মধ্যবর্তিনী (পর্ব: ২)


নিউজটি শেয়ার করুন

সুদীপ্তা ভট্টাচার্য্য রুমকি

বেশিরভাগ প্রেমের বিয়ের ক্ষেত্রে এই মানসিকতার শাশুড়িরা উন্মাদের মতো আচরণ করেন।মরার উপর খাড়ার ঘা হিসাবে কাজ করে বিয়ের আগে ছেলের সাথে গড়ে উঠা বউ এর বন্ডিং।ছেলে বউ এর গোলাম হয়ে যাচ্ছে এই আশঙ্কায় তারা কি পরিমাণ নিচে নেমে যান তা তারা একবারো ভাবেন না।অথচ এটুকু বোঝেন না বিয়ের আগে বিশ্বাস, আস্থা, নির্ভরতা গড়ে ওঠার একমাত্র কারণ মধ্যবর্তিনী হয়ে প্রতিটা মুহূর্তে প্যাচ লাগানোর অন্যের সুযোগের অভাব।অথচ সেই সম্পর্কটাই ধ্বংস হয়ে যায় বিয়ের পর অসুস্থ মানসিকতার অনেক শাশুড়ির কারণে।এতে শুধু একটা সংসারই ভাঙে না,ভাঙে মন, ধ্বংস হয় জীবন।সন্তান যদি থাকে তাহলে এই নোংরামিটা পাপের পর্যায়ে পড়ে আমার মতে।

মাতৃঋণ শোধের মাধ্যম যদি স্ত্রী-সন্তানহীন জীবনযাপন হয় তাহলে মায়ের সাথে পুত্রেরও চিকিৎসা প্রয়োজন অতিসত্বর। আমাকে সেদিন একজন একটা ছবি দেখিয়েছিল যেখানে বিবাহিত পুত্র স্ত্রী-সন্তানহীন হয়ে তার বাবা মায়ের প্রায় কোলেই বসে আছে এবং ছবিটির ক্যাপশন মে বি ‘পরিবারই সব’।আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম ক্যাপশন দেখে যে এর পুরো বংশ কি পরিবারের সংজ্ঞা জানে না।স্বামী -স্ত্রী মিলে পরিবার গঠিত হয় এতে সন্তানসন্ততি থাকতে পারে, নাও থাকতে পারে।কিন্তু বিবাহিত পুত্র বাবা,মায়ের কোলে বসে থাকবে এবং তাদের ভালো লাগলে স্ত্রী-সন্তান পাশে থাকতে পারে আবার নাও থাকতে পারে এবং স্ত্রী তো স্ত্রী, কোলের সন্তানের প্রতিও দায়িত্ব,কর্তব্যহীন থাকাকে পরিবার বলে, বাপের জন্মেও শুনিনি।আমাদের সমাজে অনেক পরিবারে যতই প্রেমের বিয়ে হোক- পারিবারিকভাবে যখন সেটা সম্পন্ন হয় তখন দুজন মানব মানবীর প্রেম সেদিন থেকে সংসারের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে যায়।এইসব পরিবারে বিয়েটা বাড়ির ছেলের সাথে হয়, না শাশুড়ির সাথে হয় তা আমার জানতে ইচ্ছে হয়।সেসব পরিবারের ছেলেরাও কি যতক্ষণ বৈধতাহীন থাকে সম্পর্ক সেটাকে প্রেম ভেবে নেয়, বিয়ের পর সেটা বোধ হয় অন্যকিছুতে রূপান্তরিত হয়ে যায় এদের কাছে।মধ্যরাত ছাড়া যদি দুজনের ব্যক্তিগতভাবে কাটানোর কোন সময় না থাকে,প্রত্যেকক্ষেত্রে যদি অনভিপ্রেত মধ্যবর্তী অন্তর্ভুক্তি থাকে, এতে করে যে মেয়েটি বউ হয়ে এসেছে, যার সাথে নতুন জীবন শুরু করেছে তার  সাথেই মানসিক দূরত্ব তৈরি হবে,সেটা থেকে অভিমান,মন খারাপ, স্বাভাবিকভাবেই স্বতঃস্ফূর্ততা হারিয়ে ফেলবে নতুন মানুষটি। মনে হওয়া খুব অমূলক নয়, কেন হাজব্যান্ড বুঝতে পারছেনা,আগে তো না বললেও বুঝতো!নিজেদের জন্য নিজস্ব কোন সময় কেন রাখছেনা,ছোটখাট নিতান্ত বেডরুমের অভন্তরীণ বিষয়ে অপ্রয়োজনীয় উপদেশ টিটকারি, ধিক্কার ঘরের নতুন মানুষটির কষ্ট শত গুনে বাড়িয়ে দিতে পারে। সব সম্পর্কের ক্ষেত্রে স্পেইস প্রয়োজন। সেজন্য আলাদা বাসার প্রয়োজন হয় না, এক বাসায় থেকেও সেটা সুন্দরভাবে করা সম্ভব যদি বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি নিজের প্রবেশাধিকারের সীমা অতিক্রম না করেন।সেক্ষেত্রে পুত্রেরও দায়িত্ব বর্তায় অন্ততপক্ষে যৌথ জীবন যাপনের ফিরিস্তি চাহিয়া  তার স্ত্রীকে প্রতিনিয়ত লজ্জায় না ফেলেন তা নিজের মাকে বোঝানো।কিছু জিনিস থাকে ছেলে এবং বউ এর উপর ছেড়ে দেয়া উচিৎ।

এদিকে অনেক হাজব্যান্ড কোন পরিস্থিতিতে স্ত্রী সারাদিন কাটায় সেটা না ভেবে মাঝ রাতে স্ত্রীর সাথে দেখা হওয়ার পর সে কেন খুশিতে নৃত্য করলো না সেই কারণে মনঃক্ষুণ্ণ  হন অথচ তার একবারো বিবেচনায় আসেনা তার অনুপস্থিতিতে মানুষটির সাথে কি ঘটছে, তিনি কতটুকু সময় মানুষটির জন্য বরাদ্দ রেখেছেন,কতটুকু পরিস্থিতি মোকাবেলায় সহায়তা করছেন।বিশেষত একই বাসায় অবস্থানকারী তৃতীয় ব্যক্তি যদি সমস্ত ক্ষেত্রে দুইজনের মধ্যে অবস্থান করেন নেতিবাচকভাবে, তাহলে সম্পর্কের ধ্বংসের শুরু এখানেই। ফলশ্রুতিতে সব নষ্টের আদি,মধ্য,অন্ত বউকে বানিয়ে সংসার,বউ সব জলাঞ্জলি দিয়ে প্রেমের কাঙাল পুত্র অনেকেই নিরেট প্রেমের লোভে ঝুকে পড়তে পারে পরকীয়ায়।পারিবারিক অশান্তির মাঝে বেচারা পুত্রের বউ এর প্রতি প্রেম অবশিষ্ট রেখে এত কাঠখড় পোড়ানোর চেয়ে মায়ের ছত্রছায়ায় ছেলে এবং ছেলের সহায়তায় মা মিলে বউকে বলির পাঠা বানানো বুদ্ধিমানের কাজ মনে করতেই পারেন।পরকীয়া সম্পর্ক তরতাজা হওয়ার প্রধান কারণ সেখানে নমস্য মধ্যবর্তিনীর অন্তর্ভুক্তি থাকেনা।আর ঘরে বউ না থাকলে মাতৃদেবীও নিজের অবস্থান নিয়ে চিন্তিত থাকেন না,গৃহে তো তিনি অপ্রতিদ্বন্দ্বী।বাইরে তো আর কোন প্রতিদ্বন্দ্বিতা নেই।এদিকে পরকীয়ার ক্ষেত্রে তো জাত,ধর্ম, বর্ণ কিছুই মেলাতে হয়না- তা হোক সানজিদা মুন বা অমানিশা ত্রপা।আর এতে মাম্মী ভি খুশ কারণ পরকীয়ায় লস তো বউ এর হয়।অথচ সমাজের চোখে উন্নত সাজতে গেলে এই পরকীয়া বিষয় রাখঢাক করতে যে পরিমাণ এফোর্ট দিতে হয় তার সিকি ভাগ যদি কোন ছেলে তার নিজকীয়ার পিছনে দেয় তাহলে তার পাশে তার স্ত্রী,সন্তান সর্বোপরি একটা সুন্দর সংসার ঠিকই থাকে।আসলে একজন পুরুষকে বুঝতে হবে বিয়ে মানে মাঝরাতে একঘরে থাকার সার্টিফিকেট শুধু নয়,নয় প্রেমের পরিসমাপ্তির মাধ্যমে বাবা মায়ের জন্য নিয়ে আসা দাসী। বিয়ে মানে প্রেম,ভালবাসা, আস্থা,বিশ্বাস,নির্ভরতা দিয়ে জীবনসঙ্গীকে বেঁধে  রাখা। তাকে ঐচ্ছিক বিষয় বানিয়ে পুরো সমাজের সামনে অপমান করা নয়।একসাথে থাকা এক জিনিস আর জীবনসঙ্গী হওয়া আরেক জিনিস।জীবনসঙ্গী সবাই হতে পারেনা।জীবনসঙ্গীর অর্থ একজন মানুষের সুখ,দুঃখের সঙ্গী হওয়া,তাকে নিঃসঙ্গ করে দিয়ে সবার সাথে তার কষ্ট উপভোগ করাকে জীবনসঙ্গী বলেনা।

