স্বপ্নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আর বন্ধু পুনর্মিলনী - Women Words

স্বপ্নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আর বন্ধু পুনর্মিলনী

Romena Lais‘এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়’। এরকম আঠারোর উজ্জ্বল যৌবনে যাদের সাথে দেখা হয়েছিলো স্বপ্নের ক্যাম্পাসে, আজ তিরিশ বছর পরে তাদের সাথে দেখা হলো।কথা হলো, আড্ডা হলো। মনে হলো আমরা যেন ফিরে গেলাম সেই অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে। এক জীবনে মানুষ কতটুকু পায়? কোন কোন জীবন রাতে ফোটা শিউলির মত ভোরেই ঝরে যায়। কারো কারো জীবন দীর্ঘ হয়। অভিজ্ঞতার ঝুলিতে জমতে থাকে কত কত স্মৃতি।

১৯৮২ তে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ছিলাম পাবলিক এডমিনিস্ট্রেশনে। । পাবলিক এডের বন্ধুদের পাশাপাশি বন্ধুত্ব ছিলো আই আরের কামরুল,তানভীর টিটোর সাথে। কামরুল তানভীর ছিলো মাণিকজোড়। সবসময় একসাথে এই দুজনকে দেখা যেতো ক্যাম্পাসে। টিটো ছিলো মার্ক্সবাদীয় তত্ত্বে বিশ্বাসী। ভালো ছাত্র।

 ইহুদিদের হলিডের জন্য এই উইক এন্ড চারদিনের। স্কুল খুলবে বুধবারে। আজ শুক্রবার (৩০ সেপ্টেম্বর) ছেলের ক্লাস আছে, পিকআপ করতে আসেনি।কাজের শেষে সাবওয়েতে ঢুকেই ট্রেন পেয়ে গেলাম। ট্রেনে বসে ফেসবুকে চোখ রাখতেই একটা ছবি আর তার ক্যাপশনে (“তিরিশ বছর পর জ্যাকসন হাইটস এ আমার তিনবন্ধু”) চোখ আটকে গেলো। ফ্লাশব্যাক ফিরিয়ে নিয়ে গেলো আমাকেও সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলোতে। বন্ধু পাশে থাকলে সবকিছু কেমন নরম হালকা শিমুলের তুলোর মত। সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মল চত্বর, সেই জারুল, কৃষ্ণচূড়া,সেই নীপা লাইব্রেরি, ভাষা ইন্সটিটিউটের সিঁড়ি,আর বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরি। ঝালমুড়ি,বাদাম,আর ফুচকা-কত মায়া ময় দিন। এরশাদবিরোধী আন্দোলন,এরশাদ ভ্যাকেশন,এরশাদের পতন কতো স্মৃতি।romena-lais-du-02-women-words

আমি লিখলাম -তোমরা নিউ ইয়র্কে? কিছুক্ষণ পর ফোন করলো কামরুল। নিউ জার্সির বাসায় চলে গেছে পোর্ট অথরিটি বাস টার্মিনাল থেকে টিটোকে রিসিভ করে ।টিটো এসেছে মন্ট্রিআল থেকে।

