মুক্তিযোদ্ধা মুখতার আহমেদ মৃধার উপর হামলাকারীদের বিচার চাই - Women Words

মুক্তিযোদ্ধা মুখতার আহমেদ মৃধার উপর হামলাকারীদের বিচার চাই

reza-gotok-women-wordsঝিনাইদহের প্রবীণ মুক্তিযোদ্ধা ও শিক্ষানুরাগী মুখতার আহমেদ মৃধার উপর যে নির্মম হামলা হয়েছে তা একুশ শতকের বাংলাদেশের আরও একটি বর্বরতার দৃষ্টান্ত। মুখতার আহমেদ মৃধার উপর কেন এই নৃশংস হামলা? কী অপরাধ করেছেন তিনি?

সম্প্রতি শৈলকুপা উপজেলার রাস্তা রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের কাজে ছয় কোটি টাকার চারটি দরপত্র আহ্বান করেছিল এলজিইডি। প্রবীণ মুক্তিযোদ্ধা মুখতার আহমেদ মৃধা ১৭ অক্টোবর অনলাইনে দরপত্র জমা দেন। দরপত্র যাচাই ও বাছাই শেষে ১৮ অক্টোবর বিভিন্ন শর্ত পূরণ করায় ও সর্বনিম্ন দরপত্র হওয়ায় তিনি ছয় কোটি টাকার কাজটি পান। কাজটি না পেয়ে ক্ষমতাসীন দলের প্রতিপক্ষ একটি গ্রুপ ক্ষুব্ধ হয়ে মুখতার আহমেদ মৃধাকে প্রথমে মুঠোফোনে মারধর ও হত্যা করার হুমকি দেয়। পরে ওই একই দিন (১৮ অক্টোবর ২০১৬) সন্ধ্যা ৬টা ৪৫ মিনিটের দিকে মুখতার আহমেদ মৃধার উপর তারা ওই বর্বর হামলা চালায়।

শৈলকুপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের গেটের সামনে জাকির মেডিকেল নামে একটি ওষুধের দোকানে মুখতার আহমেদ মৃধার উপর নিজ দলের প্রতিপক্ষ একটি গ্রুপের একদল সন্ত্রাসী লোহার রড, হাতুড়ি, চাপাতি ও লাঠিসোঁটা নিয়ে ওই বর্বর হামলা চালায়। পাশে বসা তাঁর ছেলে গোলাম মুর্শিদ এগিয়ে গেলে তাঁকেও ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপানো হয়। পুরো ঘটনা জাকির মেডিকেলের সিসি ক্যামেরায় ধরা পড়ে। মুখতার আহমেদ মৃধার আরেক ছেলে সুমন মৃধা সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে ফেসবুকে পোস্ট করেন। তারপর সেই ভিডিওটি স্যোসাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে যায়।

মুখতার আহমেদ মৃধার ছেলে সুমন মৃধা ওই ঘটনায় বাদী হয়ে ১০ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা কয়েকজনকে আসামি করে শৈলকুপা থানায় হত্যাচেষ্টার মামলা করেছেন। কিন্তু মামলার আসামিরা আদালত থেকে জামিন নিয়ে এখন প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে ও মামলার বাদীকে বিভিন্ন হুমকি-ধমকি দিচ্ছে। অথচ শুরুতে এজাহারভুক্ত আসামি আশরাফুলকে গ্রেপ্তার করলেও অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে তেমন তৎপর নয় পুলিশ।

মুখতার আহমেদ মৃধার উপর হামলাকারীদের ধরতে পুলিশের এত অনীহা কেন? নাকি হামলাকারীরাও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সমর্থক বলে পুলিশ এত খাতির করছে? হামলার ঘটনার সিসি টিভি ফুটেজ থাকা স্বত্ত্বেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আসামী ধরতে সক্রিয় নয় কেন? এমন নৃশংস হামলার ঘটনার সুস্পষ্ট প্রমাণপত্র থাকা স্বত্ত্বেও হামলাকারীরা আদালত থেকে জামিন পায় কীভাবে?

শৈলকুপার এই ঘটনায় গোটা বাংলাদেশের মানুষের কাছে কী বার্তা গেল? বাংলাদেশের সংবিধানে আইন সবার জন্য সমান। কিন্তু প্রবীণ মুক্তিযোদ্ধা মুখতার আহমেদ মৃধা’র উপর হামলাকারীদের পেছনে শক্তিশালী কারোর রাজনৈতিক সমর্থন থাকায় হামলাকারীরা ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে! তাহলে দেশের আইন ও বিচার ব্যবস্থার উপর মানুষ আস্থা রাখবে কীভাবে?

মুখতার আহমেদ মৃধার প্রথম অপরাধ- ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে ৮ নম্বর সেক্টরে মঞ্জুরের নেতৃত্বে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন করেছিলেন! মুখতার আহমেদ মৃধার দ্বিতীয় অপরাধ- একজন মুক্তিযোদ্ধা হয়ে যুদ্ধের ৪৫ বছর পরেও এখনো তিনি এই অসভ্য দেশে বেঁচে আছেন! মুখতার আহমেদ মৃধার তৃতীয় অপরাধ- মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের তিনি দীর্ঘদিনের একজন পরীক্ষিত সৈনিক।

মুখতার আহমেদ মৃধার চতুর্থ অপরাধ- তিনি ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ও শৈলকুপা উপজেলা শাখার প্রতিষ্ঠাতা সাংগঠনিক সম্পাদক। মুখতার আহমেদ মৃধার পঞ্চম অপরাধ- তিনি শৈলকুপার একজন শিক্ষানুরাগী ও যমুনা শিকাদার কলেজসহ ওই এলাকার বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেছেন। মুখতার আহমেদ মৃধার ষষ্ঠ অপরাধ- তিনি শৈলকুপা উপজেলার আবাইপুর ইউনিয়নের দুইবারের নির্বাচিত চেয়ারম্যান ছিলেন। মুখতার আহমেদ মৃধার সপ্তম অপরাধ- শৈলকুপা উপজেলার রাস্তা রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের কাজে অনলাইনে দরপত্র জমা দিয়ে এলজিইডি’র বিভিন্ন শর্ত পূরণ ও সর্বনিম্ন দরপত্র জমা দেওয়ার কারণে তিনি ছয় কোটি টাকার কাজ পেয়েছেন।

এই সপ্তম দোষে দুষ্টতার কারণে প্রবীণ মুক্তিযোদ্ধা মুখতার আহমেদ মৃধাকে তাঁর নিজের দল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের একটি প্রতিপক্ষ গ্রুপ ওই নির্মম নৃশংস ও বর্বর হামলা করেছে। কোথায় যাচ্ছে বাংলাদেশ? আমরা কী এই বাংলাদেশ চেয়েছিলাম? মুখতার আহমেদ মৃধা কী এই বাংলাদেশের জন্য একাত্তরে যুদ্ধ করেছিলেন? এ কোন অসভ্য বর্বর দেশ হতে চলেছে বাংলাদেশ?

বাবাকে বাঁচাতে গিয়ে মুখতার আহমেদ মৃধার এক ছেলে গোলাম মুর্শিদ ওই বর্বর হামলায় গুরুতর আহত হয়েছেন। মুখতার আহমেদ মৃধার অপর ছেলে এবং ওই হামলায় করা মামলার বাদী সুমন মৃধাকে হামলাকারীরা এখন বিভিন্ন হুমকি-ধমকি দিচ্ছে। হামলাকারীরা আদালত থেকে জামিন পেয়ে এখন প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাহলে কী এই বাংলাদেশ স্বাধীন করার জন্য মুখতার আহমেদ মৃধারা একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন?

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, প্রবীণ মুক্তিযোদ্ধা ও শিক্ষানুরাগী মুখতার আহমেদ মৃধার উপর এই হামলা প্রকৃতপক্ষে একাত্তরে যুদ্ধ করা প্রতিটি মুক্তিযোদ্ধার উপর হামলার সমান। এই হামলাকারীরা মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের কেউ নয়, বরং এই হামলাকারীরা বিগত ৪৫ বছরে দেশে দুর্বৃত্ত ও নষ্ট রাজনীতির চর্চা ও অনুশীলনের সুযোগে বিভিন্ন সময়ে আওয়ামী লীগের পতাকাতলে আশ্রয় ও প্রশ্রয় পাওয়া নব্য সন্ত্রাসীদের স্বার্থ সংক্রান্ত হামলা। যারা দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের নাম ভাঙিয়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডসহ লুটপাট, চাঁদাবাজী, টেন্ডারবাজী, দখল, জ্বালাও-পোড়াও করে আওয়ামী লীগার সেজে নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত। এই হামলাকারীরা যদি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগেরও কেউ হয়, আইনের দৃষ্টিতে তারা এই বর্বর হামলার জন্য দায়ী!

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি শুধু বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নন, আপনি বাংলাদেশের স্থপতি ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্যা কন্যা। বাংলাদেশের ষোল কোটি মানুষেরই আপনি প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশের যে কোনো প্রান্তে সংঘটিত যে কোনো আইন বহির্ভুত ঘটনায় দোষীদের দেশের প্রচলিত আইনের আওতায় এনে তাদের উপযুক্ত বিচার ও শাস্তি দেওয়ার দায়িত্বও আপনার। হামলাকারীরা যদি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সমর্থকও হয়, এই দায় আপনি কিছুতেই এড়াতে পারেন না।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, হয় আপনি ঝিনাইদহের শৈলকুপার ওই নৃশংস ঘটনায় হামলাকারীদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করান। হামলাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক সাজার ব্যবস্থা করেন। নতুবা বাংলাদেশে জীবিত ও মৃত সকল মুক্তিযোদ্ধার সম্মান, ভাতা ও সুযোগসুবিধা বাতিল করুন। সকল মুক্তিযোদ্ধার মুক্তিযুদ্ধের সার্টিফিকেট বাতিল করুন। মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের ও বাংলাদেশের সবচেয়ে গর্বিত ও সম্মানিত নাগরিক।

তাঁদের উপর যে কোনো ধরনের হামলা, অসম্মান, অসৌজন্যতা, কটাক্ষ, টিটকারী কার্যত বাংলাদেশের পতাকার উপর হামলার সমান। যা আমাদের মত দেশের সাধারণ নাগরিকরা যেমন মেনে নিতে পারছে না, আপনার পক্ষেও মেনে নেবার প্রশ্নই ওঠে না।

সন্ত্রাসীদের প্রকৃতপক্ষে কোনো দল নেই। তারা ক্ষমতাসীন দলের উপর ভর করে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করে। প্রবীণ মুক্তিযোদ্ধা মুখতার আহমেদ মৃধার উপর হামলাকারীদের আপনি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করবেন, এটাই আমাদের প্রত্যাশা। জয়তু মুক্তিযোদ্ধা, জয়তু বাংলাদেশ।
লেখক: কথাসাহিত্যিক ও নির্মাতা

 

 

মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। womenwords.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে womenwords.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।