আর যেসমস্ত বিশ্ব মা ওরফে শাশুড়ি পুত্রবধূর জীবন বিনষ্ট করতে বদ্ধপরিকর হয়ে ওঠেন, তাদের পুত্রবধূটি তাদের  নিজের মেয়ে না হোক বউটা তো আরেকজনের আদরের মেয়ে, তাকে কারণ ছাড়া কথা শুনিয়ে, আঘাত করে, কষ্ট দিয়ে,অপমান করে, বানোয়াট কথা ছড়িয়ে শাশুড়ি নামকরণের স্বার্থকতা কেন আনতে হয় বুঝিনা।

অতিরিক্ত করতে গিয়ে বউ তো বউ, নাতি-নাতনির জীবন পর্যন্ত অভিশপ্ত করে তোলেন এবং শেষপর্যন্ত সেটা উপলব্ধিও করতে পারেন না কত বড় অন্যায় তিনি করছেন ।

আর হাজব্যান্ড, যে এখানে কিছুটা ভূমিকা পরিস্থিতিটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারতো কিন্তু তিনি যদি সদ্যোজাত শিশুর মতো মায়ের আচরণের মূল্যায়ন ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন,রূঢ় ব্যবহার,অশ্লীল গালিগালাজ করা স্বাভাবিক ভাবেন,  তবে এমন পুরুষের পরিবার গঠন করতে যাওয়াটাই অপরাধ বোধ করি।যদি একজন পুরুষের সামনে তার স্ত্রী অপমানিত হয় অথচ ঢাল হয়ে তিনি সামনে না দাঁড়িয়ে তাকে নিজেই আঘাত করতে সচেষ্ট হন,যদি যে কেউ তার সামনে তার স্ত্রীর বিষয়ে যা তা বললেও তিনি তা প্রতিহত না করে উল্টো আরও দ্বিগুণ উৎসাহে জানতে আগ্রহী থাকেন স্ত্রীর কর্মকাণ্ড অন্যের কাছ থেকে, আমার মতে তিনি কারো হাজব্যান্ড হওয়ার যোগ্য না।এত নিম্ন মানের পুরুষের স্ত্রীর সাথে কোন উচ্চমানের ঘটনা ঘটারও কথা না।শ্বশুরবাড়িতে একটা মেয়ের অবস্থান তার হাজব্যান্ডের মান নির্ণায়ক।

মায়ের সাথে অভদ্রতা করতে বলছিনা কিন্তু বউ যদি কোন ভুল না করে তাকে শুধুমাত্র বউ বলে অপমানিত হতে দেয়া একজন হাজব্যান্ডের কোনভাবেই উচিৎ না বরং এটি তার বিবাহিত জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল।নিজের মা অস্বাভাবিক আচরণ করেছেন সেটা বুঝতে পারলেই enough কিছু করতে পারার দরকার নেই।তখন  বউটিরও নিজেকে অবাঞ্ছিত কেউ মনে হবে না, মনে হবেনা সে বাইরের কেউ।এতে নিজেদের বন্ধনটা কিন্তু ঠিকই দৃঢ়ই হয়।কিন্তু তা না করে মা, ছেলে মিলে বউসহ তার চৌদ্দগুষ্ঠির সাথে বস্তিবাসীর মত নোংরা আচরণে মেতে উঠলে তা পুত্রের মাতৃভক্তি প্রদর্শন না হয়ে মাতৃশিক্ষার অভাবের নিদর্শন হয়ে যায়।Wrong is always wrong।মা বলে কারো দোষ যেমন গুণে রূপান্তরিত কখনোই হয়না, ঠিক তেমনি শুধুমাত্র  বউ বলে নির্দোষ কেউ দোষী হয়ে যায় না।মানসিকতা পরিবর্তন করুন,নিজে সুন্দরভাবে বাঁচুন আরেকজনের সুন্দর জীবনকে নিজের পঙ্কিল মানসিকতা দ্বারা নষ্ট করে দেবেন না।

শেষ

আগের পর্ব পড়ুন

মধ্যবর্তিনী (পর্ব: ১)

 

এই বিভাগের আরও সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *