মায়া এ্যাঞ্জেলো : জীবন ও কবিতা - Women Words

মায়া এ্যাঞ্জেলো : জীবন ও কবিতা

অদিতি ফাল্গুনী 
বিশ্বখ্যাত মার্কিনী কবি, গায়িকা, অভিনেত্রী, সাংবাদিক ও নাগরিক অধিকার কর্মী মায়া এ্যাঞ্জেলো (এপ্রিল ৪ ১৯২৮- মে ২৮, ২০১৪) এক জীবনে প্রকাশ করেছেন মোট সাতটি আত্মজীবনী, তিনটি প্রবন্ধ সংকলন, বেশ কয়েকটি কবিতার বই। এছাড়াও পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় ধরে অসংখ্য নাটক, সিনেমা ও টেলিভিশন অনুষ্ঠানেও অংশ নিয়েছেন তিনি। ডজন খানেক পুরষ্কার ও পঞ্চাশটির বেশি সাম্মানিক ডিগ্রি অর্জন করেছেন এই নারী। তবে মায়া সবচেয়ে বেশি পরিচিতি অর্জন করেছেন তাঁর সাত খন্ডের আত্মজীবনী রচনার মাধ্যমেই। ‘আমি জানি কেন খাঁচার পাখি গান গায় (আই নো হোয়াই দ্য কেজড বার্ড সিংস-১৯৬৯)’ রচনার মাধ্যমেই মায়া আন্তর্জাতিক খ্যাতি ও স্বীকৃতি অর্জন করেন এবং এই বইয়ে তাঁর শৈশব থেকে সতেরো বছর বয়স অবধি জীবনের ইতিবৃত্ত অকপটে বর্ণনা করেছেন তিনি।
কঠোর সংগ্রামের জীবনে কি করেননি তিনি? কবি ও লেখক হবার আগে রাঁধুনী, যৌনকর্মী, নৈশ ক্লাব নাচিয়ে, অপেরা অভিনেত্রী, সাউদার্ন ক্রিশ্চিয়ান লিডারশীপ কনফারেন্স এবং আফ্রিকার বিউপনিবেশীকরণের সময় মিশর ও ঘানায় সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেছেন মায়া।
জন্মের সময় অবশ্য মায়ার নাম ছিল মার্গারিটে এ্যানি জনসন। মিসৌরীর সেন্ট লুইসে বেইলী জনসন এবং ভিভিয়ান জনসনের কন্যা হিসেবে তাঁর জন্ম। মায়ার এক বছরের বড় ভাই বেইলী জুনিয়র মার্গারিটেকে ‘মায়া’ বা ‘আমার বোন’ হিসেবে ডাকতেন। মায়ার বয়স যখন তিন আর তাঁর ভাইয়ের বয়স মাত্র চার, তখন বাবা-মা’র বিয়ে বিচ্ছেদ হলে বাবা এই দুই শিশুকে পাঠিয়ে দিলেন আরকানসাসের স্ট্যাম্পসে তাদের পিতামহী অ্যানি হেন্ডারসনের কাছে। ত্রিশের দশকের মহামন্দা ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়েও বুদ্ধিমতী এ্যানি তাঁর দোকানের পসরা ভালই জমাতে পেরেছিলেন। মায়ার বয়স যখন আট, তখন তাঁর বাবা এসে দুই ছেলে-মেয়েকেই সেইন্ট লুইসে তাদের মায়ের কাছে পাঠিয়ে দেন। সেইন্ট লুইসে মা’র ছেলেবন্ধু ফ্রিম্যান আট বছরের মায়াকে ধর্ষণ করলে মায়া তাঁর এক বছরের বড় ভাইকে জানান। ভাই সেটি বাড়ির সবাইকে বলে দিলে ফ্রিম্যানকে মাত্র একদিনের জন্য জেলে পোরা হয়। জেল থেকে ছাড়া পাবার চারদিন পর সম্ভবত: মায়ার মামারাই সেই ধর্ষণকারীকে হত্যা করে। শিশু মায়ার মনে হয় সে মুখ খুলে ফ্রিম্যানের নাম বলার জন্যই বোধ করি ফ্রিম্যান মারা গেছে ও পরবর্তী পাঁচ বছর তিনি কথা বলেন নি। যাহোক, ১৯৪২ সালে মায়া স্কুল থেকে ড্রপ-আউট হয়ে সান ফ্রান্সিসকোর প্রথম আফ্রো-আমেরিকান নারী বাস কন্ডাক্টর হন। এরপর ১৯৫৪ থেকে ১৯৫৫ নাগাদ ইউরোপ ভ্রমণ করেন একটি অপেরা দলের সঙ্গে। ১৯৫৭ সালে প্রথম গানের এ্যালবাম ‘ক্যালিপসো লেডি’ রেকর্ড করেন। ১৯৫৮ সালে নিউ ইয়র্ক গিয়ে ‘হার্লেম রাইটার্স গিল্ড’-এ যোগ দেন। ১৯৬০ সালে মিশর গিয়ে ‘দ্য এ্যারাব অবসার্ভার’-এর সম্পাদক নিযুক্ত হন। ১৯৬১ সালে ঘানায় গিয়ে ‘ইউনিভার্র্সিটি অফ ঘানা’-র ‘স্কুল অফ মিউজিক এ্যান্ড ড্রামা’-য় শিক্ষকতার পাশাপাশি ‘দ্য আফ্রিকান রিভিউ’-এর ফিচার এডিটর হন। ১৯৬৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে এসে ম্যালকম এক্সকে ‘আফ্রো-আমেরিকান একতামূলক সংগঠন’ গড়তে সহায়তা করেন। ১৯৭০ সালে তাঁর প্রকাশিত ‘আই নো হোয়াই দ্য কেজড বার্ড সিংস’ বইটি ইয়েল ইউনিভার্সিটিতে ফেলোশীপ অর্জন করে এবং তিনি পঞ্চাশটির বেশি সম্মাননা অর্জন করেন। ১৯৭২ সালে ‘জর্জিয়া, জর্জিয়া’ সিনেমার চিত্রনাট্য রচনা করেন প্রথম কালো নারী হিসেবে যা পুলিতজার পুরষ্কারের জন্য মনোনীত হয়। ১৯৭৭ সালে এ্যালেক্স হেলির সাড়া জাগানো ‘রুটস’-এ অভিনয় করেন। ১৯৮২ সালে ওয়েক ফরেস্ট ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতার কাজে যোগ দেন। ১৯৯৩ সালে ‘গ্র্যামি এ্যাওয়ার্ড’ অর্জন করেন। ১৯৯৫ সালে ‘ফেনোমেনাল ওম্যান’ এ্যালবামের জন্য আবার গ্র্যামি এ্যাওয়ার্ড পান। ১৯৯৬ সালে ‘ডাউন ইন দ্য ডেল্টা’ নামে প্রথম ফিচার ছবি পরিচালনা করেন। ২০০০ সালে পান ‘প্রেসিডেন্সিয়াল মডেল অফ আর্টস।’ ২০০৮ সালে ‘কালো মোমবাতি’ নামে পুরষ্কার জয়ী তথ্যচিত্রের জন্য কবিতা রচনা করেন ও ধারাভাষ্য বর্ণনা করেন। এসময় ‘লিঙ্কন মেডাল’-ও অর্জন করেন। ২০১১ সালে হোয়াইট হাউজে তদানীন্তন রাষ্ট্রপতি স্বয়ং বারাক ওবামা তাঁকে ‘প্রেসিডেন্সিয়াল মডেল অফ ফ্রিডম’ পুরষ্কার প্রদান করেন। ২৩শে মে ২০১৪ তারিখে মায়া তাঁর শেষ টুইট বার্তা প্রকাশ করেন ‘নিজেকে শোন এবং সেই নির্জনতায় তুমি ঈশ্বরের গলার স্বর শুনতে পাবে।’ ২০১৪-এর ২৮শে মে মায়া এ্যাঞ্জেলো দেহত্যাগ করেন।
নিচে এই মহিয়সী নারীর দু’টো কবিতা উইমেন ওয়ার্ডস-এর পাঠকদের জন্য অনুবাদ করা হলো:

আফ্রিকা
এভাবেই শায়িতা থেকেছে সে
ইক্ষুর মত মিষ্টি
তার চুল যেন মরুভূমি
সোনালী পায়ের পাতা
পাহাড়েরা তার স্তন
নীল নদ তার অশ্রু।
এভাবেই শায়িতা থেকেছে সে
কালো মেয়ে
বহু বছর ধরে।
সাদা সমুদ্রের উপর
শীতল শিশির ঘনীভূত
বর্বর দস্যুরা আসে
আসে তারা হিমশৈল ভেদ করে।
দস্যুরা নিল তার তরুণী মেয়েদের
সবল ছেলেদের বেচল বাজারে
গির্জা বানিয়ে শেখাল খ্রিষ্টের নাম জপ
বন্দুকের গুলিতে তাকে করলো রক্তাক্ত।
এভাবেই শায়িতা থেকেছে সে।

আজ জাগছে সে
স্মরণ করছে তার যন্ত্রণা
মনে পড়ছে তার যত ক্ষয়-ক্ষতি
তার তীব্র, বিফল আর্তনাদ
সে মনে করছে তার অতীতের যত ঐশ্বর্য
তার ইতিহাস জবাই হয়েছে
এখন সে পা ফেলছে
যদিও এতদিন শায়িত ছিল।

মেয়েরা কাজ করে

আমাকে ত’ বাচ্চাদের দেখতে হবে
কাপড়গুলো সেলাই করতে হবে
মেঝেটা ঝাড়– দেয়া দরকার
দোকানে যেতে হবে খাবার কিনতে
মুরগীর মাংস ভাজতে হবে
বাচ্চার হিসি শুকোতে হবে
সবাইকে খাওয়াতে হবে
বাগানের আগাছা নিড়ানী প্রয়োজন
শার্টগুলো ইস্ত্রি করা জরুরি।
বাচ্চাদের জামা পরাতে হবে
বেতগুলো ছিলতে হবে
এই কুঁড়েঘরটি পরিষ্কার করতে হবে
দেখতে হবে বাড়ির রোগীদের
তুলা তুলতে হবে
হে সূর্য, আমার উপর ফ্যালো রশ্মি তোমার
হে বৃষ্টি, বর্ষিত হও আমার উপর
ও শিশিরকণারা, আমার উপর মৃদু পতিত হও
আমার তপ্ত কপাল শীতল করো
ঝড়, আমাকে এখান থেকে উড়িয়ে নাও তুমি
তোমার তীব্রতম বাতাসে উড়িয়ে নিয়ে

আমাকে ভাসতে দাও আকাশে
ততক্ষণ অন্তত: আমার বিশ্রাম হবে।
হে তুষারকণারা, আমার উপর মৃদু ঝরে পড়ো
আমাকে ঢেকে দাও শুভ্র, শীতল চুম্বনে এবং
আজ রাতটা অন্তত: বিশ্রাম নিতে দাও।
সূর্য, বৃষ্টি ও ঢেউ খেলানো আকাশ
পর্বত, সমুদ্র, পাতা ও পাথর
দীপিত নক্ষত্ররাজি আর ও চকমকে চাঁদ
তোমরাই তারা যাদের বলতে পারি নিজের যা কিছু।

 

লেখকের অন্যান্য লেখা
মেরী দেনিসকে লেখা সিমোন দ্য বোভোয়ার-এর তিনটি চিঠি