মঙ্গলবার, ১৬ অক্টোবর ২০১৮, ০৮:৩৯ পূর্বাহ্ন

মানবিক মানুষ

রোমেনা লেইস

বুকের ভেতরে ভীষণ এক শঙ্কা নিয়ে ঘুম ভাঙলো। ভয় পাচ্ছি না মুখে বললেও ভয় পাচ্ছি। হুমায়ূন আহমেদের নাটকের দৃশ্য মনে পড়ছে। চোখ অপারেশনের পর চোখের বাঁধন খোলা হচ্ছে। ডাক্তার বললেন ধীরে ধীরে চোখ খুলতে, মেয়েটি ধীরে ধীরে চোখ খুললো। চিৎকার করে বলছে -মা আমি কিছু দেখতে পাচ্ছি না। নাহ।এটি সত্যি নয়। একটু পরই বললো -মা আমি দেখতে পাচ্ছি। আমি সব দেখতে পাচ্ছি। আমিও দেখতে পাবো। পরিবারের সবাই চোখের সার্জারীতে অভিজ্ঞ।পাশাপাশি কিন্তু ভয়াবহ অভিজ্ঞতাও আছে।

এই উপমহাদেশের বিখ্যাত রেটিনা স্পেশালিস্ট ছোটবোনের চোখের লেজার ট্রিটমেন্ট করার পরদিন রেটিনা ডিট্যাচ্ড হয়ে গেলো। অন্ধকার নেমে এলো আমাদের পরিবারে। কর্মসূত্রে দূরেই ছিলাম। কিন্তু কষ্টের অনুভব ছিলো অন্তরে। বোনটির বেদনার সামনে দাঁড়ানোর সাহস ছিলো না। নতুন বিয়ে হওয়া বোনটি আমার। তার হাজবেন্ড চাকরি ব্যবসা সব বাদ দিয়ে ভেঙে পড়া মেয়েটিকে ঘুরে দাঁড়ানোর সাহস জুগিয়ে চলেছে।আমার চিকিৎসক বাবা বটবৃক্ষের মতো নিজের সকল সাধ্যমতো ওদের পাশে দাঁড়ালেন।আমার মা তার নিজের সংসার বাড়িঘর সব ছেড়ে এসে আমার বোনের সাথে থাকলেন।আমার মার বোনেরা, আমার অন্য বোনরা সকলেই তার পাশে ছায়ার মতো মায়া আর সাহস যুগিয়েছেন ।আমিই একমাত্র ভীতু যে ওর সামনে যাইনি সাহস করে।মরার উপর খাড়ার ঘায়ের মতো এর পরের সংবাদটি সুসংবাদের বদলে আরো আতঙ্কগ্রস্ত করে তুললো আমাদের। থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত বোনটি যার একটি চোখের রেটিনা ডিট্যাচ্ড সে প্রেগন্যান্ট। আমার আম্মার সেদিনের কান্না আজো আমার কানে বাজে। ‘আমার যাদুকে আর বাঁচানো যাবেনা।শরীরে রক্ত নাই।একটা চোখ গেলো।এখন পেটের বাচ্চা রক্ত টানবে আর বাঁচানোর উপায় নাই।’ ভয়াবহ সংবাদ আরো অপেক্ষা করে ছিলো। আল্ট্রানসোগ্রাম করে ফিরে এসে জানা গেলো আমার বোনটি যমজ বাচ্চা ক্যারি করছে।আমরা সবাই যখন ভেঙ্গে পড়ি আব্বা তখন সীমাহীন শক্তি নিয়ে পাশে দাঁড়ান। যে আব্বা সুনামগঞ্জকে ভালবেসে সব বড় বড় হাতছানি উপেক্ষা করে সুনামগঞ্জে আবাস স্থাপন করেছিলেন। সেই আব্বা ঢাকার উত্তরায় বাসা নিয়ে সাহস যুগিয়েছেন আমার বোন আর তার বরকে। উপরওয়ালা নিশ্চয়ই উপর থেকে ভ্রুকুটি করছিলেন। আমার মা ছোটবোন আর তার বরকে নিয়ে ভারতের শঙ্কর নেত্রালয়ে শেষ আশ্রয় খুঁজতে গেলেন।কোন রকমের আশা আছে কী না? ডাক্তাররা জানালেন, যে চিকিৎসা বাংলাদেশে হয়েছে তা যথার্থ ছিলো। চিকিৎসক উপমহাদেশের এক নম্বর। এমনটি দুর্ভাগ্যবশত একশ জনে একজনের বা দুইজনের এমন হয়। আমার বাবা, মা আর বোনের হাজবেন্ডের যত্নে, আদরে সর্বোপরি আমার বোনটির অসীম মনোবল আর সাহসে এক ছেলে আর এক মেয়ের জন্ম হলো। তাও পেরিয়ে গেছে আজ ষোল বছর।

তবে ঐ যে ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখে ভয় পায়।আমার আম্মার হয়েছে সে অবস্থা ।আমার চোখে সার্জারী আম্মার চিন্তার শেষ নাই।যেতে চাইলেন আমার সাথে ।দশটা পনেরোয় যাব আমি, তাই রাতে বিদায় নিয়ে রাখলাম। সকালে আমি আর আমার মেয়ে রেডি হয়ে বসে আছি।কার সার্ভিস আসবে, নিয়ে যাবে সার্জারীর পরে আবার পৌঁছে ও দিবে।যাহোক আম্মা উঠে এসে অস্থির ।ওরা কেউ মানে আমার স্বামী আর দুই ছেলে উঠছে না কেন! কেউ যাবে না কেন?মেনে নিতে পারছেন না।হয়তো তার কাছে মনে হচ্ছে অবহেলা । আম্মার চোখের সার্জারী ল্যাবএইডে হয়েছিলো ।তখন আমরা ঢাকায় ছিলাম। ল্যাব এইডে দশ বার জনের বহর, বাইরে গাড়ির বহর, যেন আম্মা ভি ভি আইপি। আর তাই আমি যাচ্ছি আর বাসা থেকে আর কেউ আমাকে নিয়ে যাচ্ছে না আম্মা তা মানতেই পারছেন না। আমার আই ডক্টর একজন গ্লুকোমা স্পেশালিস্ট ।ইহুদি ভদ্রলোক ।আমাকে প্রি অপারেটিভ চেকআপের দিন সব বলে দিয়েছেন।উনাদের কার সার্ভিস আমাকে পিকআপ করে নিবে আর সার্জারীর পরে পৌঁছে দেবে। আনকমফোর্টেবল মনে হলে একজন শুধু পেশেন্ট এর সাথে যেতে পারবে। আই হসপিটাল এস্টোরিয়ায়।পৌঁছালে সাথে সাথে ফ্রন্টডেস্কে সব টুকটাক ইনফরমেশন নিয়ে মেডিকেল এসিসট্যান্ট ভেতরে নিয়ে গেল। ব্লাড প্রেশার চেক করতেই হাইপার টেনশন ধরা পরলো ।রিলাক্স থাকতে বললো।পূনরায় চেক করে নর্মাল পেলো।তখন সার্জারির জন্য পোশাক পরিয়ে দিলো একজন।জুতা সহ।তারপর একটু অপেক্ষার পরই অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে গেলো ।একটা চেয়ারে বসালো।কথা বলতে বলতে চেয়ার টি বাটন টিপে বেড বানিয়ে ফেললো।আপাদমস্তক ঢেকে দিয়ে শুধু বাম চোখ বের করে রাখলো। এনেসথিয়াসিস্ট এসে নিজের পরিচয় দিয়ে বললো আমার হাতে আই ভি দিচ্ছে । তারপর আমি ডাক্তারের গলা শুনলাম। আমি ছাদের দেয়ালে একটা বিন্দু একটু একটু দুলছিলো দেখছি।তারপর আর কিছু জানি না।মনে পড়লো আব্বার সাথে সাইকেলে করে দূরে অনেক দূরে যাচ্ছি ।বাতাস কেটে কেটে সাইকেল ছুটছে।আমার ফ্রকের ঝুলে বাতাস ঢুকে বেলুনের মতো ফুলে উঠছে…. নার্স ডাকলো। চেয়ার থেকে উঠিয়ে নিয়ে এলো পাশের রুমে। সার্জারীর পরে আমাকে কিছুক্ষণ অবজার্ভেশনে রেখে আপেল জুস, হালকা স্ন্যাকস খেতে দিলো। আমার মেয়েকে ডাকলো ।এলিভেটরে উপর তলায় এনে বসালো ।তারপর কার সার্ভিসে বাসায় আসলাম। এতো নিখুঁতভাবে সবকিছু হলো মনে হলো চিকিৎসক, নার্স,এরাই হচ্ছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষ ।মানবিক মানুষ ।মানব সেবা এঁরাইতো করছেন। যে জন সেবিছে মানবেরে, সে জন সেবিছে ঈশ্বরে।

নিউইয়র্ক ৬ জুন,২০১৭

নিউজটি শেয়ার করুন







© All rights reserved © 2015 womenwords.com
পোর্টাল বাস্তবায়নে : বিডি আইটি ফ্যাক্টরী লিঃ