You are here
নীড়পাতা > প্রতিবেদন > শেকড় ( ১)

শেকড় ( ১)

Your ads will be inserted here by

Easy Plugin for AdSense.

Please go to the plugin admin page to
Paste your ad code OR
Suppress this ad slot.

অনন্যা হক

মাধবী বসে আছে বাবার বাড়ির বারান্দায়।দুপুরে খেয়ে তখন থেকে এই বারান্দায় বসে, বাড়ির অন্য সবাই যার যার কাজে। অন্য ভাই বোনেরাও এসেছে, অনেক দিন পরে এক সাথে বাড়িতে এল সবাই। মাধবীর কিছু টা সময় এমন একা থাকতে ভাল লাগে, তার নিজের মত করে কত কিছু ভাবনা আছে, যার জন্য সে এই একাকীত্ব কে বেছে নেয়। বাড়ির চারিদিকে নারিকেল, সুপারি, আম, মেহগনি বিভিন্ন ধরনের গাছে ঘেরা।হেমন্তের বিকালের নরম রোদ গাছের শাখার ফাঁকফোকর দিয়ে বাড়ির আঙিনায় এসে পড়েছে।ছায়া আর রোদের একটা খেলা ভাল লাগছে দেখতে।চড়ুই পাখি গুলো কিচিরমিচির করতে করতে এ ডালে সে ডালে ছুটোছুটি করছে। আজ চল্লিশ বছর ধরে এই মনোরম দৃশ্য দেখে আসছে।এ এক অদ্ভুত ভাল লাগা, যা একাকীত্ব কে আরো জমিয়ে অনুভব করাতে পারে। মাধবী আনমনে বসে দেখছিল আর ভেসে যাচ্ছিল অনেক পুরোনো স্মৃতির ভেতরে। বাড়ির সাথে লাগোয়া, এক প্রাচীর এর ব্যবধানে এক প্রতিবেশীর বাড়ি।হঠাৎ প্রাচীর এর উপর দিয়ে চোখ গেল ও বাড়ির ছাদের দিকে।ঐ বাড়ির গৃহকর্ত্রী হাসির মা ছাদে বসে ডাল নাড়ছে।বয়স আশির কোঠায় হবে। অনেক কর্মঠ নারী ছিল বরাবর, তাই এখনও এমন শক্তপোক্ত আছে। মাধবী দেখলো একটু ঝুঁকে হেঁটে ছাদ থেকে নেমে গেল।মাধবীর মনে ইচ্ছে হলো, যাই তার সাথে একটু কথা বলে আসি।কত দিন পাড়া দেইনি ঐ বাড়ির মাটিতে ,অথচ একসময় ছোট থাকতে এই দাদি কে কত জ্বালিয়েছি তার গাছের বরই আর তেঁতুলের জন্য।

মাধবী গিয়ে ঢোকে ঐ বাড়ি তে, গেট টা খোলাই ছিল।দেখে হাসির মা বারান্দায় বসে আছে পানের বাটা সামনে, সুপারি কাটছে। মাধবী কাছে গিয়ে বসে। বারান্দায় একটা ছোট চৌকি পাতা ছিল সেই আগে থেকে, সেখানে। বলে দাদি চিনতে পারেন, কেমন আছেন? এই নারী কে তারা সব ভাই বোনেরা দাদি বলেই ডাকে। সে মুখ ফিরিয়ে তাকায়, একটা হাসি দিয়ে বলে তুমি কবে এলে, কতদিন দেখি না তোমারে! আছি ভাল, এ বয়সে যেমন থাকে সবাই। তোমার বাচ্চা কাচ্চা কই, আননি কেন সাথে, ওদের তো দেখলাম না কোন দিন। বড় হয়ে গেছে না? শুনেছি তোমার দুই বাচ্চা, সেই এতটুকু মেয়ে, তুমি এখন কত বড় হয়ে গেছ। হ্যা দাদি, আছে সবাই ঘরে, এক সাথে গল্প করছে। আমার ইচ্ছে করলো তাই আপনাকে একটু দেখতে এলাম। এত ফাঁকা বাড়ি কেন, আর কেউ থাকে না? কে থাকবে, ছেলে দুটো তো অন্য শহরে চাকরি করে।তোমার দাদা মারা যাওয়ার পর আজ পাঁচ বছর আমি এখানে একা। মাধবী জিজ্ঞাসা করে, আপনার মেয়েরা আসে না বাড়িতে, তাদের কাউকে অনেক দিন দেখিনা।সব তো আশেপাশের গ্রামে বিয়ে হয়েছিল, দেখিনা কেন? তারা আছে তাদের সংসার নিয়ে ব্যস্ত, কিভাবে আসবে, বলে আর তাদের নিয়ে কথা বাড়ায় না, কেমন যেন একটু এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা বোঝে মাধবী। মাধবীর হঠাৎ মনে হলো, এই নারীর নাম কি, কোন দিন তো জানতে পারলাম না, এত বছর ধরে এত কাছে থেকেও।শুধু হাসির মা বলেই বছরের পর বছর চিনে এল সবাই। তার তো একটা নিজের নাম ছিল, বাবা, মা রেখেছিল, হয়তো কত আদরে এক সময় নাম ধরে ডাকতো। কি জানি নিজেরই মনে আছে কিনা, হয়তো সেই ছোট থেকে এই সংসারে ঢুকে নিজের নাম টাই হারিয়ে ফেলেছে! বাবার বাড়ি তে যেতেও তেমন দেখা যেত না কখনও, বাড়ি থেকে কাউকে খুব একটা আসা যাওয়া করতেও দেখা যায়নি।শুধু অসম্ভব নিষ্ঠার সাথে একভাবে আষ্টেপৃষ্টে সংসার করে যেতে দেখেছে। মাধবী ভাবে, এদের ভেতরের মন টা কে কিভাবে পড়া যায়, জানা যায়।খুব জানতে ইচ্ছে করে তার ভেতরের কথা মাধবীর।তার যেমন নিজের অস্তিত্ব, শেকড়, স্মৃতির জন্য হাহাকার আছে ভেতরে, এই নারীর কি এমন কোন অনুভব কাজ করে না? মাধবী বলে, দাদি আপনার নাম টা বলেন না। দাদি হেসে বলে, কেন রে বোন, এই এত বছর পর, মরার আগে আমার নাম টা তোমার জানতে ইচ্ছে করলো বোন? আমার নাম রাফেজা, নিজেই তো ভুলতে বসেছিলাম, কেউ তো ডাকে না কত বছর এই নাম ধরে। সেই দশ বছর বয়স পর্যন্ত বাবার বাড়ি তে, এই নাম টা শুনেছি নিজ কানে ডাকতে।এর পরে এই সংসারে ঢুকে হয়ে গেলাম সালামের বউ, এরপর থেকে হাসির মা।এই তো এখন আমার পরিচয় । রাফেজা খাতুনের চার মেয়ে, দুই ছেলে।সবাই দূরে থাকে।এত বড় বাড়ি তে সে একা আজ পাঁচ বছর ধরে।অনেক জায়গা নিয়ে বাড়ি।চারিদিকে গাছ গাছালি তে ভরা।দেখে মনে হচ্ছে না, কোন কিছু তে ভয় আছে তার।কোন একাকীত্ব, কোন হাহাকারের ছাপ নেই চেহারা তে। মাধবীর মনে অনেক প্রশ্ন খেলে যায়, জানতে ইচ্ছে করে এই অদ্ভুত রমনীর মনের গহীনের কথা। এই বাড়ির মেয়ে গুলো যখন বড় হচ্ছে একে একে, কারো বা বিয়ে হয়েছে, মাধবী তখন অনেক ছোট, একেবারে কিশোরী বেলা। অনেক আদর করতো তারা।খুব মনে পড়ে মাঝে মাঝে সেই হারিয়ে যাওয়া মুখ গুলো।খুব কাছের কোন গ্রামেই তাদের বসবাস, তবুও বহু বছর ধরে তাদের কোন ছায়া এ বাড়ি তে দেখা যায় না, তাদের কারো কন্ঠ শুনতে পায়নি মাধবী। কিন্তু এ বাড়ির ছেলেদের কন্ঠ শোনা যায় ,তাদের কে বাড়ির আনাচে কানাচে দেখাও মেলে। মাধবীর মনে প্রশ্ন জাগে,কেন এ বাড়ির মেয়ে গুলো বাড়ি তে আসে না, কেমন আছে তারা? কেন মায়ের সংস্পর্শে তারা আসে না, কেমন লাগে তাদের মনের ভেতরে এমন শেকড় ছাড়া হয়ে থাকতে? তাদের কে এমন নাড়ি ছাড়া, অস্তিত্ব হীন করলো কে, তাদের বাবা, মা, নাকি ভাইয়েরা? আজ কেন এই বুড়া বয়সে তাদের মা একেবারে একা দিনের পর দিন, এই ফাঁকা, নির্জন বাড়ি তে শুধু ছেলেদের পথের দিকে তাকিয়ে বসে থাকে, তারা কবে আসবে, শুধু তারাই তাকে সঙ্গ দেবে? দেখে মনে হলো, কথা শুনে মনে হলো, মেয়েদের সঙ্গ পেতে সে তেমন আগ্রহী বা উন্মুখ নয়। সে এক নিবিষ্ট মনে পাহারা দিয়ে আগলে রাখছে যেন তার ছেলেদের অস্তিত্ব। তার মেয়ে গুলো তার আশেপাশে ঘুরবে, কাছে কোল ঘেঁষে বসবে, মা বলে ডাকবে, এমন কোন পিপাসা কি তার হয় না কখনও? এই সংসারের রাজত্বের মায়াজালে সে এমন ভাবে আবদ্ধ যে কন্যা সন্তানের বুকের হাহাকার, তৃষ্ণা কিছুই তাকে স্পর্শ করে না। মাধবী কে জানতে হবে অনেক প্রশ্নের উত্তর, তাদের সকলের মনের কথা, কি তাদের হিসাব নিকাশ !

Similar Articles

Leave a Reply