মঙ্গলবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০৮:৩৪ অপরাহ্ন

বৈরি (৩)

অনন্যা হক

ইলা পর দিনই দেখে তার শাশুড়ি বাড়ি যাওয়ার তোড়জোড় শুরু করেছে।ইলা অবাক বিস্ময়ে ভাবে, এ কেমন  পরিবেশ শুরু হলো বাসায়!

মায়ের কাছে গিয়ে বলে, কি হলো মা হঠাৎ গোছগাছ করছেন কেন? আমাকে তো আগে বলেন নাই।

শাশুড়ি বলে, অনেক দিন তো হলো এসেছি, আমার তো ওটাই আসল সংসার। এত দিন বাড়ি ছেড়ে কারো থাকতে ভাল লাগে মা? আমার মত হলে তুমিও বুঝবে।

ইলা বলে, তা অবশ্য ঠিক।মনে মনে ভাবে, আমি তো নিজের কথা ভাবছি, তার ইচ্ছে তো জানতে চাইনি।ঘর থেকে বের হয়ে নিজের ঘরে ফিরে আসে।একটু  হতাশ হয়ে পড়ে্।কোন না কোন একটা বাঁধা এসে সামনে দাঁড়াচ্ছে।

রফিক বলছিল, এই সপ্তাহের মধ্যে জানাতে।হবে না এখানে বুঝে গেল।

রাজীব কে নিয়ে একটা বড় সংশয় ঢুকে গেল মনে। এখানে তার কোন কারসাজি নেই তো?

ইলা ভেবেছিল, আগে ক্যারিয়ার ঠিক করে এর পরে বাচ্চা নেবে।যা হয় একটা উপায় হতো। কিন্তু তার ভাগ্যে বোধহয় এটাই ছিল।তার ভেতরে মাতৃত্ববোধ টাও প্রখর ছিল, বাচ্চা খুব ভালবাসতো সে।তাই বোধহয় আগে বাচ্চা  এসে গেল।রাজীব বাচ্চা হওয়ার কথা শুনে অসম্ভব খুশি হয়েছিল। আসলে এটাই চেয়েছিল রাজীব।

ইলার শ্বশুর বেঁচে নেই।ইলার আশা ছিল, সে যখন চাকরি করবে তখন শাশুড়িকে এখানেই থেকে যেতে বলবে রাজীব।তাকে সব দিক থেকেই  আশা ভঙ্গ হতে হলো। আজ খুব মন খারাপ লাগে তার।রাজীব কে কেমন অচেনা মনে হয়। এর থেকে সহজ করেই বলতে পারতো, সে চাকরি করতে দিতে চায় না। কিন্তু সেটা তো ইলা মেনে নিত না, তাই বোধহয়  এমন করে  অসহযোগিতা করছে।

সারা দিন এমন অনেক কিছু ভাবতে ভাবতে কেটে যায়।রাজীব বাইরে থেকে বাসায়  আসে। এসেই বলে, মা তোমার গাড়ির টিকিট কেটে নিয়ে এলাম, কাছে রাখ এটা। মা দেখলো দুই দিন পরের টিকিট।

আসলে রাজীব মা কে বলেছিল সেদিন ইলার অগোচরে, এত ছোট বাচ্চা রেখে কি চাকরি করবে মা, আমার তো সংসারে কোন অভাব নেই।আমি চাই না এখন সে কোন চাকরি তে যাক।

নিজের মনের কথাটা বলে মায়ের অভিমত জানতে চায় সে।তোমার কি মনে হয়? তোমার বউমা চায় তুমি এখানেই থেকে যাও, তাহলে সে নিশ্চিন্ত মনে কাজে যেতে পারবে।

মা বুঝতে পারে, ছেলে কি বলতে চাচ্ছে ।বলে, আমি এসে মাঝে মাঝে থাকি, ছোট বাচ্চা নিয়ে তোমরা একা তাই ভেবে কিন্তু ওদিকে আমার আরও একটা সংসার আছে, আমি তো এই ভাবে  আটকে যেতে পারবো না বাবা। রাজীব যেন শুনে আশ্বস্ত হলো।