আকাশ আজ মেঘলা ,মন খারাপ করে আছে।মুখভার করে আছে ,যে কোন সময় ঝড়বে ঝরঝর বৃষ্টি। কামরুলের লাঞ্চ অ্যান্ড ডিনারের আমন্ত্রণে আমরা নিউ জার্সির পথে। পৌঁছে গেলাম দুইটার দিকে। তিরিশ বছর পর দেখা নাকি তারও দুচার বছর বেশী হবে। মনে আছে একবার ঈদের ছুটিতে ঢাকায় ছিলাম। সারাদিন ঘুরেছিলাম ডেইজি তানভীর আর কামরুলের সাথে। স্বপ্নের মতন মনে হলো। এও কী সত্যি? আবার এতো বছর পর আমাদের দেখা হলো! আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের বয়সে আমার ছোট-বড় যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী আরো আমন্ত্রিত অতিথিরা এসেছেন। পরিচয় হলো কামরুলের স্ত্রী সুমনার সাথে। আজিজা হক রুমি,মিতু,টিপু,দীপু,নাইমা,আফজাল,রুমানা, লীটা ,নন্দন রুনী সকলেই আই আরঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। আর ছিলো পাবলিক এডের ছোটভাই মীজান।সাথে সবার স্পাউসরাবাংলাদেশ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এগুলো বুকে ধারণ করেই আমরা প্রবাসে ছড়িয়ে আছি। যুক্তরাষ্ট্র,কানাডা যেখানেই থাকি নিজের শেকড়কে ভুলিনি,ভোলা যায় না। বারবিকিউ দিয়ে শুরু। বৃষ্টি হবে মনে হলেও বৃষ্টি আসেনি।

বারবিকিউ গ্রিলের সাথে স্মৃতির পথ ধরে হাঁটাহাটি। আমাদের সুনামগঞ্জের বাড়ির ছাদে শুয়ে অন্ধকার রাতে ছায়াপথ দেখতাম। কী সুন্দর স্নিগ্ধ আলো বিছিয়ে দেয়া সেই পথ।আজ এই মিলনমেলায় আগত মানুগুলোকে দেখে আমার ছায়াপথের কথা মনে হলো।আমার আশেপাশের আঁধার চিড়ে এই মানুষগুলো সব যেন ছাসাপথের মতই স্নিগ্ধ আলো ছড়াচ্ছেন। বিরিয়ানী মাংস সালাদ আরেক রাউন্ড খাওয়ার পর চা এর সাথে মূল অনুষ্ঠান শুরু হলো। কামরুল পুরো অনুষ্ঠানটিকে দুই পর্বে ভাগ করেছে। প্রথম পর্বে লটারী এবং পারফরমেন্স। যার যা উঠবে তাই পারফর্ম করতে হবে। খুব মজার এই পর্বটি। তারপর দ্বিতীয় পর্ব-স্মৃতিচারণ পর্ব। সকলে দুচার কথায় যার যার ডিপার্টমেন্টে ভর্তির স্মৃতি তুলে ধরলো। এরপর শুরু হলো ট্যালেন্ট শো। আমাদের মাঝে এতো প্রতিভাধর আছেন- এ যেন দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া। একের পর এক শিল্পীদের গান। প্রথমেই পূর্ণতা গাইলো ইম্পসিবল ।ওর সুরের ঝংকারে সকলের সাথে আমিও মুগ্ধ। মিতু গাইলো কবিতা পড়ার প্রহর এসেছে রাতের নির্জনে। হাসানের সাহসী মানুষ চাই আবৃত্তি মন জয় করলো সবার। টিটো গাইলো আমার হাড় কালা করলাম রে। রুনী আর করভী রবীন্দ্রসঙ্গীতের সূরে মুগ্ধ করলো আমাদের। লীটা গাইলো তুমি যে আমার কবিতা। রুমানা গাইলো আমার অত্যন্ত প্রিয় মৌসুমী ভৌমিকের আমি শুনেছি সেদিন তুমি। আফজাল বাবু গাইলো আযম খানের মন জয় করা গানগুলো। সুর তাল ছন্দে আমরা ক্রমাগত হাবুডুবু খেতে লাগলাম। স্মৃতির জানলা খুলে উকি দিতে লাগলো কতো প্রিয়মুখ।

‘শ্রাবণের মেঘগুলো জড় হলো আকাশে অঝোরে নামবে বুঝি শ্রাবণ ধারায়’।সূরের মূর্ছনা শুনতে শুনতে রাতের ডিনার সেরে সবাই বিদায় নিলাম। স্মৃতির ঝুলিতে যুক্ত হলো চমৎকার একটি স্বর্ণালী দিন।