You are here
নীড়পাতা > প্রতিবেদন > মুক্তিযুদ্ধে সিলেটের নারী (পর্ব:৮)

মুক্তিযুদ্ধে সিলেটের নারী (পর্ব:৮)

আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধকে ঘিরে এক কাতারে এসে দাঁড়িয়েছিল আবালবৃদ্ধবনিতা, ছাত্র-শিক্ষক, কৃষক-মুটে-মজুর-কুলি, পেশাজীবি-শ্রমজীবী সবাই। মুক্তির আকাঙ্খায় মুছে গিয়েছিল ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ-অবস্থানভেদ। মুক্তিযুদ্ধে সংগ্রামের, ত্যাগের, সহ্যের, সাহসের এক অকৃত্রিম তুলনাহীন ভূমিকা পালন করেছিলেন আমাদের নারীরা। মুক্তিযুদ্ধে সিলেট অঞ্চলের নারীদের ভূমিকা নিয়ে  ‘মুক্তিযুদ্ধে সিলেটের নারী’ শিরোনামের ধারাবাহিক প্রবন্ধটি উইমেন ওয়ার্ডস  এর পাঠকদের জন্য লিখেছেন–

অপূর্ব শর্মা

অস্ত্র হাতে যুদ্ধের ময়দানে

সময়ের প্রয়োজনে একাত্তরে অনেক নারী অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিলেন। পুরুষের পাশাপাশি দেশ মাতৃকাকে পরাধীনতার শৃংখল থেকে মুক্ত করতে তারা ঝাপিয়ে পড়েছিলেন বহিঃশত্রুর উপর।যুদ্ধে প্রাণ হারানোর শঙ্কা থাকা সত্ত্বেও তারা পিছপা হননি।পাকহানাদারদের পরাজিত করতে লড়াই করেছেন সমানতালে। সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেওয়া অনেক নারী আজও রয়ে গেছেন নিভৃতে। এই পর্বে তুলে ধরা হলো যুদ্ধ জয়ী এক নারীর কথা।

ছামছুন নাহার   

ছামছুন নাহারের জন্ম সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার বড়বন্দ গ্রামে। স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় তাঁর বয়স ছিলো পনেরো। তাঁর বাবা আবদুল মজিদ ছিলেন কানাইঘাটের লক্ষ্মীপ্রসাদ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান। অনেকটা আকস্মিকভাবেই তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। পাঁচ নম্বর সেক্টরের মুক্তাপুর সাব-সেক্টরে যুদ্ধ করেন ছামছুন নাহার। সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মীর শওকত আলী।

মুক্তিযুদ্ধে যোগদান প্রসঙ্গে ছামছুন নাহার বলেন, আষাঢ় মাস। ক্যাপ্টেন ফারুক আহমদের নেতৃত্বে একদল মুক্তিযোদ্ধা আমাদের বাড়িতে আসেন। তাঁদের সন্দেহ ছিল আমার বাবা নাকি রাজাকার। তাদের ভুল ভাঙে। তাঁরা নিশ্চিত হন আমার বাবা ইউপি কার্যালয়ের আনসারদেরও মুক্তিযুদ্ধে পাঠিয়েছেন। সেদিন থেকেই আমাদের বাড়ি হয়ে ওঠে মুক্তিযোদ্ধাদের অস্থায়ী ক্যাম্প। ক্যাপ্টেন ফারুক আমার মাকে মা ডাকতেন। আমি তাঁকে ডাকতাম ভাই। আমার মা মুক্তিযোদ্ধাদের রান্না করে খাওয়াতেন।

