মোহজাল (পর্ব: চৌদ্দ)


নিউজটি শেয়ার করুন

অনন্যা হক

আজকাল কদম আলীর মাঝে মাঝেই শরীর খারাপ হয়।মোমেনা চিন্তায় পড়ে যায়।যে লোক নামাজ বাদ দেয় না কোন দিন,সে আজ ফজরের নামাজ পড়তে উঠলো না।

আজ ঘুম থেকে ওঠে দেরি করে।ঘর থেকে বেরিয়ে সোজা কল তলায় যায়।মোমেনা কে ডাকে।

মোমেনা গিয়ে দেখে বালতি খালি।বলে,খাড়ান ভরে দেই,আজ বেলা করে উঠলেন যে?

-শরীর ডা ভাল না।

-হাত মুখ ধুয়ে বারান্দায় যান,আমি খাবার নিয়ে যাচ্ছি।

কদম আলী বারান্দার খাটে গিয়ে আবার শুয়ে পড়ে।মোমেনা দূর থেকে খেয়াল করে।তাড়াতাড়ি খাবার গুছিয়ে ঘরের বারান্দায় যায়।

-কি বেশি খারাপ লাগতিছে আপনার?

-হ,মাথা ঘুরায়, বসতে পারি না।ছেলে মেয়ে গুলো রে খবর দেয়া দরকার।শরীর খারাপ শুনে যদি আসে।

মোমেনা ভয় পায়।কি বলে এই লোক,মাত্র দুই বছরের সংসার, এত তাড়াতাড়ি এমন কি শক্ত অসুখ করলো! বলে,এই যে খাবার আনছি,ওঠেন তো,এই সেদ্ধ ডিম ডা খান,দেখেন ভাল লাগতি পারে।

-তুমি বুঝতে পারবা না,এখন আমার খাওয়া সম্ভব না।মোমেনা আরো বিচলিত হয়ে যায়,বলে আপনি থাকেন আমি জমির ভাই রে ডেকে নিয়ে আসি।

জমির আসে তড়িঘড়ি করে।বলতে বলতে আসে,কালও তো দোকানে দেখলাম ভাল মানুষ বসে আছে।কি হলো আবার।

-দেখি ভাইজান,কেমন লাগতিছে কন তো?

-জমির আমার ছেলে, মেয়েদের খবর দে আগে।আমার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে, ভাল ঠেকছে না।

-কি বলেন আপনি,এ তো ঠান্ডা লাগলেও হয়,ওঠেন আমি ভ্যান আনি,ডাক্তারের কাছে চলেন।ছেলে মেয়ে দের খবর পরে দিয়েন।

-যান তো জমির ভাই।আগে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান।আমার হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসতিছে।

জমির বের হয়ে যায় বাসা থেকে।

কদম আলীর গায়ে হাত দিয়ে মোমেনা দেখে সে ঘামছে।কপালে ঘামের রেখা।তাড়াতাড়ি টেবিল ফ্যান টা এনে চালিয়ে দেয়।গামছা ভিজিয়ে কপাল মুছে দেয়।

জমির আলী সরাসরি ডাক্তার কে নিয়ে আসে গুরুতর অসুস্থ বলে।

ডাক্তার প্রেসার মেপে দেখে প্রেসার অনেক বেশি।সাথে শ্বাস কষ্ট টা ভাল লক্ষণ ছিল না।

তখনই ওষুধ খাইয়ে দিয়ে শহরে নিয়ে যেতে বলে।সব কিছু ভাল করে পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে হবে।

চলে যাবার আগে বলে যায়, খাবার খাইয়ে একটা ঘুমের ওষুধ খাইয়ে দিতে।আসলে কদম আলীর শরীরে কবে কবে কি অসুখ দানা বেঁধে উঠছিল সে নিজেও জানতো না।মরিয়মের হঠাৎ মৃত্যু তে সে দিশাহারা হয়ে পড়ে।মনে করেছিল মোমেনা কে বিয়ে করে বোধহয় একটা নিষ্কৃতি হবে এই পরিস্থিতির।

কিন্তু ছেলে-মেয়েদের বিগড়ে যাওয়া তে সে সব সময় একটা দোদুল্যমান পরিস্থিতির ভেতরে বসবাস করতে থাকে।

শুধু মোমেনা নিয়ে কে সুখি হওয়া এই বয়সে বেশ কঠিন হয়ে উঠছিল সন্তানদের অসহযোগিতায়।

পিতার মন একটা হাহাকার জাগিয়ে রাখে তার ভেতরে।তার দুশ্চিন্তা দিনে দিনে শরীরে প্রভাব বিস্তার করতে থাকে।

মোমেনার সাথে এই অসামঞ্জস্য বিয়ে বরং দুজনের জন্য এক কাল

হয়ে দাঁড়ায় দিন দিন। ডাক্তার চলে গেলে জমির কদম আলীর ছেলে রজব কে ফোন করে বলে সব।

মোমেনার জীবনের সব সুখ যেন এই দু দিনে হাওয়ায় মিলিয়ে গেল।স্বামী কে নিয়ে চিন্তা, সাথে তার ছেলে-মেয়েদের মুখোমুখি হয়ে কি হবে ভেবে সংকুচিত হয়ে পড়লো।এখন তো তার অসুস্থ স্বামী ছেলে, মেয়েদের কব্জায় চলে যাবে,তার কি গতি হবে,এসব হাজার টা বিষয় তার মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে।

পরদিনই রজব আলী চলে আসে।আর কোন গড়িমসি করার প্রশ্নই আসে না।অনেক শাস্তি দেয়া হয়েছে।খবর জেনে মেয়েরাও আসে এক এক করে।ফাঁকা বাড়ি টা হঠাৎ ভরে ওঠে।মোমেনা একটু দূরে দূরে সরে থাকে।আজ দুই বছর পরে তারা বাড়ি তে এল।মন থেকে মেনে না নিলেও এই বিপদের মধ্যে কেউ কোন কথা বলে না এসব নিয়ে।

কিন্তু তাদের একটা তাচ্ছিল্যের দৃষ্টি মোমেনার শরীর, মনে আঁচ পেতে থাকে।

দুই দিন পরেও কদম আলী বিছানা ছেড়ে ওঠে না দেখে সবাই চিন্তিত হয়ে পড়ে।মোমেনা একেবারে নিশ্চুপ থেকে সংসারের এতগুলো মানুষের রান্না খাওয়ার দায়িত্ব পালন করে যায়।

এর মধ্যে কেউ ওর সাথে খুব প্রয়োজন ছাড়া তেমন কোন কথা বলেনি।কিন্তু বড় মেয়ে ফরিদার মন টা খুব নরম আর বুঝদার।

ফরিদা মোমেনা কে একসময় আড়ালে ডেকে বলে, ছোট মা,এরা কেউ যদি কোন কটু কথা কয় একটু চুপ থাকবা। দেখবা এক সময় সব ঠিক হয়ে যাবি।

তুমি আব্বার আইন মতে বিয়ে করা বউ,না মানে যাবি কই।এই যে এত দিন তুমি আমার আব্বারে দেখে রাখছো,সংসার ডা ঠিক রাখছো এতেই আমি খুশি।

আমরা কি আসতি পারি ইচ্ছা করলি? ওরা ছোট, বুদ্ধি কম।আমি ওদের কে বোঝাবো।

মোমেনা একটা কৃতজ্ঞতার দৃষ্টি তে ওর দিকে তাকিয়ে থাকে।

ভাবে,এই দুনিয়ায় কত পদের মানুষ থাকে।খুব ভয় ছিল মনে।

একটু ভরসা পায়, যাক একজন হলেও তো তার পাশে আছে।

এত টুকু কথা তেই একটা মায়া জন্মে ফরিদার উপর।আরো ভাল লাগে ওর মুখে ছোট মা ডাক টা।খেয়াল করে দেখে চেহারা টাও বেশ ভাল দেখতে,মন টাও সুন্দর।

ফরিদা আরো বলে, রজব একবার কাছে নিক আব্বা রে, এরপরেই দেখো ওর রাগ পড়ে যাবি।ওর যে বউ,তারেই মানে না,তো আব্বার সেবা যত্ন করবি,আমার বিশ্বাস হয় না।আল্লাহ যদি ভাল করে,ডাক্তার দেখায়েই তোমার জিম্মায় রাখে যাবি বলে দিলাম।

মোমেনা এই কষ্টের মধ্যেও ফরিদার কথায় হেসে দেয়।বলে, উনি ভাল হোক আগে, এসব নিয়ে আমি চিন্তা করছি না এখন।

-উনার কি কঠিন কিছু হলো নাকি?

-আল্লাহ কে ডাক,দেখা যাক।কালই শহরে নিয়ে যাবি।

চলবে…

আগের পর্ব পড়তে ক্লিক করুন

মোহজাল (পর্ব: তেরো)

 

 

 

 

 

 

এই বিভাগের আরও সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *