ইফিজেনিয়া, কার্ল গুস্তাভ ইয়ুং ও পদ্মা সেতুর জন্য ‘দরকারী নরমুন্ডে’র গুজব... - Women Words

ইফিজেনিয়া, কার্ল গুস্তাভ ইয়ুং ও পদ্মা সেতুর জন্য ‘দরকারী নরমুন্ডে’র গুজব…

অদিতি ফাল্গুনী

ইফিজেনিয়া ছিল গ্রিস-ট্রয় যুদ্ধের সময় গ্রিসের ছোট ছোট বেশ কিছু দ্বীপ তথা নগররাষ্ট্রের একটির নৃপতি আগামেমননের কন্যা। নয় কি দশ বছর বয়স। ট্রয়ের দিকে গ্রিক যুদ্ধ জাহাজগুলো যখন রওনা করবে, জাহাজ আর ছাড়ে না। কেন? সুবাতাস বইছে না। জাহাজের পালে বাতাস লাগতে হলে কি করতে হবে? আগামেমননের শিশু কন্যা ইফিজেনিয়াকে বলি দিয়ে দেবতাদের তুষ্ট করতে হবে। সঙ্গত কারণেই আগামেমননের স্ত্রী এতে রাজি নন। কিন্ত আগামেমনন পুরুষ ও রাজা। বন্ধু মেনিলাসের যে স্ত্রী স্বেচ্ছায় ট্রয় রাজকুমারের সাথে পালিয়েছে, তাকে জোরপূর্বক ফিরিয়ে আনার যুদ্ধ অভিযানের মাধ্যমে গ্রিক পৌরুষের হৃত মর্যাদা ফিরিয়ে আনতে মেয়েকে আনালেন নিজের কাছে। শিশু কন্যা সরল বিশ্বাসে বাবার দিকে খিলখিল করে হাসতে হাসতে দু’বাহু বাড়িয়ে ছুটলো। বাবা তাকে কোলে নেবার ভাণ করে ছুরি বিদ্ধ করলো। গ্রিক জাহাজে বাতাস লাগল। ইফিজেনিয়ার মা এই প্রতারণা সহ্য করতে পারেনি। স্বামীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে গিয়ে পুরুষতন্ত্রের কাছে হেরে গেছেন।

এখন এই যে নরবলির মাধ্যমে বা শিশু বলির মাধ্যমে দেবতা বা অদৃশ্য কোন শক্তিকে তুষ্ট করতে হবে, এই রোমহর্ষক ক্যানিবাল বিশ্বাস আমাদের ভেতর আজো আছে। গ্রিকরা খ্রিষ্টান হয়েছে। বর্তমান বাংলাদেশ বা অতীতের পূর্ব বাংলার অধিকাংশ হিন্দু মুসলিম হয়েছে। কিন্ত ভেতরের ক্যানিবাল বিশ্বাস অপসৃত হয়েছে? হয়নি। আরবেও হযরত ইব্রাহিম প্রিয়তম পুত্রকে কোরবানী দিতে গিয়ে অনন্ত করুণাময় নিজেই পুত্রের জায়গায় এক দুম্বাকে হত হবার যে ‘লীলা/ম্যাজিক’ প্রদর্শন করেন, সেই প্রথাই ‘কোরবানী’ হিসেবে আজো আছে। বাস্তবে ‘কোরবানী’ আর ‘বলি’র পার্থক্যই বা কি? ইন ফ্যাক্ট প্রাক-ইসলামী আরব থেকেই ‘কোরবানী’ প্রথার সূচনা। একইভাবে নৃ-মুন্ডমালিনী কালী শোণিত পিপাসু। ভারতের তান্ত্রিক বা কাপালিকরা বলিদানের জন্য নবকুমারের মত হৃষ্ট-পুষ্ট কোন যুবককে এই সেদিনও কোন না কোন অমাবশ্যায় তোড়-জোড় করছে…তার অনবদ্য আখ্যান পাই বঙ্কিমের ‘কপাল কুন্ডলা’য়। আফ্রিকার সাম্প্রতিক সাহিত্যে তাদের প্রাচীন ধর্মগুলোর এসব রিচ্যুয়ালসের বিবরণ পাবেন। এজন্যই ফ্রয়েড যেখানে ক্রমাগত নারী-পুরুষের অবদমিত যৌনতাকে দুনিয়ার সব রোগের নিদান মনে করছেন, কার্ল গুস্তাভ ইয়ুং মানব সভ্যতার বিভিন্ন জনগোষ্ঠির ‘কালেক্টিভ আনকনশাস’ ও ‘কালচারাল আর্কিটাইপে’র উপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। বার্গম্যানের ছবিতে যেমন খ্রিষ্ট ধর্ম গ্রহণ করার পরেও বহু সুইডিশের চরিত্রে থেকে যায় গোপন নর্স বা ভাইকিং দেব-দেবীরা, তেমনি পৃথিবীর নানা দেশেই একেশ্বরবাদী ধর্মও সভ্যতার উত্থানের পরও ভেতরে কালেক্টিভ আনকনশাসে থেকে যায় হারিয়ে যাওয়া ধর্ম ও সংস্কৃতির ‘লুপ্ত পূজাবিধি।’ অনেক সময় নতুন একেশ্বরবাদী ধর্মত্রয়ী অতীতের ধর্মগুলো থেকে নানা উপাদানও নিশ্চুপে গ্রহণ করে বৈকি।

ইয়ুং খুবই প্রয়োজনীয় মনস্তাত্ত্বিক। তাঁর আর একটি ভাবনা আমার খুব প্রিয়। সব পুরুষের বা ‘এ্যানিমাসে’র ভেতর ‘এ্যানিমা’ আর সব নারীর ভেতর ‘এ্যানিমাস’ বা পুরুষ সত্ত্বার কিয়দংশ উপস্থিতি রয়েছে। ইয়ুংয়ের এই তত্ত্ব পড়ার পরে ‘অনিমেষ ও অনিমা’ নামে একটি কবিতা লেখার কথা ভেবেছিলাম। ইয়ুংয়ের ভাবনার মতই ভারতের ‘অর্ধ-নারীশ্বর’ বা চীনের তাও দর্শনেও এমন ভাবনা ছিল। যে কারণে দীর্ঘকেশী চিত্রশিল্পী এস,এম, সুলতানের ‘রাধা ভাব’ হলে শাড়ি পরা হতো…এমন সংস্কৃতি ও হেটেরো-সেক্স্যুয়াল যৌনতার চাপিয়ে দেওয়া মডেলের ভেতর কত চোরা ঢেউই না আছে! যাক…আর ভাবের ত্যানা না পেঁচিয়ে সরকারকে আপাতত যাবতীয় গুজব বন্ধ করার জন্য কঠোর পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ করি। যদিও লক্ষ বছরের মানব সভ্যতার ‘কালেক্টিভ আনকনশাসে’ প্রোথিত এই ক্যানিবাল ভাবনার সাথে লড়াই অত সহজ কাজও নয়।