শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১০:০৪ পূর্বাহ্ন

ব্যবধান ( পর্ব: চৌদ্দ )

অনন্যা হক

অরুণ কি হচ্ছে এসব?

তোমার হাতটা একবার ধরতে দাও। বলে শিপার হাতে হাত রাখে। শিপা হাত ছাড়াতে গিয়ে নিজেই হাল ছেড়ে দেয়।কারণ শিপার ভেতরে অরুণের জন্য একটা তৃষ্ণা, একটা পিপাসা ছিল,

যেটা মাঝে মাঝেই তার ভেতরে জাগতো।

শিপা নিথর হয়ে বসে থাকে।শিপার চোখে পানি এসে যায়।

এ এক অন্য রকম গভীর প্রেম ছিল তাদের ভেতরে, যা দুজনে দূরে থেকেও মর্মে মর্মে অনুভব করে গিয়েছে।তারই ফল স্বরূপ আজ এমন হলো।

অরুণ শুধু হাতে হাত রেখে বলে গেল, শিপা, কারো দৃষ্টিতে আমার আর এই অধিকার নেই। কিন্তু জানো, ব্যাক্তি আমার কাছে  আছে এই অধিকার। আমি চাই, আমার সত্তা চায়, এটা তো মিথ্যা না।

অনেক গরম লাগছে শিপার, একেবারে শরীরের পরতে পরতে বিদ্যুতের মত ছড়িয়ে পড়েছে বহু দিন পর সেই স্পর্শ। বরফ খন্ডের মত ভেতরে সে গলে গলে যাচ্ছে।

অরুণ খুব ঘন হয়ে কাছে বসেছে, শুধু হাত না, তার শরীরের ছোঁয়া লাগছে শিপার শরীরে।

অরুণের শরীর থেকে একটা তাপ এসে তার শরীর ছুঁয়ে যাচ্ছে।

শিপা ভুলে যাচ্ছে, সে পরস্ত্রী, দুই বাচ্চার মা।

শিপা নিজেকে হঠাৎ সংবরণ করে বলে ওঠে, অরুণ সর প্লিজ, তুমি কি চাও? কি জানতে এসেছো? কিন্তু অরুণ তাকে পিঠের পেছন দিয়ে হাত দিয়ে ধরে একটু কাছে টেনে বলে, কিছু চাই না আমি, তোমার কোন ক্ষতি করবো না। শুধু স্পর্শ টুকু অনুভব করতে দাও।

শিপার ভেতরে যেন আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাতের মত একটা লাভা ছড়িয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ করে যেন দূর থেকে মা বলে একটা ডাক কানে এল। তার নারী সত্তার ভেতরে মা সত্তা টা জেগে উঠলো।

এক ঝটকায় সরে গেল অরুণের কাছ থেকে।এবং উঠে পাশের সোফায় গিয়ে বসে পড়ে। অরুণ যথেষ্ট হয়েছে, আমি পরস্ত্রী, তুমি ভুলে যাচ্ছো, বলে শিপা বেশ করুণ কন্ঠে।

বার বার এক কথা বলছো কেন? আমি ভুলিনি।

তোমার জন্য আমি স্যাক্রিফাইস করেছিলাম শিপা, আমার কোন দায় ছিল না।আমি হারাতে চাইনি তোমাকে। কিন্তু আমি কি পেলাম? একটা অপূর্ণতা আমাকে কুরে কুরে খায়

প্রতিনিয়ত। আবার বার বার তোমাকে সম্পূর্ণ করে পেতে চাই মন, আমার শরীর। এই অপূর্ণতাই আমাকে আবার তোমার কাছে টেনে নিয়ে এসেছে।

বেশ উত্তেজিত ভাবে বলছে অরুণ কথা গুলো, যেন সেই হারানোর আক্ষেপ গুলো এখন ঝাড়ছে তার উপর। যদি জীবনে পরের ধাপে সুখী হতো, হয়তো এমন করে ছুটে আসতো না আবার শিপার কাছে।

ঠিক শিপার বেলায়ও হয়তো তাই, যদি সুখী হতো, সাজীদ তাকে অবহেলা, উপেক্ষা না করতো, সেও অরুণের ডাকে বাসা থেকে ছুটে আসতো না বান্ধবীর বাসায়।

সব তো ঠিক হয়ে গিয়েছিল, তাহলে এতদিন পরে  এসব বলে কি লাভ, বলে শিপা।

না সব ঠিক হয়নি, যদি হতো তুমি আমার ডাকে এভাবে আসতে না। আমি বুঝতে পেরেছি শিপা, যা জানতে চেয়েছিলাম জেনেছি। তুমি আমারই আছ। আমি বুঝেছি তুমি ভাল নেই।

কেন তোমাকে স্পর্শ করেছি বুঝেছো এবার? জানতে পেরেছি আমি, অনুভব করেছি, আমার ভালবাসা এখনও বেঁচে আছে। আমি হেরে যায়নি।ঐ সাজিদ নামের লোকটা তোমাকে কেড়ে নিতে পারেনি আমার কাছ থেকে। আমি জিতে গিয়েছি, আমার ভালবাসা মিথ্যে কোন মোহ ছিল না।

শিপা তাকিয়ে আছে বিষন্ন, বিমোহিত হয়ে তার এই পাগল প্রেমিকের দিকে। শুনছে শুধু, বলছে বলুক, যেন থামতে দিতে চায় না। এই আসক্তি, বাঁধ ভাঙা প্রেমের প্লাবন তার দেখতে ভাল লাগছে। কয়জন পারে এমন অকপটে তার ভেতরের কথা গুলো, এত স্পষ্ট করে মুখের উপর বলে যেতে।

অরুণ বলে, কি দিয়েছে সাজিদ সাহেব তোমাকে এই পনেরো বছরে? আমি সাত বছরে যা দিয়েছি তার থেকেও বেশি শিপা?

এবার কথা বলে শিপা,অনেক কিছু দিয়েছে, আমার পরিবারের নির্ভরতা, নিশ্চয়তা, আমার আয়েশ, বিনোদন, জীবনের জৌলুস, আর দুটো ফুটফুটে বাচ্চা। আর কি চাই বল?

শিপা তার জীবনের প্রেমহীন অতৃপ্তির কথা বলে না, বলতে চায় না। এ তো কাউকে বলার কথা না। সে তো সুতো ছিঁড়ে ঘুড়ি ওড়াবে না, তাই কথার লাগাম টেনে রাখে।

সে অরুণকে কিছুতেই বুঝতে দেবে না তার অপ্রাপ্তির গল্প। রাশ টেনে ধরে নিজের জন্যে, অরুণের জন্যেও।

চলবে …

গল্পের আগের অংশ

ব্যবধান ( পর্ব: তেরো )

 

 

 

 

নিউজটি শেয়ার করুন







© All rights reserved © 2015 womenwords.com
পোর্টাল বাস্তবায়নে : বিডি আইটি ফ্যাক্টরী লিঃ