মোহজাল (পর্ব: নয়)

নিউজটি শেয়ার করুন

অনন্যা হক

রাজু ছেলে টা তার ছোট ছেলে মন্টুর বয়সি হবে।খুব যত্ন করে ভাত গুলো মাখিয়ে খায়।অভাবি ঘরের ছেলে,সারাদিন থেকে রাতে চলে যায়।গরু টারও দেখাশোনা করে।

মোমেনা তাকিয়ে থাকে দূরে গরুর ঘরের দিকে।রাজু খেয়ে চলে যায় দোকানে। কদম আলী বলে, তুমি ভাত খাবা না, বেলা তো কম হলো না।

আমি কি গোসল করছি নাকি,যে খাব। মনে মনে ভাবে, নতুন কালে তাই চোখে পড়ে, আর কয় দিন যাক, তখন দেখা যাবি কত খেয়াল করে। পোড় খাওয়া মন, শুধু সংশয় কাজ করে।

কদম আলী ধীরে ধীরে খায়।পুঁইশাক দিয়ে শেষ করে বলে কাঁচকি মাছ টা দাও তো। নেন, তেল টা আজ একটু বেশি পড়ছে।

তাই তো দেখি,এই বয়সে এত তেল সহ্য হবিনে।তবুও ভাল হইছে,তুমি ঝালও বেশি খাও।ভাল রান্নায় খিদা বাড়ে।এতদিন তোমার মার রান্না খাইছি। তোমার মত এত ভাল না।মরিয়মের রান্নাও খুব ভাল ছিল।

-আপনি সব কিছুতে ওনার কথা মনে করেন। তারে অনেক ভালবাসতেন বোঝা যায়।

-হ,কয়দিন আগেই তো তোমার মত সামনে বসে ভাত বাড়ে খাওয়াতো।মনে পড়ে ছোট বউ।মনের কি দোষ দিয়া যায়?

তোমার কি হিংসা হয় নাকি,বলে মুখের দিকে হাসি মুখে তাকায়।

-না,হিংসা হবি কেন? সে হলো আপনার প্রথম পক্ষ, তার উপরে মরে গেছে। মরা মানুষ রে হিংসা করে আমার কি লাভ? যদি বাঁচে থাকতো তয় ছিল ভিন্ন কথা।

কদম আলী হাসে। ঠিক কইছো,তোমার বুদ্ধি ভাল। যে চলে গেছে দুনিয়ার তে তারে হিংসে করবা কেন?

এই পঞ্চাশ বছরের সংসারে সে ছিল সুখি দুঃখি আমার পাশে। তারে ভুলে যাওয়া কি এত সহজ? তার জায়গায় তারে থাকতি দিও।

-তাড়াতাড়ি শেষ করেন খাওয়া, আমি গোসল করে খাব। কদম আলীর খাওয়া হলে মোমেনা একটা গামলা এগিয়ে দিয়ে বলে নেন, এর মধ্যি হাত ধুয়ে ওঠেন।এই যে গামছা, যান ঘরে যান।

মোমেনা কাপড়, গামছা নিয়ে কল তলায় যায়। আর শরীরে কুলায় না এখন কল চেপে বালতি ভরতে। ভাবে, একটা ট্যাপ কল থাকতো যদি, কত আরাম করে গোসল করতে পারতো।

ঘর থেকে সুগন্ধি সাবান টা আনতে ভুলে গেছে। আবার ফিরে গিয়ে নিয়ে আসে।দেখে এর মধ্যেই কদম আলী নাক ডেকে ঘুমোচ্ছে।

দরজা টা ভেজিয়ে দিয়ে নেমে আসে।

কোন তাড়াহুড়ো করে না। তাড়া দেয়ার কেউ নেই। কাজ যা সব তার। করবে নিজের মন পছন্দ মত। আগে বালতি দুটো ভরে।পরে আস্তে ধীরে সাবান মেখে আয়েশ করে গোসল করে।

শাড়ি টা পরতে গিয়ে খুশী লাগে দেখে, নতুন শাড়ি বিয়ের সময় কেনা।

ভাবে,আজ স্বামী কে বলবে এই কল তলা চারিদিকে ঘিরে দিতে।

তাইলে গোসল আরো একটু শান্তি মত নিশ্চিন্তে করতে পারবে।

মনের ভেতরে একটু একটু করে শখ আহ্লাদ যোগ হচ্ছে ইদানীং।

গোসল করে একবারে রান্না ঘরে গিয়ে ওঠে।ভাত খুলে বারান্দায় চৌকি তে এসে বসে।এ জায়গা টা খুব পছন্দ তার।কাজ না থাকলে এখানে বসে থাকে সে। এখান থেকে বাইরে ধানের ক্ষেত দেখা যায়। গেটের বাইরে দিয়ে রাস্তা চলে গেছে। লোক জন আসা যাওয়া করে, দেখতে ভাল লাগে।

ভাত খেতে বসে সব সময় একা।

খেতে গেলেই ছেলে দুটোর মুখ চোখের সামনে ভেসে ওঠে।

অন্যমনস্ক হয়ে খেতে থাকে। কত কিছু ভাল মন্দ খায় সে স্বার্থপরের মত। ছেলে দুটো রে কাছে আনতে মন চায়।বুকের মধ্যে একটা ব্যথা দলা পাকিয়ে ওঠে।কষ্টের কোন শেষ নেই, একটা দূর হয় তো আর একটা যোগ হয়।জীবন টা এমন কেন বুঝে কূল পায় না।মায়ের মন বলে কথা।

এতদিন পরের বাড়ি বলে এমন কথা মনে আসেনি কিন্তু এ তো নিজের সংসার, কত বড় বাড়ি ফাঁকা পড়ে আছে।

নিজের বুক টা ফাঁকা করে এই সংসার সামলে চলে সে।

কোথায় কোথায় হাটে মাঠে ঘোরে, নানি, মামী সামনে ধরে যা দেয় তাই খায়।সেই কবে থেকে কোল ছাড়া করে পরের বাড়ি তে ঢুকেছিল। কতদিন বাপ ছাড়া ওরা। বাপের আদর, ভালবাসাও কপালে জোটে নাই। যেন শেকড় উপড়ে ছেড়ে দিয়েছে, পরগাছা করে।

ভাত শেষ করে ওখানেই বসে থাকে।

মাঝে মাঝে ওদের জন্য ভাবতে গেলে মনে হয় মোমেনার, এর থেকে কি সতিনের ঘর করা ভাল ছিল? সিরাজের বাপ রে ফিরিয়ে দিয়ে কি ভুল করছি!

ছেলে দুটোর তো কোন গতি করতি পারেনি এতদিনে।

তেমন কোন কাজেও এখন পর্যন্ত দিতে পারেনি।কেমন উড়ুটে স্বভাবের হয়ে যাচ্ছে দিন দিন যেন।কোন কথা শুনতে চায় না।

আবার কাদেরের সাথে ফুলির সে সব রঙ তামাশা, ঢলাঢলি মনে পড়লে গায়ের মধ্যে রি রি করে ওঠে।তখন মনে হয় ঠিক করছে, তবুও তো নিজের কোট টা বজায় রাখতে পারছে।

প্রায়ই তার মনে উঁকি দেয়,বলবে নাকি স্বামী কে, ছেলে দের কাছে আনতে চায়।কিন্তু আবার পিছু হাঁটে,মনে পড়ে কদম আলী প্রথমেই বলে নিয়েছিল, ওরা নানি র কাছে যেমন আছে তেমন থাক।এই লোক বিয়ে করছে ছেলে মেয়ে কে না বলে, তার এই সাহস বোধহয় হয় হবে না, ওদের দায়িত্ব নেবার।

তাও মোমেনার মনে একটা আশা বাসা বাঁধে মাঝে মাঝেই,আর একটু শক্ত হয়ে জায়গা করে নিই এই সংসারে,তখন না হয় বুঝায় কব তারে।

বারান্দা থেকে নেমে আসে।বেলা পড়ে এসেছে।রাজুর তো মাঠ থেকে গরু টা দিয়ে যাওয়ার কথা।এগিয়ে যায় একটু পথ ধরে।পাটকাঠির বেড়া দিয়ে ঘেরা ছোট একটা জায়গা পথের পাশে।সেখানে পেঁপে গাছে একটা পেঁপে পেকে আছে।কোটা এনে পেঁপে টা পাড়তে চেষ্টা করে।

এর মধ্যে গরু নিয়ে রাজু ঢোকে বাড়ি তে।

-দাদী দাঁড়ান আমি পেড়ে দিচ্ছি।ও দাদী বললে মোমেনার কেমন যেন লাগে। ছেলের বয়সি ছেলে দাদী বলে,বারণও করতে পারে না।

কদম আলীকে তো সে চাচা বলেছে বিয়ের আগে।

চলবে…

আগের পর্ব পড়তে ক্লিক করুন

মোহজাল (পর্ব: আট)

 

এই বিভাগের আরও সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *