You are here
নীড়পাতা > নারীর অগ্রযাত্রা > যেভাবে লড়েছি

যেভাবে লড়েছি

জেসমিন চৌধুরী

প্রথম পরিচয়ে কেউ যখন আমাকে প্রশ্ন করেন, ‘আপনি কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন?’ আমি বলি ‘আমি পড়াশোনা তেমন একটা করিনি।’ আমার সখাটি তখন বাঁকা চোখে তাকান, পরে বলেন ‘তুমি এমন করে বলো কেন?’ একটা গভীর অভিমান থেকেই এমন করে বলি।

এসএসসি পাশ করার পর কলেজে ভর্তি হলাম, তার কিছুদিন পরেই একজন দেখতে শুনতে চৌকশ অভিবাসীর সাথে বিয়ে হয়ে বিলেত চলে গেলাম। আব্বা বলেছিলেন, ‘আমাদের দেশের পড়াশোনার কোন দাম নেই, তুমি বিলেতে গিয়ে অনেক ভাল পড়াশোনা করতে পারবে’।

বিলেতে গিয়ে দেখলাম জীবন এতো স্বপ্নিল নয়, বরং অনেক কঠিন। উল্লেখিত অভিবাসীটি দেখতে যত চৌকস আদতে তার চেয়ে অনেক বেশি অর্বাচীন ছিলেন।ইতিমধ্যে বেড়ে উঠা ঋণের বোঝার উপরে তার ফুলটাইম চাকুরীটার কারণে আমার ফ্রি পড়ার সুযোগ বা খরচ করে পড়ার সামর্থ্য কোনটাই ছিল না। বরং আমাকেও তড়িঘড়ি অর্থ উপার্জনে লেগে যেতে হলো। পড়াশোনা হলো না। তারপর কিছুদিনের মধ্যেই মা হয়ে গেলাম। জীবনে সুখের সীমা পরিসীমা থাকলো না।

পরের বছর ছেলেকে নিয়ে দেশে বেড়াতে গিয়ে আমি যখন বাপের বাড়ি আর শ্বশুর বাড়ির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষায় ব্যস্ত, তখন পথেঘাটে পুরোনো ক্লাসমেটদের সাথে দেখা হলে মন ভারাক্রান্ত হয়ে উঠত। তারা সবাই, যাদের অনেকের থেকেই আমার সম্ভবানা অনেক বেশি ছিল, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে। কেউ মেডিকেলে, কেউ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, কেউ শাহজালালে, কেউ বুয়েটে। আমি তখন ছেলের নেপি চেঞ্জিং আর দুধ বানাতেই ব্যস্ত।

এবার বিলেতে ফিরে গিয়ে সুখী বাঙ্গালি রমণীর ভূমিকাটি অসহনীয় মনে হতে লাগল। রাতে ঘুমাতে পারি না। স্বপ্ন দেখি, পরীক্ষা দিচ্ছি কিন্তু লেখায় মন দিতে পারছি না, ছেলে দুধের জন্য কাঁদছে। তারপর নিজেই কেঁদে উঠি ঘুম থেকে। আমার জন্য এই না দিতে পারা এইচএসসি পরীক্ষাটা একটা মানসিক নির্যাতনে পরিণত হলো।

সিদ্ধান্ত নিলাম প্রাইভেটে পরীক্ষা দেব। যেই ভাবা, সেই কাজ। দেশ থেকে বইপত্র আনিয়ে পড়াশোনা শুরু করে দিলাম। রেজিস্ট্রেশনও করা হলো। পরীক্ষার সময় এলে অনেক উত্তেজনা আর আগ্রহ নিয়ে দেশে গেলাম পরীক্ষা দিতে। প্রবেশ পত্র আনতে গিয়ে দেখি আমার নামে কোন প্রবেশ পত্র আসেনি। এসআইএফ নামক একটা নতুন ব্যবস্থা এসেছে যার কথা আমার পরিবারের কেউ জানতেন না। আমার এসআইএফ করা হয়নি কাজেই আমি পরীক্ষা দিতে পারব না। ততদিনে এই পরীক্ষা দেয়ার জন্য ঋণ করে দুইবার দেশে গেছি। আমি গলা ছেড়ে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলাম। রাগে দুঃখে বইগুলো সব কুটিকুটি করে ছিঁড়ে ফেললাম। সবাই শান্তনা দিলেন। আবার চেষ্টা করো। হবে।

পরের বছর থেকে শিক্ষাক্রম পাল্টে যাচ্ছে যার অর্থ হলো আমাকে আবার সম্পূর্ণরূপে নতুন করে পড়তে হবে। নতুন করে সাহসে বুক বেঁধে আবার বইপত্র কিনে নিয়ে বিলেতে ফিরে গেলাম। পরের একবছরে আমাকে আরো দুইবার এই উপলক্ষে দেশে যেতে হলো- একবার এসআইএফ পূরণ করতে, একবার পরীক্ষা দিতে। শ্বশুরবাড়ি থেকে প্রতিরোধ এলো, কোন পাগলে দেশে একটা পরীক্ষা দেবার জন্য এতো টাকা খরচ করে, তা ও যখন সাফল্যের কোন সম্ভাবনাই নেই? এভাবে একা একা পড়ে পাশ করা যায়?

এবার যখন পরীক্ষা দিতে গেলাম, আমি সাতমাসের অন্তঃসত্ত্বা। প্রথম পরীক্ষার দিন আমার পা ফুলে ঢোল হয়ে আছে। কিছুক্ষণ পরপর ইনভিজিলেটরের অনুমতি নিয়ে উঠে হাঁটাহাঁটি করতে হচ্ছে। বিশাল পেটের এক মহিলা পরীক্ষার হলে খটখট করে হাঁটাহাঁটি করছে, মুখ টিপে হাসছে অনেকে। পেছনের বেঞ্চ থেকে একটা মেয়ে বলে উঠল, ‘হায়রে আল্লারে, এইন এবো ফরীক্কা দিরানি?’ (হায়রে আল্লাহ, উনি এখনও পরীক্ষা দিচ্ছেন?) মেয়েটা স্কুলে আমার থেকে কয়েক ক্লাস নীচে পড়ত, এখন তার সাথেই আমি পরীক্ষা দিচ্ছি। কিন্তু কোন বিদ্রুপ, কোন কষ্টই আমার মনোনিবেশ নষ্ট করতে পারলো না। চমৎকার একটা পরীক্ষা দিয়ে বোনের বাসায় ফিরলাম।

সে কী উত্তেজনা! ভাষায় বর্ণনা করার মত নয়। আমি পেরেছি, শেষ পর্যন্ত আমি পেরেছি!! উত্তেজনায় সেদিন রাতে আমার ঘুম হলো না। এক ফোঁটাও না। শেষরাতের দিকে উদ্বিগ্ন হয়ে বোনকে ডাকলাম। উনি এসে আমার মাথায় বিলি কেটে দিলেন, কিন্তু তবু ঘুম এলো না। পরের দিন সারাদিন চেষ্টা করেও একবারও চোখ বন্ধ করতে পারলাম না। আমার আপা ডাক্তারকে ফোন করলেন। ডাক্তার বললেন প্র্যাগনেন্সির কারণে ঘুমের ওষুধ দেয়া যাবে না। সেদিন রাতেও আমার চোখে এক ফোঁটা ঘুমও নেই।

পরদিন বাংলা দ্বিতীয় পত্র পরীক্ষা। দুইদিন দুইরাত না ঘুমিয়ে কীভাবে পরীক্ষা দেব? পড়াশোনাও করতে পারিনি। আমি সব বইপত্র সরিয়ে রাখলাম। এখানেই আমার পড়াশোনার স্বপ্নের ইতি ঘটল বোধ হয়। সবাই ভাবলেন আমার প্রথম পরীক্ষাটি খুব খারাপ হয়েছে, তাই আমার এই অবস্থা। আমি আজো জানি না এমনটা কেন হয়েছিল। যাই হোক, পরদিন সকাল ছয়টার দিকে একটু সময়ের জন্য চোখে ঘুম এল। আটটার দিকে ঘুম ভাঙ্গলে আমি পরীক্ষার হলে ছুটলাম। আপা বললেন, কীভাবে পরীক্ষা দেবে? পড়াশোনা তো একেবারেই করোনি।’ আমার এই পরীক্ষাটি আগেরটার চেয়েও ভাল হলো। এরপর সবগুলো পরীক্ষাই ভাল হলো।

পরীক্ষা শেষে বিলেতে ফিরে গেলাম। তিনমাস পর যেদিন ফলাফল বের হবে, ফোনটা বেজে উঠতেই আমার হাত পা কাঁপতে লাগল। অন্যপাশে আব্বার উত্তেজিত কন্ঠস্বর- ‘তুমি ফার্স্ট ডিভিশন পেয়েছ।’ পেছনে ভাইবোনদের উত্তেজিত কথোপকথনও শুনতে পাচ্ছিলাম। আমার এই কষ্টার্জিত সাফল্য সবার জন্য একটা চমক ছিল কারণ আমার পরীক্ষাগুলো যে আসলেই এতো ভাল হয়েছিল তা কেউ আগে বিশ্বাস করেনি। তখনকার দিনে অবজেক্টিভ বলে কিছু ছিল না, নিয়মিত ছাত্ররাও মানবিক বিভাগ থেকে সহজে ফার্স্ট ডিভিশন পেত না।

বিশ্বাস হচ্ছিল না আমারও, একেবারেই বিশ্বাস হচ্ছিল না। সম্ভব? এও সম্ভব? আনন্দে, কষ্টে, উত্তেজনায় আমার শরীর অবশ হয়ে গিয়েছিল। ততদিন আমার দ্বিতীয় সন্তানেরও জন্ম হয়েছে। পঁচিশ বছর বয়সে অনেক নাটকীয়তার পর অর্জিত এই সাফল্য থেকে জেগে উঠা আকাঙ্ক্ষা পরবর্তিতে আরো অনেক নাটকের জন্ম দিয়েছিল আমার জীবনে যার সবটুকু একসাথে বলতে গেলে পূর্ণদৈর্ঘ্য ছায়াছবি হয়ে যাবে। বাকিটা দ্বিতীয় এপিসোডের জন্য তোলা থাকুক।

 

Similar Articles

Leave a Reply