মোহজাল (পর্ব: বারো)


নিউজটি শেয়ার করুন

অনন্যা হক

কদম আলী ঘরে ঢোকে,কেমন যেন চেহারা টা বেশ ফ্যাকাশে লাগে দেখতে।ঘুম ঘুম চোখেও মোমেনার খেয়ালে আসে।

-এত দেরি করলেন,আমার ঘুম ধরে গিছলো।নেন হাত মুখ ধুয়ে নেন,ভাত বাড়ি আমি,বলে মোমেনা রান্না ঘরে চলে যায়।

ভাত খেতে বসে আজ কদম আলী খুব কম খেল।মোমেনা বলে, এই কয় টা ভাত খেলেন,কি হইছে আপনার,শরীর খারাপ নাকি?

আমারে কন, জমির ভাই রে খবর দেই, ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাক।

যদি রাতে বেশি খারাপ করে,তখন কি করবেন,আপনার চোখ মুখের চেহারা কেমন লাগতিছে।

-না,তেমন কিছু না।আজ দুই বছর হলো পোলাপান গুলো বাড়ি আসে না,আমার মনে শান্তি নেই,তাই শরীর ডাও ভাল লাগে না।

কদম আলী বলে না যে, একজন কে পাঠিয়েছিল ছেলের কাছে বুঝিয়ে বাড়ি আসার কথা বলতে।সে আজ ফিরে এসে বললো,ছেলে এসব মানতেই পারবে না।

বাড়িও আসবে না।সব শুনে বোঝে না কদম আলী কি করবে।

মোমেনা কে নিয়ে তার সুখ, শান্তি এক জটিল পরিস্থিতি তৈরি করেছে।

চুপচাপ ভাত খেয়ে ঘরের দিকে উঠে চলে যায়,পেছন থেকে শোনে,মোমেনা বলছে, কেন ছেলে মেয়ে কারো সাথে কথা না বলে বিয়ে করলেন আমারে!

মোমেনা ঘরে এসে দেখে,কদম আলী বিছানায় শোয়া।সে টিভি টা অন করে।দেখে তার পছন্দের সিরিয়াল টা শেষের পথে।কদম আলী বলে ওঠে, টিভি টা বন্ধ কর,ঘুমাবো। শব্দে ঘুম আসে না।

-আপনি তো শুতে শুতেই নাক ডাকা শুরু করেন,আমি কি করবো?

-কি করবো,নাক ডাকা তো বন্ধ করা যায় না।

টিভি বন্ধ করে,চুল টা বেণী করে পাশের খাটে বসে।মোমেনা স্বামীর কাছে এসে বসে।আজ ছেলে টার কথা একটু জোর দিয়ে বলবে।

গায়ে হাত দিয়ে বলে,ঘুমায় গেলেন নাকি?

-না,পা টা টিপে দাও তো বউ।মোমেনার মনে রাগ দানা বাঁধতে থাকে।প্রতি রাতে পা টিপতে হয় তার!

সারা দিনের খাটনির শরীরে তারও একটু আরাম চায়।এই লোক তো কিছুই বোঝে না।শুধু নিজের চাহিদা পূরণ করতে ব্যস্ত।তাও সেই চাহিদা গুলো তে মোমেনার কোন ভাল লাগা জড়িত নেই।

ইচ্ছে না থাকলেও পায়ের কাছে গিয়ে বসে।সে খুব একটা নরম স্বভাবের নারী না।খুব কষ্ট করে নিজের স্বভাবের সাথে সমঝে চলছে।ভেতর থেকে তার প্রকৃত রূপ বেরিয়ে আসতে চাইছে।তবুও নিজেকে চেপে গিয়ে পা টিপতে শুরু করে।

-আপনার গা মনে হচ্ছে গরম।জ্বর আইছে নাকি?

-না,একটু ঠান্ডা লাগছে।

-একটা কথা কওয়ার ছিল।

-বল।

-আমার ছেলে দুডোরে কাছে নিয়ে আসি,এত বড় বাড়ি আমার একা ভাল লাগে না।ভয়ও লাগে,আপনি এই যে কত দেরি করে আসলেন।খাবারের কোন অভাব নেই আপনার সংসারে।আমি এই খানে কত কিছু খাই,আর ছেলে দুডো মুখ শুকনো করে ঘুরে বেড়ায়,কি খায় না খায়!

আমার মনে অনেক কষ্ট হয়।

-কেন,শহরে থাকতেও তো ওরা নানির কাছেই ছিল।এ কথা আবার তোল কেন? মনে মনে ভাবে, এমনি জ্বালায় বাঁচিনে,তার মধ্যে আরো বিপদ ডাকে আনতিছে।

-তখন তো ওদের কে আমার বেতনের টাকা খরচ বাবদ দিতাম। এখন তেমন কিছু কি দেই? আপনি দোকানের কাজ টা আমার বড় ছেলে কে দেন।

কদম আলী বিপদের গন্ধ পায়।ভাবে এর তো মতলব ভাল না।

নিজেকে শক্ত করে, বুড়ো কালে বিয়ে করছে বলে এর সব কথা শুনলে সংসার রসাতলে যাবে।

-কি কথা কন না কেন?

-কি কব কও,আজ কত বছর রাজু ছেলে টা আমার কাছে কাজ করে, ওর রুজি মুখের সামনের থেকে কাড়ে নিলি আমার ঈমান থাকে নাকি? সে দোকানের সব কিছু বুঝে নিয়েছে,আমি কত নিশ্চিন্তে থাকি।খুব বিশ্বাসী ছেলে।এই কথা আর মুখে আনবা না।

-আমি কি আপনার কেউ না? এই সংসারে আমার কোন অধিকার নেই কন? মোমেনা পা টিপতে থাকে ধৈর্য ধরে,যদি বুড়োর মন টা গলে।

-কোন কথার ভিতরে কি কও তুমি? এই বাড়ি কি আমার একার নাকি? ভুলে যাও কেন আমার চার চারটে ছেলে মেয়ে আছে।দেখ না তারা আসে না, কথা কয় না।

আজ কত দিন তাগের মুখ দেখি না, আমার কি ভাল লাগে নাকি?

এমনি না বলে বিয়ে করছি,এখন যদি তোমার ছেলেরে দোকানে নিয়ে বসাই তো তারা আমার ত্যাজ্য করবেনে।

তোমার একটু বুঝে চলতি হবি ছোট বউ।

-হ,বুঝে খালি আমিই চলবো।যত জ্বালা শুধু আমার।

কদম আলীর এমন কথার পর মোমেনা হতাশ হয়ে পড়ে।আস্তে করে পা থেকে হাত টা সরিয়ে নেয়।চুপ করে কিছু সময় বসে থাকে।বোঝে তার হিসাব নিকাশে ভুল হচ্ছে, এই বুড়ো ট্যটন আছে।জাতে মাতাল তালে ঠিক।

বিয়ে করছে নিজের সুখে,কিন্তু হিসাবে পাকা।

কদম আলীর ঝিমুনি কেটে গেলেও নির্লিপ্ত ভাবে পড়ে থাকে ঘুমের ভান করে।

ভাবে, রাগ হলে হোক,যাবে আর কই। অভাবী মোমেনার গতি আর কত দূর! এক সময় সত্যি সে ঘুমিয়ে যায়।

মোমেনা উঠে মনমরা হয়ে পাশের খাটে গিয়ে বসে।ধীরে ধীরে যে স্বপ্ন গুলো কে লালন করছিল,যে ইচ্ছা গুলো ডালপালা গজিয়ে বেড়ে উঠছিল,সে গুলো যেন গোড়াতেই বিনাশ হয়ে গেল।

হায় রে সংসার! এই সংসারের লোভে সে বিয়ে করছিল,একটা নিজের সংসার। বোঝে শুধু নিজের খাওয়া পরা তে সে কোথাও সুখ খুঁজে পাচ্ছে না।

সন্তান দুটো কে বুকের কাছে নিয়ে না পারলো কতদিন শুতে,না পারলো তাদের কোলের কাছে নিয়ে ভাত বেড়ে খাওয়া তে, না পারে তাদের গায়ে হাত বুলিয়ে একটু আদর সোহাগ করতে।

কতদিন বাপের বাড়ি গিয়ে তাদের কাছে দুদিন থাকার সুযোগ পায় না এই সংসার রেখে।

তার মনের হাহাকার মনে নিয়ে সে বসে থাকে ঠায়।

বোঝে না স্বামীর মতিগতি, মেটে না মন কিবা শরীরের খোরাক।

সে এক ফাঁপরের মধ্যেই পড়ে থাকে, কি যে তার জন্যে ভাল ছিল এ জীবনে!

চলবে…

আগের পর্ব পড়তে ক্লিক করুন

মোহজাল (পর্ব: এগারো)

 

 

এই বিভাগের আরও সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *