সোমবার, ২২ অক্টোবর ২০১৮, ১১:০৯ পূর্বাহ্ন

আমেরিকায় থিতু হলেও রয়ে গেছে বউ পেটানো স্বভাব!

আমেরিকায় থিতু হলেও রয়ে গেছে বউ পেটানো স্বভাব!

রোমেনা লেইস

বাঙালী বউ পেটায়; কথাটা সেদিন প্রথম আলোয় আরেকবার পড়লাম আনিসুল হকের লেখায়। বউ তো ভালবাসার মানুষ, আদর সোহাগের। বউকে কেন নির্যাতন করা হবে? আমাদের দেশে অনেকেই বউ পেটান কথাটা অনেকের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্য।

নিম্ন শ্রেণীর লোকেরাই বউ পেটায়, এমন ধারনা প্রচলিত থাকলেও সত্যি কথা হলো উচ্চবিত্ত থেকে মধ্যবিত্ত, শিক্ষিত থেকে অশিক্ষিত সকলেই এই কাজে পারদর্শী। কিন্তু বাংলাদেশী আমেরিকানরাও বউ পেটান শুনলে কেউ বিশ্বাস করবেন?
বাস্তবতা হলো আমেরিকার মত দেশে থেকেও তাদের মানসিকতা এতটুকু উন্নতি সাধন হয়নি। পান থেকে চূণ খসলেই তারা হাত উঠান। অথচ এখানে আইন অনেক কঠোর। গায়ে হাত দিলে শুধু ‘৯১১’ -এ কল দিলেই হলো অভিযুক্ত সাথে সাথে এরেস্ট। এরকম আইন থাকার পরও নিষ্ঠুর নির্যাতন চলছেই।

সেদিন আমার ডেন্টিস্টে এপয়েনমেন্ট ছিল । স্কুলের শেষে বাসায় এসে দুটো মুখে গুজেই সেখানে গেলাম। পাক্কা দুইঘন্টা
লাগলো। ডেন্টিস্ট সেরে বাসায় ফিরে কাপড়ও পাল্টাইনি ফোন বাজলো।
এক ভাবী কল করেছেন। আমি বল্লাম, একটু পরে কল দিচ্ছি।
– না এখনি শুনতে হবে, তাঁর গলায় উত্তেজিত স্বর!
কী আর করা শুনতে হলো, তাঁর হাজবেন্ড প্রতিদিনই কাজ থেকে ফিরে ওয়াইন নিয়ে বসেন। ঘরে শাশুড়ি আছেন। কিছু বললেই বলেন -‘হু কেয়ারস্’?
আজ ও বসেছেন। এই কথা সেই কথার পর বউয়ের গায়ে হাত তুলেছেন। চড়, থাপ্পর, কিল, ঘুসির কিছুই বাদ রাখেননি। বউকে পিটাতে গিয়ে নিজের লুঙ্গি খুলে যাচ্ছে তাও সেই মাতাল ভদ্রলোকের নাকি খেয়াল নাই। মেরেই চলেছেন।
মার খেয়ে আবার উঁচু আওয়াজ করে কাঁদাও যাবে না। কাঁদলে কোন নেইবার পুলিশ কল করলে হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাবে। আমার কাছে উনি জানতে চাইছেন ঘর ছেড়ে বের হয়ে যাবেন কিনা!!

কত ভালবেসে সংসারের হাল ধরেছিলেন। বিয়ে হয়েছে পনরো বছর হলো আমেরিকায় যখন আসেন তখন বড় মেয়ে সাত মাস বয়সের। তারপর আরো দুটি ছেলে মেয়ে হয়েছে। পরিস্কার পরিচ্ছন্ন ঝকঝকে ঘরবাড়ি। সুন্দর ফুলের মত ছেলে মেয়ে। খুবই হাসিখুশি ভদ্রমহিলা। আই এ পাশ করেছিলেন বাংলাদেশের এক জেলা শহরের মহিলা কলেজ থেকে। বাবা আমেরিকা ফেরত পাত্র পেয়ে মহা ধুমধামে বিয়ে দিয়ে দেন।
স্বামীর বয়স উনার চেয়ে প্রায় সতেরো বছর বেশী। শিক্ষাগত যোগ্যতা আছে কি নাই খোঁজ নেননি। তবুও ভালই বাসেন, বিয়ে যখন হয়েই গেছে।

