শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১০:০৭ পূর্বাহ্ন

অন্তরালে (পর্ব:পাঁচ)

অনন্যা হক  

পারুল আর চাঁপা এক বিছানায় শুয়ে ছিল ।পারুল গল্পের বই পড়তে পড়তে, একটু  তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে গিয়েছিল ।উঠে দেখে মেয়ে নেই পাশে ।

পারুল জানে, কতদূরেই বা যাবে । এই বাড়ি ময় ঘুরবে ,না হলে তিথীর সাথে,  আশেপাশে খেলবে।

তাই তাকে না খুঁজে ছাদে যায় ।ছাদে কিছু ক্ষণ সময় কাটায় ।

নিজের দাম্পত্য জীবন নিয়ে ভাবে।শফিকের কথা ভাবে।ব্যাংকের উচ্চ পদস্থ অফিসার ।কিন্তু শিক্ষা আর যোগ্যতার সাথে, মানসিকতাটা ঠিক যায় না।

কোথায় যেন আধুনিকতা আর উদারতার  অভাব বোধ করে পারুল ।

ছেলে সন্তান, মেয়ে সন্তানের ক্ষেত্রে তার  আচরণের পার্থক্য বেশ চোখে পড়ে  ইদানীং । এমন কি পারুল কেও তার সমান কাতারে মর্যাদা দিতে, কোথায় যেন একটা কুন্ঠা বোধ করে ।

সে  অনেক  আগেই বুঝেছে, তার দাম্পত্য জীবনটা সে যেভাবে ভাবতো, তেমন টা  হয়নি ।

আজ পনেরো বছরের সংসার।ঝগড়া ঝাটিও কম হয়নি।কিন্তু  এখন বোঝে, ঝগড়া, মনোমালিন্য  একটু ছাড় দিলে মিটে যায়।

কিন্তু মানসিকতার ফারাক টা  কোন কিছু দিয়েই  উৎরানো যায় না।

নিজের বাবা, মা, শ্বশুর, শাশুড়ি আরও অনেককে দেখেছে ,সবাই যেন  যোজন যোজন ফারাক নিয়ে সংসার করে যায়।

পারুলও মেনে নিয়েছে, যেন আপোষ করে যাওয়ার আর এক নাম সংসার।

এখনও চাঁপা ফিরলো কিনা ভাবলো।নীচে নামার আগে, ছাদের সামনের দিকে যায় ।চোখ পড়ে লিচু গাছের দিকে ।

বেশ ডালপালা ছড়ানো গাছ।তার ফাঁকফোকর দিয়ে দেখা যাচ্ছে, গোলাপি রঙের ফ্রকের ঝালর।

মানে চাঁপা। অন্য ডালে তিথী বসে ।দুজনে বেশ নিবিষ্ট মনে গল্প করে যাচ্ছে।

না জানি কত রঙের গল্প আছে, দুজনের মনে! এ বয়সের কোন গল্পই পারুল ভোলেনি।

লম্বা লম্বা পা দেখা যাচ্ছে গাছের ডালে ।বারো বছর বয়সে, লম্বা যেন একটু বেশি হয়ে গিয়েছে ।

পারুলেরও একহারা লম্বাটে গড়ন।পারুল ভাবে, মেয়ে তো বড় হয়ে যাচ্ছে দ্রুত ।

হঠাৎ মাথায় এলো, লম্বা পা গুলো যেন কেমন চোখে পড়ছে।চারিদিকে এত এত মানুষের সামনে মেয়ে ঘুরে বেড়ায় ।

মনে প্রাণে আধুনিক হলেও, পোশাকের ব্যাপারে পারুলের শালীনতা বোধ টা বেশ টনটনে।সে শালীনতার ভেতরে একটা সৌন্দর্য খুঁজে পায়।

মনে মনে ভাবে, চারিদিকে যে যুগের পরিবর্তনের হাওয়া, তাতে  বাইরে থেকে প্রভাবিত হওয়ার আগে, মেয়ে কে নিজেই প্রভাবিত করতে হবে ।

সে নীচে নেমে আসে।কাপড় গোছাতে গোছাতে ভাবে, কালই মেয়েকে দোকানে নিয়ে যেতে হবে।

পোশাক পাল্টে দেবার সময় হয়ে গিয়েছে ।

সন্ধ্যায় ছেলে মেয়ে একসাথে বাসায় ঢোকে।পারুল রাহেলা কে ডেকে বলে, ওদের দুজনের নাস্তা দাও, আর আমার চা টা বানাও।

টিচারের নাস্তা টা আলাদা করে রেখে দিও।

টিচার  এলে মাঝখানের ঘর টা তে সব সময় পড়তে দেয়,যাতে পারুল যেখানেই থাকুক, ছেলে মেয়ে কে দেখা যায়, বিশেষ করে মেয়ে কে।

পারুল এবার নিজের চা টা নিয়ে বারান্দায় বসে। সুন্দর চাঁদ, আকাশে হালকা মেঘের ফাঁকে ফাঁকে ভেসে বেড়াচ্ছে ।

গুনগুন করে, সেই ঘুম ঘুম চাঁদ গান টা মনে ভেসে ওঠে ।একাই গাইতে পারতো, ইচ্ছে থাকলেও শিখতে দেয়নি মা।

একটু বিষন্ন হয়ে যায়। মনের গহীনে যাকে যত্ন করে রেখে দিয়েছে, আজ এই অবসরে, তাকে খুব মনে পড়ে ।

পারুল যখন বেশী অসুখী বোধ করে,  সে যেন এত ঝামেলার ভেতরেও মনে এসে হানা দেয়।

সেই মুক্তমনা, উদাসী ছেলেটা আবীর। অনেক স্বপ্ন দেখিয়েছিল তাকে ।

একটা ক্ষোভ ভেতর থেকে উথলে ওঠে।

পারুল ভাল ছাত্রী ছিল। বাবা তাকে নিয়ে অনেক উচ্চাশা করেছিলেন। কিন্তু তার মা একদিন ছাদে দাঁড়িয়ে তার আবীরের চিঠি পড়া দেখে ফেলে।

তখন পারুল বি এ পড়ে। সামনে পরীক্ষা ছিল ।মা খুব কঠিন হৃদয়, জেদী মহিলা ।সে খুব দ্রুত,  তার এই দূর সম্পর্কের ভাই এর ছেলে, শফিকের  সাথে বিয়ে ঠিক করে ফেলে।

বাবা ,মেয়ে কেউ মায়ের প্রতাপের সাথে পারেনি ।এই ছেলের বাড়ি থেকে আগেই মুখিয়ে ছিল।

বি এ পরীক্ষার পর, পারুলের বিয়ে হয়ে যায়। সেই থেকে সে মায়ের  উপর একটা ক্ষোভ পুষে নিয়ে চলে ।

আবীর কে সে ভুলতে পারে না। সে হেলাফেলা করার ছেলে ছিল না। একটু অপেক্ষা করলেই প্রতিষ্ঠিত হতে পারতো।

আজ যার ঘর করছে, তাকে বাহ্যিক ভাবে দেখলে সবই ভাল।কিন্তু পারুল তার ভেতরটা জানে, তার সাথে তার মানসিকতার  অমিলটাই বেশী।

এ তো কিছু দিয়েই পূরণ হবার নয় ।

পারুল চেয়ারের শব্দে সম্বিত ফিরে পেল।তাকিয়ে দেখে, কাপের বাকী চা টুকু ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে।

চলবে …

গল্পের আগের অংশ পড়ুন

অন্তরালে (পর্ব: চার)

 

 

 

নিউজটি শেয়ার করুন







© All rights reserved © 2015 womenwords.com
পোর্টাল বাস্তবায়নে : বিডি আইটি ফ্যাক্টরী লিঃ