আমার আঙুলে যে আংটি দেখছো এগুলো আমার ঠাকুমা পরিয়ে দিয়েছে।তাঁর বিশ্বাস ছিলো, এগুলো নাকি আমার চঞ্চলতা কমিয়ে আমাকে কিঞ্চিৎ শান্ত স্বভাবের করে তুলবে । হতচ্ছাড়া আংটি গুলো বহুবার খুলে রেখেছি কিন্তু সেই ওঁনার জোরজবরদস্তি আর শাসনের জোরে সেগুলো আবার পরতে হয়েছে।

কিন্তু এ বাড়িতে আসবার পর আপনার ঠাকুমার সঙ্গে তো সাক্ষাৎ হয়নি।

দু’বছর হলো ঠাকুমা পরলোক গমন করেছেন।

তবে তো এই আংটি খুলতে এখন আর  কোনো বাঁধা নেই?

একটা সময়ে আংটি গুলো আমার বিড়ম্বনার কারণ ছিলো ;কিন্তু এখন প্রিয় মানুষের ইচ্ছেটাকে  গুরুত্ব দিতে ভালো লাগে ।অসময়ে ভালোবাসা বাড়ে। কারো অনুপস্থিতি  তাদের গুরুত্বের জানান দেয়।

রোদ্দুর,তোমার  ক্যাফেইন পান করার অভ্যেস আছে তো?

আইস টি চলবে?

হ্যাঁ,হলে বেশ হয়।

কিছুক্ষণ পর,  দু’ মগ আইস টি হাতে প্রসূন। ব্ল্যাক টি’র সঙ্গে বরফ,চিনি ও লেবু মিশিয়ে কড়া আইস টি।

প্রসূন চট্টোপাধ্যায়; রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক। হরিদাখলিশায়  একটা দ্বিতল বাগান বাড়ি করেছেন। গ্রামের দিকে বাড়িটা হলেও তাতে আধুনিক সুবিধার কোনো কমতি ছিল না। সাজসজ্জার দিক থেকেও বাড়িটা ছিলো দেখার মতো। সেখানে  বিভিন্ন অ্যানটিক  জিনিসের সমাহার চোখ ধাঁধানোর  মতো ছিলো।বড়ো বড়ো ঝাড়বাতি।মূল ফটোকে ঢুকতেই বিশাল বড়ো হলঘর;সেখানে একটা চমকপ্রদ ঘড়িও দেখলাম। আমাকে যে রুমে থাকতে দেওয়া হয়েছে সেখানেই   রাজকীয় স্টাইলের একটা আয়না রয়েছে ।এছাড়া, ঘাট বাঁধানো বিশালাকার পুকুর।পুকুরের পাশ ঘেষেই বাগান; বাগান জুড়ে অসংখ্য অচেনা ফুলের বসবাস ।বাড়ির গায়ে খোদাই করে ‘সুরমহল’ লেখা। যদিও বাড়িটা এখনোও পুরোটা ঘুরে দেখার সুযোগ হয়নি। এ  বাড়িতে লোকজনের বিশেষ কোনো যাতায়াতও দেখি নি ।এক মহিলা গৃহপরিচারিকাকেই শুধু দেখতে পেয়েছি।  ভাইয়া সময় বিশেষে  অবসর কাটাতেই এখানে আসেন ।

রাতে ভোজের জন্য গৃহপরিচারিকা দরজায় করাঘাত করলো। হাঁসের কষা ঝাল  মাংস আর রুমালি রুটি।

বুঝলে রোদ্দুর,এই ঝড় বাদলের দিনে এই খাবারটা আমার খেতে বেশ লাগে। তবে নয়নতারা থাকলে খিচুড়ি আর মাংসের ভোজ হতো।ওর হাতের রান্না খিচুড়ির কথা  ভাবলেই জিভে জল আসে।রোদ্দুর খাবারের মেনু তোমার পছন্দসই হয়েছে তো?

এই বাদলা দিনে এর থেকে ভালো কিছু হতে পারে না।এক কথায়,অসাধারণ মেনু।

নাটোরে এর আগে কখনও এসেছ তুমি?

ভাইয়া,রাজশাহীতেই কখনও আসার সুযোগ হয়ে ওঠেনি।

বেশ,আমি তোমায় পুরো রাজশাহী  ঘুরিয়ে  দেখাবো ।রাজশাহী  শুধু চোখ দিয়ে দেখলে হবে না,এখানকার ইতিহাসটাও জানতে হবে।বিশেষত, নাটোরের   প্রতিটি অলিগলি জুড়ে রয়েছে অজস্র রাজরাজড়ার  ইতিহাস।ইতিকথা না জানলে সব কিছু দেখাই বৃথা।নাটোর মানেই সবাই ভাবে সেই ‘দীঘাপতিয়া রাজবাড়ী’ যেটা এখন ‘উত্তরা গণভবন ’ নামে পরিচিত; চৌগ্রাম জমিদার বাড়ি,চলন বিল, হালতির বিল, রাণী ভবানীর রাজবাড়ী  । এর আড়ালেও যে  কতশত দেখার বিষয় রয়েছে সেটা অনেকরই অজানা  ।এখানে রানী ভবানীকে বলা হতো “অর্ধ বঙ্গেশ্বরী”।  বাংলার অর্ধেক মালিকানা তাঁর ছিলো বলে ধারনা করা হতো।এছাড়া  রাজশাহী জেলার কাছে যে  তাহেরপুর থানা রয়েছে সেখানে নাকি   রাজা কংস নারায়ণ প্রথম দুর্গা পূজার প্রচলন করেছিলেন।লোকমুখে শুনেছি, নাটোরে যে জয়কালী মন্দির রয়েছে সেটা নাকি  ভীষণ জাগ্রত,বহু বছরের পুরনো মন্দির।

তারপর, এই  পুঠিয়া রাজবাড়ি দেখার কথা লোকে হামেশাই ভুলে যায়।পুঠিয়ার  শিবমন্দিরে যে শিবলিঙ্গ রয়েছে, সেটা এশিয়া মহাদেশে বৃহত্তম ; আর ওখানকার আয়তকার দ্বিতল রাজবাড়িটি ১৮৯৫ সালে মহারানী হেমন্তকুমারী দেবী ইন্দোইউরোপীয় স্থাপত্য রীতিতে নির্মাণ করেছিলেন।  এই হেমন্তকুমারী ছিল বড়ো মহারাণী। আরো একটা মজার বিষয় কি জানো, এই পুঠিয়া রাজবাড়ির চতুর্থ রাণী ছিলেন আমার মায়ের ঠাকুমা ।মায়ের মুখে গল্প শুনেছি,আমার বড়ো মাসীর বিয়ের সময় আমার দাদু তাকে ৯০ভরি গহনা দিয়েছিলেন ।ঐ সময়টুকু পর্যন্ত বেশ সম্পদশালী ছিলেন আমার দাদু । মায়ের বিয়েতে অবশ্যই এমন আড়ম্বরপূর্ণ ব্যবস্থা দাদু করতে পারেন নি। এখন সবটা শুনলেই গালগল্প মনে হয়,বুঝলে।

বড়ো ভাইয়ার মুখে আপনাদের কিছু গল্প শুনেছি।

হ্যাঁ,অনিক প্রায় সবটাই জানে।তোমার ভাইয়া মানে অনিক আহমেদ আরাফ  এর সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব তো ভার্সিটির সবার ঈর্ষার কারণ ছিলো। আমরা দু’টি ছিলাম হরিহর আত্মা।  ভার্সিটিতে থাকাকালীন পুরো রাজশাহী আমরা চড়ে খেতাম।অবসর মানেই দু’বন্ধুর ছোটাছুটি।  ও…তোমার পুরো নামটা কিন্তু জানা হলো না!

কাইফ আহমেদ রোদ্দুর।

অনিক একদিন বলছিলো, তুমি নাকি চারুকলা নিয়ে বিশ্বভারতীতে পড়েছো। তো এখন কি করছো তুমি?

বিশ্বভারতীর কলাভবন থেকে BFA সম্পূর্ণ করেছি, কিন্তু MFA এখনও করা হয়ে ওঠেনি ।ইচ্ছে ছিলো জার্মানিতে করবো। এখন ফ্রিল্যান্সিং করি,সময় বিশেষ সুযোগ হলে বিভিন্ন জায়গায় কাজের সবামিশন করি;

বুঝলে রোদ্দুর আমি আর অনিক কতো বার যে শান্তিনিকেতন যাওয়ার কথা ভেবেছি; প্রতিবারেই নানা কারণে আমাদের সবটা ভেস্তে গেছে। তো রোদ্দুর  শান্তিনিকেতনে পুরো সময়ের যাত্রাটা কেমন ছিলো?