যাক মায়ের বক্তব্য তার অনুকূলেই রইলো।ইলার আর তাকে অভিযোগ করার কিছু থাকবে না ।

এই ঝামেলাটা থেকে আপাতত বাঁচা গেল, তাই সে মায়ের কাছে বলেই তাঁর টিকিট কেটে আনে।

আসলেই সংসারে এমন ঝামেলা একটার পর একটা আসতে থাকবে ইলা আগে বুঝতে পারেনি। যখন লেখাপড়া শুরু করেছিল, অনেক বড় স্বপ্ন নিয়েই শুরু করেছিল।সে ছাত্রী বরাবরই ভাল, তাই ইচ্ছে গুলো কে তখন থেকেই লালন করে এসেছে ইতিবাচক ভাবে। এত প্রতিকূলতা আসবে এমন করে ভেবে দেখেনি।

রাজীবের মনে যাই থাক, এটা তো ইলা অস্বীকার করে না সে রাজীবকে ভালবাসে, তাকে নিয়ে  অনেক কামনা ছিল সুখের সুন্দর একটা সংসারের।সেটা সে পেয়েছে।

সন্তান এত তাড়াতাড়ি না চাইলেও, মা হতে গিয়ে সে তো সত্যি অনেক আপ্লুত ছিল।মাতৃত্বের আবেগ তার ভেতরে সে সব সময় অনুভব করে।

বাচ্চার পাশে শুয়ে ভাবছিল এসব।বাচ্চা পাশে ঘুমোচ্ছে, তার দিকে তাকিয়ে ভাবে, আসলেই তো  এই বাচ্চা  মা কাছে না থাকলে কার দায়িত্বে আমি রেখে যাব, আর গেলেও কি স্বস্তিতে বাইরে থাকতে পারবো!

এত মরিয়া হয়ে কোন লাভ নেই, মানসিক অশান্তি ছাড়া।এই ছাড় টা তো আমাকেই দিতে হবে, আমি যে সবার সাথে আষ্টেপৃষ্টে বাঁধা পড়ে গেছি।

রফিক যা বলেছিল, সব শুনে ইলার মনে হয়েছিল, চাকরি টা সব দিক দিয়েই ভাল হতো তার জন্য।

শাশুড়ির উপর আর ভরসা করতে পারে না সে। ঠিক করে, তাকে বলবে একটা নির্ভরযোগ্য লোক খুঁজে দিতে, এর পরে আবার চেষ্টা করতে হবে।এভাবে এবার সে মন টা কে শান্ত করে।

চুপ করে শুয়ে ছিল, এমন সময় রাজীব ঘরে ঢোকে।কি ব্যাপার ঘুমোচ্ছ নাকি? আরে এ সময় শুয়ে থাকে নাকি কেউ, ওঠ ওঠ, চল তো কোথাও ঘুরে আসি শুধু তুমি আর আমি,  আজ মৌকে মায়ের কাছে রেখে যাব।

ইলা  উঠে বসে। এত খুশির কি হলো, কোথায় যাবে?

ইলা যেন কি একটা ইঙ্গিত পায় মনে। একদম সব কিছু পরপর সাজালে, রাজীব  এর মনোভাবটা বেশ পরিস্কার হয়ে যায়।মায়ের যাওয়াটা ঠিক করে সে একরকম নিজের সুপ্ত ইচ্ছাটাই প্রতিষ্ঠিত করতে পারলো আপাতত।এ কারণেই বোধহয় এত খুশি।

তবুও ইলার হাত পা বাঁধা, আসলেই তো তার কিছু করার নেই। তাই ইলা ভাবে, এখন আর অশান্তি করবো না। আর যেহেতু রাজীব সরাসরি বাঁধা দেয়নি, সে তাকে অভিযোগও করতে পারে না তেমন করে। ভাবে  এর পর সুযোগ  এলে বুঝতে পারবো।

আবার রাজীব বলে বসে ঝিমাচ্ছো কেন? যাও তো রেডি হও।বলেছি না আমার সামনে এমন মুখ গোমড়া করে থাকবে না ।ইলা হেসে দেয়, বলে আমার হাসি, মন খারাপের চাবিটাও কি তোমার নিয়ন্ত্রণে রাজীব? তোমার সাবজেক্টটা  ইকোনমিক্স না হয়ে পলিটিক্যাল সাইন্স হলে ভাল হতো।

রাজীব শুনেও গায়ে লাগায় না।ইলা বলে, চা খাবে না?

না দেরী হয়ে যাবে, বাইরে কফি খাব।

চলবে …

গল্পের আগের অংশ পড়ুন

বৈরি (২)

নিউজটি শেয়ার করুন







© All rights reserved © 2015 womenwords.com
পোর্টাল বাস্তবায়নে : বিডি আইটি ফ্যাক্টরী লিঃ