শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০৯:৫১ পূর্বাহ্ন

জীবন তরী (পর্ব:স্থিরতা)

অনন্যা হক

বাচ্চারা খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে।রাতে সবাই যার যার ঘরে।বাড়িটা রাতের নিরবতায় স্তব্ধ হয়ে  আছে।মিলি নিজের ঘরে গল্পের বই পড়ছিল।রিফাত না আসা পর্যন্ত সে ঘুমিয়ে পড়ে না কখনও। ঘুমিয়ে লাভ নেই,  উঠতে তো হবেই। যতই বিরোধ থাক, সে তার তিন বাচ্চার বাবা, একটা উৎকণ্ঠা নিয়ে জেগে থাকে না ফেরা পর্যন্ত।

মিলির ভাল লাগে না, বারান্দায় এসে বসে থাকে।সে এখন অনেক কিছুর সাথে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে।মেনে নিয়েছে তার নিয়তি।সে এতদিনে বুঝেছে, রিফাতের কাছে কতটুকু আশা করতে পারে সে।রিফাতের চিন্তা ভাবনার একটা সীমাবদ্ধতা আছে।

রাত এগারোটা নাগাদ রিফাত বাসায় ফিরে এলো।মিলি কে দেখে বলে, কি ব্যাপার, এত রাতে এখানে বসে যে? মিলি বলে, এমনিতেই বসে আছি, ঘরে আর কতক্ষণ একা আবদ্ধ থাকতে ভাল লাগে।

রিফাতের একটু লাগে মনে।আজ হঠাৎ মনে এল তার, একটু বোধহয় লাগাম টানা দরকার, অনেক তো হলো।বেশ কত গুলো বছর স্বেচ্ছাচারীতা করে মিলিকে কম তো অবহেলা করলাম না।একটু মায়া হয় বউ এর প্রতি।

আজ একটা বিশেষ দিন, কখনও মিলি এসব নিয়ে কিছু বলে না, কিছু আবদার করে না, বোধহয় অভিমানে।

আজ তাদের বিবাহবার্ষিকী।রিফাত এটা সব সময় মনে রাখে।মিলি দেখে, হাতে  একটা শাড়ির প্যাকেট।

মিলি কে বলে, চল ঘরে চল।ঘরে গিয়ে প্যাকেট টা দিয়ে বলে, এটা তোমার। তোমার বোধহয় মনে থাকে না, তাই না? আমি বুঝি,  আমার  উপর রেগে থেকে, সব ভুলে যাও। খুলে দেখ পছন্দ হয় কিনা।

মিলি বলে, পছন্দ না হলে ফেরত দেবে নাকি? আমি জানি তো তোমার পছন্দ ভাল।চল আগে খেয়ে নাও ।কেমন একটা নিস্পৃহ ভাব দেখায়। আসলে তার প্রতি রিফাতের এই মনোযোগ মিলি তার  অন্য আচরনের সাথে মেলাতে পারে না। এবং একটা চাপা অসন্তোষের কারণে উচ্ছ্বাস, ভাল লাগা প্রকাশ করতে পারে না।কিন্তু মিলি বরাবরই দেখেছে এই লোকটার রোমান্টিকতায় কোন কমতি নেই।

দুজনে খেয়ে ঘরে আসে। পাশের ঘরে দুই বিছানায় তিনটা বাচ্চা ঘুমোচ্ছে।বিয়ের পনেরো বছরের মাথায় আজ মিলি তিন বাচ্চার মা।দুই মেয়ের পরে আর বাচ্চা নিতে চায়নি মিলি ।

কিন্তু রিফাত একদিন বলে, আমার একটা ছেলে সন্তান চাই। আমার এই এত কিছু রক্ষা করবে কে?

মিলি বলেছিল, এ কেমন কথা, ছেলে হওয়া কি আমার হাতে? এই মেয়েরাই আমাদের সব দেখবে। এদের কে ভাল ভাবে মানুষ করে তুলতে দাও, তুমি নিজেকে বদলাও আগে।

কিন্তু রিফাত অবুঝ, সে মেয়েদের কে বংশ রক্ষার হাতিয়ার ভাবতে পারছে না। এই জায়গা টা তে মিলির সাথে তার মানসিকতার আবার একটা দ্বন্দ্ব হয়।

কিন্তু একদিন বড় জা এর কথায় সে একটা  অন্যরকম আভাস পায়। এখন রুমানারও দিনের সাথে সাথে, চেহারা অনেক অন্য রকম টের পেতে থাকে মিলি।বিশেষ করে বাচ্চাগুলো বড় হওয়ার পর থেকে।

সে মিলি কে শুনিয়ে শুনিয়ে প্রায়ই বলতো,মেয়ে রা তো বিয়ে হয়ে গেলে, এই বাড়ি থেকে চলে যাবে। আমার ছেলে দের কেই তখন বুঝেশুনে সব রক্ষা করতে হবে।

তার এখন এই পরিবারের বংশধরের মা হওয়ার গর্বে, আলাদা একটা মাত্রা যোগ হয়েছে চরিত্রে।

রুমানা  দেখতে উপরে শান্ত  এবং খুব নিরীহ ভাব করে চলে কিন্তু তার ভেতরটা  একদম উল্টো । তার ঈর্ষা  এবং লোভ অনেক বেশি। এই লিপ্সা টা একটা বড় আকার ধারন করছিল দিনেদিনে।

মিলির মনে একটা জেদ চেপে গেল। সে সিদ্ধান্ত নিল, যা থাকে কপালে, সে রিফাতের কথাই শুনবে। সে কারণেই এই তৃতীয় সন্তানের মা হলো, যেটা আশীর্বাদ স্বরূপ ছেলে।

আজ মিলি রিফাত কে বলে, তুমি তো কোন কিছু খেয়াল কর না, এই যে বাচ্চা গুলো বড় হচ্ছে, ওদের ভাই বোন দের জন্য আলাদা ঘর দরকার, আর কতদিন  এভাবে চলবে? তোমার তো অভাব নেই। রিফাত বলে,  এ বাড়িতে আর ঘর কোথায় বানাই, এখন তো সব নতুন করে করতে হবে।

যেন নতুন করে কিছু একটা ভাবে রিফাত। আজকাল তার ভেতরে কিছুটা স্থিরতা এসেছে বোঝে মিলি।

মিলি সংসার করতে করতে অনেক কিছু শিখতে পেরেছে। এক দিকে শাশুড়ির কর্তৃত্ব, জা এর বিভিন্ন অভিলিপ্সা, তিন বাচ্চার দায়িত্ব, নিজের নিঃসঙ্গ জীবন, এই সব প্রতিকূলতার ভেতরে মিলি নিজেকে যেন ভেঙে চুরে নতুন করে গড়ে তুলছে। তার কোমলতা একটা কঠিন অবয়বে রুপ নেয়। বাচ্চাদের কথা ভেবে অশান্তি অনেক কমিয়ে দিয়েছে।নিজের জগত আর বাচ্চাদের ঘিরে, তার একটা গন্ডি তৈরি করে, তার ভেতরেই সে ভাল থাকতে চায়।

মিলি নিঃসঙ্গ থাকে বলে, রিফাত কে নিয়ে একটা সন্দেহ তার মনে কাঁটা হয়ে বিঁধে থাকে, সে কি বাইরে কোন নারী ঘটিত ব্যাপারে জড়িত কিনা! কিন্তু এখন পর্যন্ত  এমন কোন মোহের আঁচ পায়নি সে।মেয়েরা এ ব্যাপারে অত্যন্ত অনুভূতিপ্রবন হয়, এমনিতেই তারা বুঝতে পেরে যায়।

এটাই আবার রিফাতের চরিত্রের মোহনীয় দিক, যা মিলিকে শক্তি জোগায় । ঐ যে কচি মনে মিলি কে জায়গা দিয়েছিল, আর কেউ সেই ভালবাসার জায়গাটা তে চিড় ধরাতে পারে নি। এমন বেপরোয়া স্বামী তার, কিন্তু এখন পর্যন্ত এই টুকু স্বস্তি তাকে দিতে পেরেছে ।

এটাই ছিল মিলির স্থিরতার শক্তি। তাই মিলি  এই জায়গাটা তে, একাই যেন ভেতরে ভেতরে  অহংকারী হয়ে থাকে।

চলবে…

গল্পের পূর্বের অংশ পড়ুন

 

জীবন তরী (পর্ব: অতৃপ্তি )

নিউজটি শেয়ার করুন







© All rights reserved © 2015 womenwords.com
পোর্টাল বাস্তবায়নে : বিডি আইটি ফ্যাক্টরী লিঃ