শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১০:০১ পূর্বাহ্ন

অন্তরালে (পর্ব: বারো)

অনন্যা হক

আজ ছুটির দিন। সকালে সবাই একসাথে নাস্তা করছে। শফিক বললো, সোমার বিয়ে ঠিক হয়ে গিয়েছে, আজ বড় ভাই খবর দিল। তোমরা প্রস্তুতি শুরু কর, দশ-বার দিনের মধ্যে যাব।

তো আগে বলবে না বাবা, সোমা আপুর বিয়ে, যেতে তো চাই, কিন্তু ছুটি তো মিলিয়ে নিতে হবে, বলে উঠলো চাঁপা ।

কয়েক দিন ক্লাস মিস করলে কিছু হবে না। এমনিতেই অনেক দিন যাওয়া হয়নি। এর ভেতরে  তোমার দাদী অসুস্থ ছিল, তখনও যাওনি তোমরা, শফিক বলে।

ভাবছি এবার আসার সময় মাকে সাথে করে নিয়ে আসবো। কিছু দিন এখানে থাকবে।

পারুলের প্রয়োজনীয় কথার বাইরে শফিকের সাথে কথা হয় খুব কম। সে এসব বিয়ের ব্যাপারে কিছুই জানতো না। শফিক এমনই করে, একেবারে হঠাৎ করে একটা কথা বলবে, যেন তার আগে, পিছে আর কারো কিছু শোনার নেই।

পারুল একটু অবাক হলো। সে বলে, কেবলই না মেয়েটা অনার্স শুরু করলো, এখনই বিয়ে ঠিক হয়ে গেল? ওর তো আর পড়া হবে না, লেখাপড়ায় তো ভালই শুনেছি।

শফিক খোঁচা টা বুঝতে পারলো, একটু তাকালো পারুলের দিকে।

সে পারুলের ক্ষোভের কোন মূল্যই বোঝে না। সে একেবারে এমনই বদ্ধমূল ধারণার পুরুষ যে, পারুল যেমন একেবারে ঘরোয়া জীবন যাপন করে, এটা সে বরং উপভোগ করে।

শফিক বলে, ভাল ছেলে পেয়েছে, অবস্থাপন্ন ঘর, ওরা পড়াটা শেষ করাবে বলেছে।

আর না পড়ালেও কি, চাকরি তো আর করার প্রয়োজন পড়বে না।

ছেলের বাবা বড় ব্যবসায়ী, ছেলের চাকরি ভাল, এত চিন্তার কিছু নেই।

পারুল বলে, পড়াবে বলেছে, তোমাদের মত? আর চাকরির সাথে পড়ার কি সম্পর্ক? তাহলে তো সব মেয়ের শুধু অক্ষর চিনলেই চলে।

শফিক এমনই, একেবারে রক্ষণশীল মনোভাবের, আধুনিকতা বোঝে না, হৃদয় বোঝে না, শুধু নিজের বেলায় বোঝে, মেয়েদের বেলায় একেবারে না। আর অবস্থাপন্ন ব্যাপারটা  তার কাছে যে কোন কিছুর থেকে বেশি মূল্য পায়।

পারুল বলে, তোমাদের বাড়িটাই এমন। কিন্তু বড় ভাইকে অন্য রকম ভেবেছিলাম। দিল মেয়ে টাকে খাঁচায় পুরে। আর কিছু দিন একটু ডানা মেলে চলতে পারতো।

সবাই চুপচাপ খেয়ে যাচ্ছে, ছেলে মেয়ে বুঝতে পারে, মায়ের কিছু  একটা তিক্ততা আছে বাবার পরিবারের  উপর, তার ঝাল ঝাড়ছে।

পারুল কোন উত্তরের অপেক্ষা না করে, একাই বলে যায়, অবশ্য বড় ভাইই বা কি করবে, বড় ভাবীর উপরে কোন বক্তব্য তো তার টিকবে না। সবাই পৃথিবীতে শক্তের ভক্ত।

ঐ যে অবস্থাপন্ন ঘর শুনেছে, ভাবীর তো আর পেছন ফিরে তাকাবার কিছু নেই। ঐ অবস্থাটাই দেখি সবার কাল হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

অনেক পুরোনো, মনের ভেতরে দানা বেঁধে থাকা আক্রোশের ঝাল যেন মেটাচ্ছে কিছুটা  সুযোগ পেয়ে।

আহ্ পারুল, তোমার কি? তাদের মেয়ে, তারা যেটা ভাল বুঝেছে করেছে। ভাল একটা বিয়ে, কোন বাবা মা মেয়েকে দিতে চায় না। বাদ দাও এসব।

ছেলে মেয়ের সামনে আর কথা বাড়াতে চায় না শফিক, নিজের খোলসটা খুলে যাচ্ছে ভেবে।

অভি এতক্ষণ শুনছিল, সে পারিবারিক ব্যাপারে কথা কম বলে। কিন্তু এখন বললো, ঠিকইতো বাবা, এই যুগে আবার কেউ মেয়েকে লেখা পড়া শেষ না করিয়ে বিয়ে দেয় নাকি? সোমার একটা ভবিষ্যত আছে না, সংসারে ঢুকে গেলে আর পড়া হবে নাকি? কি যে কর তোমরা!

পারুল আর কথা বাড়ায় না, একটা  স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে।

টেবিল থেকে খাওয়া শেষে, বাবা, ছেলে  উঠে চলে যায়। চাঁপা  একটু ধীরে অন্যমনস্ক হয়ে খাচ্ছিলো।

পারুল যেন কোথায় একটা বিষয়ে গিয়ে, শফিকের  উপর জিতে গেল। সেটা হলো, অভির মানসিকতা। তার মনটা একাই উৎফুল্ল হয়ে উঠলো, যাক ছেলের অভিরুচি অন্তত বাবা, দাদার মত হয়নি। এটুকুই তার শান্তি।

এই সেকেলে আর রক্ষণশীলতার পরিবেশে সে যেন হাঁফিয়ে উঠছিল। ছেলে মেয়েকে নিয়ে এই পরিবেশটা ভেঙে দেওয়ার ইচ্ছে সে গোপনে পোষণ করে চলেছে মনে মনে।

টেবিল গোছাতে থাকে পারুল। চাঁপা বলে, মা আমি চা বানাচ্ছি।

চাঁপার মনে একটা  চিন্তার কাঁটা বিঁধে গেল।চাঁপা  আজকের খাওয়ার টেবিলের কথোপকথনের ভেতর থেকে কিসের যেন একটা সংকেত পেল নিজের জন্য। বুঝতে পারলো বাবার মনোভাব।

চাঁপা আজ সিদ্ধান্ত নিল, সে দু এক দিনের মধ্যেই, মাকে সব খুলে বলবে। এই মা ই তার মন বুঝতে পারবে, তাকে রক্ষা করতে পারবে।

আর অবস্থাপন্ন শব্দ টা কানে যেন বড় বেশি করে বাজছে। আজই প্রথম একটা আশঙ্কা তার এত দিনের ডানা মেলা মনকে যেন একটু  সাবধানী করে তুললো।

চলবে …

গল্পের আগের অংশ পড়ুন

অন্তরালে (পর্ব: এগারো)

 

 

 

 

 

নিউজটি শেয়ার করুন







© All rights reserved © 2015 womenwords.com
পোর্টাল বাস্তবায়নে : বিডি আইটি ফ্যাক্টরী লিঃ