স্বামীর বিষয়টাও প্রায় একই রকম। মধ্যবিত্ত পরিবারে ডাইভারসিটি ভিসা পেয়ে আসা এইচএসসি পাশ একজন এসেই বাংলাদেশ থেকে আসা কয়েকজনের সাথে শেয়ার করে একটা বাসা নেন। বারো থেকে ষোল ঘন্টা কাজ করেন। ক্রেডিট লাইন ভাল হতেই ক্রেডিট কার্ড এর অফার আসা শুরু হলো। ভাল জব পেয়ে দুই হাতে টাকা দেশে পাঠাতে লাগলেন। কুঁড়ে ঘরের জায়গায় তিনতলা বাড়ি হলো। দুই বোনের বিয়ে দিয়ে দিলেন মহা ধুমধামে। বড়ভাই আর নিজের বিয়েও করলেন মহা ধূমধামে। সোনার গয়না হীরার গয়না সবই দেয়া হলো বউদের। ক্রেডিট কার্ড চার্জ করে সীয়ার্স থেকে হীরার গয়না কেনা হলো। সময়মত বিল পেমেন্ট দেয়া হচ্ছে না। ক্রেডিট নেমে গেলো। মাকে জিজ্ঞেস করলেন, কার জন্য এপ্লাই করব?
মা বললেন, বউকে নিয়ে যাও।
বউ নিয়ে আসলে ও টাকা পাঠানো কমেনি। নিজে বাড়তি কাজ করে দেশে নিয়মিত টাকা পাঠাতেন। একে একে তিনটি সন্তান হলো। এখানে সংসার বড় হচ্ছে কিন্তু টাকা পাঠানো লাগছে নিয়মিত।
প্রতি মাসে স্বামী বড় অংকের টাকা দেশে পাঠান। ট্যাক্স রিটার্ণের টাকা পাঠিয়ে দেশে তিনতলা ভিত্তি দিয়ে বাড়ি বানিয়েছেন। ভাইবোনদের সেইরকম মহা ধুমধামে বিয়ে দিয়েছেন। গহনা থেকে সব খরচ তার। একবোন লন্ডনে থাকে তার মেয়ের বিয়েতে বেডরুম সেট উপহার দিয়েছেন। আগে ভাল বেতন পেতেন । এখন কোম্পানীর মালিকানা বদল হওয়ায় মজুরী আগের চেয়ে কমে গেছে আবার ‘আওয়ার’ ও কমেছে। আগের মালিক আবার টিপস ও দিত অনেক। এখন বাচ্চারা বড় হয়েছে। তাদের খরচও বেড়েছে। বাড়ি ভাড়া বেড়েছে। বিশ বছর আমেরিকায় থেকে দেশে টেক্স রিটার্ণের সময় চার পাঁচ লাখ করে টাকা পাঠিয়েছেন। এখানে একটা বাড়িও নাই। এখন দেশে সেটা বলারও ক্ষমতা নাই যে তিনি আর পারছেন না। এখন ট্যাক্স ফাইলের সময় এসেছে বাড়ি থেকে টাকার তাগিদ আসছে আর বউ এর উপর অত্যাচারের মাত্রাও বাড়ছে।
অথচ দেশে যে ভাইবোনরা আছেন তারা সকলেই কর্মক্ষম। সবার বউ ছেলে মেয়ে আছে। তারা নিজের সংসার নিজে চালিয়ে নিতে পারেন। মায়ের দেখাশোনা করতে পারেন। বোনদের নাইওর আনতে পারেন।
কিন্তু তা না করে প্রতিটা বিষয়ে তার কাছে টাকা চেয়ে ফোন করেন। কেন?
কই কেউতো তাকে ফোন দিয়ে তার জব আছে কিনা, কেমন যাচ্ছে দিনকাল তা জিজ্ঞেসও করেন না। একই বাবার ঔরসজাত একই মায়ের পেটের সকল সন্তান কি এক নয়? বিদেশে যিনি থাকেন তাকে শুধু দিয়েই যেতে হবে কেন? কেউ দেশে গেলে তাকে সবার জন্য উপহার পাঠাতে হবে কেন?
যে বিদেশে থাকে তাকে তার নিজের সংসার বউ বাচ্চার দিকে খেয়াল করার সুযোগই দেয়া হচ্ছে না। ক্রমাগত চাপ সৃস্টি
করে। কেন?
আর দশ পনেরো ঘন্টা কাজ করে শারীরিক মানসিক যত চাপ তা স্ত্রীকে মারধর করে মুক্ত হতে হবে! মদের বোতল
আর গ্লাসে আশ্রয় কী মিলে? এই জটিলতার সমাধান কি ভাবে পাওয়া যাবে??

বিস্তারিত শোনার পর সারারাত আমার ঘুম নেই। কিভাবে মহিলাকে সাহায্য করব। এই কী সেই সোনার সংসার? ৯১১ কল দিতে বলবো? ঘর ছেড়ে বের হয়ে যেতে বলবো? নাকি মার খেতে বলবো?

লেখকের আরও লেখা পড়ুন
নায়াগ্রার জল আর আমাদের বন্ধুতা
আমার একটা স্বপ্ন ছিল
জর্জ ওয়াশিংটনের আঙ্গিনায়
তাদের ইংরেজি জানার পরিধি, ‘থ্যাংক ইউ’ পর্যন্ত

নিউজটি শেয়ার করুন







© All rights reserved © 2015 womenwords.com
পোর্টাল বাস্তবায়নে : বিডি আইটি ফ্যাক্টরী লিঃ