বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে সাফল্যের চূড়ায় - Women Words

বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে সাফল্যের চূড়ায়

Romena Laisসুনামগঞ্জের সতীশ চন্দ্র উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের হীরকজয়ন্তী উদযাপনের প্রাক্কালে আজ প্রথম প্রজন্মের আরেক জন নক্ষত্রকে নিয়ে আলোচনা করব। তিনি শুধু নিজে আলোকিত তা নয়, আলোকিত করেছেন চারপাশ। আলোকিত মানুষ গড়ার কারিগর তিনি। আজ যার কথা উল্লেখ করছি তিনি প্রফেসর দিলারা হাফিজ (ঝর্ণা)।

জীবনের চলার পথে দুর্বার গতিতে ঝর্ণার মতই এগিয়ে গেছেন তিনি। কোন বাঁধা কোন পিছুটানই তাঁকে আটকে রাখতে পারেনি।

১৯৪৯ সালে সুনামগঞ্জের আরপিননগরে নানাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন দিলারা হাফিজ। তাঁর বাবা আবুল হোসেন চৌধুরী ও মা করিমুন্নেসা খাতুন চৌধুরী। বাবা আইনজীবী আর মা ছিলেন সতীশ চন্দ্র সরকারি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা। দুই ভাই আর তিনবোনের মধ্যে তাঁর অবস্থান তৃতীয়। তিনি সতীশ চন্দ্র সরকারি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সাথে এস এস সি পাশ করেন ১৯৬৩ সালে। ১৯৬৫ সালে সিলেট মহিলা কলেজ থেকে এইচ এস সি পাশ করেন । এই পরীক্ষায় তিনি মেধা তালিকায় স্থান পেয়েছিলেন। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে ভর্তি হন।১৯৬৮ তে অনার্স আর ১৯৬৯ এ মাস্টার্স পাশ করেন। মাস্টার্সে তিনি ২য় শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করেন। ওই বছরে তার গ্রুপে কেউ প্রথম শ্রেণী পায়নি ।

১৯৭২ এ সেনা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন হাফিজউদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম এর (পরবর্তীতে মন্ত্রী )সাথে বিয়ে হয় তাঁর। পরবর্তীতে তিনি মাস্টার্স লিডিং টু পিএইচডি প্রোগ্রামে কমনওয়েল্থ স্কলারশিপ পান, কিন্তু বাচ্চারা ছোট থাকায় স্কলারশিপটি গ্রহন করতে পারেন নি। । ইডেন মহিলা কলেজে প্রভাষক হিসেবে চাকুরী জীবন শুরু করার পর ঢাকা কলেজ,জগন্নাথ কলেজ ও তিতুমীর কলেজে বিভাগীয় প্রধান হিসেবে কাজ করেন। পরবর্তীতে তিনি ধামরাই কলেজ ,শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ এবং ইডেন কলেজে অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন। এই বোর্ডে তিনিই ছিলেন প্রথম মহিলা চেয়ারম্যান। সবশেষে ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরেরর মহাপরিচালক ছিলেন। এই পদে কর্মরত অবস্থায় অবসর গ্রহণ করেন।

তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট মেম্বার ছিলেন। বুয়েট, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট মেম্বার ছিলেন তিনি।

তিনি বাংলাদেশ স্কাউটস এর নির্বাচিত সহ-সভাপতি ছিলেন। বাংলাদেশ স্কাউটস থেকে তাঁকে রৌপ্য ইলিশ এওয়ার্ড দেয়া হয়। এছাড়া নারীকন্ঠ ফাউন্ডেশন থেকে তাঁকে শাইনিং পার্সোনালিটি এওয়ার্ড প্রদান করা হয়। ২০১৪ সালে সিলেট সরকারি মহিলা কলেজের ৭৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে ১৩ নারীকে কৃতি নারী সম্মাননা প্রদান করা হয়। তিনিও এ সম্মাননা লাভ করেন।

