মোহজাল (পর্ব: এগারো)


নিউজটি শেয়ার করুন

অনন্যা হক

কুপি জ্বালিয়ে চুলার কাছে মোমেনা বসে আছে।চুলায় রাতের ভাত।কারেন্ট চলে গিয়েছে। গ্রামে এমনই হয়, যাওয়া আসার ভেতরে থাকে।এ কারণে সিরিয়াল গুলো ঠিক মত দেখতে পারছে না।শহরের বাসায় সন্ধ্যায় কাজ সেরে নিয়মিত দেখতো।আপা পুরোনো টিভি টা ছেড়ে দিত ওদের জন্যই।

অনেক দিনের অভ্যাস,এতটুকু বিনোদন সে বেশ উপভোগ করতো।কিন্তু এখানে কারেন্টের আনাগোনায় মেজাজ টা বিগড়ে থাকে তার।

আজও ভাত চুলায় হয়ে আসছে,তখন কারেন্ট চলে গেল।উঠে গিয়ে হারিকেন টা ধরিয়ে বড় ঘরের বারান্দায় রেখে আসে।কদম আলী নামাজ পড়তে মসজিদে গিয়েছে।

পুরো বাড়ি টা একটা ভুতুড়ে বাড়ি হয়ে রয়েছে।গ্রামের বাড়িতে এমন একা থাকা বেশ কষ্টকর।ছড়ানো বাড়ি লোকজন ছাড়া মানায় না।একটা ছেলে মেয়ে নেই কদম আলীর কাছে।মোমেনা ভাবে,একজন কেউ কাছে থাকলে কি আর এই বুড়া কালে তাকে বিয়ে করে আনতো!

কদম আলীর ফেরার নাম নেই।যদি ছেলে দুটো কে আনতে পারতো তাহলে বাড়ি টা এমন শুনশান লাগতো না।পুরো জীবন টাই কি ছেলে গুলো কে কোল ছাড়া করে বাঁচতে হবে তার? ভাবে,আজ রাতে সাহস করে বলবে স্বামী কে।

গ্রামের মেয়ে হলেও মোমেনার বাঁশঝাড়ে আগাগোড়াই ভয়।রান্না ঘরের পাশেই একটা বাঁশঝাড় আছে।কি যেন একটা শুকনো পাতায় খসখস শব্দ করে দৌঁড়ে গেল।শেয়াল হবে হয়তো।মনে করে মুরগীর খোপ টা বন্ধ করছে কিনা।

এমন সময় কদম আলী ফিরে আসে নামাজ পড়ে।সোজা রান্না ঘরের কাছে এসে দাঁড়ায়।

-আপনি আইছেন? এত দেরী করেন কেন,সারা বাড়ি ঘর অন্ধকার, ভয়ে আমার গা ছমছম করতিছে।

-তুমি না এই গ্রামেরই মেয়ে, ভয়ের কি আছে?

-তয় কি,আমি এমন একা থাকিনি কোনদিন।আমার বাপের বাড়ি অনেক মানুষ থাকে।

মোমেনা একটা কাঠের টুল এগিয়ে বলে বসেন এই জায়গায়।

-না, তোমারে কইতে আসলাম, একটু দোকানে যাব।চা খায়ে দোকান বন্ধ করে আসি।

-আমি চা বানায় দেই।আপনি আর বাইরে যাবেন না।রাজুই তো দোকান বন্ধ করে প্রতিদিন।

-তুমি ভাত নামায়ে ঘরে যায়ে খিল আটে শুয়ে থাক।আমার একজনের সাথে একটা দরকারি কথা আছে,তার দোকানে আসার কথা।

কদম আলী বেরিয়ে গেলে মোমেনা ভাত নামিয়ে ভর্তা করতে বসে।এর মধ্যে কারেন্ট চলে আসে।চুলায় লোহার তাওয়া রেখে শুকনো মরিচ পুড়তে দেয়।আজ ঝাল করে ভর্তা মাখবে।স্বামীর জন্য ঝাল খেতে পারে না মন মত।একটু ভর্তা আলাদা করে তুলে রেখে দেয়।শুকনো মরিচের পোড়া গন্ধ ছড়াতে থাকে।

এবার তাড়াতাড়ি শেষ করে হাতের কাজ,ঘরে গিয়ে টিভি ছাড়বে।

ঘর বন্ধ করে নেমে আসে উঠোনে।পেছনে একটা বিড়াল দৌঁড়ে এসে পায়ের সাথে ঘেঁষে দাঁড়ায়।চমকে মুখ ফিরে তাকায়,একটা দাবড়ানি দিয়ে ঘরে উঠে যায়।

