শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১০:০৭ পূর্বাহ্ন

ব্যবধান ( পর্ব:ষোল )

অনন্যা হক

নিমা এসে অরুণকে খেতে ডাকে।তুমি একা বসে এখনও? ওকে যে পাঠিয়ে দিলাম।

তোমার বন্ধু কোথায় এতক্ষণ? রাগ করলো নাকি আমার উপর, অরুণ বলে।

কেন তুমি রাগ করার মত কিছু করেছো নাকি? দেখে তো মনে হচ্ছে, পরের বউকে এখনও নিজের সম্পদ মনে করছো।

কে বললো তোমাকে?

না তোমার হাবভাবে মনে হচ্ছে। শোন অরুণ একটা কথা বলি, আর দেখা করো না। সাজিদ জানলে, শিপার অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যাবে। তোমরা পুরুষেরা খুব স্বার্থপর সব সময়। একটা মাত্র ছোট ভুল সারাজীবনেও ক্ষমা করবে না বউদের। হয়তো সম্পর্কটাই চুকিয়ে দেবে।

শুধু মাত্র একবার দেখা করার কথা জানলেই আর কোনদিন বিশ্বাস করবে না। তুমি হলেও তাই করতে। কিন্তু আমাদের নারী দের বেলায়? কত কত ঘরে কত ধরনের কিছু শুনতে পাই, দেখতে পাই! যাইহোক, আমি জানি তুমি ওকে ভালবাসো বলেই এগুলো বুঝতে পারবে। অনেক কথা আগ বাড়িয়ে বলে ফেললাম। চল খেতে চল।

নিমা নিজের ঘরে যায়, বলে, কিরে তুই এখনও একভাবে বসে আছিস? কোন ঝামেলা হয়েছে তোদের মধ্যে?

না, কি ঝামেলা? অনেক সময় এসেছি না, মেয়েদের জন্য চিন্তা হচ্ছে, ওদের সাথে একটু কথা বললাম।

সাজিদের সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করলো না, নিমা হেসে জিজ্ঞাসা করে।

কেন, সে কতবার খোঁজ নেয় আমার?

চল খেতে চল।

খাবার টেবিলে নিমাই বেশি কথা বললো। অরুণ আর শিপা যেন আর নিজেদের মেলে ধরতে পারছে না। একটা অন্যরকম অনুভূতির আবেশে বুদ হয়ে আছে দুজনে। সেখান থেকে বের হতেও ইচ্ছে করছে না।

নিমা বলে, তোরা কথাও কম বলছিস, খাবারও কম খাচ্ছিস মনে হয়?

অরুণ বলে, খাচ্ছি তো, রান্না ভাল হয়েছে,কতদিন পরে বাঙালি ঘরানার  খাবার খাচ্ছি এবার এসে, তাই ধীরে ধীরে রসিয়ে রসিয়ে খাচ্ছি। বাঙালি ঘরানার সব কিছুই আমার ভাল লাগে, কিন্তু কপালে জুটলো না।

শিপা অরুণের দিকে তাকায়। অরুণ বলে, নিজের কষ্ট ভুলতে চলে গেলাম বিদেশে। একটা বউ বিয়ে করলাম বিদেশি মেয়ে। তার সাথে আমি, নাকি আমার সাথে সে তাল মেলাতে পারলো না। আমি এখন হয়ে গেলাম ঘর থেকেও ঘরছাড়া।

যাও আবার গিয়ে একটা বাঙালি ঘরানার মেয়ে খুঁজে বের কর, সংসার পাতো, নিমা বলে, নাকি খুঁজে দিতে বলছো?

বার বার এক জিনিস খুঁজে পাওয়া যায় না, জfনো তো? আর একটা মন কতজন কে দেয়া যায় বল তো, আমি তো মানুষ ! নিমা, প্রেমহীন সংসার বড়ই কঠিন, শুধু খেয়ে পরে, ঘুমিয়ে পাশাপাশি থাকা, এ কি কোন জীবন হলো?

