শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০৯:০৯ পূর্বাহ্ন

ঈশ্বরের উপহার !

শাহনেওয়াজ কাকলী

ভয় পেয়ে দৌড়ে খাটের নিচে এসে ঢুকলাম। ৫/৭ বছর বয়স থেকে নানান দোষে অন্যায়ের বোঝা বাড়তে থাকে বলে সব সময় মায়ের বুকে আশ্রয় মেলে না। ঘরের আলমিরা, খাটের তলা,পর্দার আড়াল, আলনার চিপাই ছিলো শ্রেষ্ঠ আশ্রয় কেন্দ্র। তেমনি একদিন ভয়ে ঠাই নিয়েছিলাম খাটের তলে, সমস্ত শরীর কাঁপছে। ভয়ে কান্না আসছে বলে মুখ চেপে রেখেছি যাতে শব্দ বের না হয়। জেনেছিলাম আল্লাহ কান্না, হাসি,মিথ্যা-সত্য সবই টের পায়। তাঁকে ফাঁকি দেবার ক্ষমতা নাকি কারোই নাই। কী করে সে দেখে ফেলে, শিশুমন কত কিছুই না ভেবে বড় হয়েছে। আমি যে ভয় পেয়েছি, এখনও কি সে দেখছে? না মনে হয়। আমি তাঁকে রাস্তায় দেখে এসেছি। এতক্ষনে সে চলে গেছে। আল্লাহ আবার এই বাড়িতে চলে আসবে নাতো! আজ আমার বিচার যদি শুরু করে; আম্মা আমাকে অনেক মারবে। উফফ!শরীর কাঁটা দেয় আম্মার মার’ এর কথা মনে হলে। আল্লাহ’র চেয়েও আম্মাকে ভয় পেতাম বেশি আবার ভালবাসাও নিগুঢ়। একমাত্র যে আমি, আম্মার মার জীবনে খুবই কম খেয়েছি কিন্তু ভাইদেরকে নির্মম মার দিতেন, তা দেখেই আমি সোজা। কিচ্ছু করার নাই। আমার কি কি বিচার হবে আজ?কবে কোনদিন কি করেছি,মনে নাই। আর তখনের টা’তো তখনি গরম গরম পেয়েছিলাম। আজ কেন আবার তবে? মনে পড়ে, ভাইবোনের মারামারিতে গালি দিয়েছিলাম সেজন্য কি হবে পারে নিশ্চিত মার। কিন্তু ভয় তো কোন সাবজেক্ট এ কত পেয়েছি এই বিচারে? রেজাল্ট শিট নিয়ে যদি আল্লাহ বাসায় এসে আম্মাকে নিয়ে বসে তাহলে তো আজই বিচারের দিন। আমি ভয়ে কাঁদছি খাটের তলায়। একটু পর ভয় কিছুটা থেমে এলে;মনের জোরে বের হয়ে বাইরে এসে কাঁদছি। কে যেন বলছিলো, “কি হয়েছে”? আমি কিছুইতেই বলি না। শুধু কেঁদেই যাচ্ছি। বেশ খানিক পর আমার কান্নার হেতু খুঁজে পেলেন সবাই। আমি আল্লাহকে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতে দেখেছি। আল্লাহ’র বর্ননা ছিলো এমন; পরনে হাঁটু পেরিয়ে লম্বা সাদা পাঞ্জাবি, লুঙ্গি সাথে। গালের সাদা দাঁড়িগুলো মুখ পেরিয়ে বুক অবধি। মাথায় গোল টুপি। খাটো ছিলো এই রক্ষা, আল্লাহ আকাশ সমান,অনেক লম্বা আমার ধারণায় তাই ছিল। পরে বড়রা বলাবলি করছিলো- মনে হয় নুরন্নাহারের বাবা। কখন কীভাবে মন শান্ত হয়েছিলো মনে নেই। আল্লাহ’র এই ভয়ঙ্কর রূপ শিশুমনকে কিভাবে ছবি এঁকেছিল আজ মনে হলে ভীষণ রাগ হয়। ঘৃনা হয়। আজ ২৫শে ডিসেম্বর