এ ট্রিবিউট টু ঋত্বিক কুমার ঘটক - Women Words

এ ট্রিবিউট টু ঋত্বিক কুমার ঘটক

reza-gotok-women-wordsমৃত্যুর মাত্র সাত মাস আগে ১৯৭৫ সালের জুলাই মাসে ঋত্বিক কুমার ঘটক (১৯২৫-১৯৭৬) শান্তি নিকেতনে চারদিনের এক শুটিং যজ্ঞ করলেন। ইচ্ছে ছিল বিখ্যাত ভাস্কর ও পেইন্টার রামকিংকর বাইজ (১৯০৬-১৯৮০) -এর উপর একটি ডকুমেন্টারি বানাবেন। কিন্তু ১৯৭৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি এই ডকুমেন্টারি অসমাপ্ত রেখেই ঋত্বিক মারা যান।

ঋত্বিকের সেই অসমাপ্ত ডকুমেন্টারির ফুটেজগুলো পরবর্তী সময়ে জোড়া দিয়ে ‘রামকিংকর বাইজ- এ পারসোনালিটি স্ট্যাডি’ নামে ৩০ মিনিট ৪৭ সেকেন্ডের একটি ডকুমেন্টারি তৈরি করা হয়। ঋত্বিক যেভাবে চিত্রনাট্য করেছিলেন এই ডকুমেন্টারিটি সেভাবে যুক্ত করা হয়েছে। প্রথমে একটা বড় হোয়াইট স্ক্রিন। তার উপর হঠাৎ চারপাশ থেকে নানান রঙের এক বর্ণালী এসে তাক লাগিয়ে দেয়। কারো হয়তো মনে প্রশ্ন জাগতে পারে ঋত্বিক কেন সাদা স্ক্রিনে এভাবে মগ ভর্তি বিভিন্ন রঙ ছুড়ে ছুড়ে পর্দা রঙিন করলেন?

দর্শক যদি একটু ধৈর্য ধরেন তাহলে পরের মিনিটেই আপনি জবাবটা পেয়ে যাবেন। যেখানে বিভিন্ন এঙ্গেলে রামকিংকরের করা ভাস্কর্যগুলোকে দেখা যায়। ব্যাকগ্রাউন্ডে তখন তানপুরার সঙ্গে মাদল বাজতে থাকে। ঋত্বিক কি তাহলে বৃষ্টি নামাতে চাইছিলেন?

নইলে এক একটি ভাস্কর্যের মুখমণ্ডলের ক্লোজ ছাপিয়ে ক্যামেরা যখন অন্য একটি ভাস্কর্যকে তাড়া করছিল, তখন হঠাৎ সেতার কেন মিউজিক লিড করতে থাকবে?

এরপর রামকিংকরের ভাস্কর্য রমনীর মুখ, পরিবার, শিশুর মুখ, প্রিয় কুকুর, গান্ধীজি, একটার পর একটা ভাস্কর্য যেতে থাকে। আবার সেই রঙ লাগানো স্ক্রিন। ঋত্বিক সেখানে লিখে রেখেছেন, দ্য রিভার, দ্য আনডুলেটিং ল্যান্ডস্কেপস, দ্য ভিলেজ ইটিস। তারপর আমরা দেখতে পাই পাখির কলকাকলির সাথে বাঁশি বাজছে আর নদীর এপার থেকে ওপারের দূরের গ্রাম দেখা যাচ্ছে। সেখানে মাটির ঘরের পেছনে গরুর গাড়ি, দুষ্টু পঞ্চ বালকের ভো দৌড়, যাদের পেছন পেছন সেই প্রিয় কালো কুকুর ভোলাও যাচ্ছে। ওরা কি দেখার মত তাজ্জব কোনো কিছুর সন্ধান পেতেই এভাবে ছুটছিল? নইলে ভোলাকেও অত উৎসাহী লাগল কেন? নাকি ঋত্বিক এখানে রামকিংকরের ছেলেবেলাকে নির্দেশ করেছেন?

দুষ্টু বালকদের ছত্রভঙ্গ হবার সাথে সাথে ভোলা একটু কিংকর্তব্যবিমুঢ়! ভোলা আবার পেছন ফিরে ক্যামেরায় লুক দেয়। তারপর ভোলা আবার সামনে দৌড়াতে থাকে। এরপর আমরা দেখি সুবিশাল কাশবন। এখানে ঋত্বিক লিখেছেন যে, ছেলেমেয়েরা কলা ভবন থেকে বের হয়ে আসছিল। তাদের আলোচনার বিষয় ছিল আর্ট। এরা ক্যমেরা থেকে ফ্রেমআউট হলে আমরা কলা ভবনের দিকে অগ্রসর হই। আর তারপর ক্যামেরা প‌্যান করে ম্যুরাল ধরতে শুরু করি।

এই ম্যুরালটি অনেক শিল্পীর একসঙ্গে করা একটি কাজ। রামকিংকর মূলত যাদের নির্দেশনায় ছিলেন। শিল্পী নন্দলাল বসু’র কিছু কাজ এরমধ্যে ছিল। তারপর আমরা ক্যামেরায় ম্যুরালগুলোর ডিটেইল ধরা শুরু করলাম। এর কোনোটা আর্যযুগের, কোনোটা দ্রাবিঢ়যুগের। কোনোটা আবার ঐশ্বরিয়ান, মিশরীয়, পারশ্য বা মহেঞ্জদাড়ো যুগের কাজ। ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক দিয়ে তা স্পষ্ট করে বোঝানো হবে। গান্ধীজির ভাস্কর্যটির নানা অ্যাঙ্গেলে শুট করলাম। এরপর গান্ধীজির ভাস্কর্যের সামনেই ঋত্বিক রামকিংকরের সঙ্গে কথা বলা শুরু করেন।

ঋত্বিক: কিংকরদা, গান্ধীজির পায়ে এই যে নরকংকালের মুন্ডুগুলো, এর মানেটা কি?

রামকিংকর: ওটার মানে সহজেই যুগযুগান্তর ধরে ওই লোকগুলা পায়ের তলায় পড়ে আছে। আজকে সেই বুড়োর পায়ের তলায় সেই স্কালপচার দেখানো হয়েছে।

ঋত্বিক: কারেক্ট…

এরপর সেই মুণ্ডুগুলোর ক্লোজ শট থেকে আমরা আসি একযুগল কৃষক দম্পতির কাছে-

ঋত্বিক: আচ্ছা কিংকরদা, এই ছবিটা, এই মুর্তিটা কিসের?

রামকিংকর: ওরা কুলি। ওরা রাইসমিলে কাজ করে। ওরা খাবারের হুইসেল শুনে দৌড়াতে থাকে। কিন্তু ওদের কাপড় শুকানোর মত অত সময় কোথায়? তাই অনেকে কাপড়টা শুকায় না, কাপড় শুকাতে শুকাতে এভাবে দৌড়ে তারা খাবার খেতে যায়। এই হচ্ছে ব্যাপারটা…হা হা হা…

রামকিংকরের বামহাতে একটা মাতাইল আর ডানে হাতে গামছা। ঋত্বিকের দিকে ঘুরে কথা শেষ করে তিনি প্রাণখুলে হাসতে থাকেন।

ঋত্বিক: এটা হচ্ছে এর আর্ট?

রামকিংকর: হ্যা হ্যা এটাই…হা হা হা….

ঋত্বিক: এই হল ঘটনা?

রামকিংকর: এই ঘটনা হা হা হা…

আজ ঋত্বিক কুমার ঘটকের ৯১তম জন্মদিন। লাল ছালাম গুরুজি!

 

লেখক: কথাসাহিত্যিক ও নির্মাতা