আজ মনের ভেতরে একটু বেশি অস্থির হয়ে ওঠে সে।ওর নিজের বাড়িতে সারাক্ষণ কথার হৈচৈ থাকে।মাঝে মাঝে মা, ভাই, ভাবী, ছেলে পুলের গ্যাঞ্জাম,ঝগড়া ঝাটি চলে, তখন ভাল না লাগলেও এখন মনে হয় ওসবও ভাল,তবু মানুষ ভাল।

কিন্তু কিছু করার নেই, সংসারের হিসাব নিকাশে সব কিছু এক সাথে মেলে না।

ঘরে গিয়ে টিভি ছেড়ে শুয়ে পড়ে বিছানায়।ভাবে, এই লোক তো কিছুই বোঝে না,কেমন যেন খসখসে মন।যে সঙ্গ তার কাছে সে আশা করে,তার ধারে কাছেও থাকে না এই লোক।

সারা জীবন অভাবের সাথে যুদ্ধ করা মন বড্ড একপেশে ভাবনা ভেবেছিল তার।তার সাথে কদম আলীর বয়সের পার্থক্য কে আগে আমলে না নিলেও এখন বুঝতে পারছে তাদের মনে মনেও কত ফারাক।

কদম আলী যতটুকু বাড়ি তে থাকে ঝিম মেরে কি যেন ভাবে।সেই বিয়ের প্রথম দিকের মত ফুর্তি দেখে না মোমেনা আর।মোমেনার হাসিখুশি ভাবও মিলিয়ে যেতে থাকে।সারা দিনে সংসার, গরু, ছাগল, মুরগী সব কিছুর সাথে তাল দিয়ে এরপর থাকে স্বামী সেবা।স্বামী মানে সেবা ছাড়া তেমন কিছু বোঝে না আর।মিষ্টি করে কথা কি একটু রঙ তামাশা,এসব কিছুই আসে না তার ভেতর থেকে।

সারা দিনে কাজের ঝামেলায় এসব ভুলে থাকে।রাতে ঘরে এলে মন অস্থির হয়। সিরাজের বাপ এখনও মনে উঁকি দেয়। তার কাছেই সে ভালবাসা বুঝতে শিখছিল। পুরুষটার মনে রঙ ছিল,মোমেনা যেমন করে চাইতো।

মাঝে মাঝে মন চায় ফুলি রে নিয়ে কত ভাল আছে দেখে আসি।লোক মুখে শুনছে ঐ ঘরে কোন বাচ্চা হয়নি।

এতেও তার মনে শান্তি পায় সে।ভাবে আমারে দুঃখ দেয়ার ফল পাইছো তুমি।ছেলে দের নিতে চাইলেও ওরা যায়নি বাপের কাছে।

ওরা বোঝে তাদের মা কত কষ্ট করে বড় করছে তাদের।এসব ভাবতে ভাবতে টিভির দিকে তাকিয়ে ছিল।কিন্তু সিরিয়ালে মন দিতে পারে না তেমন।

একটা মনে কত মানুষ আনাগোনা করে তার! কদম আলীর সাথে থাকে কিন্তু তার মন ঘুরে বেড়ায় ঘাটে ঘাটে।কখনও কাদেরের দেয়া দুঃখ কষ্ট, মাঝের দুই অমানুষ স্বামী অল্প দিনের অসৎ সঙ্গের জ্বালা যন্ত্রণা,আর ছেলে দুটো তো চলতে ফিরতে চোখের সামনে এসে দাঁড়ায়।,কখনও শহরের আপা কেও মনে পড়ে, ইচ্ছে করে গিয়ে দেখে আসে।একদিন যাবে ঠিক করে মনে মনে।

কদম আলী মোমেনার মনে তেমন করে বসত গড়তে পারে না।

তারও জগত সংসারে অনেক হিসাব নিকাশ আছে তার মত করে।মোমেনার সংসার হয়, খাওয়া পরার অভাব পূরণ হয়,কিন্তু মনের অস্থিরতা যায় না।

কখন যেন খাটনির শরীরে ঘুম এসে যায় মোমেনার।

বউ দরজা খোল বলে দরজা তে কড়া নাড়ে কদম আলী।

মোমেনা কোন গভীর ঘুমের রাজ্যে চলে গিয়েছিল।শুনতে পায় দেরী করে।উঠে দরজা খুলে দেয়।

চলবে…

আগের পর্ব পড়তে ক্লিক করুন

মোহজাল (পর্ব: দশ)

 

 

 

এই বিভাগের আরও সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *