মোহজাল (পর্ব:সাত)

নিউজটি শেয়ার করুন

অনন্যা হক

অনেক বড় জায়গা নিয়ে বাড়ি কদম আলীর।দক্ষিণ দিকে থাকার ঘর ইটের দেয়াল ঘেরা টিনের ছাউনি দেওয়া।পর পর তিন টা ঘর।একটা তে কদম আলী থাকে,আর দুটো ফাঁকা পড়ে থাকে, কখনও ছেলে মেয়েরা এলে থাকে।

বাড়ির উত্তর প্রান্তে ধানের ঘর।পাশে রান্না ঘর।এগুলো বাঁশ,চাটাই এর ঘর,মাটির দাওয়া, উপরে টিনের ছাউনি।একদিকে কল তলা,তার পাশ দিয়ে বাড়ির বাইরে যাওয়ার পথ।বাকি সব দিকে পাটকাঠির বেড়া দেওয়া।তার প্রথম সংসারের মত বাড়ির পাশে

একটা বাঁশঝাড় আছে।

এত বড় বাড়ি তে এখন কদম আলী একা।হঠাৎ করে বলা কওয়া নেই সুস্থ বউ টা হার্ট এটাক করে মারা গেল।তিন মেয়ের বিয়ে হয়ে গিয়েছে আর এক ছেলে, সেও বউ নিয়ে শহরে থাকে।

মা মারা গেলে সবাই এসে শোক কাটিয়ে ফিরে গেল।কদম আলী পড়ে গেল বিপাকে।তার এ বাড়ি ছেড়ে কোথাও যাওয়ারও উপায় নেই।এত বড় বাড়ি, জমি জিরাত আছে,ঘরে ফসল তুলতে হয়,এসবের নেশাই আলাদা।

তাছাড়া শহুরে জীবন তার ভাল লাগে না কখনও।একবার ছেলের বাসায় মরিয়ম সহ গিয়েছিল,ঠিক তিন দিন থেকে চলে এসেছে,

আর যায়নি।

আজ ছয় মাস হলো মরিয়ম মারা গিয়েছে।তার রান্নার কাজ করে মোমেনার মা।একবার ছুটি তে এসে মোমেনা এসেছিল মায়ের খোঁজে কদম আলীর বাড়ি তে।

মোমেনা নিঃসঙ্গ স্বামী ছাড়া মহিলা সে জানে।তাকে দেখে কদম আলীর মোমেনা কে নিয়ে ভাবতে শুরু করে।বিষয় টা মাথায় গেঁথে যায়।কদম আলী জানে এই সত্তর বছর বয়সে তাকে কেউ বিয়ে করতে রাজী হবে না।তাই এই অভাবী ঘরের মেয়ের দিকে তার নজর পড়ে।

সব হিসাব নিকাশ পাকা করে মোমেনা কে সে ঘরে তুলে নিয়ে আসে।এই বুড়া বয়সের বিয়ে তাই ছেলে মেয়ে দের কে না জানিয়েই করে ফেলে সে।প্রতিদিন একটু একটু করে সংসারের খুঁটিনাটি নতুন বউ কে বুঝিয়ে দিতে থাকে।

মোমেনার মন টা বেশ খুশি খুশি লাগে,খাওয়া পরা, তেল,সাবান, কোন কিছুর অভাব নেই।এসবে তো কোন দিন এত সহজে পায়নি।ধানের ঘরে গেলে মোমেনার মন টা ভরে যায়।অভাবের ভেতরে বেড়ে ওঠা মোমেনা, এরপরে সংসারও করেছে অভাবের মধ্যে, এই প্রথম সচ্ছলতার চেহারা দেখতে পেল জীবনে।এ যেন তার এক বিশাল প্রাপ্তি, তাও নিজের সংসারে।

প্রথম দিকে কিছু টা দিশেহারা বোধ করে।কখনও মনে হয় সব তার,আবার যখন মনে পড়ে এ লোকের চার টা বড় বড় ছেলেমেয়ে আছে।তারা তো সব কিছুর ভাগীদার, তখন মন টা সমঝে যায়।

বিয়ের সময় ছেলে মেয়ে দের কাউকে দেখেনি সে।

তারা জানে কিনা, তাদের মত আছে কিনা মোমেনা জানে না।একটা ভয় কাজ করে মনে,তারা এসে কি আচরণ করবে ভেবে।

তবুও দিনের সাথে সাথে পোড় খাওয়া মন টা কে শক্ত করতে থাকে এই ভেবে যে, তার কাবিন কলমা করে বিয়ে,তারও একটা অধিকার আছে এই সংসারে।