দিলারা হাফিজের অবসর কাটে বই পড়ে। তাঁর আরও একটি বিশেষ শখ হচ্ছে দেশে-বিদেশে ভ্রমণ। ইতিহাস বিষয়ে পড়াশুনা করার অন্যতম কারন ছিলো উপ-মহাদেশের ঐতিহাসিক স্থান গুলো পরিদর্শনের সুযোগ পাওয়া। তিনি নিজ উদ্যোগে এবং চাকুরীর সুবাদে পৃথিবীর বহু দেশ ভ্রমন করেছেন। এগুলোর মধ্যে আছে যুক্তরাষ্ট্র,যুক্তরাজ্য,কানাডা,অষ্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন রাজ্য, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ব্যাংকক, হংকং, দুবাই, সৌদী আরব, তুরস্ক, ইটালী, জার্মানী, অষ্ট্রিয়া, ফ্রান্স, বেলজিয়াম,সুইজারল্যান্ড, ইন্ডিয়া, পাকিস্তান, নেদারল্যান্ড ইত্যাদি।

তিনি লেখালেখিও করেন। চারকন্যা নামে তাঁর একটি বই বেরিয়েছে ২০১৪ সালে। ইতিহাসের ছাত্রী ছিলেন,তাই বইটিতে অত্যন্ত নিপুনভাবে তাঁর নানী,মা,নিজের ও নিজের কন্যার জীবনকে উপন্যাসের কাঠামোয় তুলে এনেছেন। দুই ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে বর্তমানে ঢাকায় বসবাস করছেন। আগামী বইমেলায় তাঁর নতুন বই আসবে।

যে সময়টায় তিনি পড়ালেখা করেছেন, সে সময় যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত খারাপ ছিল। তিনটি ফেরী পার হওযা লাগত। তবে বর্ষা কালে প্রধান সড়ক থেকে নেমে যাওয়া অত্যন্ত কর্দমাক্ত,পিচ্ছিল,ঢালু রাস্তা ধরে ফেরীতে গিয়ে ওঠা পুরুষদের জন্যই সহজ সাধ্য ছিলো না,মেয়েদের কথা তো বলাই বাহুল্য। সুনামগঞ্জের যোগাযোগ ব্যবস্থা আগে এতো খারাপ ছিল যে সুনামগঞ্জ থেকে ঢাকা যেতে দুইদিন লেগে যেত।এখন যেমন রেস্ট এরিয়া রয়েছে তখন তা ছিল না।গাড়ি কোথাও দাঁড়ালে ছেলেরা খোলা জায়গায় প্রাকৃতিক কাজ সেরে নিতো। আর মেয়েরা খুব বিপদে পড়লে গ্রামের কোন বাড়িতে আশ্রয় নিতে হতো। বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছেছেন প্রফেসর দিলারা হাফিজ।

চাকুরী থেকে অবসর নেয়ার পর তিনি নিজ উদ্যোগে প্রজেক্টের সহায়তায় তাঁর দাদার বাড়ী দিরাই উপজেলার অত্যন্ত অবহেলিত গ্রাম মাটিয়াপুরে একটি হাইস্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। স্কুলটির নাম মাটিয়াপুর এসইএসডিপি মডেল হাই স্কুল। পরবর্তীতে তাঁর ইচ্ছা এই স্কুলটিকে কলেজে রূপান্তরিত করে পিছিয়ে পরা এই এলাকার শিক্ষাকে প্রসারিত করবেন।

কর্মজীবনে তাঁর মত এত সফল নারীর সংখ্যা বাংলাদেশে কমই আছে। নতুন প্রজন্মকে তিনি বই পড়ার আহ্বান জানিয়েছেন। আসলেই বই পড়ার কোন বিকল্প নেই। বই মানুষের মেধাকে শাণিত করে। মনের জগতের সকল অন্ধকার দূর করে।আমি তাঁর সুখী আনন্দময় দীর্ঘ জীবন কামনা করি।