শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০৮:৫৪ পূর্বাহ্ন

মুক্তিযুদ্ধের সোনালী ইতিহাস সমৃদ্ধ নাটক ‘দুবড়ি’

মুক্তিযুদ্ধের সোনালী ইতিহাস সমৃদ্ধ নাটক ‘দুবড়ি’

রীমা দাস

ডিসেম্বর ১৯৭১। বিজয় সমাগত। পাকবাহিনী যখন বুঝতে পেরেছিলো আমাদের বিজয় সুনিশ্চিত তখন তারা আমাদের মেধাশূন্য করার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তারা আমাদের দেশের বুদ্ধিজীবীদের রাতের অন্ধকারে, দিনের আলোয় ঘর থেকে ডেকে নিয়ে বা ঘরে হত্যা করে। ১৪ ডিসেম্বর এই হত্যাকান্ড ব্যাপক আকার ধারণ করে। স্বজন হারানোর তীব্র হাহাকারে তখন বাংলার বুক প্রকম্পিত। বাতাসে লাশের গন্ধ তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। এর একদিন পরই আমাদের বিজয় কে জানত? ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ রক্তের অক্ষরে নাম লিখালো বাংলাদেশ। পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে নিজের অস্তিত্ব জানালো বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র।

স্বাধীন বাংলাদেশের মুক্ত বাতাসে, মুক্ত আলোতে আমরা বেড়ে উঠি স্বাধীনতার শপথ নিয়ে। আমরা জানি এই বিজয়, স্বাধীনতা কারো দয়ার দান নয়। এখনও ৭ মার্চের ভাষণ আমাদের রক্তে আন্দোলন তোলে। কি ছিলো না আমাদের সোনালী ইতিহাসে? আন্দোলন, প্রতিবাদ,দ্রোহ, প্রেম, রক্ত আর সীমাহীন স্বপ্ন। সে সীমাহীন স্বপ্নের কারণে আজকের বাংলাদেশ। আজ শহিদ বুদ্ধিজীবী দিবস। মুক্তিযুদ্ধের শহিদ বুদ্ধিজীবীদের জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।

সিলেটের মাটিতে জন্ম নেয়া, বেড়ে ওঠা একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের কাছে ” দুবড়ি” শব্দটি অচেনা, অজানা। লিখছি “দুবড়ি” নাটক নিয়ে। এই দুবড়ি শব্দটি শোনার পর থেকেই মনের মধ্যে তোলপাড় শুরু হলো– কি এর অর্থ, কেন এই শব্দ ব্যবহার করা হলো। গতকাল দেখা হলো “দুবড়ি” নাটকের নাট্যকার মু. আনোয়ার হোসেন রনি ভাই এর সাথে। জানতে চাইলাম এই শব্দ সম্পর্কে। তিনি জানালেন ১৯৭১ সালে সিলেটের উপশহরে দুবড়ি নামক হাওর ছিলো, যা আমরা দেখিনি এবং জানিও না। এই হাওর আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসের সাথে সম্পর্কিত। ৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে শহিদ সোলেমান ও তাঁর দল নিয়ে কৈলাশ বিমানবন্দর থেকে হেলিকপ্টার যোগে এই হাওরে অবতারণ করেন। দুবড়ি হাওর, সোনারপাড়া,হাদারপার প্রভৃতি সহ সিলেটের অন্যান্য স্থান শহিদ সোলেমান, মুক্তিযুদ্ধের সাথে সম্পর্কিত। যা আমি গতকাল জানলাম “দুবড়ি” নাটকের মাধ্যমে।

গতকাল কাজি নজরুল অডিটোরিয়ামে দেড় ঘন্টা কাটলো মন্ত্রমুগ্ধের মত। নতুন করে জানলাম সিলেটের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, জানলাম শহিদ সোলেমান সম্পর্কে এবং দেখলামও। নাটকটির নির্দেশনা দিয়েছেন অরিন্দম দত্ত চন্দন ও আমিরুল ইসলাম বাবু।সোলেমান চরিত্রে অভিনয় করেছেন মাধব কর্মকার।মঞ্চে বা মঞ্চ পরবর্তী সময়ে মনে হয়েছে সে ই সোলেমান। তার অভিনয় শৈলীর মাধ্যমে সে জীবন্ত সোলেমান হিসেবে আমাদের সামনে উপস্থিত হয়েছিলো। নাটকে শামসুল ( সোলেমানের চাচাতো ভাই)  চরিত্রে প্রলয় দে ও হেনা ( সোলেমানের বোন) চরিত্রে সাইমা শাহিদ এর জবানী ছিলো মুগ্ধ করার মত। সোলেমানের বাবা ও মা’র ভূমিকায় অরিন্দম দত্ত চন্দন ও পরাগ রেণু দেব এর অভিনয় ছিলো প্রাঞ্জল। মনে হয়েছিলো এ তো আমার পাশের বাড়ির দেখা ঘটনার মত। প্রাণবন্ত অভিনয় ছিলো ক্যাম্পের মুক্তিযোদ্ধাদের। অন্যান্য নবীন অভিনেতাদের অভিনয় শৈলীতে আমরা টাইম মেশিনে করে চলে গিয়েছিলাম ১৯৭১ সালে। আলোক পরিকল্পনা, আবহসংগীত ও চিত্র প্রক্ষেপণের সমন্বয়ে এক সময় উপযোগী নাটক ” দুবড়ি” পরিবেশিত হলো।

নাটক দিন বদলের হাতিয়ার, ইতিহাসের হাতিয়ার সেটা গতকাল আবারও প্রমাণ হলো। আমরা নতুনভাবে জানলাম শহিদ সোলেমান সম্পর্কে, জানলাম আমাদের সিলেটের সমৃদ্ধ ইতিহাসকে। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করি ‘বিজিতকুমার ক্যাম্পাস থিয়েটার’ প্রযোজনাকে, যারা বুদ্ধিজীবী দিবসে, বিজয়ের মাসে এই নাটকটি মঞ্চায়ন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ভালোবাসা রইলো এই প্রযোজনার সকল কলাকুশলী ও পর্ষদের প্রতি। এভাবে ইতিহাস আসুক আমাদের নতুন প্রজন্মের সামনে নাটকে, গানে, আবৃত্তিতে।

এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়, জ্বলে পুড়ে ছারখার, তবু মাথা নোয়াবার নয়…আমরা মাথা না নোয়ানো জাতি, আমাদের রক্তে মুক্তিযোদ্ধাদের আগুন আছে, যা প্রয়োজনে জ্বলে উঠে, উঠবে। জয় বাংলা।।

 

নিউজটি শেয়ার করুন







© All rights reserved © 2015 womenwords.com
পোর্টাল বাস্তবায়নে : বিডি আইটি ফ্যাক্টরী লিঃ