বিশ্বের শীর্ষ ৭ নারী সরকারপ্রধান - Women Words

বিশ্বের শীর্ষ ৭ নারী সরকারপ্রধান

শামস্ বিশ্বাস
নারী সরকারপ্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, যুক্তরাজ্যের মার্গারেট থ্যাচার ও শ্রীলংকার চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গার রেকর্ড ভেঙে দিয়েছেন। সম্প্রতি উইকিলিকসের এক জরিপের তথ্যের ভিত্তিতে ভারতীয় বার্তা সংস্থা ইউনাইটেড নিউজ অব ইন্ডিয়া (ইউএনআই) এ তথ্য জানিয়েছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন- শামস্ বিশ্বাস

শেখ হাসিনা
বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনা চতুর্থবারের মতো বাংলাদেশের সরকারপ্রধানের দায়িত্ব পালন করছেন। প্রায় তিন যুগ ধরে তিনি দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তার জীবননাশের জন্য কমপক্ষে ২১ বার হামলা হয়েছে। ২০০৪ সালের গ্রেনেড হামলা থেকে প্রাণে বেঁচে গেলেও তিনি আহত হয়েছেন। কারাবরণ, মিথ্যা মামলায় হয়রানি ও জীবনের ঝুঁকি নিয়েই তিনি দৃঢ়চিত্তে এগিয়ে চলেছেন ছাত্রজীবন থেকেই। মুক্তিযুদ্ধের সময় ৮ মাস বন্দি ছিলেন সপরিবারে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে সপরিবারে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু নিহত হলে তৎকালীন পশ্চিম জার্মানিতে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহানা। ওই সময় তাকে দেশে ফিরতে দেওয়া হয়নি। ৬ বছর ভারতে থাকার পর ১৯৮১ সালে দেশে ফিরে আওয়ামী লীগ পুনর্গঠন করেন তিনি। ১৯৯০ সালে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, ১৯৯৬ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন, ২০০৭ সালে গ্রেপ্তার, ২০০৮ সালের ১২ জুন মুক্তি ও ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নির্বাচনে তার নেতৃত্বাধীন মহাজোট ২৬৪টি আসনে লাভ করে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠন করে তার নেতৃত্বাধীন জোট। এর পর ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে চতুর্থবারের মতো সরকার গঠন করেন।

ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে একমাত্র নারী নেতা হিসেবে শেখ হাসিনা দক্ষতার সঙ্গে ইসলামি ঐতিহ্য ও নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করছেন। নারীদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা, শিক্ষায় আরও সহায়তা দেওয়া, আর্থিক স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে কাজ করছেন তিনি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার এমন সাফল্য এটিই প্রথম নয়, এর আগেও নানা বৈশ্বিক সম্মাননা লাভ করেছেন তিনি। ২০১৮ সালে তিনি বিশ্বের ক্ষমতাধর ১০০ নারীর তালিকায় ২৬তম স্থানে ছিলেন। ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সাময়িকী ‘ফরেন পলিসি’র করা বিশ্বের নেতৃস্থানীয় ১০০ চিন্তাবিদের তালিকায় স্থান পান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব নিয়ে সচেতনতা তৈরিতে ভূমিকার জন্য এ তালিকায় ‘ডিসিশন মেকার্স’ ক্যাটাগরিতে বিশ্বের শীর্ষ বুদ্ধিজীবীদের তালিকায় উঠে আসে তার নাম। অলস সময় পার না করে ৩০ শতাংশ দারিদ্র্যসহ অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পরিবেশ সুরক্ষাকে একটি জাতীয় অগ্রাধিকারে পরিণত করেছেন। এ জন্য তিনি জাতিসংঘের ‘চ্যাম্পিয়ন অব দ্য আর্থ’ পুরস্কার পেয়েছেন। মার্কিন সাময়িকী ‘ফোর্বস’ তাকে ‘লেডি অব ঢাকা’ হিসেবে অভিহিত করে জানায়, তিনি রোহিঙ্গা জনগণের সাহায্যের অঙ্গীকার ও রোহিঙ্গাদের আশ্রয়দানের জন্য ২ হাজার একর ভূমি বরাদ্দ করেন। তা মিয়ানমারের অং সান সু চির সম্পূর্ণ বিপরীত। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশে যাওয়ার ক্ষমতা, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, সাহসিকতা আর ব্যক্তিত্বের জন্য দেশ-বিদেশের নামকরা প্রতিষ্ঠান থেকে পেয়েছেন নানা সম্মাননা। এর চেয়েও বড় কথা, সাধারণ মানুষের ভালোবাসা।

উইকিলিকসের জরিপে বলা হয়েছে, টানা তৃতীয়বারসহ চতুর্থবারের মতো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন শেখ হাসিনা। প্রথম মেয়াদে ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন তিনি। পরে ২০০৮ সালে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে ফের প্রধানমন্ত্রী হন শেখ হাসিনা। এর পর ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনেও নিরঙ্কুশ জয় পায় তার দল আওয়ামী লীগ। চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন শেখ হাসিনা। ইতোমধ্যে এ পদে ১৫ বছরেরও বেশি সময় পার করে ফেলেছেন তিনি।

অ্যাঙ্গেলা মেরকেল
যুক্তরাষ্ট্রীয় দেশের মধ্যে জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেল আছেন সবার শীর্ষে। তিনি ২০০৫ সাল থেকে এখনো ক্ষমতায়। তিনি জার্মানির প্রথম নারী চ্যান্সেলর। ১৯৯০ সালে দুই জার্মানি এক হওয়ার পথে। ওই বছরই ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন (সিডিইউ) দলে যোগ দেন মেরকেল। দলের সাধারণ সদস্য থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য, তার পর মন্ত্রী, সিডিইউ দলের প্রধান ও চ্যান্সেলরÑ এত অর্জন ধরা দিতে সব মিলিয়ে ১৫ বছরও লাগেনি। যখন প্রথমবার চান্সেলর নির্বাচিত হলেন, তখন অনেকের মনেই সংশয় ছিলÑ এমন দায়িত্ব পালন করতে পারবেন তো? ম্যার্কেলের ব্যক্তিত্ব আর নেতৃত্বগুণে তৃতীয় মেয়াদে রয়েছেন ক্ষমতায়। আঙ্গেলা মেরকেল ইউরোপীয় ইউনিয়নে যে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন, এতে তার প্রতি ইউরোপবাসীর আস্থা বেড়েছে অনেক।

ইন্দিরা গান্ধী
জরিপে উল্লেখ করা হয়, ইন্দিরা গান্ধী ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ১৫ বছরের বেশি ক্ষমতায় ছিলেন। তিনি ভারতের প্রথম এবং আজ পর্যন্ত একমাত্র নারী প্রধানমন্ত্রী। ভারতের প্রভাবশালী নেহরু পরিবারে জন্মগ্রহণ করায় তিনি এক রাজনৈতিক পরিম-লে বেগে ওঠেন। তার পিতামহ মতিলাল নেহরু প্রথম সারির কংগ্রেস নেতা ছিলেন। তার পিতা জওয়াহের লাল নেহরু ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী। তার ছেলে রাজীব গান্ধী ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ১৯৪১ সালে অক্সফোর্ড থেকে ফিরে এসে ইন্দিরা গান্ধী পিতার সঙ্গে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৫০ সাল থেকে অপেশাগতভাবে জওয়াহের লাল নেহরুর অফিস সহকারীর কাজ করে আসছিলেন। ১৯৬৪ সালের জওয়াহের লাল নেহরুর মৃত্যুর পর ভারতের প্রেসিডেন্ট তাকে রাজ্যসভার সদস্য হিসেবে নিয়োগ দেন। ইন্দিরা গান্ধী তখন লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর মন্ত্রিসভায় তথ্য ও প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর হঠাৎ মৃত্যুর পর ইন্দিরা গান্ধী ভারতের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

মার্গারেট থ্যাচার
মার্গারেট থ্যাচার ব্রিটেন শাসন করেছেন ১১ বছর ২০৮ দিন। ব্রিটেনের ইতিহাসে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার কনজারভেটিভ পার্টি থেকে এই দায়িত্ব পালন করেন। দেশটির প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হয়েও যেভাবে শক্ত হাতে বিভিন্ন বাধা অগ্রাহ্য করে ব্রিটেনের অর্থনীতিতে বৈপব্লিক সংস্কার এনেছিলেন, এ জন্য আয়রন লেডি হিসিবে পরিচিতি পেয়েছিলেন।

চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গা
শ্রীলংকার প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্টÑ দুভাবেই ক্ষমতায় ছিলেন ১১ বছর ৭ দিন। আজ পর্যন্ত তিনি শ্রীলংকার একমাত্র নারী হিসেবে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেছেন। তারা বাবা সলোমন বন্দরনায়েকে ছিলেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী ২০০৫ সাল পর্যন্ত শ্রীলংকা ফ্রিডম পার্টির (এসএলএফপি) দলীয় প্রধান ছিলেন চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গা।

ডেম পারলেট লুইজি
জরিপ অনুসারে ১৯৯৭ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ২০ বছর ১০৫ দিন দেশ শাসন করেছেন ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জের দ্বীপরাষ্ট্র সেন্ট লুসিয়ার গভর্নর জেনারেল ডেম পারলেট লুইজি। তিনি সবচেয়ে বেশিদিন ক্ষমতায় থাকা নারী। বিশ্ব রাজনীতিতে তিনি খুব বেশি পরিচিত ছিলেন না।

ভিগডিস ফিনবোগডোটিয়ার
আইসল্যান্ডের ভিগডিস ফিনবোগডোটিয়ার ক্ষমতায় ছিলেন ১৯৮০ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত প্রায় ১৬ বছর। তিনি ছিলেন বিশ্বের প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে সরাসরি নির্বাচিত নারী প্রেসিডেন্ট। তিনি এখন পর্যন্ত যে কোনও দেশের সবচেয়ে দীর্ঘকালীন নির্বাচিত নারী রাষ্ট্রপ্রধান।