যুদ্ধের সময় মানুষ বলাবলি করত রাজাকার ও পাকিস্তানি সেনারা তরুণী মেয়েদের পেলেই ধরে নিয়ে যায়। তাই আমার মধ্যে আত্মরক্ষার চিন্তা আসে। মুক্তিযোদ্ধা আকবর জমাদারের কাছে রাইফেল ও রিভলবার চালনা এবং গ্রেনেড নিক্ষেপের প্রশিক্ষণ নিই। আমার চাচা মুছব্বির হাজি রাজাকার ছিলেন। সময়টা ছিল ভাদ্র মাস। মুছব্বির হাজি ও হাজি মুহিব মৌলানাসহ আরো কয়েকজন অস্ত্রধারী রাজাকার পাকিস্তানি সেনাদের নিয়ে আমাদের বাড়িতে হামলা চালায়। সেদিন ফারুক ভাইসহ মুক্তিযোদ্ধারা অন্যত্র অপারেশনে ছিলেন। ক্যাম্পে ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা আবুল লেইস। পাকিস্তানি সেনারা বাড়িতে এসে গুলি ছুড়তে শুরু করলে বাড়ির লোকদের সরিয়ে ক্যাম্পের সব গোলাবারুদ ও বন্দুক পুকুরে ফেলে একটি রাইফেল হাতে তুলে নিই এবং আবুল লেইস ও আমি গুলি ছুড়তে ছুড়তে আত্মরক্ষার জন্য পেছনে চলে যাই। সেদিন থেকেই আমার যুদ্ধযাত্রা শুরু। ওইদিন পাকিস্তানি সেনার গুলিতে আমাদের গ্রামের লতিব আলী মারা যান।

আমাদের বাড়িতে হামলার আগের দিন রাজাকারদের সহযোগিতায় ক্যাপ্টেন বসারতের নেতৃত্বে পাকিস্তানি সেনারা পাশের মালিগ্রামে আগুন জ্বালিয়ে সব ছারখার করে দেয় এবং গ্রামের ২২ জনকে ধরে নিয়ে হত্যার পর মাটিচাপা দেয়। এই বিষয়টিও আমাকে কষ্ট দেয় এবং আমার ভেতর প্রতিশোধের নেশা জন্মে। এ ঘটনার এক সপ্তাহ পর রাজাকার মুছব্বির আলীর হুকুমে রাজাকার মকদুস আলী আমাদের ২৫টি গরু নিয়ে পাকিস্তানি সেনাক্যাম্পে দিয়ে আসে। খবর পেয়ে ১৫-২০ দিন পর আমরা মকদুসকে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে সারি নদীর কিনারে দাঁড় করাই। সুবেদার ওয়াহিদ মকদুসের মাথায় গুলি করেন, সে পানিতে পড়ে মরে যায়।

সব সময় মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে থাকলেও আমাকে সবার পেছনে রাখা হতো। গ্রেনেডসহ গোলাবারুদ থাকত আমার কাছে। অস্ত্র হিসেবে আমার হাতে থাকত একটি রিভলবার। কখনো রাইফেল দিয়েও গুলি ছুড়তাম। আমি সাঁতার জানতাম না। তাই সহযোদ্ধারা পানি বা খাল পার করাতেন আমার দুই হাতে ধরে। চতুল বাজার খালে যানবাহন পারাপারের জন্য নৌকা ফেরি (মাঝিমাল্লাচালিত ফেরি) ছিল। ফারুক ভাইয়ের নেতৃত্বে ডিনামাইট দিয়ে আমরা সেটি ধ্বংস করে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিলাম।

বাড়িতে হামলার পর আমার বাবা বড় বোন খয়রুনকে নিয়ে রতনপুর আশ্রয় নিয়েছিলেন। আপাকে তুলে নিতে মৌলভি মুহিব রাজাকার পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে নিয়ে সেখানে হামলা চালায়। আপা মামাদের সঙ্গে দৌড়ে পালিয়ে যান। বাবাকে রতনপুরের একটি বাড়ির ধানের ভাঁড়ারে বস্তার নিচে লুকিয়ে রাখা হয়। পরে বাবার কাছ থেকে জেনেছি, তাদের না পেয়ে বাড়ির চার তরুণীকে ধরে পাকিস্তানি সেনারা দরবস্থ ক্যাম্পে নিয়ে গিয়েছিল। আমাদের দুই বোনকে পাকিস্তানি সেনাদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য রাজাকাররা নানা চেষ্টা করেছিল। নভেম্বর মাসে আমার ভাইয়া লিয়াকত সিরাজীকে পাকিস্তানি সেনারা সিলেট সার্কিট হাউসে ধরে নিয়ে যায়। আমাকে ও আপাকে তাদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য ভাইয়াকে খুব বেশি মারধর করে। ভাইয়া বলছিলেন, পাকিস্তানি সেনার মারধর খাওয়ার চেয়ে বিষপানে মৃত্যু গ্রহণ করা হাজার গুণ ভালো। আনসারদের রাজাকার বাহিনীতে না দেওয়াতে পাকিস্তানি সেনারা আমার বাবাকে চতুল বাজার থেকে ধরে সড়কের বাজারে নিয়ে গাছে ঝুলিয়ে মারধর করেছিল। এই মারধর প্রভাবে অসুস্থ হয়ে ১৯৭৬ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

