শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০৯:৫২ পূর্বাহ্ন

মুক্তিযুদ্ধে সিলেটের নারী (পর্ব:৯)

মুক্তিযুদ্ধে সিলেটের নারী (পর্ব:৯)

আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধকে ঘিরে এক কাতারে এসে দাঁড়িয়েছিল আবালবৃদ্ধবনিতা, ছাত্র-শিক্ষক, কৃষক-মুটে-মজুর-কুলি, পেশাজীবি-শ্রমজীবী সবাই। মুক্তির আকাঙ্খায় মুছে গিয়েছিল ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ-অবস্থানভেদ। মুক্তিযুদ্ধে সংগ্রামের, ত্যাগের, সহ্যের, সাহসের এক অকৃত্রিম তুলনাহীন ভূমিকা পালন করেছিলেন আমাদের নারীরা। মুক্তিযুদ্ধে সিলেট অঞ্চলের নারীদের ভূমিকা নিয়ে  ‘মুক্তিযুদ্ধে সিলেটের নারী’ শিরোনামের ধারাবাহিক প্রবন্ধটি উইমেন ওয়ার্ডস  এর পাঠকদের জন্য লিখেছেন–

অপূর্ব শর্মা

অস্ত্র হাতে যুদ্ধের ময়দানে

সময়ের প্রয়োজনে একাত্তরে অনেক নারী অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিলেন। পুরুষের পাশাপাশি দেশ মাতৃকাকে পরাধীনতার শৃংখল থেকে মুক্ত করতে তারা ঝাপিয়ে পড়েছিলেন বহিঃশত্রুর উপর।যুদ্ধে প্রাণ হারানোর শঙ্কা থাকা সত্ত্বেও তারা পিছপা হননি।পাকহানাদারদের পরাজিত করতে লড়াই করেছেন সমানতালে। সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেওয়া অনেক নারী আজও রয়ে গেছেন নিভৃতে। এই পর্বে তুলে ধরা হলো যুদ্ধ জয়ী এক নারীর কথা।

ছায়ারুন

সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার ভাদেশ্বর ইউনিয়নের নালিউরী গ্রামের ছায়ারুন দেশ মাতৃকাকে পরাধীনতার শৃংখল থেকে মুক্ত করতে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিলেন। তাঁর স্বামী মৃত ফজির উদ্দিনও ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। স্বামীর অনুপ্রেরণায় যুদ্ধে অংশগ্রহন করেন তিনি। তাঁর পাঁচ ছেলে তিন মেয়ে। এক ছেলে মানসিক প্রতিবন্ধী। জীবন সায়াহ্নে এসেও অগ্নিঝড়া দিনগুলোর কথা তাড়িত করে তাঁকে। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করাকে নিজ জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন মনে করেন তিনি।

যুদ্ধ দিনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ছায়রুন বলেন, একাত্তরে পাকিস্তানি আর্মি যখন গোলাপগঞ্জ আসে তখন চৈত্র মাস। একদিন হঠাৎ কয়েকটি গুলির শব্দ শোনা গেল। তারপর কিছুক্ষণ নীরব। আবার যখন গুলির শব্দ শুরু হলো, তখন চারপাশের মানুষের মধ্যে কি যে আতঙ্ক! সবার মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ। গুলির শব্দে হৃৎপিণ্ড পর্যন্ত কেঁপে উঠত। হরিণের বাচ্চার মতো সারাক্ষণ চোখ-কান খোলা রাখতে হতো। ঝরাপাতার মর্মর শব্দও মানুষকে আতঙ্কিত করে তুলত। আমি তখন চার সন্তানের মা। গ্রামে বসবাস করলেও মানুষের মুখে মুখে খুব দ্রুতই যুদ্ধের খবর ছড়িয়ে পড়ত। এসব খবরের মধ্যে গুজবও ছড়াত। আমি যেদিন প্রথম শুনলাম পাকিস্তানি আর্মি গোলাপগঞ্জ এসেছে, আমার মধ্যে অজানা আতঙ্ক ভর করেছিল। নিজের চেয়ে স্বামী-সন্তানদের নিরাপত্তার চিন্তাই ছিল বেশি।

আমি মেয়ে মানুষ, বন্দুকওয়ালা পাকিস্তানি আর্মির মোকাবিলা করব-কোনো সময় এমন চিন্তাও করিনি। তবু যখন শুনতাম জামায়াত, মুসলিম লীগ, রাজাকার, আলশামস, আলবদর বাহিনীর সহযোগিতায় পাকিস্তানি শয়তানরা নারীদের নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে, তখন শরীর জ্বলে উঠত। মনে হতো দা-বঁটি নিয়ে ওই শয়তানদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ি। এভাবে কয়েক দিন যেতে না যেতেই আমার স্বামী ফজির উদ্দিন ওরফে মনাই মুক্তিযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। একদিন তিনি ব্যতিব্যস্ত হয়ে বাড়িতে এসে আমাকে বললেন, ‘দেশের অবস্থা ভালো না। পাকিস্তানি আর্মি আর রাজাকারদের হাত থেকে নারীদের ইজ্জত রক্ষা করা কঠিন হয়ে গেছে। তুমি শুনে রাখো, দেশের জন্য, দেশের অসহায় নারীদের জন্য আমাদের সবাইকে যুদ্ধ করতে হবে। তোমাকেও পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে।’ স্বামীর উৎসাহে সেদিন থেকেই সিদ্ধান্ত নিই মরতে হয় মরব, শয়তানদের সঙ্গে লড়ব।

যুদ্ধের সময় আমার ভেতরে মোটেও ভয় ছিল না। শত্রুর মোকাবিলা করা ও দেশ শত্রু মুক্ত করার আনন্দ যুদ্ধে প্রেরণা জোগাত। কিন্তু ওই সব দিন নিয়ে যখন স্মৃতির পাতা উল্টাই, তখন মনে হয় কি যে ভয়ংকর দিন অতিবাহিত করেছি আমরা! এখনকার প্রজন্ম আমাদের কথা বিশ্বাসই করবে না হয়তো। এলাকায় পাকিস্তানি শয়তানদের আসার খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে নারীরা আতঙ্কিত হয়ে উঠত। কখন কার ওপর বিপদ আসে, সেই ভয়ে থাকত সবাই। ভয়ে নারীরা টয়লেটে পর্যন্ত আত্মগোপন করত। পাকিস্তানি আর্মির চেয়ে রাজাকারদের নিয়ে ভয় ছিল আরো বেশি। ওরা সুযোগ পেলেই নারীদের ধষর্ণ করেছে। নির্যাতনের পর অনেক নারীকে মেরেও ফেলেছে। সন্ধ্যার পর সব বাড়িঘর নীরব-নিস্তব্ধ হয়ে যেত। ঘরের ভেতরে ফিসফিস করে কথা বলতে হতো। হারিকেনের আলো নিভু নিভু থাকত। গুলির শব্দে রাতে শেয়াল পর্যন্ত ডাকাডাকি করত না!

আমার বাড়িতে মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্প ছিল। অনেক মুক্তিযোদ্ধা আমার বাড়িতে থাকতেন। যুদ্ধের পাশাপাশি তাঁদের রান্না করে খাওয়ানোরও দায়িত্ব ছিল আমার। গ্রামের কোথাও ঢেঁকি ছিল না। গাইল-ছিয়া (হামানদিস্তা) দিয়ে ধান ভাঙিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের খাওয়াতাম। আমার স্বামী ভারতের আর্মিদেরও বাড়িতে থাকতে দিতেন। এভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করতে গিয়ে স্বামীর টাকার অভাব দেখা  দেয়। পরে তিনি টাকা ধার করে মুক্তিযোদ্ধাদের খরচ চালাতে লাগলেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের পর দুই হাজার টাকা বিঘা দরে পৌনে তিন বিঘা জমি বিক্রি করে আমার স্বামী মানুষের দেনা পরিশোধ করেন। এখন এই জমির বিঘাপ্রতি মূল্য ১০ লাখ টাকা। আমাদের দুটি হালের বলদ ও একটি গাভী ছিল। যুদ্ধের সময় একটি হালের বলদ ও গাভী বিক্রি করে দিয়েছিলেন আমার স্বামী।

যুদ্ধ শুরুর দেড় মাস পর আমার বাড়িতে আশ্রয় নেন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মাহবুব হোসেন খয়ের। তাঁকে আমি ভাই ডেকেছিলাম। তিনি আমাকে বন্দুক চালনাসহ শত্রুর মোকাবিলা করার কলাকৌশল শেখান। আমি বোরকা পরে অস্ত্র বহন করতাম। কখনো কালো ওড়না পরে ক্যাম্পে যেতাম। মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে সমানতালে বন্দুক চালাতাম। একদিন ভাদেশ্বর বাজারের কাছে রাস্তায় পাকিস্তানি আর্মির সঙ্গে মুক্তিবাহিনীর বন্দুকযুদ্ধ হয়। ওই সময় আমাদের পক্ষের ছোড়া গুলিতে দু’জন পাকিস্তানি আর্মি মারা যায় এবং বাকিরা পালিয়ে যায়। স্বাধীনতার এক মাস আগে মোকামবাজার থেকে পাকিস্তানি আর্মির টহলদল ভাদেশ্বর আসে। মুক্তিবাহিনী খবর পেয়েই শওকত আলীর বাড়ির পাশে রাস্তায় একটি স্থলমাইন পেতে রাখে। আমার ওস্তাদ কমান্ডার খয়ের আমার হাত থেকে মাইনটি নিয়ে রাস্তায় পুঁতে রেখেছিলেন। পাকিস্তানি বাহিনী আসার সময় মাইন বিস্ফোরিত হয়। একজন পাকিস্তানি আর্মি মারা যায়। বাকিরা আহত অবস্থায় পালিয়ে যায়।

একজন শত্রুকে ঘায়েল করলে মুক্তিযোদ্ধাদের ভেতর কী যে আনন্দ হতো, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। এভাবে জীবন বাজি রেখে মুক্তিযোদ্ধারা এ দেশ স্বাধীন করেছেন। দেশ স্বাধীনের পর আমাদের বাড়িতে ৪৩টি বন্দুক জমা হয়। পরে সব বন্দুক সরকারের কাছে জমা দিয়ে দিই। ওই দিন আমাদের বাড়িতে অনেক মুক্তিযোদ্ধা জড়ো হয়েছিলেন। মনে হয়েছিল, দিনটি ঈদের দিনের চেয়েও আনন্দের।

আগের অংশ পড়ুন

মুক্তিযুদ্ধে সিলেটের নারী (পর্ব:৮)

 

নিউজটি শেয়ার করুন







© All rights reserved © 2015 womenwords.com
পোর্টাল বাস্তবায়নে : বিডি আইটি ফ্যাক্টরী লিঃ