বেশ এক নাগাড়ে নিজের কথা গুলো বলে যায় অরুণ, যেন শিপাকে শুনিয়ে নিমাকে বলছে। শিপা ভাবে, বলছে বলে যাক, তার তো বলার কিছু নেই। এ দায় তো তার। কোন দিন দুজনের কেউই একবারও ভাবেনি তাদের এই বিচ্ছেদের কথা। একেই বলে ভবিতব্য।

খাওয়ার পর্ব শেষ হয়।নিমা বলে, এরপরে চা পর্ব শেষ করে তোমরা যাবে। আমি সারাদিন একা থাকি, আজ ভালই লাগছে তোমাদের সঙ্গ পেয়ে।

না না, আর চা লাগবে না নিমা, বেশিক্ষণ থাকবো না। মেয়ে দুটো অনেকক্ষণ হলো ফিরেছে।

তোরা ঐ রুমে যা, আমি শুধু চা নিয়ে আসছি। এতটুকু সময় বসে চলে যাস।

বাকী সময় টুকু তিনজন সাদা মাটা ভাবে কথা বলে কাটিয়ে দেয়।

নিমা আর উঠে যায় না সেখান থেকে। কোন অন্তরঙ্গ আলাপের আর কোন সুযোগ হলো না দুজনের।

শিপা তার, ঘোরের রাজ্য থেকে, বাস্তবে ফিরতে শুরু করে। তার মাতৃত্ব বোধ তাকে খোঁচাতে থাকে। একটা অদ্ভুত টানাপোড়েন চলতে থাকে তার ভেতরে। সম্পর্কের টানাপোড়েন।

একদিকে এক জনের বউ, বাচ্চাদের মা। আবার অরুণের প্রেমিকা, যে সম্পর্কটা এই সমাজে কোন পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে না কোনদিন। কিন্তু একদিন ছিল অনেক গভীরে, সারাক্ষণই মন ,মস্তিষ্কের স্তরে স্তরে, এই পুরুষটার আনাগোনা।

এখন সে সাজিদের বউ, এটাই তার পরিচয়। এখানে আর কোন পুরুষের স্থান নেই, থাকতে নেই। যতই তুমি অরুণ কে নিয়ে মনের উথালপাতাল সাগরে ডুবে, ভেসে সাতার কেটে যাও না কেন, সেটা একাকী, নিভৃতে, সঙ্গোপনে বয়ে বেড়াতে হবে। অথবা মন থেকে এই অনুভব গুলো কে একদম ছিন্ন করে সিন্দুকে তালা মেরে সরিয়ে ফেলতে হবে।

কোনটা করবে শিপা, সে নিজেও জানে না। সময়ই তাকে বলে দেবে।

তাদের চা খাওয়া শেষ হয়। অরুণ বলে, আমি এবার উঠি। নিমাকে অনেক ধন্যবাদ, এমন একটা সময়  উপহার দিলে আমাদেরকে।

আমাদের কথা টা শিপার কানে গিয়ে লাগে, শিপা বোঝে, অরুণ তার মতই, আলাদা করতে পারে না শিপা কে। এ যেন এক অবিচ্ছেদ্য বন্ধন, এর নামই প্রেম।

অরুণ উঠে দাঁড়ায়, বলে আমি আসি শিপা, তুমি ভাল থেকো। বলার সময় সে চাহনি ছিল খুবই গভীর, যেন শিপার ভেতরটা পড়ে নিতে চাইছিল।

আর একটা কথাও বেশি বলে না। আর না তাকিয়ে সোজা হেঁটে চলে যায়।

এখন থেকে আবার শিপার বিরহ শুরু হলো অরুণকে ঘিরে। শেষ হলো শিপার নিষিদ্ধ অভিসার।

আবার শুরু হবে, অরুণকে নিয়ে তার নিজের সাথে একাকী বসবাস। তার স্বামী কোন দিন জানবে না, তার পনেরো বছরের ঘরনী নারী, আজ কোন এক নিষিদ্ধ অভিসার সেরে আবার তার খুব বিশ্বস্ত ঘরনী হয়ে ঘরে ফিরে গেল।

আবার সাজিদের বক্ষলগ্না হবে, যদিও অরুণের স্পর্শের রেশ টুকু তার মন এবংশরীরে বয়ে নিয়ে চলবে শিপা অগণিত কাল হয়তো।

শুধু একটা ব্যাপার বুঝতে পারবে সারাজীবন ধরে, প্রেমহীন স্পর্শের সাথে প্রেমের আসক্তির স্পর্শের ব্যবধানটা।

শেষ।

গল্পের আগের অংশ পড়ুন

ব্যবধান ( পর্ব: পনেরো )

 

 

 

 

 

 

 

নিউজটি শেয়ার করুন







© All rights reserved © 2015 womenwords.com
পোর্টাল বাস্তবায়নে : বিডি আইটি ফ্যাক্টরী লিঃ