রান্না ঘরের দাওয়ায় বসে মোমেনা ছেলে দুটোর কথা ভাবছিল।

কদম আলী বাজার এনে দিল।এক বাজার করে এসেই ঘেমে নেয়ে একসার।ব্যাগ ভরা বাজার,মোমেনা এগিয়ে গিয়ে হাত থেকে নিয়ে রান্না ঘরের ভেতরে রেখে সিটকানি তুলে দেয়।ফিরে গিয়ে বড় ঘরের বারান্দা থেকে গামছা টা নিয়ে বলে,

চলেন কল তলায়, ভাল করে চোখে মুখে পানি দিয়ে ঘরে যান,

একটু শুয়ে থাকেন এখন।

বুড়া শরীর, মোমেনা বুঝতে পারে, এর যত্ন করাই তার আসল কাজ।এখন যা করছে সব তার কর্তব্য বোধ থেকে।এখনও তেমন ভালবাসা, মায়া বোঝে না।

কদম আলী খুশি মনে হাত পা ধুয়ে বলে,ভিজে গামছা দিয়ে পিঠ টা একটু মুছায়ে দেও তো নতুন বউ।মোমেনা বলে আচ্ছা ঘুরে খাড়ান আপনি দিচ্ছি।

পিঠ মুছতে মুছতে মোমেনার হাসি পায়,একটু হেসে ওঠে।

কি রে বউ হাসো কেন?

এমনি।

এমনি কেউ হাসে?কও শুনি।

আপনার পিঠের চামড়া তো ঢিল হয়ে গেছে।

এইডা একটা হাসির বিষয় হইলো?

আমি এমনই ,যা সত্যি তাই কই।আপনি ঘরে যান।

কদম আলী একটু মন মরা হয়ে ঘরের দিকে চলে যায়।

মোমেনা গিয়ে বাজারের ব্যাগ বের করে।বাজার বের করে রান্নার কাজে মন দেয়।কদম আলী বারান্দায় চৌকি টা তে বসে হেলান দিয়ে।ঘরে আর যায় না।মোমেনা কে খেয়াল করে দেখে ওখান থেকে।বুড়া হলেও চোখে তার এখন যেন নতুন রঙ লেগেছে।

নতুন বিয়ে, যেমনই হোক না কেন দুজনেই দুজনের কাছে নতুন মানুষ।অচেনার একটা আমেজ কাজ করছে মনে।

মোমেনা এত কিছু খেয়াল না করে মন দিয়ে রান্নার কাজ করতে থাকে।মোমেনার তেমন রুপ নেই।চেহারায় বয়সের ছাপ,দুঃখ, কষ্টের ছাপ স্পষ্ট।তবুও এই কদিনে যেন একটু খুলেছে চেহারা টা।

মাথা ভরা চুল একটা বড় খোপা হয় এখনও।লম্বা গড়ন,শরীরের গাঁথুনি টা শক্ত আছে।চেহারা তে আছে বুদ্ধির ধার।

কিছুক্ষণ পর কদম আলীর একটা ঝিমুনি আসে।ঐখানে চৌকি তে কাত হয়ে শুয়ে পড়ে।তার মনে এখন একটা আলাদা ফুর্তি।আজ সাত মাস ধরে ফাঁকা বাড়িতে বড্ড কষ্ট বুকে চেপে দিন যাপন করতে হয়েছে।

এখন আর চারপাশে এত ফাঁকা, শূণ্য লাগে না।বাড়ির মধ্যে এক মহিলার ঘোরা ফেরা তার সেই শূন্যতা দূর করেছে।যদিও রুনির মা যখন তখন চোখের সামনে এসে দাঁড়ায়, মনের মধ্যে ঘোরে,

তখন বুকের ভেতর কেমন যেন মোচড় দিয়ে ওঠে।

বউ টা তার যেমন রুপবতী ছিল তেমনই পয়মন্ত ছিল।

কিছুক্ষণ পরে কদম আলী উঠে বসে।বড় ঘরের দাওয়া রান্না ঘর থেকে বেশী দূরে না।ওখান থেকে বলে,

বউ,পুঁইশাক দিয়ে মিষ্টি কুমড়োর চচ্চড়ি কর,আর কাঁচকি মাছ আলু,পেঁয়াজ দিয়ে হাতমাখা কর,আমার খুব প্রিয় মনে রাখবা।

চলবে…

আগের পর্ব পড়তে ক্লিক করুন

মোহজাল (পর্ব: ছয়)

 

এই বিভাগের আরও সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *