লৌহমানবী ইরোম শর্মিলা চনু : কী হতে পারে তাঁর ভবিষ্যৎ - Women Words

লৌহমানবী ইরোম শর্মিলা চনু : কী হতে পারে তাঁর ভবিষ্যৎ

এ কে শেরাম

মণিপুরের ইরোম শর্মিলা চনু আজ আর কেবল একটি নাম নয়–একটি প্রতিষ্ঠান। মণিপুর থেকে ‘আফস্পা’ নামের একটি কালো আইন প্রত্যাহারের দাবিতে প্রায় ১৬ বৎসর ধরে একটানা অনশন করে সারা বিশ্বেই একটি অনন্য ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন তিনি। বলে রাখা ভাল যে, ’আফস্পা’ এমন এক আইন যার ক্ষমতাবলে সামরিক ও আধাসামরিক বাহিনী বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্দেহে যে কাউকে যে কোনো সময় আটক করে গুম করে ফেলতে পারে, খুন করতে পারে; তার জন্যে তাদের কারো কাছে জবাবদিহি করতে হয় না। আমরা জানি, মণিপুরের মালোম এলাকায় এক সকালে ভারতের আধাসামরিক বাহিনী আসাম রাইফেলসের জওয়ানরা একটি বাস স্ট্যাণ্ডে দাঁড়িয়ে থাকা শিশু-নারীসহ নিরীহ ১০ জন মানুষকে গুলি করে হত্যা করে। আর তারই প্রতিবাদে এক তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে ২৭ বছরের মানবাধিকারকর্মী শর্মিলা অবিলম্বে ‘আফস্পা’ প্রত্যাহারের দাবিতে স্বেচ্ছায় আমরণ অনশন শুরু করে।
irom chanu sharmila Sketch Women wordsমনে রাখা দরকার, শর্মিলা একজন কবি। সেকারণেই হয়তো তাঁর আবেগের মাত্রাও ছিল একটু বেশি। এই ঘটনা ২০০০ সালের নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহের। যতোই শর্মিলার অনশন কর্মসূচি এগিয়ে যেতে থাকে ততোই শর্মিলা হয়ে ওঠেন সমগ্র মণিপুরবাসীর নয়নের মণি, সকলের আশা-আশাঙ্ক্ষার প্রতীক। অনেক উল্লেখযোগ্য পুরস্কার ও সম্মানে ভূষিত হন তিনি। খ্যাত হন মণিপুরের লৌহমানবী হিসেবে। অবশেষে এক অনমনীয় দৃঢ়তায় প্রায় ১৬ বৎসর ধরে একটানা অনশন করার পর নিজের একক সিদ্ধান্তেই গত ৯ আগস্ট অনশন প্রত্যাহার করেছেন ইরোম শর্মিলা চনু। এই ইতিহাস এখন প্রায় সকলেরই জানা। অনশন প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত জানাতে গিয়ে শর্মিলা বলেছেন, মণিপুর থেকে ‘আফস্পা’ প্রত্যাহারের দাবিতে ১৬ বৎসর একটানা অনশন করে তিনি বুঝতে পেরেছেন এভাবে দিল্লীর মসনদকে কাঁপানো যাবে না। গান্ধীজী প্রদর্শিত অহিংস আন্দোলন এখানে ব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছে। তাই তিনি এখন ক্ষমতা চান। আগামী নির্বাচনে তিনি মণিপুরের মুখ্যমন্ত্রীর বিপক্ষে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করবেন। তিনি মণিপুরের জনগণকে আহ্বান জানিয়েছেন তাঁকেসহ কমপক্ষে ২০ জন স্বতন্ত্র প্রার্থীকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করার জন্যে, যাতে তিনি মণিপুরের মুখ্যমন্ত্রী হতে পারেন। আর তাহলেই তিনি মণিপুর থেকে ‘আফস্পা’ প্রত্যাহারে সমর্থ হবেন।
কিন্তু অনশন প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর তাঁর জনপ্রিয়তা হঠাৎ করেই নেমে যায় প্রায় শূন্যের কোঠায়। শর্মিলার এই সিদ্ধান্ত মেনে নেয়নি তাঁর মা ও ভাই, মেনে নেয়নি এতোদিন পাশে থাকা তাঁর অসংখ্য অনুরাগী ও আন্দোলনকামী মণিপুরের জনগণ। তাই অনশন প্রত্যাহার ও মুক্তির পর শর্মিলার মা তাঁর মুখের উপর দরোজা বন্ধ করে দেন, আশ্রয় দিতে অস্বীকৃতি জানান মণিপুরের সাধারণ মানুষ। ফলে, শর্মিলাকে আবার তাঁর সেই পুরোনো আবাসস্থল হাসপাতালেই ফিরে যেতে হয়। কিন্তু কী করতে পারতো শর্মিলা? ১৬ বৎসর একটানা অনশন ও অহিংস আন্দোলনের পরও যখন তাঁর লক্ষ্য অর্জনের পথে তেমন দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হলো না, তখন একধরনের হতাশা ও নৈরাশ্য তাঁর ভেতরে জন্ম নেওয়া খুবই স্বাভাবিক। তিনি হয়তো ভাবতে পারেন, আন্দোলনের কৌশল পরিবর্তন করে রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জনের মাধ্যমে সমর্থ হবেন ঈপ্সিত লক্ষ্য অর্জনে, তখন তাঁকে খুব একটা দোষও দেওয়া যাবে না। কিন্তু আমরা যদি বাস্তবতার আলোকে বিষয়টি একটু বিশ্লেষণ করে দেখি, তাহলে কী দেখা যাবে? শর্মিলা আগামী নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে, ধরে নেয়া যাক, বিজয়ী হলেন। কিন্তু তাঁর প্রত্যাশা অনুযায়ী সমমনা আরো ২০ জন স্বতন্ত্র প্রার্থীকে নির্বাচনে বিজয়ী করে আনা কি আদৌ সম্ভব হবে? আমার বিবেচনায় তা হবে প্রায় অসম্ভব একটি বিষয়। তবু তর্কের খাতিরে যদি ধরে নিই তাও হলো, শর্মিলা মণিপুরের মুখ্যমন্ত্রী হলেন, তাতে কি তিনি ‘আফস্পা’ প্রত্যাহারে সমর্থ হবেন? কারণ, বিষয়টি সম্পূর্ণতই কেন্দ্রীয় সরকারের এখতিয়ারভুক্ত। তাহলে এই অবাস্তব এবং রাজনীতির পিচ্ছিল পথে হাঁটার Irom Sharmila Women wordsসিদ্ধান্ত নিয়ে কি তিনি তাঁর দীর্ঘ সংগ্রাম ও ত্যাগের মাধ্যমে গড়ে তোলা নিজের বিশাল ভাবমূর্তিকে নিজেই ধ্বংস করে দিচ্ছেন না? হয়তো এভাবেই তিনি হারিয়ে যেতে পারেন বিস্মৃতির অতলে। কেউ কেউ এমনও বলেন, নিজের অজান্তেই তিনি ভারত সরকারের কৌশলী দাবাখেলার ঘুঁটিতে পরিণত হয়েছেন, রাজনীতির ফাঁদে পা দিয়েছেন। এবং এক্ষেত্রে কুশীলব হিসেবে আধা-ভারতীয় তাঁর এক প্রেমিকের নামও উঠে এসেছে। এমনই প্রেক্ষাপটে শর্মিলার জন্যে সম্ভাব্য করণীয় হিসেবে অনেক প্রজ্ঞাবান বিশ্লেষকের লেখায় কিছু পদক্ষেপের কথা আলোচনায় এসেছে। তাঁদের মতে, শর্মিলা সরাসরি ভোটের রাজনীতিতে প্রবেশ না করে তাঁর ঘোষিত লক্ষ্য অর্জনের জন্যে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ‘শান্তির দূত’ হিসেবে কাজ করে যেতে পারেন, যেরকম করেছেন বার্মার (বর্তমান মায়ানমার) নেত্রী অং সান সু চি। ইতোমধ্যে শর্মিলার যথেষ্ট আন্তর্জাতিক খ্যাতি ও পরিচিতি অর্জিত হয়েছে। সেটাকে কাজে লাগিয়ে তিনি যদি জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে যোগাযোগ এবং সমর্থন আদায়ের প্রচেষ্টা চালিয়ে যান, আর সেভাবেই ‘আফস্পা’ প্রত্যাহারের মাধ্যমে মণিপুরে আইনের শাসন ও শান্তি প্রতিষ্ঠার তাঁর এই আন্দোলন চালিয়ে যেতে থাকেন, তাহলে হয়তোবা তা সাফল্য নিয়ে আসবে। সেক্ষেত্রে এখন মুখ ফিরিয়ে নেওয়া মণিপুরের সংগ্রামী জনগণও আবার তাঁর পাশে এসে দাঁড়াবেন। সিদ্ধান্ত যা নেওয়ার শর্মিলাকেই নিতে হবে। সুতরাং বিষয়টি নিয়ে তাকেই ভাবতে হবে গভীরভাবে এবং নিতে হবে সময়োপযোগী সঠিক সিদ্ধান্ত।

লেখক : কবি