মঙ্গলবার, ১৬ অক্টোবর ২০১৮, ০৮:২৭ পূর্বাহ্ন

সাজাপ্রাপ্ত শতাধিক ভারতীয় ধর্ষকের সাক্ষাৎকার নিলেন যে নারী, কি জানলেন তিনি

সাজাপ্রাপ্ত শতাধিক ভারতীয় ধর্ষকের সাক্ষাৎকার নিলেন যে নারী, কি জানলেন তিনি

ওয়াশিংটন পোস্ট থেকে উইমেন ওয়ার্ডস এর পাঠকদের জন্য লেখাটি বাংলায় অনুবাদ করেছেন  অদিতি দাস:

ভারতীয় ধর্ষণকারীদের সাথে দেখা করতে এবং তাদের সাক্ষাৎকার নেয়ার জন্য মধুমিতা পান্ডে যখন প্রথমবারের মতো নয়া দিল্লির তিহার জেলে যান, তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ২২। মধুমিতা ব্রিটেনের এংলিয়া রাসকিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধতত্ব বিভাগের ছাত্রী। তাঁর থিসিসের অংশ হিসেবে তিন বছরে ১০০ জন সাজাপ্রাপ্ত ধর্ষণকারীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তিনি।

শুরুতে পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে ২০১৩ সালে মধুমিতা কাজটি শুরু করেন। এর কয়েক মাস আগেই ঘটে গেছে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টিকারী সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা, যেটি ‘নির্ভয়া’ নামে পরিচিত-যার অর্থ হলো নির্ভীক। মামলার বিবরনী থেকে জানা যায়, একজন উচ্চাকাঙ্খী তরুণ মেডিকেল শিক্ষার্থী, যিনি তাঁর এক বন্ধুর সাথে ‘লাইফ অব পাই’ সিনেমা দেখে বাসায় ফেরার পথে এ ঘটনার শিকার হোন। ভারতের ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরো এর তথ্য অনুযায়ি ২০১৫ সালে ৩৪ হাজার ৬৫১ জন নারী  ধর্ষণের শিকার হয়েছেন।

২০১২ সালে নির্ভয়া ঘটনাটি ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করা ধর্ষণ সংস্কৃতি ও নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে হাজার হাজার ভারতীয়কে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করতে বাধ্য করে।ওই বছরই লিঙ্গ বিশেষজ্ঞরা জি-২০ দেশগুলোর মধ্যে ভারতকে সবচেয়ে বাজে জায়গা হিসেবে অভিহিত করেন এমনকি সৌদি আরবের চেয়েও, যদিও সৌদি আরবে একজন নারীকে তাঁর পুরুষ অভিভাবকের তক্তাবধানে বসবাস করতে হয়।

মধুমিতা পান্ডে বলেন, সবাই এই বিষয়ে চিন্তা করছিল,কেন ধর্ষণকারীরা এ ধরণের কাজ করে? আমরা তাদেরকে রাক্ষস বা দানব মনে করি, আমরা মনে করি কোন মানুষের পক্ষে এ ধরণের কাজ করা সম্ভব নয়।’

মধুমিতা যিনি বড় হয়েছেন দিল্লিতে,নির্ভয়া ঘটনার পর শহরটিকে তিনি নতুন রূপে চিনেছেন। তিনি বলেন, আমি ভাবছিলাম, ধর্ষণকারীরা কিভাবে উদ্বুদ্ধ হয়?কোন অবস্থার কারণে পুরুষেরা এরকম হয়? আমি সিদ্ধান্ত নিলাম,ধর্ষণকারীদের কাছ থেকেই বিষয়টি জানার।

এরপর থেকেই তিনি ধর্ষকদের সাথে কথা বলতে সপ্তাহের পর সপ্তাহ দিল্লির তিহার জেলে কাটিয়েছেন।

যাদের সাথে মধুমিতা কথা বলেছেন, তাদের অধিকাংশই ছিলেন অশিক্ষিত। তাদের বেশির ভাগই স্কুলের গণ্ডি ডিঙোয়নি। মধুমিতা বলেন, গবেষণা শুরুর সময়ে বেশিরভাগ মানুষই আমায় বলেছিলেন, ধর্ষকরা রাক্ষস বই আর কিছুই নয়। কিন্তু তাদের সঙ্গে কথোপকথনে তিনি বুঝতে পেরেছেন, এরা মোটেই তেমন কিছু অ-স্বাভাবিক মানুষ নয়। বরং এরা বেশি মাত্রাতেই সাধারণ।  এদের বেড়ে ওঠা এবং চিন্তা ভাবনার মধ্যেই রয়ে গিয়েছে প্রবল অসংগতি।

বেশির ভাগ ভারতীয় পরিবার আজও মেয়েদের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের শিক্ষাই দেয়। এমনকি অনেক শিক্ষিত পরিবারেও নারীদেরকে সংস্কার মেনে চলতে বাধ্য করা হয়।অনেক নারী তাঁদের স্বামীদের নাম মুখে আনতে পারেন না। মধুমিতা জানান, একটি পরীক্ষা চালানোর জন্য আমি আমার কয়েকজন বন্ধুকে কল দিয়ে জানতে চাই, তাঁদের মায়েরা তাঁদের বাবাকে কি নামে সম্বোধন করেন? আমি যে উত্তর পেয়েছি তা হল, ‘ওগো শুনছ’, ‘শুনোতো’ অথবা ‘রনকের বাবা’।

