সোমবার, ২২ অক্টোবর ২০১৮, ১২:১০ অপরাহ্ন

আমি তোমাদের সাথে আছি: জাফর ইকবাল

আমি তোমাদের সাথে আছি: জাফর ইকবাল

ভাবছিলাম যে সারা পৃথিবীতে আমি মনেহয় একমাত্র মানুষ, যে নাকি মারা যাওয়ার পরে শোকসভায় যে কথাগুলো বলা হয়, সে জীবিতাবস্থায় সবগুলো কথা শুনে ফেলেছে। হেসে হেসে কথাগুলো বলছিলেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্বদ্যিালয়ের  (শাবিপ্রবি) শিক্ষক, বিশিষ্ট লেখক অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল।

তিনি বলেন, আমি মনে হয়না যে গুছিয়ে কথা বলতে পারব, আমি যে গুছিয়ে কথা বলি তাও না, তোমরা একটু সহ্য কর আরকি আমার কথা।

জাফর ইকবাল বলেন, আমি যখন বেচে গেলাম, তখন বারবার ঘুরেফিরে অভিজিতের কথা মনে পড়েছে, আমার ছাত্র অনন্তের কথা মনে পড়েছে, নিলয়ের কথা মনে পড়েছে, দীপনের কতা মনে পড়েছে, ওয়াশিকুর এর কথা মনে পড়েছে, হুমায়ুন আজাদ স্যারের কথা মনে পড়েছে।উনারা কিন্ত সবাই আস্তে আন্তে স্মৃতি হয়ে গিয়েছেন।আমারো নামটা ওদের সঙ্গে যুক্ত হতে পারত।কিন্তু হয়নি। আমার বারবার তাদের পরিবার-পরিজন এবং তারা যে মানুষগুলোকে হারিয়েছে, কষ্ট পেয়েছে-তাদের কথা মনে পড়ছে।আমি তাদের প্রতি সম্মান জানাচ্ছি।

জনপ্রিয় এই লেখক বলেন, ওই যে আমাদের যে বিল্ডিং টা আছে, ওই বিল্ডিংয়ের সামনে আমার ছাত্ররা আমাদের শিক্ষকদের গায়ে হাত তুলেছিল ২০১৫ সালেল ২৩ আগস্ট।তখন মনে খুবই কষ্ট পেয়েছিলাম, আমার ছাত্ররা আমার শিক্ষকের গায়ে হাত তুলবে!তখন ভেবেছিলাম যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা শিক্ষকের গায়ে হাত তুলবে, সেখানে থেকে কি হবে, চলে যাই।আবার ভাবলাম, গিয়ে কি করব, সহ্য করি। আরতো কয়েক বছর তারপর তো রিটায়ারমেন্ট হয়ে যাবে, এমনিতেই চলে যাব।কাজেই সকালবেলা হেটে হেটে আইসিটি বিল্ডিং এ ঢুকি, যখন অন্ধকার হয়ে যায়, মাথাটা নীচু করেই আবার বাসায় চলে যাই।সব জায়গা থেকে আমি গুটিয়ে ফেলেছি নিজেকে।ছাত্র সংগঠন থেকে যারা আসছে, আমি বলেছি সরি, আমি সবসময় তোমাদের প্রতিটা সংগঠনের এডভাইজার ছিলাম।আমি আর তোমাদের এডভাইজার না।তোমরা যদি আমাদের গায়ে হাত তুলতে পার, তাহলে আমি তোমাদের এডভাইজার না।ছেলেপিলেগুলো খুব মিনতি করেছে, প্লিজ স্যার থাকেন আমাদের সাথে। আমি একেবারে নিষ্ঠুরের মতো বলেছি, আমি তোমাদের সঙ্গে থাকব না।তারপর আমি আসি নাই, ইয়াসমিন ও আসে নাই।আমরা একেবারেই নিজেদের ভেতর গুটিয়ে নিয়েছিলাম।

তিনি বলন, এই ঘটনাটা (হামলা) ঘটার পরে আমি টের পেলাম, আমি নিশ্চয়ই তোমাদের সাথে নিষ্ঠুরতা করেছি। সেটা বলার জন্য আজ আমি এসছি যে দেখো আমি তোমাদের সাথে আছি, আমি তোমাদের সাথে থাকব।তোমরা যখন নাটক করবে, আমাদেরকে ডাকবে, আমরা আবার তোমাদের নাটক দেখতে যাব, গানের অনুষ্ঠান করবে, আবার আমাদেরকে ডেকো, আমরা আবার সেই গানের অনুষ্ঠান শুনতে যাব।তোমরা যখন সাইন্সের কিছু করবে, আমাদেরকে ডেকো, আবার শুনতে যাব।এ

আমি যে নিষ্ঠুরতা করেছি সেজন্য আমি তোমাদের কাছে ক্ষমা চাই, কিন্তু আমি আশা করি তোমরা নিশ্চয়ই বুঝবে যে একজন শিক্ষক সবচেয়ে বেশি মনে কষ্ট পায়, যখন দেখে একজন ছাত্র শিক্ষকের সঙ্গে কোনরকম বেয়াদবি করে, কোনরকম গায়ে হাত দেয়। কিন্তু আমি জানি তোমরা সেটা কখনই করবেনা।তোমরা দেখিয়েছ যে ম্যাচিউরড ছেলেপিলে হতে হল কিভাবে থাকতে হয়।আমি এই জন্যই ছুটে এসেছি একথা বলার জন্য যে আমি আছি তোমাদের সঙ্গে, তোমাদের সমস্ত ব্যাপারে তোমাদের সঙ্গে আছি।

জাফর ইকবাল বলেন, আমি মোটামুটি এই জায়গাতেই বসা ছিলাম, যখন আমাকে আঘাত করা হয়েছে, স্ট্যাব (ছুরিকাঘাত)করা হয়েছে।আমার কাছে মনে হয়েছে, কেউ মাথায় কোনকিছু দিয়ে বাড়ি দিয়েছে।আমি এখানে দাঁড়িয়েছি, দাঁড়িয়ে দেখি সামনে কয়েকটা মেয়ে চিৎকার করছে পাগলের মতো, হিস্টিরিক (রোগী)।আমি বললাম, আমার কিছু হয় নাই, আমি ভালো আছি।

তিনি আরও বলেন, সবাই মিলে আমাকে ধরে ওই জায়গায় নিতে নিতে দেখলাম একটা ছেলে তার শার্টটা খোলে আমার মাথার মধ্যে বেধে ফেলেছে, খালি গায়।

তিনি বলেন, ‘তোমরা বিশ্বাস করবে কি না জানি না যে ছেলেটি আমাকে মেরেছে তার জন্য আমার কোন রাগ নেই, অভিমান নেই। মায়া আছে, করুণা আছে।কেন এটা করেছে? বেহেশতে যাবে বলে। এটা তার মাথায় ঢুকানো হয়েছে। একজন মানুষ কত দুঃখী হতে পারে যার মনে হয়, একজনকে মেরে বেহেশতে যাবে। পৃথিবীতে তাকিয়ে দেখো। কী সুন্দর। কী সুন্দর মানুষ, মানুষের ভালোবাসা। এ সুন্দর পৃথিবীর কিছুই সে দেখে না, জানে না। কেবল জানে একজনকে মারলে বেহেশতে যাবো।

‘এখানেও একজন  হয়তো আছে। যে ভাবছে, পারলাম না আরেকবার অ্যাটেম নিতে হবে। তোমাদের মধ্যে যদি কোন বিভ্রান্তি থেকে থাকে, আমার সঙ্গে কথা বলতে আসো। অস্ত্রটা বাসায় রেখে আসো। সামনাসামনি কথা বল প্লিজ। আমি শুনতে চাই, কেন তোমার এত কষ্ট।’

তিনি বলেন, ‘আমাকে নাস্তিক বলো? আমি পবিত্র কোরান শরিফ প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত নিখুতঁভাবে পড়েছি। সেখানে একটি আয়াত আছে, তুমি যদি একটা মানুষকে মারো, তুমি সারা মানবজাতিকে হত্যা করছো। কেমন করে তারা এত বড় দায়িত্ব ঘাড়ে নেয়। কে তোমাদের এসব বুঝিয়েছে। যারা বুঝিয়েছে তারা নিশ্চিন্তে আছে। আর তুমি, যে কিনা রিমাণ্ডে আছো, তোমার মা, ভাই, বাবা রিমাণ্ডে। যারা এসব কথা বলো, তারা আসো আমার সঙ্গে কথা বলো।’

‘কোরান শরিফের পরের লাইনে লেখা আছে, তুমি যদি একটা মানুষকে বাঁচাও, সামগ্র মানবজাতিকে তোমরা বাঁচাও। যারা আমাকে বাঁচিয়েছ, তারা সমগ্র মানবজাতিকে বাঁচিয়েছ। তোমাদেরকে ধন্যবাদ।’

তিনি সিএমএইচ  ও সিলেট ওসমানি মেডিকেল কলেজের চিকিৎসক,  নার্স ও অন্যান্যের প্রতি, পুলিশের প্রতি, পরিবার-পরিজন, শুভাকাঙ্খী সকলকে ধন্যবাদ জানান।

 

নিউজটি শেয়ার করুন







© All rights reserved © 2015 womenwords.com
পোর্টাল বাস্তবায়নে : বিডি আইটি ফ্যাক্টরী লিঃ