শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০৮:৫৪ পূর্বাহ্ন

নিউমার্কেট (৪)

রোমেনা লেইস

বিশাল একটা পুকুর। তার পাড় ঘেষে তিনতলা বাড়ি।তিনজন শিক্ষক থাকেন। একজন জুওলজির আয়েশা আপা। একজন বাংলার চেমন আরা আপা।আর একজন ইতিহাসের নার্গিস আপা।আয়েশা আপা পুরানো হোস্টেলের সুপার।।কচিআপা আর নার্গিস আপা সহকারী সুপার।চেমন আরা আপা নূতন হোস্টেলের দায়িত্ব প্রাপ্ত সুপার ।তার সহকারী ছিলেন ইতিহাসের নওরোজ আপা। হোস্টেলে এসে পড়ালেখা শুরু করতে না করতে মনিষা নামের মেয়েটির বিয়ে হয়ে গেলো।ইতিহাস ক্লাসে দুপুরের ঝিমধরা রোদ ।আপা পড়াচ্ছেন -ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজী মাত্র বারজন আশ্বারোহী সৈন্য সাথে নিয়ে .. সোনার চুড়ি আর কাঁচের চুড়ি রিনিঝিনি বেজে উঠলো। -এই কে? দাঁড়াও। -চুড়ি পরে ক্লাসে এসেছ কেন? – আমার হাজবেন্ড পছন্দ করে। উত্তরটা দিয়েই ভুল বুঝতে পারলো।কিন্তু তীর অলরেডি ছুটে গেছে। আর ফেরানোর কোন উপায় নাই। -শোন বিয়ে হয়েছে ভালো।এসব ন্যাকামো করতে কলেজে আসবে না।শাড়ি গয়না পরে ক্লাসে আসবে না। বুঝলে? সুন্দরী মেয়েটার অপমানে চোখমুখ লাল হয়ে গেল।চুড়ি খুলে ব্যাগে রাখলো।টিপ খুলে রাখলো। ক্লাস শেষে হোস্টেলে ফিরে বলতেই বড়আপুরা বললেন -নওরোজ আপার ডিভোর্স হয়ে গেছে। তাই আপা চান সব মেয়েরা পড়ালেখা করুক। মানুষ হোক। নিজের পয়ে দাঁড়াক। আজ আবার নিউমার্কেট যেতে হবে।হীরক আসছে।হীরক আসলে মন খুব ভাল থাকে। পারমিশন নেয়া ছিলো। ঢাকা নিউমার্কেট সোমবারে হাফ আর মঙ্গলবারে বন্ধ ।তাই বুধবারকে বেছে নিয়েছে।মিতি বইএর দুই নম্বর দোকানে ঢুকে বই নাড়ানাড়ি করছে তখনই হীরক আসলো।হীরক একটা সাদা শার্ট পরা। ওকে একটু কেমন অগোছালো দেখাচ্ছে । -কেমন আছ? -চলো বসি। -চলো। রেস্টুরেন্ট এ বসলো।দুটো চা আর পরোটা কাবাব অর্ডার দিয়ে। -কী হয়েছে ?হৃদয়?তোমাকে এমন দেখাচ্ছে কেন?ভালবেসে এ নামেই ডাকে। -আব্বা নেই। -কী বলছো? -পাঁচদিন আগে জরুরী ট্রাঙ্ককল পেয়ে বাড়ি যেয়ে আব্বাকে আর পেলাম না।দাফন দোয়া সব শেষ ।আমার আব্বা চলে গেলেন মিতু।হীরক ফুপিয়ে কেঁদে উঠলো।হীরকের হাত দুটো চেপে ধরে মিতিও কাঁদে।হীরককে কী বলবে বুঝে উঠতে পারে না। হীরক নিজেকে সামলে নেয়। -তোমার পরীক্ষা কেমন হচ্ছে ?আর একটা বাকী? -হ্যা এটা ফোর্থ পেপার। হায়দার আলী, হীরকের বাবা গাইবান্ধা শহরের একজন উকিল ছিলেন। নাম যশ সবই ছিলো ।কিন্তু মৃত্যুর পর দেখা গেলো তিনি যা আয় করতেন, তাই ব্যয় করেছেন । হীরক বলে -জীবন আমার খুব সুন্দর চলছিলো ।আমার বাবাব মৃত্যু আমাকে আচমকাই বাস্তবের রাস্তায় এনে আছড়ে ফেললো।সামনে সীমাহীন পথ।কীভাবে যাবো জানা নাই।নিজের পড়ার খরচ,ছোট ভাই বোন দুটোর পড়ার খরচ।বাসায় মা আছেন তার খরচ।চোখে অন্ধকার দেখছি ।বললো হীরক। -পার্টটাইম কিছু করা যাবে? -মেডিকেলের পড়া অনেক কঠিন।পড়তে হয়।কাজ করলে পড়বো কখন? গাইবান্ধার বাসার এক অংশ ভাড়া দিয়ে আপাতত মা আর ছোট ভাইবোনের থাকা খাওয়ার বন্দোবস্ত হলো।হীরকের পাশে দাঁড়ালেন এক শিক্ষক।তিনি বললেন -আমার এক বড়লোক আত্মীয় তার সুন্দরী মেয়ের জন্য পাত্র খুঁজছেন।তুমি তাকে বিয়ে করো যদি তাহলে যে টাকা পাবে তাতে তোমার পড়ালেখা হবে ।তুমি দাঁড়িয়ে যাবে। মাথায় বাজ পড়লো যেন হীরকের। মিতি? মিতির কী হবে?মিতিকে নিয়ে কতো স্বপ্ন বুকে।চার বছর ধরে পত্রে পত্রে কতো আলাপন।বাবা তুমি কেন আমাদের ছেড়ে অকালে চলে গেলে।মা নিজও বেশী নরম।না না আমি মিতিকে হারাতে পারবো না। হীরকের স্যার স্থায়ী ঠিকানা বের করে হীরকের গাইবান্ধার বাসায় গেলেন মেয়ের বাবাকে সাথে নিয়ে।সেখানে হীরকের মা আর চাচার সাথে কথা হলো। দশলাখ টাকা হীরকের একাউন্টে জমা দিয়ে মেয়েকে হীরকের বউ করে নিতে প্রপোজাল দিয়ে আসলেন। মা টেলিগ্রাম করলেন। “কাম শার্প।” হীরক বাড়ি গেলো।ঐদিন হীরকের স্যার মোজাফফর আহমদ আসলেন তার বন্ধু সহ। অনিশ্চয়তা অর্থাভাবের কাছে ভালবাসা হেরে গেলো।টাকার কাছে বাঁধা পড়লো হীরকের জীবন ।ইতিহাস হয়ে গেলো মিতি আর হীরকের ভালবাসা, প্রেম। দুই দিন সময় চেয়ে হীরক ঢাকা আসলো। মিতিতো জানে না হীরক আসবে।হীরক ওর বড় আপার মেয়ে মুনিয়াকে নিয়ে কলেজে গিয়ে গেটে দাঁড়িয়ে মুনিয়াকে ভেতরে পাঠালো। “জরুরী কথা আছে।একবার নিউমার্কেটে এসো কাল দুপুরে ।” অচেনা মেয়ে রুমের দরজায় দেখে মিতি এগিয়ে এলো। -মিতি আছেন? -হ্যা আমি মিতি। -আন্টি হীরকমামা বাইরে। চিঠিটা দিলো।চিঠি না আসলে চিরকুট । -চলো আমি তোমার সাথে গেটে যাই।আমার পরীক্ষা শেষ। আমার বন্ধু শিউলির প্র্যাকটিক্যাল চলছে। আর দুটো হলেই আমরা হোস্টেলে ছেড়ে চলে যাব। -নানাভাই মারা যাবার পর মামুর মন ভাল নেই। – ও । গেটে এসে শুধু একনজর দেখতে পেলো দুজনে দুজনকে।হীরকের দিকে তাকিয়ে বুকটা হু হু করে উঠলো।