ভাইয়া,শৈশব আর কৈশোরের সমস্তটা জুড়ে ছিল  ইট পাথরের ঘেরা ঢাকা শহর।তাই জীবনটাও ছিল  যান্ত্রিক। বড়ো ভাইয়া যেদিন শান্তিনিকেতন রেখে চলে এসেছিলো, মনে হয়েছিলো কেউ বোধহয় আমায় বনবাসে রেখে পালিয়ে গেলো।প্রথম প্রথম ভীষণ মন খারাপ হতো। এতো নিস্তব্ধতায় দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হতো। কিন্তু দিন যায় আর শান্তিনিকেতনের প্রকৃতির প্রেমে পড়ি।প্রতিটি ঋতুকে উপলব্ধি করতে শিখি।প্রতিটি ঋতু ভীষণ ভাবে জানান দিয়ে যেতো, যে সে এসেছে।ফুল,পাখি সবটা আগে থেকেই যেন ঋতু  বরণের অপেক্ষায় বসে থাকতো।

সত্যি বলতে,শান্তিনিকেতন না গেলে আমার আমিকে চেনা সম্ভব হতো না।

খাসা বলেছো, রোদ্দুর। আমার আমিকে চিনতে হলে নীরবতা দরকার।নিজেকে সময় দেয়া দরকার। আর আমরা এতো বেশি বানিজ্যিক হয়ে যাচ্ছি দিনে দিনে;যে এই সামান্য ফুরসত আমাদের কাছে নেই।

নৈশভোজ শেষে বিছানায় গা ঘেষতেই রাজ্যের ঘুম এসে জড়ো হলো।কখন যে ঘুমিয়ে গেছিলাম টের পাইনি।হঠাৎ  কলিং বেলের টুংটাং আওয়াজ কানে এলো।শব্দটা কানে এলেও পাশ ফিরে আবার ঘুমোতে আরম্ভ করলাম ।মিনিট দশেক বাদে আবার সেই কলিংবেলের টুংটাং আওয়াজ।এবার খানিকটা  ভয় আর আতঙ্ক এসে জড়ো হলো। ঘুমের ঘোর নিয়েই হাঁটু গেঁড়ে খাটে বসলাম।এবং আবারও কলিংবেলের আওয়াজ। ফোনের দিকে তাকাতেই দেখি সময় রাত বারোটা পাঁচ। তড়িঘড়ি করে প্রসূন ভাইয়ার  নম্বরে ডায়াল করলাম ।ফোনের রিসিভারের ওপাশে প্রসূন ভাইয়ার সচকিত কণ্ঠস্বর ভেসে আসলো।আমি থতমত খেয়ে বললাম,এতো রাতে কলিংবেলের আওয়াজ? তিনি আমাকে নির্ভয় দিয়ে বললেন,আমার রুমে একটু আসতে পারবে ?তারপর সবটা বলি।

মনের ভিতরে কেমন জানি অজানা ভয় আর আতঙ্ক এসে জড়ো হয়েছিলো।এমনিতেই মাঝেমধ্যে Uncanny  feeling কাজ করে। তাই বেশ হকচকিয়ে ওঁনার রুমে পালালাম।এ বাড়িটা মোটামুটি লোকালয় থেকে বেশ দূরে।আর সন্ধ্যের পর বজ্রাঘাতের সঙ্গে  উথাল-পাতাল ঝড়বৃষ্টি হয়েছে।ঘন্টাখানেক  সময় ধরে চলেছে  লোডশেডিং। কখন বাতি জ্বলেছিলো সেটাও খেয়াল নেই।

রোদ্দুর ভাইয়ার রুমে গিয়ে দেখলাম ওয়াইনের বোতল।দুটো গ্লাস ভর্তি ওয়াইন। রঙের অবশ্য তফাত ছিলো।একটা গ্লাসে সাদা ওয়াইন অন্যটা লাল ওয়াইন। ওঁনাকে রুমে পেলাম না।ব্যালকনি থেকে ওঁনার কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।আমি ব্যালকনিতে যেতেই উনি আমাকে বললো“আমিও কয়েকবার কলিং বেলের আওয়াজ পেলাম। প্রত্যেকবারই ব্যালকনিতে এসে দেখার চেষ্টা করেছি। কিন্তু জনশূন্য প্রতিবারই।” এটা শুনে আমার আরো পিলে চমকানো অবস্থা।

রোদ্দুর আমরা বরং রুমে গিয়ে কথা বলি। রুমে আসতেই তিনি আমাকে অ্যাপেল ওয়াইন পান করতে অফার করলেন। খানিকটা গ্লাসে ঢেলে সামনে এগিয়ে দিলেন।তবে ওয়াইন থেকেও আমার বেশি কৌতূহল হচ্ছিল ঘরে টাঙানো মায়াবী ছবিটার প্রতি। ভীষণ আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম ছবির মানুষের কথা।

প্রসূন ভাইয়া খানিকটা গম্ভীর ভাব নিয়ে  বললেন,নয়নতারা।আমার সহধর্মিণী ছিলো।  ছয়মাস আগে আমাদের ডিভোর্স হয়েছে ।কথাটা শেষ না হতেই আবার লোডশেডিং।

বেশ বড়ো সাইজের একটা মোম জ্বালানো হলো। তারসঙ্গে দেখলাম কয়েকটা ধূপকাঠি জ্বালিয়ে প্রসূন ভাইয়া ছবির সামনে রাখলেন।তারপর আনমনে বলতে আরম্ভ করলেন, ধূপের ধোয়া নয়নতারার ভারি পছন্দ ছিলো। আমি শহরে গেলেই ওর বায়না থাকতো হরেক রকম সুগন্ধি ধূপ কাঠি   আর ধূপ নিয়ে আসবার জন্য। নারকেলের শুকনো খোসা কেটে তাতে ধূপ দিয়ে সেই ধোয়া চুলে নিতো মাঝেমধ্যেই। মন মানসিকতায় ভীষণ আধুনিক হলেও সাজসজ্জায় পুরনো ভাবনা গুলোই ওর পছন্দ ছিলো ।

জানো রোদ্দুর নয়নতারা থাকাকালীন সময়ে আমি ওকে সময় দিতে পারিনি। তখন সবেমাত্র ক্যারিয়ার শুরু করেছি।থিয়েটার,মঞ্চ নাটক,ভার্সিটি  সবটা মিলেই ছিলাম কর্মব্যস্ত। আর ওর ছিলো মন খারাপের ব্যামো। অকারণে কাঁদতো শুধু। আমার কাছে সেটা তখন চরম  বিরক্তির ছিল।মনে হতো,ও তো আছেই; আগে সবটা গুছিয়ে নেইযখন ও নেই তখন অনুভব করছি যে, আমার ভাবনা ভুল ছিলো । এখন আমার অঢেল সময় থাকলেও আমাকে ভালোবেসে সময় দেওয়ার মানুষটার বড্ড অভাব। দুঃখের বিষয় কি জানো, আমরা ভালোবাসতেই ভুলে গেছি।তাই বোধহয় আমাদের ভালোবাসাও হারিয়ে যায়।

আপনি কি এখনও নয়নতারাকে ভালোবাসেন?

রোদ্দুর জীবনের অভিজ্ঞতা কি বলে জানো,মানুষের ডির্ভোস দুটো কারণে হয়;,একটা কারণ হলো অধিক ভালোবাসা আর অন্যটা হলো মানুষটার প্রতি বিরক্তি আর  তিক্ততা । আমাদের ডিভোর্সের কারণ হিসেবে  প্রথমটাকে ধরা যেতে পারে।

হঠাৎ বিদ্যুতের আলোতে ঘর আলোকিত হলো। সেই মুহূর্তে আচমকা কলিংবেলের টুংটাং আওয়াজ। দুজনে তৎক্ষনাৎ ব্যালকনিতে গিয়ে দেখার চেষ্টা করলাম এবং সেই কোথাও কেউ নেই,জনশূন্য।

