পালাকার পরিবারের পরাণের গহীনে রবে নিরবে - Women Words

পালাকার পরিবারের পরাণের গহীনে রবে নিরবে

reza-gotok-women-words

 

‘পূর্ণিমাতে ভাইসা গেছে নীল দরিয়া
সোনার পিনিশ বানাইছিলা যতন করিয়া
চেলচেলাইয়া চলে পিনিশ, ডুইবা গেলেই ভুস
হায়রে মানুষ, রঙ্গীন ফানুস, দম ফুরাইলেই ঠুস!’
প্রায় ৮১ বছর বয়সে রঙ্গীন ফানুস উড়িয়ে দম ফুরালেন সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক। লন্ডনের রয়্যাল মার্সডেন হাসপাতালে টানা চার মাস চিকিৎসার পর গত ২ সেপ্টেম্বর তিনি দেশে ফেরেন। এর আগে গত ১৫ এপ্রিল ফুসফুসের সমস্যা নিয়ে তিনি লন্ডনে যান। সেখানে বিভিন্ন পরীক্ষা নীরিক্ষায় পর তাঁর ক্যানসার ধরা পড়ে। দেশে ফেরার পর থেকে তিনি ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তখন থেকেই সবার মধ্যে আজকের এই ভয়াবহ দুঃসংবাদের জন্য এক ধরনের আশংকা ছিল। গতকাল মঙ্গলবার (২৭ সেপ্টেম্বর) বিকাল ৫টা ২৬ মিনিটে তিনি না ফেরার দেশে চলে গেলেন। সৈয়দ শামসুল হক, আমাদের প্রিয় হক ভাইয়ের এই চলে যাওয়ায়, তাঁর প্রতি পালাকার পরিবারের গভীর ভালোবাসা ও বিনম্র শ্রদ্ধা।

‘এ বড় দারুণ বাজি, তারে কই বড় বাজিকর
যে তার রুমাল নাড়ে পরানের গহীন ভিতর।’
সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক সত্যি সত্যিই পালাকার পরিবারের পরানের গহীন ভেতরে জায়গা করে নিয়েছেন। পালাকার প্রযোজনা করেছে সৈয়দ শামসুল হকের লেখা দুটি নাটক। ‘বাংলার মাটি বাংলার জল’ ও ‘নারীগণ’। উনিশ শতকের শেষের দিকে ১৮৮৭ থেকে ১৮৯৫ সময়কালে, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন পূর্ববঙ্গে পারিবারিক জমিদারি দেখাশোনার জন্য শিলাইদহ-শাহজাদপুর ও পতিসরে অবস্থান করেন। তখন কবি তাঁর অল্প বয়সী ভ্রাতুষ্পুত্রী, মেজ ভাই সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মেয়ে শ্রীমতি ইন্দিরা দেবীকে চিঠি লিখতেন। যেগুলো ‘ছিন্নপত্র’ নামে পরিচিত। ছিন্নপত্রের সেই চিঠিগুলোকেই অনুসঙ্গ করে নাট্যকার সৈয়দ শামসুল হক রচনা করেন ‘বাংলার মাটি বাংলার জল’ নাটকটি। ২০১১ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সার্ধশত জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে এটি একটি পালাকার প্রযোজনা। ‘বাংলার মাটি বাংলার জল’ নাটকটি নির্দেশনা দিয়েছেন বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব আতাউর রহমান।

reza-01-women-wordsনবাব সিরাজদ্দৌলার মৃত্যুর পর তাঁর পরিবারের নারীদের কী হয়েছিল, সেই ঘটনাকে বিষয়বস্তু করে ‘নারীগণ’ নাটকটি রচনা করেন সৈয়দ শামসুল হক। পালাকারের ‘নারীগণ’ প্রযোজনাটিরও নির্দেশনা দিয়েছেন আতাউর রহমান। দুটি নাটকেই নির্দেশকের বিশেষ সহায়ক ছিলেন পালাকারের অধিকারী নাট্যকার ও নির্মাতা আমিনুর রহমান মুকুল।

সৈয়দ শামুসল হক প্রথম নাটক লিখেছেন ১৯৭৫ সালের মে মাসে— ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’। প্রবাসে বসে লেখা এই নাটকটি প্রথম মঞ্চস্থ হয়েছে ১৯৭৬ সালের নভেম্বরে। আর এখন পর্যন্ত তাঁর শেষ নাটক ‘নারীগণ’। সব মিলিয়ে সৈয়দ হক মোট ২৩টি নাটক লিখেছেন। ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’, ‘নূরলদীনের সারাজীবন’, ‘গণনায়ক’, ‘ঈর্ষা’ ইত্যাদি নাটকে তিনি দারুণ মুন্সীয়ানার স্বাক্ষর রেখেছেন। ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ ও ‘নুরলদীনের সারাজীবন’ বাংলাদেশের মঞ্চনাটকের ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে আছে। থিয়েটারের প্রযোজনা ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ ও ‘নুরলদীনের সারাজীবন’, পদাতিক নাট্য সংসদের ‘ম্যাকবেথ’, কণ্ঠশীলনের ‘উত্তর বংশ, নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের ‘অপেক্ষমাণ’, প্রাঙ্গণেমোর নাট্যদলের ‘ঈর্ষা’ এবং পালাকারের ‘বাংলার মাটি বাংলার জল’ ও ‘নারীগণ’ নাটকগুলো সৈয়দ হকের দর্শকপ্রিয় নাটকগুলোর মধ্যে অন্যতম।

সৈয়দ শামুসল হকের প্রথম বইয়ের নাম ‘তাস’। এটি গল্পগ্রন্থ। প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘একদা এক রাজ্যে’। প্রথম উপন্যাস ‘দেয়ালের দেশ’। প্রথম নাটক ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’। তাঁর বহুল আলোচিত কাব্যগ্রন্থ ‘বৈশাখে রচিত পংক্তিমালা’, ‘পরাণের গহীন ভেতর’, ‘নাভিমূলে ভস্মাধার’, ‘আমার শহর ঢাকা’, ‘বেজান শহরের জন্য কেরাম’, ‘বৃষ্টি ও জলের কবিতা’।

সৈয়দ হকের সাড়া জাগানো উপন্যাসগুলো হলো- ‘খেলারাম খেলে যা’, ‘নীল দংশন’, ‘মৃগয়া’, ‘সীমানা ছাড়িয়ে’, ‘এক মহিলার ছবি’, ‘দেয়ালের দেশ’, ‘স্তব্ধতার অনুবাদ’, ‘এক যুবকের ছায়াপথ’, ‘মহাশূন্যে পরাণমাস্টার’, ‘তুমি সেই তরবারী’, ‘দ্বিতীয় দিনের কাহিনী’, ‘অন্তর্গত’, ‘এক মুঠো জন্মভূমি’, ‘শঙ্খলাগা যুবতী ও চাঁদ’, ‘বাস্তবতার দাঁত ও করাত’, ‘বৃষ্টি ও বিদ্রোহীগণ’, ‘নিষিদ্ধ লোবান’ ‘আয়না বিবির পালা’ প্রভৃতি।

reza-02-women-wordsসৈয়দ হকের বহুল পঠিত ছোটগল্পের বইগুলো হলো- ‘তাস’, ‘শীত বিকেল’, ‘রক্তগোলাপ’, ‘আনন্দের মৃত্যু’, ‘প্রাচীন বংশের নিঃস্ব সন্তান’, ‘জলেশ্বরীর গল্পগুলো’। তাঁর হাত দিয়ে বাংলা চলচ্চিত্র পেয়েছে ‘মাটির ময়না’, ‘ময়নামতি’, ‘বড় ভাল লোক ছিল’, ‘তোমার আমার ঠিকানা’, ‘নতুন দিগন্ত’, ‘ক খ গ ঘ ঙ’। তাঁর ‘নিষিদ্ধ লোবান’ উপন‌্যাস নিয়ে নির্মিত হয়’গেরিলা’ নামে চলচ্চিত্রটি। সৈয়দ শামসুল হক নিজেও চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। ১৯৬৬ সালে তিনি পরিচালনা করেন উর্দু সিনেমা ‘ফির মিলেঙ্গে হাম দোনো’। সৈয়দ হকের দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত কলাম ‘হৃৎকলমের টানে’ এবং আত্মজীবনী ‘প্রণীত জীবন’পাঠক মহলে সমানভাবে সমাদৃত।

চলচ্চিত্রের জন্য চিত্রনাট্য লেখার পাশাপাশি তিনি সিনেমার জন্য গান লিখতেন। সৈয়দ হকের লেখা জনপ্রিয় বিখ্যাত গানগুলো হলো- ‘বড় ভাল লোক ছিল’ সিনেমার ‘হায়রে মানুষ, রঙ্গীন ফানুস, দম ফুরাইলেই ঠুস’, ‘সুতরাং’ সিনেমার ‘এই যে আকাশ এই যে বাতাস’, ‘একই অঙ্গে এত রূপ’ সিনেমার ‘জানিনা সে হৃদয়ে কখন এসেছে/ প্রাণের মাঝে দোলা দিয়েছে’ ‘আয়না ও অবশিষ্ট’ সিনেমার ‘যার ছায়া পড়েছে, মনেরও আয়নাতে’ কিংবা ‘ময়নামতি’ সিনেমার ‘অনেক সাধের ময়না আমার বাঁধন কেটে যায়’ অথবা ‘আশীর্বাদ’ চলচ্চিত্রের ‘চাঁদের সাথে আমি দেব না তোমার তুলনা’।

reza-03-women-wordsসৈয়দ শামুসল হক ১৯৩৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর কুড়িগ্রামে জন্মগ্রহন করেন। তাঁর পিতার নাম সৈয়দ সিদ্দিক হুসাইন ও মায়ের নাম হালিমা খাতুন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি দুই সন্তানের জনক। তাঁর জীবনসঙ্গী মনোরোগের চিকিৎসক ও লেখক আনোয়ারা সৈয়দ হক। ছোটগল্প, কবিতা, উপন্যাস, কাব্যনাট্য, শিশুসাহিত্য, নাটক, প্রবন্ধ সাহিত্যের সব শাখায় সমানভাবে অবদান রাখার জন্য তিনি বাংলাদেশের সব্যসাচী লেখক হিসেবে পরিচিত। লেখালেখি শুরু করেন ১২ বছর বয়স থেকেই। তাঁর গ্রন্থের সংখ্যা দুই শতাধিক।

সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় অবদানের জন্য সৈয়দ শামসুল হক ১৯৬৬ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার, ১৯৮৪ সালে একুশে পদক ও ২০০০ সালে স্বাধীনতা পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেন। আজ বুধবার সব্যসাচী এই লেখককে কুড়িগ্রামের পারিবারিক গোরস্তানে দাফন করা হবে। বাংলা সাহিত্যের এই সব্যসাচী লেখকের প্রতি পালাকার পরিবারের গভীর ভালোবাসা ও বিনম্র শ্রদ্ধা। জয়তু সৈয়দ হক। জয়তু বাংলা সাহিত্য।

……………………………….
রেজা ঘটক, কথাসাহিত্যক ও নির্মাতা