You are here
নীড়পাতা > প্রতিবেদন > মোহজাগানিয়া কুয়াকাটা

মোহজাগানিয়া কুয়াকাটা

অদিতি দাস

কুয়াকাটা। নামটা মুহূর্তেই মনের গহিনে কেমন রোমাঞ্চ ছড়িয়ে দেয়। নিকষ অন্ধকার কেটে স্নিগ্ধ আলো ছড়িয়ে যখন সেখানে বাংলাদেশের সূর্যোদয় হয়, তখন কি অপার্থিব রূপেই না রাঙা হয়ে ওঠে ‘সাগরকন্যা’। পর্যটকদের কাছে কুয়াকাটা তো ‘সাগরকন্যা’ নামেই অধিক পরিচিত। সমুদ্রসৈকতের বালুকাবেলা, বিশুদ্ধ গ্রামের মেঠোপথ ধরে ছুটে চলা কিংবা সমবেত বহু রঙে বর্ণিল সূর্যাস্ত— সুন্দরবনের পূর্ব প্রান্তের এই অংশকে দিয়েছে আলাদা স্বকীয়তা। তবে এসব ছাপিয়েও ভ্রমণপিপাসুদের কাছে আরো আবেদনময়ী হয়ে ওঠে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ সৈকতটি।

প্রকৃতির এ অপার সৌন্দর্য অবলোকন করতে প্রতি বছর অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত কুয়াকাটায় পর্যটকদের আনাগোনা থাকে সবচেয়ে বেশি। এ সময়টায় কুয়াকাটার হোটেল, মোটেল, বাসাগুলোর ভাড়া বেশি থাকে। বছরের অন্য সময়ে যা অর্ধেক বা তিন ভাগের এক ভাগে নেমে আসে। স্থানীয় দোকানগুলোয় বছরজুড়ে পাওয়া যায় রাখাইনদের হাতে বোনা শাড়ি, গামছা অন্যান্য পোশাক, হস্তশিল্প, বার্মিজ আচার, চকোলেট, নান্দনিক নকশার ক্যাপ প্রভৃতি।

কুয়াকাটায় ঘোরাঘুরির জন্য আছে মোটরসাইকেল, ভ্যান, স্পিডবোট, ইঞ্জিন চালিত নৌকা। মোটরসাইকেল চালিয়েই স্থানীয় যুবকদের অনেকে জীবিকা নির্বাহ করেন। উপকূলীয় অঞ্চলের বাসিন্দাদের প্রধান পেশা মাছ ধরা। এখানেও তার ব্যতিক্রম নয়। মাছ শিকারের পাশাপাশি এখানে শুঁটকির ব্যবসাও রমরমা। সব মিলিয়ে সাগরতীরের কুয়াকাটায় নৈসর্গিক সৌন্দর্যে বাণিজ্যিকীকরণের ছোঁয়া ভালোই টের পাওয়া যায়।

সূর্যোদয় দেখব বলে, সাগরকন্যার সৌন্দর্যে বিমোহিত হবো বলে গত ১৫ মার্চ রাতের বাসে সিলেট ছাড়ি আমরা ছয়জন। পরদিন ভোরে আমরা ঢাকা পৌঁছি। এর পর সোজা সদরঘাট। সেখান থেকে আমাদের জাহাজ ছাড়ল সকাল ৮টা ১০ মিনিটে। একসময় জাহাজটি মেঘনায় প্রবেশ করল। তিনতলা জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে মেঘনা নদীর ধূসর-সাদা রঙের ঢেউ আর গাংচিলদের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে দীর্ঘপথের ক্লান্তি কখন যে কেটে গেল টেরই পেলাম না। যত দূর চোখ যায় শুধু ফেনিল জলরাশি। বরিশাল পৌঁছাতে নৌযানটির লাগল ৬ ঘণ্টা। সময়টুকু কীভাবে যেন কেটে গেল।

মেঘনার বুকে গাংচিল

বরিশাল শহরের রাস্তাঘাট অনেক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন মনে হলো। সন্ধ্যার দিকে বরিশালের বিখ্যাত ব্রজমোহন কলেজে (বিএম কলেজ) ঘুরতে গেলাম স্বল্প সময়ের জন্য। পরদিন সকাল ১০টা থেকে সোয়া ১০টার দিকে বরিশালের রূপাতলী থেকে আমরা কুয়াকাটার বাসে চড়লাম। বিআরটিসি বাসের টিকিট না পাওয়ায় উঠতে হলো লোকাল বাসে। ৩ ঘণ্টায় পৌঁছে গেলাম সাগরকন্যা কুয়াকাটায়।

কুয়াকাটায় যখন পৌঁছলাম, তখন দুপুর। ক্ষুধায় পেট মোচড় দিচ্ছে। সামুদ্রিক মাছ খাওয়ার লোভেই হয়তো তা একটু বেশিই হচ্ছিল। কিন্তু এর আগে কোথাও থিতু হতে হবে। কুয়াকাটায় থাকার জন্য সরকারি ডাকবাংলোর পাশাপাশি ব্যক্তিমালিকানায় গড়ে ওঠা হোটেল, মোটেল ও বাসা পাওয়া যায়। তবে এখানে আসার আগে থাকার জায়গাটা ঠিক করে নেয়া বিচক্ষণতার পরিচায়ক। যা হোক, হোটেল রাজধানীতে খাওয়া-দাওয়া সারতে প্রায় ৩টা বেজে গেল। কিছুক্ষণ পর আমরা রওনা হলাম পশ্চিম সৈকতে। এখানটায় অনেক লোকজনের ভিড়। কেউ সমুদ্রের ঢেউয়ে দাপাদাপি করছে, কেউ আবার ছাতার নিচে আরাম চেয়ার ভাড়া করে বসে আছে। কেউ ব্যস্ত ছবি তোলায়। দূরে দেখা যাচ্ছে স্পিডবোট ও ইঞ্জিনের নৌকা।

কুয়াকাটায় সূর্যাস্ত

আসলেই সমুদ্রের কাছে গেলে সবারই নিজেকে খুব ক্ষুদ্র মনে হয়। এখানে কিছুক্ষণ কাটানোর পর আমরা মোটর সাইকেল ভাড়া করলাম। চালকসহ বাইকে তিনজন বসা যায়। ভ্রমণের মূল অ্যাডভেঞ্চার এবার শুরু হলো। আমাদের গন্তব্য লেবুর চর আর লাল কাঁকড়ার চর। রাস্তা থেকে বাইকগুলো সাই সাই করে সৈকতের দিকে নেমে গেল। একে তো ভয়ঙ্কর ঝাঁকি, তার ওপর তীব্র বাতাস। জোরালো বাতাসকে কেটে যেন আমাদের বাইকগুলো ছুটে চলল সৈকতের বালুকাবেলার দিকে। সে এক বিরল অভিজ্ঞতা। বালুর ওপর দিয়ে যেতে হয়, তাই বাইকচালকদের সদা সতর্ক থাকতে হয়। একটু এদিক-সেদিক হলেই ঘটবে দুর্ঘটনা।

লেবুর চরের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে একটি নদী। অবশ্য নদী না বলে একে খালও বলা যায়। নদীর অন্য পাড়ে সুন্দরবনের পূর্ব অংশ। আমরা লেবুর চরে নেমে পড়লাম। ঘোরাঘুরি আর ছবি তোলায় কেটে গেল সময়টা। এর পর লাল কাঁকড়ার চরে। সেখানে কাঁকড়াগুলো সবাইকে মুহূর্তেই মুগ্ধ করে দিল। তবে লোকজন দেখলেই কাঁকড়াগুলো গর্তে ঢুকে যাওয়ার পাঁয়তারা করে। সেখানে দেখা মিলল জেলি ফিশের। লাল কাঁকড়ার চর ঘুরে আবার এলাম পশ্চিম সৈকতে। সেখানে শেষ বিকালে অপূর্ব সূর্যাস্ত উপভোগ করলাম। এক ফাঁকে স্পিডবোটে করে কিছুক্ষণ সমুদ্রে ঘোরা হলো। প্রতিটি অভিজ্ঞতাই ছিল মনে রাখার মতো।

যেদিন আমরা কুয়াকাটা পৌঁছলাম, সেদিন পূর্ণিমা না থাকলেও চাঁদটা বেশ বড়সড়ই ছিল। অনেক রাত পর্যন্ত সৈকতে বসে থাকা, গান গাওয়া, আড্ডা দেয়া— সবকিছুই ছিল খুব উপভোগ্য। পরের দিন ভোরে আমরা আবার বের হলাম সূর্যোদয় দেখব বলে। সৈকতের পূর্বদিকে গঙ্গামতির বাঁক থেকে সূর্যোদয় সবচেয়ে ভালো দেখা যায়। এর পর হোটেলে ফিরে গিয়ে পেট পুরে খেয়েদেয়ে বের হলাম মন্দির দর্শনে।

