নননপুরের মেলায় একজন কমলাসুন্দরী ও একটি বাঘ আসে - Women Words

নননপুরের মেলায় একজন কমলাসুন্দরী ও একটি বাঘ আসে

তিতাস পারের কোনো একটি জায়গায় হয়তো এই গল্পের শুরু। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের দীর্ঘ নয় মাসের ঘটনা পরম্পরার সাথে সেই গল্পের একটা যোগসূত্র রয়েছে। যেখানে নদীতে ভেসে আসা এক ছোট্ট শিশুকে ঘিরেই ঘটনার সূত্রপাত। শিশু জাইদুলকে ঘিরে মঙ্গল ও তার পরিবারে ঘটে যাওয়া নানান ঘটনা পরম্পরা ধীরে ধীরে একাত্তরে ঘটে যাওয়া পাকসেনা ও রাজাকারদের সাথে মুক্তিবাহিনীর ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া অনেকটা নানান লৌকিকতায়, বিভিন্ন মিথ ও স্থানীয় কৃষ্টিতে ফুটে ওঠে।

আবার মনে হয় এই ঘটনায় যেসকল চরিত্র দৃশ্যমান তারচেয়েও হয়তো অদৃশ্যমান ছায়ার আড়ালে অসংখ্য চরিত্র এই নাটকের মূল সুরকে টেনে নিয়ে চলে, কখনো পাহাড়ি ঝর্নার সুরে সুরে, কখনো সমতলের গীত ও ছন্দে, কখনো নদীর ধাবমান হাওয়ায়। ঘটনার যেখানে শুরু হয়তো তারচেয়েও অনেক আগে সেই ঘটনার সূত্রপাত! একবার মনে হয় সবকিছু দৃশ্যমান, আবার মনে হয় অদৃশ্যমান চরিত্রগুলোরই বেশি উপস্থিতি।

যেসকল মানুষের মিথস্ক্রিয়া এই নাটকে টের পাওয়া যায়, তারচেয়েও বেশি হয়তো সরেজমিন তাদের অনুপস্থিতি। পূর্বপুরুষের রক্তের ছটফটানির ঢালু বেয়ে এই চরিত্রগুলো কোথাও কোলাহলমুখর, কোথাও আবার নৈঃশব্দে ভরপুর। বাংলার একটি বিশেষ অঞ্চলের সংস্কৃতি, মিথ ও মুক্তিযুদ্ধকে সাথে নিয়ে এই কোলাস যেন ধীরে ধীরে আনিস মিয়ার শার্টের এক বিশাল ক্যানভাস হয়ে ওঠে।

যেখানে গল্পের প্রধান চরিত্রগুলো জাইদুল, লুপ্না, এমদাদ ও মঙ্গল আর একটি কল্পিত বাঘ। বাঘটি এখানে একটা মেটাফোর। মানুষ থেকে পরজনমে সে বাঘরূপে জন্ম নেয়। শেষপর্যন্ত সার্কাস দলের হয়ে সেই বাঘ তার পূর্বপুরুষের জন্মস্থান পরিভ্রমণ করার সুযোগ পায়।

বদরুজ্জামান আলমগীর রূপক ও প্রতীকের আশ্রয়ে যে গল্পটি রচনা করেন, সেই গল্পটি মঞ্চায়নে থিয়েটার ৫২ যে ধরনের দৃশ্যকল্প ও আনুসঙ্গিক বিষয়াবলীর উপস্থাপনা করে, সেখানে নাটমণ্ডলের মত ছোট্ট পরিসরের মঞ্চে হয়তো সেই দৃশ্যগুলোর কম্পোজিশান পুরোপুরি দেখানোর সুযোগ ছিল না। তাই নির্দেশক জয়িতা মহলানবীশ কিছু কিছু এপিসোডে দর্শকসারির জায়গা ও মঞ্চের বাইরের অংশগুলো ব্যবহার করে তা পুষিয়ে নেবার চেষ্টা করেছেন।

সেট যতটা সহজ সরল তারচেয়ে প্রোপসের ব্যবহার এই নাটকে অনেক বেশি। কস্টিউম ব্যবহারের ক্ষেত্রেও কুশলী প্রচেষ্টা রয়েছে। নাটকের লাইট কোনো কোনো এপিসোডে অসাধারণ। সে তুলনায় আবহসঙ্গীতে কিছুটা প্রক্ষেপণ সমস্যা ছিল বলে মনে হয়েছে। বিশেষ করে আর্টিস্টদের সাথে আবহসংগীত প্রক্ষেপণে একটা ধীরলয়ের গ্যাপ থেকে গেছে।

অভিনয়ের ক্ষেত্রে লুপ্না চরিত্রে সুরভী রায়, মঙ্গল চরিত্রে নজরুল ইসলাম সোহাগ ও জাইদুল চরিত্রে নূরে খোদা’র অভিনয় দৃষ্টি কেড়েছে। সবমিলিয়ে থিয়েটার ৫২-এর এই প্রযোজনাটি ধীরে ধীরে আরো সাবলিল ও সার্থক হয়ে উঠবে বলে আমি মনে করি। নির্দেশক জয়িতা মহলানবীশ হয়তো পারফর্মারদের আরো বেশি পরিশ্রম করিয়ে কঠোর অনুশীলনের মাধ্যমে নাটকটিকে আরো একটু ভিন্ন মাত্রায় উন্নিত করবেন বলে আমি বিশ্বাস করি। জয়তু থিয়েটার ৫২। জয়তু ‘নননপুরের মেলায় একজন কমলাসুন্দরী ও একটি বাঘ আসে’।