শুকিয়ে গেছে উদভ্রান্তের মতো দেখাচ্ছ। চিরকুট মুনিয়া নিয়ে দিলো হীরককে। “কাল দুপুর বারোটার সময় নভেলটিতে থাকবো ।” লাল একটা সোনালী আর কালো সরুপাড় টাঙ্গাইলের সিল্ক শাড়ি পরলো মিতি।কচি আপার রুমে একটা আয়না আছে মস্ত। সেটাতে নিজেকে দেখতেই গেলো।আপাকে বললো -আপা আপনার কিছু লাগবে? -কই যাচ্ছো? -নিউমার্কেট। -আমার শাড়ি আছে নদিয়ায়।রিসিটটা নিয়ে যাও।সুন্দর লাগছে তোমাকে । টুং টাং রিকশার বেল বাজিয়ে রিকশা এগিয়ে চললো।পরীক্ষা শেষ। আজ হীরকের সাথে অনেক গল্প করবে।অনেক ঘুরবে।সুযোগ পেলে জড়িয়ে ধরে দীর্ঘ একটা চুমু।নিউমার্কেটের গেটে ঢুকলো।কানে আসলো গান বাজাছে “শেষ করো না শুরুতে খেলা শেষ করো না।” রুনা লায়লার গান।মনটা ধ্বক করে উঠলো কেন যেন। আনমনে হেঁটে নোভেলটি র কাছে পৌঁছে দাঁড়াতেই দেখলো হীরক আসছে। -তোমাকে এমন দেখাচ্ছে কেন?বাবা মা কারো চিরদিন থাকে না।স্বাভাবিক হও মেনে নাও হৃদয় । দুজনেই উপরে গিয়ে বসলো।হীরকের মুখভর্তি খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি।একটা টিশার্ট আর জিন্স পরেছে।মুখে মনে হলো কেউ কালি লেপে দিয়েছে । -কী খাবে? ভ্যানিলা আর চকলেট ফ্লেভার অর্ডার দিলো। -মিতি তোমার পরীক্ষা শেষ।কবে গাইবান্ধা যাচছ? -আমি আর শিউলি একসাথে যবো।শিউলির দুটো পরীক্ষার প্র্যাকটিক্যাল বাকী আছে।সামনের রোববার বিকেলের বাসে বাড়ি যাব। -পরীক্ষা কেমন হয়েছে? -আমার পরীক্ষা ভাল হয়েছে।তবে কী জানো মাঝে ঐ ডিসটার্বগুলো না হলে আমি আরো বেশী নম্বর পেতাম। -চুপ করে আছ কেন? -আমি কীভাবে যে বলবো।আমি বুঝতেই পারছি না। -কী হয়েছে? -তুমি তুমি আমাকে ভুলে যেও মিতি। -কী বলছো?তোমার মাথা নষ্ট হয়ে গেছে। হীরক বুঝছিলো ও এভাবে বললে মিতি ভেঙে পড়বে।আর সেও বলতে পারবে না। তাই একটা খাম তুলে দিলো মিতির হাতে। -মিতি আমার মাথা আসলেই খারাপ হয়ে গেছে।এই প্রথম বার নীলক্ষেত দিয়ে না ঘুরে সোজাই হোস্টেলে গেলো।হীরক কাঠের মতো শক্ত হয়ে বসে রইলো রিকশায়। আর মিতিও অপমানিত বোধ নিয়ে অভিমানী হয়ে রইলো।নিউমার্কেট থেকে ইডেন কলেজের হোস্টেলে পাঁচ মিনিটে পৌঁছে গেলো।যাবার সময় হীরক শুধু বিড়বিড় করে বললো -আমাকে মাফ করে দিও।

চলবে…

গল্পের আগের অংশ পড়ুন

নিউমার্কেট (৩)

 

নিউজটি শেয়ার করুন







© All rights reserved © 2015 womenwords.com
পোর্টাল বাস্তবায়নে : বিডি আইটি ফ্যাক্টরী লিঃ