ঘড়িতে তখন রাত ১টা বেজে ১০মিনিট, রুমে গিয়ে আবার আড্ডার আবহ তৈরি করার ইচ্ছে হলো। ভাইয়াকে বললাম ঘুম পাচ্ছে না।চলুন সারা রাত গল্প করি। কাল সকালে খোঁজ নেওয়া যাবে কলিংবেল বেজে ওঠার কারণ।

ভাইয়া তখন মুচকি হেসে বললেন,‘আমি ইনসোমেনিক’।

আমি তখন হেসে বললাম,তবে তো গল্প করে সারারাত কাটিয়ে দেওয়া যেতেই পারে।  কথামতো,রুমে গিয়ে দু’জন জমিয়ে দু’পেগ ওয়াইন খেলাম। নয়ন তারার প্রসঙ্গে আরো খানিকটা বললেন ভাইয়া ।সারারাত সময় কাটানোর জন্য ট্রুথ অ্যান্ড  ডেয়ার খেলার কথা মাথায় এলো ।

দু’জনে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে এমন ভাবে খেলতে খেলতে “তোমার প্রেমকথা” হলো টপিক।

আমার প্রেমকথা !খনিকটা বিব্রত হয়েছিলাম আমি ।

কারণ,আমার প্রেমিকার শর্ত ছিলো কখনো কাউকে আমাদের প্রেমকথা বলা যাবে না।নেশার হালকা একটা ঘোর এসেছিলো এবং নিজের প্রেমকাহিনিটা একজন কাউকে শোনাতেও ইচ্ছে হচ্ছিল।

তাই বলতে আরম্ভ করলাম,   বিভাগের শিক্ষক স্যমন্তক আক্কিনেনির তত্ত্বাবধানে আমাদেরকে সিলারিগাঁও স্টাডি ট্যুরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।  আনুমানিক ৬০০০ ফুট উচ্চতায় জঙ্গল ঘেরা একটা ছোট্ট পাহাড়ি জনপদ ছিলো সিলারিগাঁও। সামনেই বিশালাকার কাঞ্চনজঙ্ঘা  আর পাইনের জঙ্গল। সিলারিগাঁওকে অনেকে মিনি দার্জিলিং বলে থাকে। সিলিরিগাঁও’এর জঙ্গলের ভেতর রয়েছে একটা দুর্গের ধ্বংসাবশেষ,পুরনো মনাস্ট্রি। ১৬৯০ সালে স্থানীয় লেপচা রাজাদের তৈরি এই দূর্গ ১৮৬৪ সালে অ্যাংলো -ভুটান যুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সেনার দ্বারা ধ্বংস হয়ে যায়। এখানে তারই কিছু ধ্বংসাবশেষ আর নিস্তব্ধতা পড়ে আছে। সেটা দেখতেই ওখানে যাওয়া মূলত ।তবে,আমার কাছে সিলারিগাঁওকে মেঘ পাহাড়ের দেশ বলে  মনে হয়েছিলো।উঁচু পর্বত, ঘন জঙ্গল,রঙিল প্রজাপতির ওড়াওড়ি, পাহাড়ি নিম ফুলের মাতাল করা ঘ্রাণ— সবটা নিয়ে সিলারিগাঁও ছিলো রূপকথার জগৎ।  ঐখানের আবহাওয়াটা ছিল একটু ভিন্ন।সবসময়ই নীলাকাশে  তুলোর মতো সাদা মেঘের ভেলা খেলা করছিলো।তো  একদিন বিকেলে অঝোর ধারায় বৃষ্টি শুরু হলো। জানালা দিয়ে বৃষ্টি দেখতে গিয়ে দেখলাম একটা মেয়ে এই ভরা বাদলে একটা কাঠঠোকরার  পিছনে ছুটছে।যদিও  কাঠঠোকরা  মেয়েটার ধরাছোঁয়ার বাইরে হারিয়ে গেলো।তারপরও  মেয়েটা পাগলীর মতো একাই আনন্দ ঘন মুখ নিয়ে বৃষ্টিতে ভিজতে থাকলো। ঐ দেখাটা সেদিন খুব স্বাভাবিক  বলে মনে হয়েছিলো;ওটা যে আমার জীবনের গল্পের একটা অংশ হবে সেটা সেদিন ভাবি না।ট্যুরে থাকাকালীন পরিচয় হলো।মেয়েটি গার্গী।ও পেইন্টিং এর স্টুডেন্ট ছিলো।ট্যুর থেকে ফেরার পর  ঐ ট্যুরের সমস্ত স্টুডেন্টদেরকে নিয়ে  একটা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ খোলা হয়েছিলো।ট্যুরের অসংখ্য ছবি , সেই ছবি গুলো সংগ্রহ করতেই  এই গ্রুপের প্রয়োজন  হয়েছিলো। গ্রুপের সবার সঙ্গে মোটামুটি আলাপ হচ্ছিল। তো গার্গীর সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে একটু বেশিই কথা হতো। দিন যায় কথা আরো বাড়ে। আমরা দু’জন দু’জনের সঙ্গ বোধহয় পছন্দ করতে শুরু করলাম। ওর সঙ্গে গল্প করতে অকারণেই ভীষণ ভালো লাগতো।

