পৃথুলা, বোনটি আমার… - Women Words

পৃথুলা, বোনটি আমার…

অদিতি দাস

পৃথুলা রশীদকে আমি জানি না। সত্যি বলতে নেপালের মর্মান্তিক বিমান দুর্ঘটনার আগে পর্যন্ত তাঁর নামের সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল না। এখন নানা কারণে তাঁর সম্পর্কে জানার তাগিদ দিচ্ছিল হৃদয়। সেই তাগাদা থেকে ফেসবুকে খুঁজে-পেতে পেয়েও যাই পৃথুলার ‘ঠিকানা’। অনেকক্ষণ ধরে ঘুরি-ফিরি তাঁর ফেসবুক আঙ্গিনায়। তা দেখে আপাত উপলব্ধি- মেয়েটি মা-বাবার আদুরে ছিলেন, হইহুল্লোড়, আড্ডায়ও সরব ছিলেন। পরিপাটি থাকতেই পছন্দ করতেন। কাজের ফাকেঁ সুযোগ পেলেই বন্ধু-স্বজনদের নিয়ে বাইরে খেতে বের হতেন। আমি দেখি আর অবাক হই। এমন আদুরে মেয়ে কিনা জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে কেমন নির্ভীক সাহসী হয়ে উঠলেন! অন্যের জীবন বাঁচাতে তুচ্ছ করে দিলেন নিজের জীবন। আহা বোনটি আমার…। এই সাহসিকতা তোমাকে অমরত্ব দেবে কিনা জানি না, তবে তোমার এই ত্যাগ বিশ্বের বুকে আরো একবার বাংলাদেশকে উর্ধ্বে তুলে ধরলো, গোটা নারী জাতিকে গর্বিত করলো। হৃদয়ের গভীর থেকে, শ্রদ্ধা থেকে, ভালোবাসা থেকে তোমাকে স্যালুট। পৃথুলাকে নিয়ে ইচ্ছে করছে দিস্তার পর দিস্তা লিখি। কিন্তু কি লিখবো? জানি না তো খুব একটা। যে মানুষটির ফেসবুকের কাভার ছবি জুড়ে থাকে বিমানের ড্যাশবোর্ড, প্রোফাইল ছবিতে থাকে পাইলটের ইউনিফর্ম পরা মুখ, সেই মেয়েটির ধ্যান-জ্ঞান যে আকাশের বিশালতায় মিশে থাকা তাতে সন্দেহ নেই। আকাশে উড়ে বেড়াতে বেড়াতে কবেই তাঁর হৃদয়টা আকাশ হয়ে গেছে সেটা কজন টের পেয়েছে? ভারত এবং নেপালের বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমনটাই বলছে। নেপালভিত্তিক বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে তাঁকে ‘ডটার অব বাংলাদেশ’আখ্যা দিয়ে শ্রদ্ধা জানানোর হচ্ছে, তাঁর বীরত্বগাঁথা লেখা হচ্ছে। পৃথুলা ছিলেন নেপালে বিধ্বস্ত হওয়া ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের বিমানটির সহকারী পাইলট। প্রতিষ্ঠানটির প্রথম নারী বৈমানিকও তিনি। দুর্ঘটনার পর সামাজিকমাধ্যম ফেসবুকে ‘সিকিম মেসেঞ্জার’ নামের একটি পেজে পৃথুলার মহানুভবতার কথা তুলে ধরা হয়। সেখানে বলা হয়, ‘আজ নেপালী নাগরিকদের বাঁচাতে গিয়ে বাংলাদেশি কন্যা তার নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন। অন্যের জীবন বাঁচাতে কাঠমান্ডুতে আজ এই বাংলাদেশি তরুণী পাইলট মারা গেছেন। তার নাম মিস পৃথুলা রশীদ। তিনি ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের (ফ্লাইট বিএস২১১) কো-পাইলট ছিলেন। যেটি আজ নেপালের কাঠামান্ডুতে ত্রিভুবন বিমানবন্দরে বিধ্বস্ত হয়েছে।’ তারপর লেখা হয়েছে, ‘যাই হোক, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ১০ নেপালি নাগরিককে রক্ষার চেষ্টা করে গেছেন। যাদের সবাই জীবিত আছেন।’ যখন দেখি এই পৃথুলা বাংলাদেশের, আমাদের বোন তখন অজান্তেই গর্বে বুকটা ভরে উঠে, অজান্তে চোখের কোনে জল জমে। কিন্তু সেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই চোখ রাখলে আবার মনটা বিষিয়ে উঠে, প্রচণ্ড ক্ষোভ হয়, ঘৃণা হয় যখন দেখি আমাদের দেশের কিছু মানুষ নামের অমানুষ পৃথুলাকে নিয়ে নানা আজেবাজে মন্তব্য লেখে সামাজিকমাধ্যমে।শুধুমাত্র নারী হওয়ার কারণে এই সাহসীনির ভাগ্যে জোটে তীর্যক মন্তব্য।যখন নেপালে চলছে প্রিথুলার জয়বন্দনা, তখন নিজের দেশের কিছু অমানুষ মেতে ওঠলো নোংরা খেলায়। কেন? একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে পৃথুলার বাবা-মা যখন খাওয়া দাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন প্রায়, বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন মা। আমরা কোনো ধরণের নেতিবাচক মন্তব্য করার আগে একবারও ভাবছিনা তাদের কথা।পৃথুলার বাবা-মা’র কানে এ কথাগুলো গেলে কেমন লাগবে তাদের? পৃথুলাকে জানতে তার ফেসবুকে ঘেঁটে বেড়াই। সেখানে কিছু তথ্য আছে-২০১৬ সালে ফাস্ট অফিসার পাইলট হিসেবে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। এর আগে আরিরাং অ্যাভিয়েশন থেকে বৈমানিক হিসেবে প্রশিক্ষণ নেন। এখানে দুই বছরের বাণিজ্যিক পাইলট লাইসেন্স (সিপিএল) কোর্স করেন তিনি।পড়াশোনা করেছেন রাজধানীর নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে। ফেসবুকে পৃথুলার শেষ দুটি পোস্টের একটি কেন জানি বুকের ভেতর বাঁধে। ১৮ জানুয়ারি ইথিওপিয়া বিমানবন্দরে বসে স্ট্যাটাসে লিখেছিলেন ‘খোদা হাফেজ ইথিওপিয়া’। এরপর দীর্ঘবিরতিতে নিজের পোষা বেড়ালকে কোলে নিয়ে শেষ ছবি পোস্ট করে লিখেন, ‘Avled’। আমার কেবল মনে হতে থাকে, এমন চঞ্চল, চপল মেয়েটি নিথর হয়ে গেলো কেন? কেমন খা খা করে ভেতরটা। পৃথুলা ছিলেন ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের প্রথম নারী বৈমানিক। যে স্বপ্ন নিয়ে তিনি আকাশে উড়াল দিয়েছিলেন পৃথিবীর অন্যতম বিপজ্জনক বিমানবন্দরে অবতরণের সময় সেই স্বপ্ন বিধ্বস্ত হলো।

প্রিথুলার মতো আরেক ‌‘প্রথমে’র নাম কানিজ ফাতেমা রোখসানা। বাংলাদেশের প্রথম নারী বৈমানিক তিনি। এদেশের নারীদের আকাশে উড়ার প্রথম সাহসের নাম। সেই সাহসীনিও প্রাণ দেন মর্মান্তিক বিমান দুর্ঘটনায়। মৃত্যুর আগমুহূর্ত পর্যন্ত যাত্রীদের নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে দিতে প্রতিকূলতার সঙ্গে কি লড়াইটা না করে গেছেন তিনি। প্রায় সাড়ে তিন দশক আগের ঘটনা। দিনটি ছিলো ১৯৮৪ সালে ৫ আগষ্ট। বাংলাদেশ বিমানের ফকার এফ ২৭-৬০০ মডেলের ছোট বিমানটি নিয়ে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন কানিজ ফাতেমা। কিন্তু ঢাকায় এসে তাঁর বিমান পড়ে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কবলে। ভারী বৃষ্টিপাতের সাথে ছিলো সেদিন বাতাসের উদ্দ্যমনৃত্য। এরকম অবস্থার মধ্যেই বেতার যোগাযোগে সিদ্ধান্ত হয়েছিল বিমানটি অবতরণের। বৈমানিক রোকসানা প্রথমে ৩২ নম্বর রানওয়েতে অবতরণের চেষ্টা করেন। কিন্তু রানওয়ে দেখা না যাওয়ায় একেবারে শেষমহূর্তে তিনি বুঝে ফেলেন ভুল দিকে যাচ্ছেন। তরিৎ সিদ্ধান্ত নিয়ে অবতরণ না করে উড়ে যান আকাশে। এরপর দ্বিতীয় দফায় আইএলএস ব্যবহার করে অবতরণের সিদ্ধান্ত হয়। নিয়ন্ত্রণ টাওয়ার থেকে এবার ১৪ নম্বর রানওয়েতে অবতরণের নির্দেশনা দেওয়া হয়। প্রবল বর্ষণ আর পাশ থেকে বাতাসের প্রবল ঝাপটায় এবারও অবতরণ চেষ্টা ব্যর্থ। তৃতীয়বার একই রানওয়েতে অবতরণ করতে গিয়ে অস্পস্টতার কারণে রানওয়ে থেকে মাত্র ৫০০ মিটার দূরে থাকতে একটি ডোবায় অবতরণ করে বিধ্বস্ত হয় কানিজ ফাতেমা রোকসানার বিমান। স্থানটি ছিলো উত্তরা জসিমউদ্দিন রোডের কাছে। দুর্ঘটনায় বিমানের পাইলট ছাড়াও ৪জন ক্রু ও ৪৫ জন যাত্রীর সবাই নিহত হন। বাংলাদেশের এভিয়েশন ইতিহাসে এটি ছিলো সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনা। যাত্রীদের সাথে সেদিন প্রাণ দেন নারী বৈমানিক কানিজ ফাতেমা। ৩৪ বছর পর আবারও একটি বড় দুর্ঘটনা। পৃথুলাদের বিমানের নিহতের সংখ্যা (৫২ জন) আগের রেকর্ডকে ছাড়িয়ে যায়। এই পর্যায়ে মনে পড়ে গেল প্রশিক্ষক বৈমানিক ফারিয়া হোসেন লারা’র কথা। তিনি ছিলেন বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেনের মেয়ে।লারা ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রশিক্ষক বৈমানিক। ১৯৯৮ সালের ২৭শে সেপ্টেম্বর প্রশিক্ষণ উড্ডয়নের সময় এয়ার পারাবতের একটি বিমানে আগুন ধরে গিয়ে ঢাকার পোস্তগোলায় বিধ্বস্ত হয়। তাতে নিহত হন বৈমানিক ফারিয়া লারা ও সৈয়দ রফিকুল ইসলাম। বিধ্বস্ত বিমানটি ছিল সেসনা-১৫০ প্রকৃতির।বিমান দুর্ঘটনায় পড়ার কিছুক্ষণ আগে একটি বার্তা নিয়ন্ত্রণকক্ষকে দিয়েছিলেন ফারিয়া। এই জরুরি বার্তায় শেষবারের মতো তিনি বলেন, ‘আমি আর কয়েক মিনিট বেঁচে আছি পৃথিবীতে। আমি হয়তো আর কয়েক মিনিটের মধ্যেই শেষ হয়ে যাচ্ছি।’ দেশের ইতিহাসে আরেক নারী বৈমানিকের এমন মর্মান্তিক পরিণতি হয়েছিল। নাম তামান্না রহমান হৃদি। বাংলাদেশ ফ্লাইং একাডেমিতে গ্রাউন্ড প্রশিক্ষণ শেষে ফ্লাইং প্রশিক্ষণও শুরু করেন তামান্না। যশোরে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান ঘাঁটিতে ২০১৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর সফলতার সঙ্গে শেষ করেছিলেন ‘সলো টেস্ট’। সে সময় তিনি প্রথম সামরিক পাইলট হিসেবেও স্বীকৃতি পান। প্রশিক্ষণ নিতে তামান্না রাজশাহীতে পার্সোনাল পাইলট লাইসেন্স (পিপিএল) কোর্সে ভর্তি হয়েছিলেন। দিনটি ছিল ২০১৫ সালের ১ এপ্রিল, বুধবার । রাজশাহীর হয়রত শাহ মখদুম (র.) বিমানবন্দর থেকে একটি সিঙ্গেল ইঞ্জিন বিশিষ্ট সেসনা বিমানে করে তামান্নার সলো ফ্লাইং শুরু হয়। সঙ্গে ছিলেন প্রশিক্ষক ক্যাপ্টেন সাঈদ কামাল। তামান্নার উড়োজাহাজ চালনা, তাত্ত্বিক ক্লাস, আলোচনা, বিশ্লেষণ- সবকিছুতেই ভীষণ সন্তুষ্ট ছিলেন তিনি। প্রশিক্ষণ বিমানটি নিয়ে রানওয়ে থেকে মাত্র পাঁচ’শ ফুট ওপরে উড্ডয়নের দুই মিনিট পরই ইঞ্জিনে ত্রুটি দেখা দেয়। ইঞ্জিন একেবারেই বন্ধ হয়ে যায়। তখন তামান্না নিজেই আবার অবতরণের চেষ্টা চালান। এ রকম ইঞ্জিন ত্রুটি দেখা দিলে জরুরী অবতরণে যেসব নিয়ম ও কৌশল অনুসরণ করার কথা তামান্না তার সবটুক চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু স্বাভাবিক অবতরণ তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠেনি। তামান্না সোজা বামে ৬০ ডিগ্রী কৌণিকে বাঁক নিয়ে রানওয়েতে উড়োজাহাজটি অবতরণের চেষ্টা চালান। কিন্তু তাতে করে উড়োজাহাজটি রানওয়েতে আঁছড়ে পড়ে তাতে আগুন ধরে যায়। এ সময় তামান্নার পাশে থাকা প্রশিক্ষক সাঈদ কামাল কোনরকমে বেরিয়ে আসতে পারলেও দুর্ভাগ্যক্রমে তামান্না ভেতরে আটকা পড়ে যান। আগুনে পুড়তে পুড়তে তামান্না বাঁচার আকুতি নিয়ে চিৎকার করে সাহায্য চাইছিলেন। এ সময় রানওয়ের পাশে দু’জন গ্রামবাসী তামান্নাকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে আসতে চাইলেও রানওয়ে কর্তৃপক্ষ তাদের ভেতরে ঢোকার অনুমতি দেয়নি। ফলে আগুণে পুড়ে মারা যান এই নারী বৈমানিক। কিছুদিন পর প্রশিক্ষক সাঈদ কামালও কয়েকদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে পরাজিত হন। কানিজ, ফারিয়া, তামান্না, পৃথুলার প্রতি রইলো অফুরান ভালোবাসা।জানিনা মৃত্যুর পর মানুষ কই যায়, যেখানেই থাকো, ভালো থাকো তোমরা। তোমরা তো ছিলে পাখি, তাই এখনো আছো আকাশে, জ্বলজ্বল করছ নক্ষত্র হয়ে।তোমাদের এই সাহসীকতার উপর ভরসা করেই তো আমরা এদেশের মেয়েরাও সাহসী হই, সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা পাই।