শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মস্থলে থামছে না যৌন হয়রানি

নিউজটি শেয়ার করুন

কবির হোসেন
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মস্থলে নারীর প্রতি যৌন হয়রানি রোধে হাইকোর্টের একটি নীতিমালা রয়েছে। এ বিষয়ে জাতীয় সংসদ থেকে আইন তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করে আইন না হওয়া পর্যন্ত নীতিমালা বাধ্যতামূলকভাবে কার্যকর করতে নির্দেশ দেন। এ ছাড়া নারীর প্রতি এ ধরনের নিপীড়নবিরোধী প্রচার চালাচ্ছে বিভিন্ন সামাজিক ও বেসরকারি সংগঠন। কিন্তু ওই নীতিমালা ও প্রচার কোনো কাজে আসছে না। থামছে না যৌন হয়রানি নামক নারীর প্রতি অবমাননাকর এ নিপীড়ন। সম্প্রতি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্রী যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে।

সামাজিক এই ব্যাধি দূর করতে একটি কঠোর ও যুগোপযোগী আইনের প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। নারীর অধিকার সুরক্ষা নিয়ে কাজ করছে এমন সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে একটি কঠোর আইন প্রণয়নের দাবি উঠেছে। ১৭টি সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত ‘জেন্ডার প্ল্যাটফরম’ থেকে যৌন হয়রানি প্রতিরোধের ব্যাপারে খসড়া আইন তৈরি করে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে দাখিল করা হয়। এর আগে ২০১০ সালে আইন

কমিশন থেকেও এ ব্যাপারে একটি খসড়া তৈরি করে সে অনুযায়ী আইন তৈরি করতে সরকারের কাছে সুপারিশ করা হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত এ ব্যাপারে কোনো আইন তৈরি হয়নি।

এ আইন তৈরির ব্যাপারে সরকারের পদক্ষেপ জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন রয়েছে, ডমেস্টিক ভায়োলেন্স অ্যাক্ট রয়েছে। যৌন হয়রানি বলতে কোনটাকে বোঝাতে চাচ্ছেন? মন্ত্রীর এ প্রশ্নে বলা হয়, হাইকোর্টের নীতিমালায় যৌন হয়রানির বিস্তারিত সংজ্ঞা দেওয়া আছে, যা নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে কাভার করে না। মন্ত্রী বলেন, তা হলে হাইকোর্টের নীতিমালাটা দেখতে হবে, তার পর আইন তৈরির ব্যাপারে বলতে পারব। তার আগে নয়।

সাম্প্রতিক হয়রানি : গত ২৭ নভেম্বর পটিয়া থেকে চট্টগ্রামে ফেরার পথে সোহাগ পরিবহনে যৌন হয়রানির শিকার হন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী। এর পর ৮ ডিসেম্বর একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রথম বর্ষের এক ছাত্রী বিশ্ববিদ্যালয় রুটে চলাচলকারী ৩ নম্বর বাসে যৌন হয়রানির শিকার হন। অথচ গত ২৪ নভেম্বর চট্টগ্রামে গণপরিবহনে নারীদের যৌন হয়রানি প্রতিরোধে অভিনব প্রচার চালায় ‘যাত্রী ছাউনি’ নামে একটি সামাজিক সংগঠন। গণপরিবহনের চালক, হেলপার ও পুরুষ যাত্রীদের উদ্দেশ্যে অভিনব কিছু কাল্পনিক বক্তব্যের লিফলেট ও পোস্টার বিলি করে সংগঠনটি। এসব পোস্টার ও লিফলেটে মায়ের উদ্ধৃতি দিয়ে লেখা হয়-‘বাবারে, নারীদের হয়রানি করিস না। ইতি- তোর মা’। বোনের উদ্ধৃতি দিয়ে লেখা হয়েছে- ‘ভাই, বাসের নারী যাত্রীদের দিকে তাকানোর সময় আমার কথা মনে রাখবে। ইতি- তোমার বোন।’ স্ত্রীর উদ্ধৃতি দিয়ে লেখা হয়-‘শুধু আমাকে না, সব নারীকে সম্মান করো। ইতি, তোমার স্ত্রী।’ মেয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে লেখা হয়েছে- ‘আব্বা, আমিও কিন্তু একদিন একা বাসে উঠবো। ইতি- তোমার মেয়ে।’

এমন অভিনব প্রচারের মধ্যেই চট্টগ্রাম নগরীতে ঘটে চলেছে যৌন হয়রানির ঘটনা। এর আগে ৬ নভেম্বর হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (হাবিপ্রবিতে) ইংরেজি বিভাগের শিক্ষকের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অডিও রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ৩০ আগস্ট এক নারীকে যৌন হয়রানির অভিযোগে রাজশাহী মহানগরীর লক্ষ্মীপুর কাঁচাবাজার এলাকায় এক পুলিশ কনস্টেবলকে গণপিটুনি দেয় এলাকাবাসী।