অনেকদিন বাদে গ্রুপের সবাই স্যমন্তক স্যারের  বাড়িতে Camp fire পিকনিকের জন্য গেলাম।ওটা  আমাদের লাস্ট ইয়ার ছিলো।

ঐদিনই আমি জানতে পারলাম গার্গী আসলে স্যমন্তক স্যারের মেয়ে। গার্গীর সঙ্গে এতো কথা হয়েছে কিন্তু কেউ কারো পরিবার নিয়ে খুব বেশি কথা বলিনি। আর ট্যুরে যখন ছিলাম তখনও কারো মাধ্যমে এটা আমার জানার সুযোগ হয়ে ওঠেনি।  ওর পুরো নাম পর্শিয়া আক্কিনেনি গার্গী। ওরা নর্থ ইন্ডিয়ান অরিজিন ছিলো। কিন্তু ছোটোবেলা থেকে পশ্চিমবাংলায় থাকার কারণে ভীষণ ভালো বাংলা বলতো।

স্যারের মেয়ে এটা জানার পরও আমাদের খুব কথা হতো হোয়াটসঅ্যাপে।তার একমাস পরেই আমি বাংলাদেশ চলে আসি। তারপরও  প্রায় সর্বক্ষণই আমরা ম্যাসেজে কথার আদান প্রদান করতাম। আমরা নিছকই  বন্ধু ছিলাম।বন্ধুত্ব থেকে ভালো বন্ধুত্বের সম্পর্ক তৈরি হলো। ধীরে ধীরে দু’জন উপলব্ধি করলাম সম্পর্কে কিছু একটা ঘটছে। একদিন আমরা  Confess করলাম“we have  fallen in love” এবং আমি আরো একটু সংযুক্ত করে বললাম“We are free clouds ;Any times any one can go any where”..!

এটা শোনার পরও গার্গীর খুব বেশি ভাবান্তর হয়নি। ধীরে ধীরে সম্পর্কটা বন্ধুত্ব থেকে ভালোবাসায় রূপান্তরিত হল। মাঝখানে বহুদিন চলে গেলো।

কিন্তু আমরা যেহেতু জানতাম এই ভালোবাসার পরিণতি সম্ভব নয়। তাই, দুজন মিলেই  বিচ্ছেদের নিষ্ঠুর দিনটি ঠিক করলাম  ।কারণ, রাগ অভিমান থেকেও ভালোবাসা আমাদের দু’জনের প্রবল ছিল ।রাগ অভিমান আমাদের ক্ষণিক অতিথি ছিলো। তাছাড়া, যে কোনো বিষয় নিয়ে দু’জনের ধ্যান ধারণা একই গোছের ছিলো।আমি একটা কিছু বলতে যাচ্ছি সেটাও আগে ভাগে  বলে দিতো।সঙ্গে সঙ্গে দু’জন বলতাম “What a coincidence! ” সময়টা অদ্ভুত সুন্দর ছিল। জানি, ছেড়ে যেতে হবে তাও এক অদ্ভুত মায়া কাজ করতো। ভার্সিটি থেকে তিন বছর আগে পাস আউট হয়ে বেরিয়ে এসেছিলাম। এখানে এসে ভীষণ কর্মব্যস্ত সময় পার করতাম, গার্গীও ক্যারিয়ার নিয়ে ব্যস্ত থাকত।তাও দিনশেষে ঠিক আমাদের কথা হতো।

এরপর  ২৫শে বৈশাখের দিনটি ঠিক হলো। এই দিনটিতে আমরা সমস্ত সম্পর্কের সমাপ্তি টানবো বলে সিদ্ধান্ত নিলাম।  রবি ঠাকুর ছিল আমাদের ভীষণ প্রিয় । তাই তার জন্মদিনকে নিজেদের বিচ্ছেদের দিন করলাম। তবে ছেড়ে যাওয়ার আগে ওর একটা আবদার ছিল;  সমুদ্র দেখবে। তাও কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকত।শেষমেশ  অনেক পরিকল্পনার অবসান ঘটিয়ে গ্রুপের ৫জন মিলে পাসপোর্ট ভিসার ঝামেলা মিটিয়ে ২৯ফেব্রুয়ারি  ঢাকায় এলো । ঢাকা থেকে আমি ওদের সঙ্গে নিয়ে কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। সেখানে গিয়ে  ভয়ংকর মহামারী করোনার প্রকোপে  লকডাউনে পড়ে গেলাম। কিচ্ছু করার ছিল না। লকডাউনের সময় টানা ৯০ দিন  সেখানে আটকা পড়লাম । বিশেষত, টাকার সংকট এমন চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল  যে , ছন্নছাড়া চড়ুইভাতির মতো করে শেষ ক’দিন কাটিয়েছি। তবে,সময়টা একাধারে সংকটময় অন্যদিকে কতকটা সুখকরও ছিলো।  সমুদ্রের গর্জন শুনে ঘুমোতে যেতাম আবার গর্জন শুনে ঘুম ভাঙতো।  অজস্র জলের ঢেউ কখনও কখনও ভাবনার জগতেও ঢেউ খেলে যেত। এই ভয়ংকর Covid-19 এর দরুন আরো অনেকগুলো দিন গার্গীর এতো  কাছাকাছি  থাকার সুযোগ পেয়ে গেলাম ।এই সুযোগটা আমার জীবনের অনাকাঙ্ক্ষিত সেরা সময় বলে মনে হয়েছিলো। ওর প্রতি আরো তীব্র মায়ার বাঁধনে জড়িয়ে পড়েছিলাম। আর সেই সময়ে কক্সবাজার জুড়ে মানুষের পদচিহ্ন ছিলো ভীষণ কম। তাই প্রকৃতির পরিবর্তনটা খুব কাছে থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিলো; প্রকৃতি নিজের মতো করে বাঁচতে শিখেছিলো। উন্মুক্ত সৈকতে দাপিয়ে বেরিয়েছিল ক্ষুদে লাল কাঁকড়ার দল ;মনে হচ্ছিল সমুদ্র জুড়ে লাল কার্পেট কেউ বিছিয়ে রেখেছে।বাসা বেঁধেছিল গাঙ কবুতরের দল। আর কলাতলী সমুদ্রসৈকতে ডলফিনের উচ্ছ্বসিত নৃত্যে আন্দোলিত হয়েছিলো সাগর। প্রতি কদমে কদমে কেঁচোর আলপনা ছিলো দেখার মতো। সৈকতের বিশাল এলাকা জুড়ে ফিরে এসেছিল “সাগরলতা” ফুল। সৈকতজুড়ে গোলাপি  অতিবেগুনি রঙের ফুল এক অন্যরকম সৌন্দর্যময় পরিবেশের সৃষ্টি করেছিলো। এই সব সৌন্দর্য দু’জনের একসঙ্গে দেখার সুযোগ হয়েছিলো। সময়টা দুঃসময় হয়েও সুখস্মৃতি হয়ে আছে।

ভাগ্যের পরিক্রমায় ২৫শে বৈশাখের দিনটি  একসঙ্গে থাকতে হয়েছিলো।সময় আমাদেরকে থাকতে বাধ্য করেছিলো। কিন্তু ঐ ২৫বৈশাখের  পর থেকে আমাদের আর কোনো কথা হয়নি। বাকি অনেকগুলো দিন কাছাকাছি থেকেও একটা ভীড়ে থমকে গেছিলাম দু’জন। ঐ ৭ই মে একটা মেইল পাঠিয়েছিলাম গার্গীকে:

“Dear Gargi,
I want to acknowledge you that my heart is overwhelmingly full with your love. Many years we are going together aimlessly. Although the journey was not so memorable but full of believe  and understandings. Sometimes, destination  makes the journey boring; Because there is a pressure to reach the destination but without destination every moment is precious and lovable. Specially, these days are really lovable for me. It is your majesty to live with me without goal. It would be greater if we were together forever. Take care of yourself.”

Bye
Raddur

১লা জুন আমরা চট্টগ্রামে ফিরে এসেছিলাম।তড়িঘড়ি করে টাকার বন্দোবস্ত করা হলো এবং তেসরা জুন ফ্লাইটে করে ঢাকা পৌঁছল ওরা ৫জন।তারপর ঢাকা থেকে ঐদিনই দমদম চলে গেছিলো। আর আমি চট্টগ্রাম থেকে সোজা এই নাটোরে চলে এসেছিলাম ।চট্টগ্রাম বিমানবন্দর থেকে ওদের বিদায় জানিয়ে যখন ফিরছিলাম তখন আমার গা ঘেষে সাই সাই করে একটা এম্বুলেন্স চলে গেছিলো। মনে হচ্ছিল, সদলবলে সবাই আজ থেকে আমার ভালোবাসাকে মৃত ঘোষণা করেছিলো।

নিজের বনলতা সেনকে হারিয়ে,আজ আমি কবির কল্পলোকের বনলতার সেনের নাটোরে কোণঠাসা…

গল্প চলাকালীন সময় আবার লোডশেডিং হয়েছিলো;গল্প শেষ হতে হতে ভোরের আলোর মৃদুমন্দ ছিটেফোঁটা জানালা দিয়ে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। গল্প শেষে  প্রসূন ভাইয়াও দেখলাম  কোনো ধরনের মন্তব্য করলেন না। শুধু হাই তুলতে আরম্ভ করলেন। আমার তখন মনে হলো ঘুমোতে যাওয়া উচিত। ভাইয়াকে ঘুমোনোর কথা বলে নিজে রুমে চলে গেলাম।কিছুক্ষণ বাদে ঘুমিয়েও গেলাম। সকাল সাড়ে দশটার সময়  ভাইয়ার ডাকাডাকিতে ঘুম ভাঙল। গিয়ে দেখি কাপ ভর্তি কফি সঙ্গে কলা পাউরুটি। অন্যদিকে রান্না চলছে তার সুগন্ধিও নাকে এলো। কফিতে চুমুক দিতে দিতে ভাইয়া শোনালো রাতবিরাতে কলিংবেল বাজার কারণ।

আমার কলিংবেলের সুইচটা ছিলো বাইরের দিকে  ; আর সুইচের উপরে যে ছোটো সেট  থাকার কথা সেটা ছিল না।আর অনেকদিন বৃষ্টির কারণে   ছাদ থেকে গড়িয়ে গড়িয়ে জল পড়েছে মেশিনের উপর , সেখান থেকেই চুইয়ে চুইয়ে  জল ঢুকে গেছিল । আর জল ঢুকে গিয়ে  সেটা শর্টসার্কিট হয়ে গেছিল। শর্টসার্কিট হয়ে যাওয়ার কারণে অটোমেটিক ভাবে সেটা বাজতে শুরু করেছিল। এবং আমরা সেটাকে মনে মনে  ভূতুড়ে কান্ড ভেবে বসেছিলাম। এবার বুঝলে। আবার সেই অট্টহাসি।  গতরাতে এই ব্যাখ্যাটা মনে আসেনি । আজকে গিয়ে দেখতেই সবটা মাথায় এলো।

রোদ্দুর সম্পর্ক নিয়ে কথা বলতে ইচ্ছে হয়না;সিদ্ধান্ত সব সময় ঐ দু’জন মানুষের  ভেবে নেওয়া উচিত।তৃতীয় কোনো ব্যক্তি কোনোদিন কোনো  সম্পর্কের গভীরতা বুঝতে পারবে না।তারপরও তোমার গল্প শুনে একটা কথা বলতে ইচ্ছে হচ্ছে- Albeit thousands reasons to love but love exists only for love. You can together sail in the sea like sugar and tea or salt with coffee.