কুয়াকাটায় সূর্যোদয়

আবার মোটরসাইকেল ভাড়া করা হলো। প্রথমে মিশ্রিপাড়া বৌদ্ধ মন্দিরে। কুয়াকাটা সৈকত থেকে প্রায় আট কিলোমিটার পূর্বে। রাখাইন আদিবাসীদের আবাসস্থল মিশ্রিপাড়ার বৌদ্ধ মন্দিরে রয়েছে উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় বৌদ্ধ মূর্তি, যা ৩৬ ফুট উঁচু। এখানে দেখা মিলল রাখাইনদের হাতে বোনা কাপড়ের কয়েকটি দোকান। মধ্যবয়সী এক রাখাইন নারীর কাপড় বোনার দৃশ্য দেখতে ভালোই লাগল। এর পর গেলাম সমুদ্রসৈকতের কাছে অবস্থিত রাখাইন পল্লী কেরানিপাড়ায়। সেখানে একটি প্রাচীন কূপ দেখা হলো। কুয়াটির সামনেই প্রাচীন সীমা বৌদ্ধ মন্দির। মন্দিরের ভেতরে রয়েছে প্রায় ৩৭ মণ ওজনের অষ্ট ধাতুর তৈরি ধ্যানমগ্ন বুদ্ধমূর্তি। কুয়াকাটায় অনেক দর্শনীয় স্থান আছে। এর মধ্যে উল্লেখ করতে হয় আলীপুর বন্দর, শুঁটকি পল্লী, ক্রাব আইল্যান্ড বা কাঁকড়ার দ্বীপ প্রভৃতি।

সময় যেন দ্রুতই ফুরিয়ে এল। এবার ঘরে ফেরার পালা। দুপুরের দিকে আমরা বাসে চড়ে বসলাম। গন্তব্য পটুয়াখালী। পৌঁছতে আড়াই ঘণ্টার মতো লাগল। পটুয়াখালী থেকে এবার আমরা ঢাকাগামী লঞ্চে চড়ে বসলাম। তিনতলাবিশিষ্ট এমভি সুন্দরবন-৩ লঞ্চটি বিশাল বড়। ভ্রমণও বেশ আরামদায়ক। সিঙ্গেল ও ডাবল দুই ধরনের কেবিন আছে। আগে বুকিং করা গেলে ভালো, নয়তো কেবিন পেতে ঝামেলা পোহাতে হবে। বিকাল ৫টার দিকে আমাদের লঞ্চটি ছাড়ল। লঞ্চঘাটের শোরগোল, লঞ্চের বিকট হুইসেল, দুই পাড়ে চিরায়ত বাংলার গ্রাম, মানুষ আর প্রকৃতি দেখতে দেখতে এগিয়ে চলা, সর্বোপরি মেঘনা নদীতে সূর্যাস্ত— সবকিছুই মনে দাগ কাটার মতো। চারপাশ অন্ধকার করে যখন রাত নামল, আকাশ তখন ছিল তারা ভরা। নদীর জলেও তারাগুলোর প্রতিবিম্ব বেশ দেখাচ্ছিল। পাশাপাশি ছিল চাঁদের আলো। ডেকে দাঁড়ালে ঠাণ্ডা হাওয়া প্রাণ জুড়িয়ে দেয়।  রাতের খাবার, ডেক আর বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছবি তোলা, কফির উষ্ণতায় গলা ভেজানো— সবই ছিল উপভোগ্য। কিন্তু প্রকৃতি বোধহয় আমাদের তার দুই রূপই দেখাতে চাইছিল। ভোররাতে তাই আমাদের পড়তে হলো তুমুল ঝড় আর শিলাবৃষ্টির কবলে। নদীর ঢেউগুলো যেন অবাধ্য আর রাগি হয়ে উঠল তাতে। সেই রুদ্ধশ্বাস সময়গুলোর অভিজ্ঞতা নিয়েই আলাদা কিছু লিখে ফেলা যায় অনায়াসে।

সকাল ৬টার দিকে আমরা ঢাকা পৌঁছলাম। তখন মনে হচ্ছিল, আবার ফিরে যাই সাগরকন্যার কোলে। ভ্রমণের চেয়ে আনন্দময় আর কিইবা আছে?

লেখক: সম্পাদক, উইমেন ওয়ার্ডস

(লেখাটি এপ্রিল ২২, ২০১৬ তারিখে ‌‌‌‌‌বণিক বার্তা‌ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।)

 

Similar Articles

Leave a Reply