মঙ্গলবার, ১৬ অক্টোবর ২০১৮, ০৭:৩১ পূর্বাহ্ন

ব্যবধান (পর্ব: দশ)

অনন্যা হক

শিপা তার অবয়বে একটা খোলসের আবরণ পরেছিল খুব ধীরে ধীরে নিজের অজান্তে। খোলসটা খুব শক্ত ভাবে পেঁচিয়ে ধরেছিল তাকে। মাঝে মাঝে মনে হত এক টানে ছিড়ে ফেলে সেই শিপাকে, উচ্ছ্বলতা ছিল যার নিত্য দিনের সঙ্গী, তাকে বের করে আনি।

কিন্তু সেটা বোধহয় আর সম্ভব হয় না, এটা বুঝেই জীবনকে সাজিয়ে নিয়েছিল।

সেই খোলসের আবরণে যেন একটা চিড় ধরেছে এই কদিনে, শুধু মাত্র তাকে ঘিরে অরুণের আকুলতা দেখে। মনে হলো তার, এখনও আমাকে ঘিরে সে এমন করছে শুধু কি বিরহ ছিল বলে?

আমাকে দেখলে তো সেই শিপা কে পাবে না কিছুতেই, তখন কি এই ব্যাকুলতা প্রকাশ পাবে?

একটা কৌতুহলী মন জেগে ওঠে ভেতরে।

অরুণ আবার বলে, শুধু কিছুটা সময় দাও শিপা।

কথা বলছিল ঘরে, হাঁটছিল ঘরময়, একটা অস্থিরতা ঘিরে। এ কি জালে জড়িয়ে যাচ্ছে, এসে দাঁড়ায় আবার আয়নার সামনে। দেখতে পেল মুখে যেন কোথা থেকে একটা ভেজা বাতাস এসে ছুঁয়ে যাচ্ছে।

এ কদিনের চিন্তিত শুকনো মুখে কিছুটা প্রেমের ছোঁয়া বহু দিন পর, সেই পুরোনো প্রলেপ মাখিয়ে আদ্র করে দিয়েছে।

শিপা আবার বলে, কি জানতে চাও অরুণ, আমার ভয় করছে।

শিপা, আমি নিজেকে খুঁজে পাই না, খুব অচেনা লাগে। আমার হারিয়ে যাওয়া সেই আমি কে খুঁজে পেতে মনে হলো, একবার তোমার সামনে এসে দাঁড়াই।

ঠিক একই বিষাদ নিজেকে ঘিরে শিপাকেও অহর্নিশ পোড়াচ্ছিল। শিপা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না, চায়ও না। বলে ফেলে, ঠিক আছে অরুণ, কোথায় দেখা করতে চাও?

অরুণ একবারেই বলে, নিমার বাসায়।

নিমা অরুণেরও বন্ধু হয়েছিল, সেই প্রেমের সময় থেকে। এর পরে অরুণ দূরে থাকলেও শিপার সব খবর নিমার কাছ থেকে নিত। নিমার সাথে যোগাযোগটা রেখেছিল কিন্তু নিমাকে কথা দিতে হয়েছিল, কখনও শিপা কে বলবে না, যাতে করে শিপার মন দুর্বল হয়ে না পড়ে।

এরকমই অরুণের ভালবাসা, দুজন দুজনকে কাছে পেলে, এর মূল্য কতটুকু থাকতো, কেউ বোঝার অবকাশ পেল না।

শিপা বলে, আমিও এটাই বলতে চাচ্ছিলাম। অন্য কোথাও সম্ভব না।

কেন আমাকে ভয় পাচ্ছো? হা হা করে একটা হাসি দেয় অরুণ। কন্ঠটা কানে গিয়ে বাজে, ভেতরে একটা তোলপাড় ওঠে।

সত্যি ভয় পায় শিপা, কিন্তু একটা অদম্য টান অনুভব করে, যেন আর ঠেকানোর কিছু নেই।

তবুও বলে, কে বললো ভয় পাচ্ছি? তুমি ভুলে যাচ্ছো আমি পরস্ত্রী।

হ্যা জানি, ভুলিনা কখনও। কিন্তু আমারও তো কিছু একটা ছিলে, শুধু কাগজে কোন প্রমাণ রাখতে পারলাম না। তাই বলে কি বলতে পারবে, আমার কিছু না? তুমি আমার প্রেমিকা, যেটা তোমার ঐ সাজিদ সাহেব কোন দিন বলতে পারবে না।

অরুণ, অরুণ, তুমি একই রকম করে কথা বলে যাচ্ছো কেমন করে এখনও? এই জন্যই অরুণ…, থেমে যায় শিপা।

থেমে গেলে কেন শিপা বল? বল আমি শুনতে চাই।

শিপা আর কথা বাড়ায় না, চুপ হয়ে যায়। আসলেই অরুণের এই দাবী, অধিকার, আসক্তির এমন প্রকাশ সব সময় শিপাকে দুর্বল করে, একটা মোহের জালে আটকে রাখতো। সেই জাল এখনও কাটেনি শিপার।

কিন্তু শিপা বলবে কিভাবে। তুমি আমার স্বপ্ন রাজ্যে এখনও নিভৃতে এসে এসে ঘুরে যাও, যা শুধু আমি একা জানি। আর কখনও কাউকে জানতে দেয়া যাবে না। এতে আমার পাপ হবে,ঘর ভাঙবে, ঘাড়ে কলঙ্ক চেপে সব কূল হারিয়ে, হেরে যেতে হবে জীবনের কাছে।

শিপা বলে, তাহলে নিমার সেল নম্বর আর ঠিকানাটা রাখো।

ঠিক আছে, তুমি টেক্সট করে দিয়ে দাও।বললো না অরুণ, যে এগুলো সে আগেই জানে।

কখন আসবে শিপা, আজ না কাল?

আজ না অরুণ, আমি তোমাকে জানাবো পরে।

রাখছি ভাল থেকো।

শিপার বিষণ্ন, অস্থির চেহারাতে একটা লাবন্য এসে ভর করলো।ফর্সা মুখে একটা লাল আভা দেখতে পেল, ভাল লাগছে নিজেকে দেখতে। আজ কত বছর পরে মুখে উচ্ছ্বাসের ছোঁয়া, একটা চঞ্চলতা মনে, হৃদয়ে তোলপাড় দুলছে!

ঘরে গান টা বেজে যাচ্ছে,

মোর বীণা ওঠে কোন সুরে বাজে

কোন নব চঞ্চল ছন্দে …

শিপা সুরে সুরে তাল মিলিয়ে গায়।

নিজেকে প্রশ্ন করে, এই আকুলতার নাম কি ভালবাসা, প্রেম?

নাকি এটা না পাওয়ার মোহ?

যাই হোক, সে অরুণের মুখোমুখি একবার হবে।

চলবে..

গল্পের আগের অংশ পড়ুন

ব্যবধান (পর্ব: নয়)

 

 

 

নিউজটি শেয়ার করুন







© All rights reserved © 2015 womenwords.com
পোর্টাল বাস্তবায়নে : বিডি আইটি ফ্যাক্টরী লিঃ