You are here
নীড়পাতা > প্রতিবেদন > রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে ইউনেস্কো’র আনুষ্ঠানিক আপত্তি!

রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে ইউনেস্কো’র আনুষ্ঠানিক আপত্তি!

reza-gotok-women-wordsরামপালে প্রস্তাবিত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ নিয়ে এবার আনুষ্ঠানিকভাবে আপত্তি জানিয়েছে ইউনেস্কো। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা (ইউনেস্কো) বাংলাদেশ সরকারকে ৫০ পৃষ্ঠার এক লিখিত প্রতিবেদনে এই আপত্তির কথা জানিয়েছে। ইউনেস্কো বলেছে, রামপালে প্রস্তাবিত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মিত হলে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সুন্দরবন ও এর জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য সরকার যে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (এভায়রনমেন্টাল ইমপ‌্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট বা সংক্ষেপে ইআইএ) করেছে, সেটিও আন্তর্জাতিক মানের হয়নি বা অসম্পূর্ণ রয়েছে। এজন্য ইউনেস্কো’র ওই লিখিত প্রতিবেদনের বিষয়ে আগামী ১১ অক্টোবরের মধ্যে সরকারের মতামত চেয়েছে সংস্থাটি। পাশাপাশি প্রস্তাবিত বিদ্যুৎকেন্দ্রটি রামপাল থেকে অন্যত্র সরিয়ে নেবার জন্য সরকারকে পরামর্শও দিয়েছে ইউনেস্কো।

আগামী ২৪ থেকে ২৬ অক্টোবর ফ্রান্সের প্যারিসে বসছে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ কমিটির ৪০তম অধিবেশন। ওই অধিবেশনে সুন্দরবন থেকে মাত্র ১৪ কিলোমিটার দূরত্বে প্রস্তাবিত রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। ১৯৯৭ সালে সুন্দরবনকে বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ কমিটি। এর আগে ইউনেস্কোর ওই কমিটি গত বছরের জুলাই মাসে জার্মানিতে অনুষ্ঠিত ৩৯তম অধিবেশনেও রামপালে প্রস্তাবিত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সুন্দরবনের ক্ষতি করবে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল।

জার্মান অধিবেশনের পর চলতি বছর ২২ মার্চ ইউনেস্কো’র তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল এক সপ্তাহের জন্য বাংলাদেশ সফর করেছিল। ওই প্রতিনিধিদলে ছিলেন আন্তর্জাতিক সংস্থা আইইউসিএন (ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার)-এর প্রতিনিধি নাওমি ডোয়াক, মিজুকি মুরাই ও বিশ্ব ঐতিহ্য সেন্টারের ফানি অ্যাডলফাইন ডাউবিরি। বাংলাদেশ সফরকালে ওই বিশেষজ্ঞদল বিদ্যুৎ বিভাগ, পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধিদলের সঙ্গে ওই বিশেষজ্ঞদলের বৈঠক হওয়ার কথা থাকলেও রহস্যময় কারণে সেটি তখন হয়নি। ওই প্রতিনিধিদলের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল রামপালে প্রস্তাবিত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ হলে সেটি পরিবেশ ও সুন্দরবনের উপর কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে তা যাচাই বাছাই করা। ২৯ মার্চ ওই প্রতিনিধিদলটি বাংলাদেশ ছেড়ে যাওয়ার প্রায় পাঁচ মাস পর তাঁদের এ-সংক্রান্ত তৈরি করা প্রতিবেদনটি গত ১১ আগস্ট সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে পাঠিয়েছে ইউনেস্কো।

এর আগে রামাপালে প্রস্তাবিত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল জাতিসংঘের আরেক সংস্থা রামসার সেক্রেটারিয়েট। এ ছাড়া গত মাসে বিশ্বের অন্তত ১৭৭টি সংস্থা রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে অর্থায়ন না করার জন্য ভারতের এক্সিম ব্যাংকের কাছে চিঠি দিয়ে অনুরোধ জানিয়েছে। উল্লেখ্য, শুরু থেকেই সুন্দরবনের পাশে রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের বিরোধিতা করে আসছে বাংলাদেশের পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো। পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রামপালে প্রস্তাবিত কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্পের বিরোধীতায় বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো মানববন্ধন করছে। কিন্তু সরকার পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর এই বিরোধীতাকে মূল্যায়ন না করে বরং এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে এখনপর্যন্ত দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

বিদ্যুৎ বিভাগের ওয়েব সাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই প্রকল্পের নাম বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি (প্রা.) লি.। এর সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠান হচ্ছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) এবং এনটিপিসি লি. ইন্ডিয়া। রামপালে প্রস্তাবিত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ১.৬৮ বিলিয়ন ডলার (বা ১৪ হাজার ৫১০ কোটি টাকা)। যার ৭০ শতাংশ ব্যাংক ঋণ থেকে নেয়া হবে, মানে এটি এখন দিতে যাচ্ছে ভারতের এক্সিম ব্যাংক। অবশিষ্ট ৩০ শতাংশের ১৫ শতাংশ অর্থ দেবে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) এবং বাকি ১৫ শতাংশ অর্থ দেবে ভারতের ন্যাশনাল থারমাল পাওয়ার করপোরেশন (এনটিপিসি)। এই প্রজেক্ট একটি কোম্পানি আইনে চলবে। এই কোম্পানির মালিকানা বিপিডিবি ৫০ শতাংশ ও এনটিপিসি ৫০ শতাংশ)।

ইউনেস্কো’র ওই প্রতিবেদনে সুন্দরবনকে বিশ্ব ঐতিহ্যের ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ স্থান হিসেবে ঘোষণা দেওয়ারও মত আভাস রয়েছে। ইউনেস্কো ওই প্রতিবেদনে বলেছে, বাংলাদেশ সরকার রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন বা ইআইএ করেছে এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড জিওগ্রাফিক্যাল ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস) নামের একটি সংস্থাকে দিয়ে। ওই ইআইএ রিপোর্ট আন্তর্জাতিক মানের হয়নি। তাতে পরিপূর্ণ সঠিক চিত্র উঠে আসেনি। রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মিত হলে ওখানকার ইকোসিস্টেমের উপর প্রবল নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এজন্য রামপালে প্রস্তাবিত স্থানে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ না করার পক্ষে মতামত দিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি অন্যত্র সরিয়ে নিতে অনুরোধ করেছে ইউনেস্কো। পাশাপাশি সুন্দরবনকে ঘিরে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের বড় বড় পরিকল্পনা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ইউনেস্কো।

ফারাক্কা বাঁধের কারণে উজান থেকে ভাটিতে পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় বাংলাদেশ বিভিন্নভাবে সমস্যায় পড়ছে বলে ইউনেস্কো’র ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মিত হলে ভারত থেকে পানির প্রবাহ আরো কমে যাবার আশংকাও প্রকাশ করা হয়েছে সেখানে। পাশাপাশি ভারতের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে বৈঠক করে সমঝোতার মাধ্যমে পানির প্রবাহ বাড়ানোর সুপারিশ করেছে ইউনেস্কো। সরকারের কাছে ওই প্রতিবেদনটি পাঠিয়েছেন ইউনেস্কো’র ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সেন্টারের পরিচালক ম্যাকটিল্ড রোসলার।

পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের বিরোধীতা যখন প্রবল আন্দোলনের দিকে গড়াচ্ছে এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে যখন এই প্রকল্পের কারণে সুন্দরবন ক্ষতিগ্রস্থ হবার আশংকা প্রকাশ করা হচ্ছে, তখন সরকার এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করার জন্য অনড় অবস্থান নিয়েছে। এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট (৬৬০ মেগাওয়াট করে দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র) বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পটি সুন্দরবন থেকে দূরে সরিয়ে না নেওয়ার জন্য সরকারের এই একঘুয়েমির পেছনে রয়েছে এই প্রকল্পকে ঘিরে প্রজেক্ট এলাকার আশেপাশে এখন যে অসংখ্য শিল্প প্রজেক্ট গড়ে ওঠার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, সেই প্রভাবশালী মহলের সরাসরি চাপ। যা ধীরে ধীরে সুন্দরবনকে গিলে ফেলে সেখানে ‘সুন্দরবন শিল্পাঞ্চল’ গড়ে তুলবে। সুন্দরবন ধ্বংস করে ‘সুন্দরবন শিল্পাঞ্চল’ গড়ে তোলায় যাদের বেশি আগ্রহ, তাদের প্রবল চাপের কারণেই সরকার এই প্রকল্পে এখনপর্যন্ত অনড় অবস্থান নিয়েছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

বিগত ৪৫ বছর আমাদের চোখের সামনে যেখানে বুড়িগঙ্গা নদীর দূষণ বন্ধ করতে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ দেখেছি বাংলাদেশের সরকারগুলোকে, সেখানে রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্পের পক্ষে সরকার যতরকমের হাজার কিসিমের যুক্তিই দিক না কেন, চোখের আড়ালে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র একদিন সুন্দরবনকে ধ্বংস করে ছাড়বে, এই আশংকার কী জবাব দেবে সরকার! সরকার যেটি বুঝতে এখনো ব্যর্থ হচ্ছে সেটি হলো- বিদ্যুৎ প্রকল্পের কেউ বিরোধীতা করছে না, সুন্দরবনকে বাঁচাতে এই প্রকল্পটি অন্য কোথাও সরিয়ে নেওয়া হোক। সরকার এই মেসেজটি যতক্ষণ না বোঝার চেষ্টা করবে ততক্ষণ সুন্দরবন নিয়ে উদ্বেগ দূর হবে না।

 

রেজা ঘটক, কথাসাহিত্যিক ও নির্মাতা

………………………………………………………………………………………..
মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। womenwords.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে womenwords.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।

 

 

Similar Articles

Leave a Reply