হাইকোর্টের নীতিমালা : জনস্বার্থে করা এক রিটের পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৯ সালে হাইকোর্ট কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নারীর প্রতি যৌন হয়রানি প্রতিরোধে নীতিমালা (গাইডলাইন) জারি করে। হাইকোর্টের এ নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির অভিযোগ উঠলে বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য কর্তৃপক্ষকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে। এ অভিযোগ গ্রহণের জন্য প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে একটি করে অভিযোগকেন্দ্র স্থাপন এবং প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত নির্যাতিত ও অভিযুক্ত ব্যক্তির পরিচয় গোপন রাখতে বলা হয়। অভিযোগকেন্দ্র গঠনের ব্যাপারে রায়ে বলা হয়, একজন নারীকে প্রধান করে অন্তত পাঁচ সদস্যের একটি অভিযোগকেন্দ্র গঠন করতে হবে। এ ছাড়া কমিটিতে একাধিক নারী সদস্য থাকবেন। কমিটির দাখিল করা তদন্ত প্রতিবেদন দেখে প্রচলিত আইন অনুযায়ী আদালত ব্যবস্থা নেবে। নীতিমালার ৪ নম্বর ধারায় যৌন হয়রানির সংজ্ঞা তুলে ধরা হয়।

বাস্তব অবস্থা হতাশাজনক : যৌন হয়রানি বন্ধে ২০০৯ সালে হাইকোর্টের দেওয়া নির্দেশনা কতটা প্রয়োগ হচ্ছে তা নিয়ে সম্প্রতি এক গবেষণা পরিচালনা করে ব্রিটিশ দাতব্য সংস্থা অ্যাকশনএইড। প্রতিবেদনে বলা হয়, সুপ্রিমকোর্টের নির্দেশনার ৯ বছর পরও প্রতিষ্ঠানগুলো যৌন হয়রানি প্রতিরোধে ওই নির্দেশনা অনুযায়ী কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না। গবেষণায় দেখা গেছে, ৮৭ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী যৌন হয়রানি প্রতিরোধে ২০০৯ সালের সুপ্রিমকোর্টের দিকনির্দেশনা সম্পর্কে একেবারেই অবগত নয়, কর্মক্ষেত্রে যার হার ৬৪.৫ শতাংশ। অথচ হাইকোর্টের দেওয়া গাইডলাইনের তিন উদ্দেশ্য তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে প্রথমটি ছিল ‘যৌন হয়রানি সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা’। দ্বিতীয়টি ছিল যৌন অপরাধের ফল সম্পর্কে সচেতন এবং তৃতীয়ত যৌন হয়রানি যে শাস্তিযোগ্য অপরাধ, সে ব্যাপারে সচেতন করা।

সংশ্লিষ্টরা যা বলছেন : সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী ও বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ফাওজিয়া করিম ফিরোজ বলেন, এখন যুগ বদলে গেছে। তরুণ প্রজন্ম প্রযুক্তির মাধ্যমে নানা ধরনের অপসংস্কৃতি গ্রহণ করছে। নিজেদের ইন্টারনেট আর টিভির মধ্যে আবদ্ধ করে ফেলছে। বিপরীত দিকে আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আগের মতো নৈতিক শিক্ষা দেয় না। সমাজ থেকেও সেভাবে নৈতিক মূল্যবোধ শেখানো হচ্ছে না। ফলে নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে সমাজে এ ধরনের নিপীড়ন বেড়েই চলেছে। তিনি আরও বলেন, এ ধরনের হয়রানি প্রতিরোধ করতে হলে স্কুল-কলেজ থেকে অব্যাহতভাবে নৈতিক মূল্যবোধের শিক্ষা দিতে হবে। প্রয়োজনে হয়রানি প্রতিরোধে স্কুল-কলেজের পাঠ্যবইয়ে নৈতিক মূল্যবোধের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এ ছাড়া এ ব্যাপারে একটি কঠোর ও যুগোপযোগী আইন তৈরি করতে হবে।

সর্বস্তরে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে একটি সমন্বিত আইন প্রণয়ন অপরিহার্য মন্তব্য করে জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের সভাপতি ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘বর্তমানে শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং কর্মস্থলে যৌন হয়রানি রোধে কমিটি গঠনের জন্য হাইকোর্টের একটি নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু অন্য স্থানে যৌন হয়রানির ক্ষেত্রে করণীয় সম্পর্কে নির্দেশনায় কিছু নেই। তাই সব ক্ষেত্রে যৌন হয়রানি রোধে একটি সমন্বিত আইন প্রণয়ন হওয়া দরকার।’

সৌজন্যে : আমাদের সময় অনলাইন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *