You are here
নীড়পাতা > প্রতিবেদন > হাওর পাড়ের আহাজারি

হাওর পাড়ের আহাজারি

তাজরিয়ান পলি

হাওর পাড়ে আহাজারি চলছে চলুক, নববর্ষ উদযাপনের প্রস্তুতি চলছে। কৃষকের মুখের অন্ন, পরনের বস্ত্র লুণ্ঠনকারী বুর্জোয়ারা প্রস্তুত। তারা প্রস্তুত ময়ূরের পেখম লাগিয়ে কাক থেকে একদিনের ময়ূর হওয়ার জন্য। বাঙালি সংস্কৃতির ইমোশনকে কাজে লাগিয়ে বসবে সংস্কৃতির হাট। একদিনের খড়ের ঘরে বসে পান্তা ইলিশ খাওয়া আর মাথায় বাশেঁর ছাতা ও গামছা বেঁধে কৃষক সাজার মহড়া চলছে।
হাওর পাড়ের কৃষকের পেটে আগুন জ্বললে জ্বলুক, সেখানে রাতে ‘বাত্তি নিবাইয়া জোসনা উৎসব’ হবে, রঙিন নৌকায় হাওরে গিয়ে নৌবিহার হবে, ভুখা-নাঙ্গা হাড্ডিসার মানুষগুলো রাজ্যের বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থাকবে।

উন্নয়নের মহাসড়কে এগিয়ে চলছে দেশ! এ মহাসড়কের যাত্রী হচ্ছেন, উপর তলার বাসিন্দারা। হাওর এলাকার মানুষ এ মহাসড়কে উঠতে পারছে না। হাওরের আফাল ডিঙিয়ে, কাঁদামাটি লেপ্টা শরীরের মানুষগুলোর এ মহা সড়কে উঠা বারণ। হামাগুড়ি দিয়ে উঠতে চাইলেও উপর তলার মানুষরা তাদের ঠেলে ফেলে দিচ্ছে। কারণ হাওরের ভুখা-নাঙ্গারা উন্নয়নের এ মহাসড়কে উঠে গেলে উপর তলা আর নীচতলা বলতে কিছু থাকবে না।

কয়েকদিন থেকে হাওর পাড়ে চলছে কারবালার মাতম। দুর্বল বাঁধ ভেঙ্গে ইতোমধ্যে বিভিন্ন হাওরের কাঁচা ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। সারা বছরের খোরাক, চিকিৎসা, বস্ত্র, বিয়ে শাদি সবই গেছে বানের জলে ভেসে। গত কয়েক বছর থেকে এ শনির দশা কাটছে না হাওর পাড়ের কৃষকের। বছর বছর ফসল খুইয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছে একেকটি কৃষক পরিবার। প্রাকৃতিক বিপর্যয় কৃষকদের জন্য নতুন নয়। বৈরী প্রকৃতির সাথে লড়াই করেই একসময় তারা সোনার ফসল ঘরে তুলেছে। এদেশকে কৃষি প্রধান দেশের খ্যাতি এনে দিয়েছে। কৃষকের শিরা-উপশিরায় সঞ্চালিত ফোঁটা ফোঁটা রক্তই ফুয়েল হয়ে এ দেশের অর্থনীতির চাকা সচল হয়েছে। খাদ্যে স্বয়ং সম্পূর্ণ বাংলাদেশ হয়েছে।

হাওর ভরা সোনার ধান তলিয়ে যাচ্ছে, এর কারণ কেউ খতিয়ে দেখে না। ফসল রক্ষার জন্য কোটি কোটি টাকার বরাদ্দ হয়, সেই টাকা কোথায় যায় তার খোঁজ কেউ রাখে না। সোনার তরীর ন্যায় হাওর ভরা সোনার ধান যখন ডুবে তখন অসহায় কৃষক মাতম করে। এ মাতম দেখে না আমাদের বুর্জোয়া শ্রেণীর পালিত মিডিয়া। কৃষকের দুঃখ- দুর্দশার লাইভ সম্প্রচার হয়না, দুর্ভাগা কৃষকের কান্না ভদ্রলোকদের পাড়া আর হেরেমে পৌছেনা।
সুনামগঞ্জ জেলার নদ-নদী গুলো একে একে মরে যাচ্ছে। পলি ভরাট হয়ে হাওরের প্রাণ এসব নদী, নালা ও খালবিল পানি ধরে রাখতে পারছে না। তার উপর অপরিকল্পিত বাঁধের কারণে পানি প্রবাহ বাঁধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। যার কারণে সামান্য বৃষ্টিপাত হলেই নদী পানি ধরে রাখতে পারে না। নদীর পানি উপচে হাওরে প্রবেশ করে ফসল তলিয়ে যায়।

হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণে প্রতি বছর সরকার কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে থাকে। এবছর সুনামগঞ্জের হাওর রক্ষা বাঁধের জন্য প্রায় ৫৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। প্রতি বছরই দেখে আসছি, সরকার টাকা বরাদ্দ করে নির্দেশ দেয় ১৫ ডিসেম্বর থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারীর মধ্যে বাঁধ গুলো নির্মাণ করতে হবে। এবং প্রতিটি বাঁধ পরিকল্পিত ভাবে করার জন্য প্রজেক্ট ইমপ্লিমেন্টেশন কমিটি(পিআইসি) ও ঠিকাদারকে দায়িত্ব দেয়া হয়। কৃষকদের মুখে একটি অভিযোগ শুনা যায়, কাজের দায়িত্ব প্রাপ্তরা প্রতি বছর একটি সময়ের জন্য অপেক্ষায় থাকেন। ডিসেম্বর ফেব্রুয়ারী চলে যাবার পর মার্চের শেষ ভাগে (চৈত্র মাস) যখন ঝড় বৃষ্টি শুরু হয় তখন তাড়াহুড়ো করে তারা কাজে হাত দেয়। সল্প সময়ে বাঁধের পাশ থেকে নামকাওয়াস্তে মাটি ফেলে খাতা কলমে প্রকল্প সম্পন্ন দেখিয়ে নিজেরা টাকা আত্মাসাত করে। আর সামান্য বৃষ্টিপাত হলেই বাঁধের নতুন মাটি ধুয়েমুছে গিয়ে পানি হাওরে প্রবেশ করে। তোড়জোড় করে ফেলা বাঁধের বালিমাটি এভাবে বছরের পর বছর হাওরে গিয়ে হাওর আর কৃষককে ধ্বংস করছে। এভাবে প্রতি বছর রেওয়াজ মতো বাঁধের টাকা বরাদ্দ হয় আর হরিলোট চলে।এসব দেখে চোখের পানি ফেলা ছাড়া অভাগা কৃষকের আর কিছু করার থাকে না।

সমুদ্র উপকুলবর্তী মানুষের উন্নয়নে যেভাবে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে, হাওর পাড়ের কৃষকদের দিকে সেই নজর পড়ছেনা। একটি হাওর উন্নয়ন বোর্ড আছে, কিন্তু এর কোন কাজ নেই। হাওর নিয়ে টেকসই উন্নয়নের কোন পরিকল্পনা নেই। বছর বছর বাঁধ রক্ষার নামে কিছু বরাদ্দ আসে আর দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের পকেট ভারি হয়।

কৃষকের এ কান্না দেখেও না দেখার ভান করলে চলবেনা। মনে রাখতে হবে, অবহেলিত কৃষক সমাজ ঝড়, বৃষ্টি বর্ষা-বাদল উপেক্ষা করে ফসল উৎপাদন করে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে। বর্তমানে কৃষি খাতে দেশের যে অগ্রগতি বা খাদ্য উদ্বৃত্ত সেটা কৃষকের অবদান। তারাই আমাদের অন্নের জোগানদাতা।

তাদের অভুক্ত রেখে বঞ্চিত করে কোনো সমাজ এগিয়ে যেতে পারে না। তাদের হাসি, কান্না, দুঃখ, বেদনা তথাকথিত শিক্ষিত ভদ্র সমাজকে অনুধাবন করতে হবে। কৃষকরা তথাকথিত ভদ্রলোকদের তুলনায় অত্যন্ত কর্মঠ, সততাই তারা সমুজ্জ্বল। কারণ দুর্নীতির খাতায় তাদের নাম নেই, আছে সততার খাতায়। মানুষকে ঠকানোর খাতায় তাদের নাম নেই, আছে মানুষ ও সমাজের উন্নতি ও সমৃদ্ধির খাতায়। ‘হে মোর দুর্ভাগা দেশ, যাদের করেছ অপমান, অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান।’

 

Similar Articles

Leave a Reply