এই তিন বছরে মধুমিতার মনে হয়েছে, পুরুষরা পাচ্ছে প্রভুত্ববাদের মিথ্যাপাঠ এবং নারীরা  কমনীয়,শালীন ও ধৈর্যশীল হওয়ার শিক্ষা পাচ্ছে।একই পরিবারে এরকম ঘটছে। তাই ধর্ষণের অপরাধী কেবল ধর্ষক নয়। প্রকৃত অপরাধী এ সমাজ।

তিনি বলেন, সবাই এটা প্রমাণ করতে চান যে, ধর্ষকদের মধ্যে সহজাতভাবেই কোন খারাপ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। কিন্তু তারা আমাদের সমাজেরই একটি অংশ।তারা ভীন গ্রহ থেকে আসা কোন প্রাণী নয়।

তিনি এ-ও জানিয়েছেন, বেশির ভাগ ধর্ষকের সঙ্গে কথা বললে মন ব্যথিত হয়ে ওঠে। অনেকে জানেও না, তারা যে কাজটা করেছে, তার নাম ধর্ষণ এবং তা আইনের চোখে গুরুতর অপরাধ।

মধুমিতা আরও বলেন, ‘তখন আপনি নিজেকে প্রশ্ন করুন, শুধু কি এই ধর্ষকরাই এরকম? নাকি বেশিরভাগ পুরুষই এরকম?’

ভারতের সমাজ রক্ষণশীল। অধিকাংশ স্কুলগুলোতে যৌন শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত নয়।বিধায়করা বারনীতিনির্ধারকরা মনে করেন, এই ধরণের বিষয় তরুণ-তরুণীদের অবক্ষয় ডেকে আনতে পারে এবং ঐতিহ্য ও সংস্কারকে ক্ষতিগ্রস্থ করতে পারে।

তিনি বলেন, বাবা-মায়েরা শিশ্ন (পুরুষাঙ্গ), যোনি, ধর্ষণ,যৌন মিলন প্রভৃতি শব্দ উচ্চারণ ও করেন না।এই অবস্থা থেকে বের হতে না পারলে কি করে তারা ছোট ছেলেদেরকে শিক্ষা দিবেন?

সাক্ষাৎকার নেয়ার সময় অনেক ধর্ষকরাই অজুহাত বা আত্মপক্ষ সমর্থন জানিয়েছেন। অনেকেই ধর্ষণের ঘটনা অস্বীকার করেছেন।তাঁদের মধ্যে মাত্র তিন/চারজন আছেন যারা জানিয়েছেন যে তারা অনুতপ্ত। অন্যরা তাদের এই কাজ নিয়ে আত্মপক্ষ সমর্থন, নিরপেক্ষতা বা ঘটনার শিকার নারী বা মেয়েটিকে দোষারূপ করেছেন।

মধুমিতা এইসব ধর্ষণকারীদের মধ্যে একজনের ঘটনা জানিয়েছেন। ৪৯ বছরের পুরুষ,  ৫ বছরের এক বালিকাকে ধর্ষণের দায়ে জেল খাটছে। তিনি যখন তার সাক্ষাৎকার নেন, সে তাঁকে জানায়, সে অনুতপ্ত। কারণ, ওই মেয়েটির বিয়ে হওয়া মুশকিল। সেই সঙ্গে সে এ-ও জানায়, জেল থেকে বেরিয়ে সে মেয়েটিকে বিয়ে করবে।

এই লোকটির কথায় মধুমিতা এতই বিস্মিত হোন যে তিনি মেয়েটির বিষয়ে খোঁজ নেন।যখন মধুমিতা বালিকাটির মাকে খোঁজে পান, তখন তিনি জানতে পারেন যে, তাঁদের মেয়ের ধর্ষক যে কারাগারে আছেন, তা মেয়েটির পরিবার জানতো না।

নিজের এই গবেষণাপত্র খুব শিগগিরিই জমা দিতে চলেছেন মধুমিতা। এর জন্য ইতিমধ্যেই অনেকে তাঁকে ফেমিনিজম (নারীবাদ)এর  পুরোহিত আখ্যা দিয়েছেন। তারা বলছেন, আরেকজন নতুন নারীবাদীর আবির্ভাব ঘটলো।তারা মনে করছেন, মধুমিতার এই ধরণের গবেষণা পুরুষদের ধারণাকে ভুল ব্যাখ্যা করবে। কিন্তু তাতে দমে যাওয়ার পাত্রী নন তিনি। নিজের অভিজ্ঞতার কথা তিনি বিশ্বকে জানাবেনই।

পুরুষ শাসিত ভারতীয় সমাজের শিকড়ে নারী শরীরের উপরে অধিকারকে এতটাই স্বাভাবিক বলে বর্ণনা করা হয়ে থাকে যে, নারীর শরীরে হাত রাখতে গেলে যে সম্মতি বলে একটা বস্তুর প্রয়োজন, তা তারা জানেই না।

 

 

নিউজটি শেয়ার করুন







© All rights reserved © 2015 womenwords.com
পোর্টাল বাস্তবায়নে : বিডি আইটি ফ্যাক্টরী লিঃ