মোহজাল (পর্ব: সতেরো)


নিউজটি শেয়ার করুন

অনন্যা হক

মোমেনা তার ঘরের খাটে বসে কাথা সেলাই করছে।দখিন দিকের জানালা টা খোলা।খাঁ খাঁ দুপুর।মা চলে গিয়েছে নিজের বাড়িতে।

ছেলে দুটো বাইরে কোথাও আছে।ঘরে একা সে।

সেলাই করতে করতে হাত থেমে যায়,দেখে জমির আসছে বাড়ির দিকে।তার ঘরের পাশের গলি দিয়ে ঢুকবে বাড়ি তে।মোমেনা বের হয়ে আসে তার সাথে কথা বলতে।

জমিরের কাছেই স্বামীর খবর নেয় সে।এই কদিনে তাকে কেউ কিছু জানায়নি।ঐ মোবাইলের মাধ্যমে জমির যতটুকু জানতে পারে সেটাই সে জানে।

বাইরে এসে বারান্দার কোণার দিকে এগিয়ে গিয়ে ডাকে জমির ভাই আর কোন খবর আছে?জমির এগিয়ে এসে উঠোনে দাঁড়ায়।

আসেন বসেন একটু, মোমেনা বলে।

-চিন্তা করে কি চেহারা করিছো ভাবী? না এখন আর বসবো না। বউ ভাত বাড়ে বসে আছে।

-বউ রে খুব ভয় পান মনে হয়?

-পাই তো, কিডা না পায়?এমনি দেরি হয়ে গেছে,মোবাইল করছিল।

-ভাবী আইছিল সকালে।মানুষ তো ভালই,ভয় পান কেন?

-নিজের দোষে পাই।দোষ আছে বুঝছো না?

কি কর ঘরে একা একা? একা কতক্ষণ ভাল লাগে, একটু যে তোমার সাথে সময় কাটাবো, এখন আর উপায় নেই বোঝ তো।

আর কয় দিন বাপের বাড়ি থাকলি ভালই হতো কি কও?

মোমেনার চোখের তারায় ঝিলিক খেলে যায়।হাসে জমির এর চোখে চোখ রেখে। বলে,আপনি ভারী ফাজিল।ভাবী রে ভাল মানুষ পায়ে এমন করেন।

আমি হলি দেখতেন।এত সহজ হতো না।

-কি এত সহজ হতো না? তয় ঐ দিন যে কিছু কলে না? দেখলাম তো

রঙ তামাশা ভালই পছন্দ কর।

-আসেন একটু বসেন, একটা পান বানায়ে দেই।

-বউ আমার ভাল, তয় এত ভাল না।খাবার খুলে বসে আছে আর পান খায়ে যাই,কি যে কও ভাবি!

কেন বারবার ডাকো কেন, মন আমার জন্যে কেমন করে নাকি?

মোমেনা তাকিয়ে থাকে তার মুখের দিকে,মনে থাকে না তার স্বামী অসুস্থ হয়ে পড়ে আছে।এখন জমির এর উপস্থিতিই তার ভাল লাগছে।

জমির বলে, যাই ভাবী পরে এক সময় সুযোগ করে আসবানে।

তুমি যাও কাথা সেলাই কর গে,চিন্তা কোর না,ভাই ভাল হয়ে ফিরে আসবেনে।

জমির চলে যায়,পেছনে দাঁড়িয়ে মোমেনা চলে যাওয়া দেখে।

কিছুক্ষণ ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকে।এই লোক টা কে তার ভাল লাগে।সে এসে কথা বললে আপন মনে হয়।যে কদিন জমির এর বউ ছিল না, মোমেনার স্বামীও নেই, জমির প্রতিদিন তার কাছে এসে বসেছে কথা বলেছে সময় ধরে।

দুদিন মোমেনা ঘরে একা ছিল, বারান্দায় না পেয়ে সাহস করে ঘরে গিয়ে উঠেছে, কিছু টা বেসামাল আচরণ করেছে।

জমির সাহস পেয়েছিল মোমেনা কে দেখে।

জমিরের মত পুরুষেরা মোমেনার মত নারীদের চোখ দেখলে বুঝতে পারে তাদের কতটুকু কাছে যাওয়া যায়।তাই সে সুযোগ জমির হাতছাড়া করেনি।

এই হলো মোমেনার আসল সমস্যা।খুব তাড়াতাড়ি কাউকে আপন লাগে,কাছে টেনে নিতে সময় লাগে না।কেমন এক টানে যেন কাছে টেনে নেয়,আবার কখনও মনে হয়, কোন পুরুষই তার আপন না।

এক আপন পরের খেলায় তার পুরো জীবন টাই কাটছে যেন।

শুধু সিরাজের বাপ ছিল তার মনের গহীনে আপন পুরুষ।

এরপর সব শুধু ঘাটে ঘাটে পানসি বাঁধে আর খোলে।

কোন ঘাটই তার ভাল করে চেনা হয় না।

মোমেনা আবার ঘরে ফিরে আসে,কাথা টা হাতে নিয়ে আবার রেখে দেয়।জমিরের কথা ভাবে।ভাবে, ভাবী মানুষ টা ভাল,সহজ সরল।মাঝে মাঝে কাছে এসে বসে গল্প করে।

বোঝাই যায় না দেখে, যে তার ঘরের পুরুষের এমন বজ্জাত খাসলত সে টের পায়।নাকি টের পায়।সে কি তারে বোঝাবে?

হয়তো বুঝেই জ্বালা যন্ত্রণা চেপে রেখে হাসি মুখে সংসার করে।

নয়তো কোনদিন চোখের সামনে দেখেনি কিছু বলে ভাল আছে।

তার নিজের জীবনের কথা মনে পড়ে।

কত ভালবাসা ছিল দুজনের ভেতরে।শাশুড়ি কোন ভাবেই ভাঙন ধরাতে পারতো না।হিংসায় জ্বলতো।সেই মানুষ টা যেই এক অল্প বয়সী সুন্দর মেয়ে চোখের সামনে আসলো কত তাড়াতাড়ি পাল্টে গেল।তার সামনে কত কিছু করছে নির্লজ্জের মত।সে হতবাক হয়ে গিয়েছিল।কত কষ্ট বুকে চেপে সহ্য করে তারপর ঘর সংসার ছেড়ে বের হয়ে এসেছিল।

হঠাৎ করে জমিরের বউ এর কষ্ট টা তার বুকে বাজে।ভাবে, আর জমির কে এমন প্রশ্রয় দেবে না।কিন্তু মোমেনা জানে আসলে সে কি করবে।জমির যখন একা কখনও তার কাছে আসবে,সে সত্যিই জানে না তার মনের কথা।

এমন করে করেই মোমেনা অনেক গুলো বছরে গড়ে উঠেছে।তার পাপ বোধ নষ্ট হয়ে গিয়েছে।অন্য কে ঠকানোর ভাল মন্দ বোধ তার নেই বললেই চলে।

নিজে প্রথম জীবনে ঠকে আসার পর থেকে সে নিজেকে চেনে না।

কাথা টা হাত থেকে রেখে দেয়।এমন সময় হঠাৎ করে জমির ঢোকে ঘরে।চমকে তাকায় মোমেনা।

-ভাবী খবর নিয়ে আসলাম।তুমি চিন্তা করতিছো দেখে ফোন দিছলাম।কাল রজব নিয়ে আসবি ভাই রে।এখন নাকি একটু ভাল।

-তাই? চলেন বারান্দায় যায়ে বসি,ভাবী কই, এখন আসলেন যে?

-কেন বারান্দায় কেন?সে ভাত খায়ে ঘুম দিছে, তারে দিয়ে তোমার কি? এখানেই বসি,কাজে যাওয়ার আগে একটু তোমার কাছে আসতি মন চাইলো।

-কেউ দেখে ফেললে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবেনে।আপনার অনেক সাহস।সরেন তো এত কাছে আসেন কেন?

মোমেনা ঠিক পাল্টে যায় নিমিষেই। এতক্ষণ যা ভাবছিল কিছুই তার মাথায় কাজ করে না।

-কেন ভাবী,তোমার না সাহস ভাল লাগে?জমির মোমেনার কথা কানেই তোলে না।

-জমির ভাই দরজা খোলা।

-তাইলে বন্ধ করে দেই।

-আপনি যান,আমার ছেলেরা আসবি এখন।যান কাজে যান।

কিছুক্ষণ পরে জমির বের হয়ে যায়।

মোমেনার জীবনে তার বুড়া স্বামীর আর শেষ পুরুষ হওয়া হলো না।

চলবে…

আগের অংশ পড়তে ক্লিক করুন

মোহজাল (পর্ব: ষোল)

 

 

 

 

 

এই বিভাগের আরও সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *