সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলায় হাবিবুল্লানগর ইউনিয়নে  তৃতীয় শ্রেণির এক ছাত্রীকে ধর্ষণের ঘটনায় দুই দফা সালিস বসিয়েছেন গ্রাম্য মাতব্বররা। সালিসের রায় মানতে শিশুটির পরিবারকে বাধ্য করা হচ্ছে। কিন্তু পুলিশ এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। আইন অনুযায়ী, নারী নির্যাতনের ঘটনা সালিসে বিচার করা যায় না।

এলাকাবাসী ও পরিবার সূত্রে জানা গেছে, হতদরিদ্র কাঠমিস্ত্রির আট বছরের শিশুকন্যা গত ৮ সেপ্টেম্বর সকালে পাশের বাড়ির টিউবওয়েলে পানি পান করতে যায়। এ সময় প্রতিবেশী পরেশ চন্দ্র সূত্রধরের ছেলে সুমন কুমার সূত্রধর (২০) শিশুটিকে তুলে নিয়ে যায়। নিজ বাড়ির নির্জন একটি ঘরে আটকে রেখে  ধর্ষণে করে সে পালিয়ে যায়। ফলে শিশুটি অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে। ওই দিন মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে শাহজাদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়।

উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাফরুল ইসলাম বলেন, শিশুটির গোপনাঙ্গ মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তিনটি সেলাই দিতে হয়েছে। পরে তাকে আরো উন্নত চিকিৎসার জন্য সিরাজগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে এখান থেকে ছাড়া হয়।

পরবর্তীতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অর্থাভাবে শিশুটিকে আর উন্নত চিকিৎসা দিতে পারেনি তার পরিবার। ফলে অবহেলা আর অযত্নে টোটকা চিকিৎসা নিয়ে শিশুটি নিজ বাড়িতে প্রায় গৃহবন্দি জীবন যাপন করছে। ঘটনার পর লোকলজ্জার ভয়ে বিদ্যালয়ে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে সে।

মেয়ের পরিবার আরো জানায়, গত ১৩ সেপ্টেম্বর বিকেলে রবীন্দ্রনাথ রায়, চিত্ত রায়, সিন্ধু চন্দ্র রায়, সুকুমার রায় ও আইয়ুব আলীর নেতৃত্বে সাত-আটজন গ্রাম্য মাতব্বর সালিস বৈঠকে বসেন। সালিসে তারা দুটি সিদ্ধান্ত নেন।—এক. অভিযুক্ত যুবক শিশুটির নামে দেড় শতাংশ বাড়ি লিখে দেবে এবং দুই. শিশুটি সাবালিকা হওয়ার পর ওই যুবকের সঙ্গে বিয়ে হবে। এ রায় উভয় পক্ষ মেনে নেয়। কিন্তু এ রায়ের বিপক্ষে অবস্থান নেন রবীন্দ্রনাথ রায় নামের এক মাতব্বর। তিনি উত্তেজিত হয়ে বৈঠক থেকে উঠে যান। এতে ওই বৈঠক সে দিনের মতো ভেঙে যায়।

এরপর গত ১৬ সেপ্টেম্বর রাতে প্রথম বৈঠকের মাতব্বররাই দ্বিতীয় দফা সালিস বৈঠক বসেন। তারা দ্বিতীয় বৈঠকে অভিযুক্তকে ৭০ হাজার টাকা জরিমানা করেন। বিয়ে ও বাড়ি লিখে দেওয়ার শাস্তি বাদ দেওয়া হয়। মেয়ের বাবা এ রায় মেনে না নিয়ে বৈঠক থেকে চলে আসেন।

মেয়ের মা অভিযোগ করেন, ‘মামলা বা বাড়াবাড়ি না করতে আমাদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে।’

মেয়ের বড় চাচা অভিযোগ করেন, ‘আমাকে এ বিষয়ে মাথা না ঘামানোর জন্য হুমকি দেওয়া হচ্ছে।’

মেয়ের বাবা বলেন, ‘অভিযুক্ত পরিবার ও প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তি ৭০ হাজার টাকা নিয়ে মীমাংসার কথা বলছে। আমি সে টাকা না নেওয়ায় প্রভাবশালী মহল আমার ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছে। তাই অসুস্থ মেয়েকে নিয়ে আমি এখন অনেকটা গৃহবন্দি জীবন যাপন করছি।’

স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা নাজমা আক্তার বলেন, ‘মেয়েটি আমার বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। লজ্জা, ভয় ও অসুস্থতার কারণে সে সাময়িকভাবে বিদ্যালয়ে আসছে না। তবে সমস্যা কেটে গেলে তাকে আবার বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে আনা হবে।’

এলাকাবাসী আরো জানান, সুমন কুমার সূত্রধর এর আগে পাশের এনায়েতপুর থানা এলাকার এক শিশুকে ধর্ষণ করে ৩৫ হাজার টাকা জরিমানা দিয়েছে। এ ব্যাপারে এলাকাবাসী প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

শাহজাদপুর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘খবর পেয়ে থানা থেকে পুলিশ পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু তারা মামলা করতে রাজি হয়নি। তারা মামলা করলে আমরা আইনানুগ ব্যবস্থা নেব।’

শাহজাদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শামীম আহমেদ বলেন, ‘বিষয়টি জানি। এ মাসের ২৯ তারিখে উপজেলা আইনশৃঙ্খলা সভায় বিষয়টি উত্থাপন করব। শাহজাদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রেজাউল হকের সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

সূত্র: কালের কন্ঠ

Similar Articles

Leave a Reply