আমরা যুদ্ধ করেছি রাইলাড়া, রতনপুর, চতুলসহ বিভিন্ন এলাকায়। রাইলাড়া সম্মুখযুদ্ধে সুবেদার ওয়াহিদ গুলিবিদ্ধ হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করেন। ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে পাকিস্তানি সেনারা ফারুক ভাইকে ধরে নিয়ে যায়। খবর পেয়ে আমরা তাদের পিছু নিই। আকবর জমাদার, ইন্ডিয়ান আর্মি এস কে আহমদসহ আমরা সম্মুখযুদ্ধের মাধ্যমে ফারুক ভাইকে পাকিস্তানি সেনার হাত থেকে উদ্ধার করি। এতে পাকিস্তানি সেনারা পালিয়ে যায়। মুক্তিবাহিনীর হাতে নিহত নারী সরবরাহকারী ভক্কুত রাজাকারের লাশ কুলিবাড়িতে পড়েছিল, কেউ দাফন করেনি। শিয়াল-কুকুর ছিঁড়ে খেয়েছে।

দেশ স্বাধীনের পর ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকায় জেনারেল ওসমানীর আসার কথা ছিল। সশস্ত্র অবস্থায় ফারুক ভাই, আমিসহ মুক্তিযোদ্ধারা সেখানে জড়ো হই। কিন্তু ওসমানী সেখানে আসেননি। তারপর অস্ত্র জমা দেওয়ার জন্য ফারুক ভাই আমাকে সঙ্গে নিয়ে যেতে চাইলেন। আমার বাবা যেতে দিলেন না। মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে গিয়েছিলাম মা-বাবার অমতে। প্রথমদিকে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে না যাওয়ার জন্য আমাকে ঘরে আটকে রাখা হয়েছিল। তখন অনেক কান্নাকাটির পর বেরিয়ে গিয়েছিলাম।

বড় কষ্টের কথা, দেশ স্বাধীনের পর এলাকার মানুষ আমাকে নিয়ে কানাঘুষা শুরু করে। এলাকার স্বাধীনতাবিরোধী লোকজন আমাকে নিয়ে নানা কুৎসা রটায়। তারা বলত, ‘নষ্টা মেয়ে মুক্তির সঙ্গে থেকেছে, তার চরিত্র বলে কিছু রয়েছে নাকি?’ সম্মান বাঁচাতে বড় বোনের বিয়ের দুই বছর আগে আমাকে বিয়ে দেওয়া হয়।’

ছামছুন নাহারের স্বামী হাবিবুর রহমান পূবালী ব্যাংকের এজিএম। তিন ছেলে, এক মেয়ে নিয়ে সিলেটের উপশহরে ভাড়া বাসায় তাদের আবাস। নিজে যুক্ত আছেন রাজনীতির সাথে। বর্তমানে তিনি সিলেট জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের কৃষিবিষয়ক সম্পাদক।

মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে তালিকাভুক্ত না হওয়ার কারণে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাননি। তবে, মুক্তিযুদ্ধে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ক্যাপ্টেন ফারুকের দেওয়া একটি সার্টিফিকেট আছে তাঁর। ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের চেয়ারম্যান বরাবর নাম তালিকাভুক্তির জন্য আবেদন করেছেন তিনি।

আগের অংশ পড়ুন

মুক্তিযুদ্ধে সিলেটের নারী (পর্ব:৭)

Similar Articles

Leave a Reply