বুধবার, ১৫ অগাস্ট ২০১৮, ০১:২১ অপরাহ্ন

একজন নারীবাদীর অসাধারণ শ্বশুরবাড়ি

একজন নারীবাদীর অসাধারণ শ্বশুরবাড়ি

জেসমিন চৌধুরী

মাবাবা, ভাইবোনের সাথে অনেকেরই ভাল সম্পর্ক থাকে কিন্তু চমৎকার একটা শ্বশুরবাড়ি একটা বিরল ব্যাপার। আমার জন্য বিষয়টা স্ট্রাইক-ইট-লাকি-সেকেন্ড-টাইম।

নিজের পরিবার নিয়ে অহংকারের কথা আমরা বলে বেড়াই, শ্বশুরবাড়ি নিয়ে যখন অনেক কষ্ট থাকে সেগুলোও বলে বেড়াই কিন্তু শ্বশুরবাড়ির গুণগান খুব একটা শোনা যায় না। নানান ধরণের সামাজিক অন্যায় অবিচারের সাথে ‘শ্বশুরবাড়ি’ নামটার সম্পৃক্ততার কারণেই হয়ত আমাদের মধ্যে এই কালচারটা গড়ে উঠেনি। তাছাড়া যে সম্পর্কের স্থায়ীত্বের নিশ্চয়তা নেই সেই সম্পর্ক নিয়ে গর্ববোধ করাটা বোধ হয় তেমন নিরাপদও মনে হয় না অনেকের কাছে।

আমার গল্পটা বলি। একটা মানুষের কথাবার্তা শুনে অল্প পরিচয়েই এতো ভাল লাগল যে আমি হুট করে তাকে বিয়ে করে ফেললাম। সে কী কাজ করে, বেতন কত পায়, সহায় সম্পত্তি কী আছে, লুকানো কোন বদভ্যাস আছে কী না এসব খোঁজ খবর নেবার কথা মনেও এলো না। সে বলল, আবার সংসারে জড়াতে চাই কী না সে সম্পর্কে আমি সম্পূর্ণ নিশ্চিত নই।’ আমি বললাম, ‘কিন্তু আমি নিশ্চিত তুমি আবার জড়াতে চাও।’

ভাললাগা মেয়েকে পুরুষের জোর করে বিয়ে করার ভুরিভুরি উদাহরণ রয়েছে কিন্তু একটা মেয়ে তার ভাললাগা পুরুষকে ফুসলিয়ে ফাসলিয়ে বিয়ে করার বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করলাম আমি। আমার প্রাপ্তবয়স্ক দুই ছেলেমেয়ে বলল, ‘এতো তাড়াহুড়া করা কি ঠিক হচ্ছে? আবার যদি আগের মত দুঃখ পাও?’

বিয়ের কাবিন লিখতে গিয়ে প্রথম শ্বশুরবাড়ির পরিচয় জানা গেল। বুঝতে পারলাম, না জেনে শুনেই বেশ নামকরা একটা পরিবারের সাথে জড়িয়ে গেছি। আমার এক বন্ধু বলল, ‘কবি বেলাল চৌধুরী তোমার মামাশ্বশুর এটা একটা হিংসা করার মত বিষয়’। কিন্তু সামাজিক সুনামের অংশটুকু বাদ দিয়েও কী যে চমৎকার একটা পরিবারে প্রবেশ করলাম তা বুঝতে আরো কিছুদিন লাগল। বুঝলাম, শুধু কবি বেলাল চৌধুরী নয়, গর্ব করার মত আরো অনেক সাধারণ ছোটখাট বিষয় তাদের মধ্যে আছে। আমার কাছে সেই ছোট বিষয়গুলোকেই বেশি বড় মনে হলো। তাদের পরোপকারের অভ্যাস, শ্রেনী-ধর্ম নির্বিশেষে মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা এবং ভালবাসা, মুক্তচিন্তার ক্ষমতা আমাকে মুগ্ধ করল।

বিয়ের পর প্রথম যেদিন রাতের বাসে একা সিলেট যাবার জন্য টিকিট কেটে আনলাম, দেবর ভাসুররা আপত্তি তুললেন। দেবর বলল, ‘কাউকে সাথে নিয়ে যাওয়া উচিৎ। এটা বাংলাদেশ, অনেক বিপদ হতে পারে’। একজন ভাসুর বললেন, ‘আমি তোমাকে প্লেনের টিকিট কেটে দিচ্ছি। এভাবে যাওয়াটা নিরাপদ নয়।’

আমার সংগ্রামী একাকী জীবনে নতুন আবির্ভুত এইসব ভালবাসার ওম উপভোগ করতে করতে আমি আমার জীবনসঙ্গীকে বললাম, ‘সবাই আমার জন্য উদ্বিগ্ন এটা অনেক ভাল লাগছে কিন্তু একদিন যখন আমার জন্য উদ্বিগ্ন হবার মত কেউ ছিল না তখন আমি অনেক পোড় খেয়ে একা চলতে শিখেছি। চিরদিন আমাকে সাথে নিয়ে যাওয়ার জন্য বা প্লেনের টিকিট কিনে দেয়ার জন্য যে কেউ থাকবেই সেই নিশ্চয়তা আমাকে কে দেবে? কষ্ট করে শেখা এই একা পথচলার অভ্যাসটা আমি ভুলতে চাই না’।

আমার কথাগুলো তারা শ্রদ্ধার সাথেই মেনে নিলেন, আমাকে বুঝতে পারলেন। এই বিষয়টাও নতুন ছিল। আমার নতুন পরিবারের সাথে এই আরামদায়ক বোঝাপড়ার আবেশে মন ভিজিয়ে আমি একাই রাতের বাসে সিলেট গেলাম।

আমি একজন নারী হিসেবে একদিক দিয়ে খুব সংসারী, অন্যদিকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত নারীর প্রতি অবমাননাকর বিভিন্ন ধ্যান ধারণার বিরুদ্ধে সোচ্চার। আমার এই আন্দোলনে আমি শ্বশুরবাড়ির মানুষকে যতটা কাছে পেয়েছি, ততটা আর কাউকে নয়।

আমি অনেক বেশি লিখি, নিজের ধ্যান ধারণা নিয়ে অতিমাত্রায় সরব- এতে অনেক আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধব বিব্রত এবং বিরক্ত। অনেকে এখন আর আমার সাথে যোগাযোগই রাখতে চান না বা রাখেন না। কিন্তু তারপরও আমার এগিয়ে যাওয়ার শক্তি বা সাহসে ঘাটতি পড়ে না। এই শক্তিটুকু আসে মূলত আমার দুই ছেলেমেয়ে এবং আমার শ্বশুরবাড়ির কাছে থেকে।

বিয়ের পর আমার সঙ্গীটি যখন বলতেন, ‘তুমি লেখালেখিতে মন দিচ্ছ না কেন? তোমার এই গুণটিই আমাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছিল’, আমি তখন ভাবতাম, ‘আমি যেসব কথা লিখতে চাই সেসব কি শ্বশুরবাড়ির লোকে মেনে নিতে পারবে? তারপর একসময় লিখতে শুরু করলাম। বিভিন্ন পোর্টালে লেখা প্রকাশিত হতে শুরু হবার সাত মাসের মাথায় আমার কলাম সংকলন ‘নিষিদ্ধ দিনলিপি’ বের হলো। বইটির বিষয়গুলো ছিল আসলেই নিষিদ্ধ।

আমার দুলাভাই Abdus Sattar, চাচাতো ভাই Musa Choudhury, ছোটভাই Ruhul Alam, ভাই Hasan A Chowdhury গাঁটের পয়সা খরচ করে অনেকগুলো বই কিনে মানুষকে উপহার দিলেন। সহযোগিতা পেলাম বড়বোন Shireen Chowdhury বোনঝি Sonia Chowdhury, Syeda Saleha Noor এর কাছ থেকেও। বাপের বাড়ির দিক থেকে এই সহযোগিতা ছিল খুবই স্বাভাবিক এবং প্রত্যাশিত। কিন্তু আমার এই নিষিদ্ধ ধ্যান ধারণা সম্বলিত বইটি নিয়ে আমার শ্বশুরবাড়িতে আমি যে উচ্ছ্বাস এবং উত্তেজনা দেখেছি তা অভূতপূর্ব, বিশেষ করে আমার ভাসুরদের মধ্যে। ভাবীর গুণে মুগ্ধ, গর্বিত আমার একমাত্র ননদ বন্ধুদের কাছে অনেকগুলো বই বিক্রি করল, আবার তাদের উচ্ছ্বসিত প্রতিক্রিয়াগুলো আমাকে কপি পেস্ট করে পাঠাল।

আমার যেসব লেখায় ‘লাইক’ ক্লিক করতে বিব্রত বোধ করেন অনেকে সেই লেখাগুলোই তার ত্রৈমাসিক পত্রিকায় অত্যন্ত আগ্রহের সাথে প্রকাশ করেন আমার ভাসুর Saiful Islam Chowdhury. আমাকে যারা নিরন্তর উৎসাহ যুগিয়ে চলেছেন তিনি তাদের মধ্যে একজন।

বৈবাহিক সূত্রের সম্পর্কগুলোর ক্ষেত্রে আমাদের মধ্যে অবচেতন মনে হলেও একটা অবিশ্বস্ততা কাজ করে কারণ এই সম্পর্কগুলো চিরদিন না ও থাকতে পারে। আমার শ্বশুরবাড়ির সাথে আমার সম্পর্কের ছয়বছর হলো। ভবিষ্যতে কী হবে জানি না কিন্তু এটুকু নিশ্চিতভাবে জানি সম্পর্ক থাকুক আর না থাকুক এদের কাছ থেকে কোন ধরণের অশোভন আচরণ কখনোই পাওয়ার সম্ভাবনা নেই।

আমি আমার বাবামা এবং বড়ভাইকে নিয়ে অনেক লিখেছি। আমার অসাধারণ এবং অনন্য শ্বশুরবাড়িটি নিয়েও লেখার ইচ্ছা অনেকদিন থেকে কিন্তু কয়েকশ’ শব্দের মধ্যে এদের অসাধারনত্ব তুলে ধরা কঠিন। সময়ের তোড়ে অনেক কিছু ভেসে গেছে, আবার সময়ের স্রোতে এসে পলিমাটির মত জমেছে অনেক শক্তিও। আমার শ্বশুরবাড়ি আমার জন্য একটা বিরাট শক্তি যার কোন তুলনাই হয় না।

(পুনশ্চঃ এই ব্যক্তিগত গল্পগুলো আমি নির্দ্বিধায় শেয়ার করি কারণ সমাজের একজন মানুষ হিসেবে নিজের জীবনের কোন ঘটনা বা অভিজ্ঞতাকেই আমার কাছে খুব বেশি ব্যক্তিগত বলে মনে হয় না। আমার গল্পগুলো অনেকেরই গল্প কিন্তু সবাই বলে না, এটুকুই পার্থক্য। তাছাড়া নারীবাদী মেয়েদের স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির সাথে সম্পর্ক ভাল থাকে না বলে যে ভ্রান্ত বিশ্বাস আছে সেটাও পরিবর্তিত হওয়া প্রয়োজন মনে করি বলেই লেখাটা লিখলাম। )

 

নিউজটি শেয়ার করুন







© All rights reserved © 2018 womenwords.com
পোর্টাল বাস্তবায়নে : বিডি আইটি ফ্যাক্টরী লিঃ