বড়দিন। খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে আনন্দের দিন। একজন শিশুর কাছে আজ একজন বৃদ্ধ মানেই তাঁর সবচেয়ে ভালো লাগার প্রিয় মানুষ। ছোটবেলা থেকে তাদের মনে একজন বয়োজ্যেষ্ঠর চরিত্রায়ন করে কাল্পনিক আনন্দের মানুষ হিসেবে আর আমরা ভয় পাই ধর্মকে শাসন নিয়ন্ত্রণে। আমাদের কাছে আল্লাহ’র রূপ একজন পুরুষের তথাকথিত জুব্বা পরিহিত,দাঁড়িযুক্ত, রাগি কেউ। যে ভালবাসবেন কিনা জানিনা শুধুই বিচার করবেন। সত্য-মিথ্যের শাসন করবেন। ভালো কাজ করলে তিনি একদিন উপহার দিবেন। আর কত ভালো কাজ করলে উপহার পাবো? জানিনা! জীবনের জন্য ধর্ম নাকি ধর্মের জন্য জীবন- কোন কাজেই ফল দেখিনা। আজ রাতে সান্তাক্লজ আসবে অনেক উপহার নিয়ে, এমন ভাবনায় বড় হওয়া খ্রিষ্টান শিশুরা বড় হয়ে বুঝেন- ছোটবেলায় মাথার কাছে লুকিয়ে রাখা উপহারগুলো মা-বাবা,আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবই রেখেছিলো। আর সেই আনন্দের অনুভূতিটুকু স্মৃতিতে বিস্ময় আনে বলেই তাঁরা আবার তাঁদের সন্তানের কাছে মেরি ক্রিসমাসের শান্তাক্লজ হয়ে যান। ওই বাচ্চারা চুল গোঁফ দাঁড়িওয়ালা মানুষ দেখে ভয়ে খাটের তলায় লুকায় না নিশ্চিত। আর আমরা একজন এমন মানুষ দেখামাত্রই ভয় পাই ধমক দিবে ভেবেই, তিনি হয়তো জিজ্ঞাসা করবেন প্রশ্ন নানান অনুশাসনে। পার্থক্যটা শিশুর মনে ভূতের ভয়ের মতই, এরচেয়ে ঢের ভালো ভূত। কারণ মানুষ ভূতকে জয় করতে পারলেও পারেনি ধর্মযাজকদের। হাজার হাজার বছর কেটে গেলো আমাদের ভীতসন্তস্ত্র নবীদের গল্প শুনে- নবীরা, সাহাবীরা কি কখনো আমাদের জন্য উপহার নিয়ে আসবেনা? আমাদের ভালবাসবে না? নাকি পার্থিব জীবনের সব কিছুই নিন্দনীয়, আনন্দের যেকোন সংজ্ঞায়ই আমি পাই ভুল। তবে তো মানুষের সমগ্র জীবনটাই ভুল। ভুল থেকেই আবার মানুষ শিখে, তাহলে শিখে শিখে এও ভুল প্রমাণিত হয়।মানুষের মাঝেই ঈশ্বরের বাস। ঈশ্বরের কোন রূপ নেই আর মানুষের চিন্তার সঙ্কট তখন-যখন আমাদের কাছে ঈশ্বরকে তুলে ধরা হয়েছে তিনি বা সে উল্লেখ করে। ঈশ্বর তিনি কিংবা সে,তাঁর দ্বারা, এসব কথা বা শব্দ ব্যবহার যুক্তিহীন। এখন বুঝি, ঈশ্বর মানে ভূখণ্ড। আলোর শক্তি, বাতাসের শক্তি, মাটির শক্তি, গাছের শক্তি- যেখানে মানবের মুক্তি। বেঁচে থাকার আনন্দ, সুস্থতা, সময়, পরিজন, স্বজনের ভালোবাসা। এটাই ঈশ্বরের উপহার।

নিউজটি শেয়ার করুন







© All rights reserved © 2015 womenwords.com
পোর্টাল বাস্তবায়নে : বিডি আইটি ফ্যাক্টরী লিঃ